¦

এইমাত্র পাওয়া

  • বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পার্শ্বে কোনাবাড়ি এলাকায় বাসে পেট্রোল বোমা হামলা: ৬ যাত্রী দগ্ধ ২ জনের অবস্থা আশংকাজনক
বাংলাদেশী নাটকে ভাষার বিকৃতি

সেলিম কামাল | প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

অফিস-আদালতে ভাষাকে সম্মান জানিয়ে নিয়ম তৈরি করা হলেও মাতৃভাষার প্রতি অবহেলার এ প্রবণতা আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সবচেয়ে বেশি। অথচ, এ মাধ্যমগুলোতেই ফেব্র“য়ারি মাস এলে বাংলা ভাষা নিয়ে তৈরি হয় নানা অনুষ্ঠান। কর্মকর্তা আর নীতিনির্ধারকদের অন্তরে নয়, টিভি স্ক্রিনের এককোণে স্থান পায় শহীদ মিনারের ছবি। এমনকি সেই মাসেও আধো বাংলা আর আধো ইংরেজির মিশ্রণে অন্য রকম স্টাইলে কথা বলার ভঙ্গিতে পাওয়া যায় তরুণ কোনো জকিকে। বিভিন্ন নাটকের সংলাপে সারা বছরই আমরা শুনতে পাই অশুদ্ধ বাংলার ছড়াছড়ি। এ অশুদ্ধ ‘অনুশীলন’ এতটাই বাজে প্রভাব ফেলেছে যে, তরুণ-তরুণীরা সংবাদ পড়তে গিয়ে ভীষণ বিপাকেই পড়ে যান। অনেক সময় এমনও দেখা যায়, টিভি রিপোর্টারদের কেউ কেউ অশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ নিয়েই দিনের পর দিন সংবাদ বর্ণনা করে যাচ্ছেন।
তাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বাংলা ভাষাকে যদি আমরা সঠিকভাবে নিজেদের মতো প্রকাশ করতে এবং তুলে ধরতে না পারি, তাহলে কী লাভ হল- এ ভাষার জন্য জীবন দিয়ে? দেশীয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদের মাতৃভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টিভি নাটকে ভাষার নেতিবাচক ও দুর্বল ব্যবহারের ফলে। একসময় টিভি নাটক দেখে অনেকে শুদ্ধ বাংলা ভাষা শেখার চেষ্টা করতেন। এখন আর কেউ বাংলা ভাষা শেখার জন্য টিভি নাটক অনুসরণ করেন না। কেউ কেউ এমনটি মনে করেন যে, এ সময়ের একশ্রেণীর নির্মাতার টিভি নাটক দেখলে নিজের জানা শুদ্ধ ভাষাই ভুলে বসে থাকতে হবে। যারা এ কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, তারা জানেন না, নিজের ভাষার কতটা ক্ষতি সাধন করছেন। আমরা মঞ্চ নাটকে শুদ্ধ বাংলায় সংলাপ ব্যবহার দেখে থাকি। যদি আঞ্চলিক কোনো নাটক হয়, তবে সেটