¦

এইমাত্র পাওয়া

  • চাঁদা না দেয়ায় নরসিংদীর পলাশে সন্ত্রাসীদের হামলায় সাবেক ফুটবলার নাদিরুজ্জামান খন্দকার নিহত
চরাঞ্চলের প্রসূতিরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত

রীতা ভৌমিক | প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৫

পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়নের চর সাড়াশিয়া গ্রামের গৃহবধূ ছালমা খাতুন। প্রথম সন্তান মেয়ে, দ্বিতীয়টি ছেলে। এরপর তৃতীয়বার গর্ভবতী হন তিনি। তার ইউনিয়নে মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। এমনকি গ্রামে মাসে একদিন স্যাটেলাইট ক্লিনিক বসলেও তাদের সময়ের ঠিক-ঠিকানা নেই।
গর্ভাবস্থায় আপনি আপনার ইউনিয়নের উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে ডাক্তার দেখাননি কেন জানতে চাইলে ছালমা খাতুন (৩২) বলেন, বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার হাঁইট্যা যমুনা নদীর পাড়ে আইস্যা নৌকাযোগে পার হইতে হয়। এরপর অটোতে গিয়া হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়নের উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেখানে যাইতে ৫০০ থাইক্যা ১ হাজার টাকা খরচ লাগে। কৃষি শ্রমিক সোয়ামির পক্ষে এত টাকা খরচ কইর‌্যা গর্ভবতী সময়ে আমারে ডাক্তর দেখানো বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না। প্রথম দুই বাচ্চা গ্রামের দাই প্রসব করাইছে। ভাবছিলাম এইবারও তিনিই করাইবেন। রাত দশটার দিকে আমার প্রসব ব্যথা শুরু হয়। স্থানীয় দাইকে আমার সোয়ামি ডাইক্যা আনেন। দাই অনেক চেষ্টা করার পরও সন্তান প্রসব না হইলে আমার সোয়ামি গ্রাম্য ডাক্তর ডাইক্যা আনেন। ডাক্তর আমারে ইনজেকশন দেয়। বাচ্চার মাথা বারাইয়া আসে। শরীর আটকাইয়া যায়। বাচ্চা না বাইর হইলে আমার সোয়ামি ইউনিয়নে নেয়ার জন্য নৌকার চেষ্টা করেন। রাইত বারটায় নৌকা পাওয়া যায় না। ডাক্তর আমার বাচ্চারে টাইন্যা হেঁচড়াইয়্যা বাইর করে। জেতা বাচ্চা মরা হইয়া বারাইল। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হইলে আমি দ্রুত হাসপাতালে যাইতে পারতাম। আমার বাচ্চা মরা বাইরাইত না। এরপর আরো দুইটা মাইয়্যা হয়। তাগো বয়স ১৮ ও ৭ মাস।
আপনার তিন মেয়ে, দুই ছেলের মধ্যে এক ছেলে মারা গেছে আপনি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করেন না জানতে চাইলে ছালমা বলেন, আমাগো এসবের দরকার নাই। বাচ্চা বেশি হইলে তারা আমাগো সম্পদ। বুড়া বয়সে ছেলেমেয়েগো বাড়িতে ঘুইর‌্যা ঘুইর‌্যা খামু।
চৌদ্দ বছর বয়সে মোসাম্মৎ সাজেদা খাতুনের বিয়ে হয় চরসাড়াশিয়া গ্রামের মাঝি আমোদ আলীর সঙ্গে। তাদের এক ছেলে, দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সাজেদা খাতুন এখন ছয় মাসের গর্ভবতী।
চেকআপ করাতে স্যাটেলাইট ক্লিনিকে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার কাছে গিয়েছেন বলতেই সাজেদা জানান, তিন বাচ্চার জন্ম তো বাড়িতে দাইয়ের হাতেই হইছে। এইবারও হইব। কারণ তাগো আসনের সময়গময় নাই। তাই যাইও না। হাটুরিয়া ইউনিয়নের উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে বালিরচর দিয়া দুই মাইল হাঁইট্যা যমুনা নদীর পাড়ে আসতে হয়। নৌকায় যমুনা নদী পার হইয়া নাকালিয়া বাজার আসতে এক ঘণ্টা লাগে। এরপর নৌকা সব সময় পাওয়া যায় না। ভোর থাইক্যা সকাল দশটা পর্যন্ত এক থাইক্যা দুই ঘণ্টা পরপর নৌকা পাওয়া যায়। দুপুরে যারা হাট-বাজারে আসেন সেই নৌকা পাওয়া যায়। রিজার্ভ ছাড়া সারাদিন নৌকা পাওয়া যায় না। রাইত হইলে রিজার্ভ নৌকা ৭০০ টাকা পর্যন্ত পড়ে। মুমূর্ষু রোগী হইলে চাইর জন মানুষ কাঁধে কইর‌্যা নিয়া আসে নদীর পাড়ে। মাঝখানে শরীর খারাপ হওয়ায় একবার বেড়া উপজেলা হাসপাতালে গেছিলাম। তারা বলছেন আমি রক্তশূন্যতা, অপুষ্টিতে ভুগতাছি।
গর্ভবতী অবস্থায় কী কী পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়, কতখানি পরিমাণ খেতে হয় তা কি আপনি জানেন, জানতে চাইলে সাজেদা (৩০) বলেন, সোয়ামি বেশি হইলে চারদিন নৌকা বাইতে পারে। সপ্তাহে ১ থেকে ১,৫০০ হাজার টাকা রোজগার করে। সবই তো কিন্যা খাইতে হয়। এমনকি এই ঘরটা যে করছি হেই জমির মালিককে বছরে দেড় হাজার টাকা জমির লিজের জন্য ভাড়া দেওন লাগে। পাঁচ জনের সংসারে আমি ভালোমন্দ খামু কেমন কইর‌্যা। আমাগো মতো গরিব মাইনষের এসব চলে না।
তিন বাচ্চার পরও আবার সন্তান নিলেন জানতে চাইলে সাজেদা জানান, এক ছেলের ভরসা নাই। ছেলের আশায় আরেকটা বাচ্চা নিলাম।
চর সাড়াশিয়া গ্রামের একজন শিক্ষকের বাড়িতে প্রতি মাসে একদিন স্যাটেলাইট ক্লিনিক বসে। ২০ মে দুপুর ১২টার দিকে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নূরজাহান বেগম এই বাড়িতে আসেন গর্ভবতীর চেকআপ এবং এলাকার গৃহবধূদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি দেয়ার জন্য।
সকাল ৯টায় আসার কথা থাকলেও এত দেরিতে কেন আসলেন জানতে চাইলে নূরজাহান বলেন, যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে দেরি হয়ে যায়। মাসে একবার গর্ভবতীর চেকআপ করি। কারও সমস্যা হলে আলট্রাসনোগ্রাফ করতে দিই। জটিল সমস্যা দেখা দিলে বেড়া উপজেলা হাসপাতালে পাঠাই। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর থেকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে দরিদ্র প্রসূতিদের জন্য ডেলিভারি কিট প্রদান করা হচ্ছে। একটি ডেলিভারি কিট দিয়ে দশটি ডেলিভারি করা যাবে। হাটুরিয়া ইউনিয়নে আপনারা ডেলিভারি কিট পেয়েছেন জানতে চাইলে নূরজাহান বেগম জানান, এখনও ডেলিভারি কিট পাইনি।
এ প্রসঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিটের উপপরিচালক ডা. তাপস রঞ্জন দাস বলেন, দরিদ্র প্রসূতিদের জন্য বিনামূল্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেলিভারি কিট প্রদানের প্রক্রিয়াটি নতুন। তাই পাবনার বেড়া উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে এটি প্রদান করতে কিছুটা সময় লাগবে।
একশন এইড বাংলাদেশ-এর ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে এর তথ্য মতে, পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়নের চর নাকালিয়া ও চর সাড়াশিয়া গ্রামে গর্ভবতীর সংখ্যা ২১ ও ১৯ জন।
পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার যমুনা নদীর তীরে চর নাকালিয়া, চর সাড়াশিয়া এবং চর নাগদায় কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। এই তিনটি গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা খুবই শোচনীয়। যমুনা নদী পার হয়ে এলাকার মানুষকে হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে হয়। এই উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমবিবিএস চিকিৎসক নেই। একজন ফার্মাসিস্ট, একজন আয়া রয়েছেন। সহকারী মেডিকেল কর্মকর্তা সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত থাকেন। গর্ভবতীর জটিল সমস্যা দেখা দিলে বেড়া উপজেলা হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে একশন এইড বাংলাদেশের পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার প্রোগ্রাম অর্গানাইজার মোহাম্মদ মানিক মিয়া বলেন, চরের মানুষের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সহজতর করার জন্য একশন এইড বাংলাদেশের আর্থিক সহযোগিতায় ২০০৬ সালের অক্টোবরে পাবনা জেলায় রিভার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা চালু হয়। একশন এইড বাংলাদেশ তার সহযোগী সংস্থা শার্প-এর মাধ্যমে বেড়া উপজেলায় ২০০৯ সালে একটি রিভার অ্যাম্বুলেন্স চালু করে। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে অ্যাকশন এইড রিভার অ্যাম্বুলেন্স ইউনিয়ন পরিষদকে হস্তান্তর করে। ইউনিয়ন পরিষদে রিভার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতি সপ্তাহে দু’দিন করে একেকটি চরে রিভার অ্যাম্বুলেন্স থাকবে। ফেব্রুয়ারি মাসে ইউনিয়ন পরিষদে রিভার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট না থাকায় নৌকার মাঝি রাখতে পারছে না। ফলে সঠিকভাবে রিভার অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা হচ্ছে না।
হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ চাঁদ প্রামাণিক বললেন অন্য কথা। তিনি বলেন, একশন এইড বাংলাদেশ হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়নের গ্রামগুলোর জন্য যে রিভার অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছে তাতে পানি উঠে নৌকা ডুবে যায়। মাঝি কোনো সমস্যা নয়। নৌকাটি ঠিক করছেন না কেন জানতে চাইলে চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ চাঁদ প্রামাণিক বলেন, একশন এইড ঠিক করে দিবে বলেছে।
আপনার ইউনিয়নের গর্ভবতীর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের অবস্থা খুবই শোচনীয়, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি? এ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ চাঁদ প্রামাণিক জানান, হাটুরিয়া নাকালিয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমবিবিএস ডাক্তার নেই। সাধারণ চিকিৎসা ছাড়া আর কোনো স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায় না। আমরা টিএনও পর্যন্ত আমাদের সমস্যা জানাতে পারি। তার থেকে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার কাছে আমাদের এলাকার সমস্যার কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। সরকার ডাক্তার নিয়োগ দিলে গর্ভবতীরা চিকিৎসাসেবা পাবেন।
এ প্রসঙ্গে ৯নং ওয়ার্ডের (চর নাগদা, চর নাকালিয়া এবং চর সাড়াশিয়ার সামান্য অংশ) মেম্বার জাহিদ বলেন, সভায় আমি প্রস্তাব রেখেছি চেয়ারম্যান মেরামত না করলে আমি নিজ উদ্যোগে এলাকার গর্ভবতী ও প্রসূতি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য রিভার অ্যাম্বুলেন্স মেরামত করব।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়নে মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই এটি আমার জানা ছিল না। উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমবিবিএস ডাক্তার নেই তাও জানি না। এই ইউনিয়নের যে তিনটি গ্রামের গর্ভবতী ও প্রসূতি মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গর্ভকালীন কতবার চেকআপ করাতে হয় এবং নিয়মিত চেকআপ না করালে কী সমস্যা হতে পারে এ প্রসঙ্গে বারডেম হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী বলেন, একজন গর্ভবতী কমপক্ষে চারবার চেকআপ করাবেন। প্রথমটি ১৬ সপ্তাহে, দ্বিতীয়টি ২৪ সপ্তাহে, তৃতীয়টি ৩২ সপ্তাহে এবং চতুর্থটি ৩৬ সপ্তাহে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার না খেলে মা ও শিশু অপুষ্টিতে ভুগতে পারে। রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে শিশু ঠিকমতো বেড়ে উঠবে না। নানাবিধ সমস্যা দেখা দিবে। এমনকি মা ও শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।
 

সুরঞ্জনা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close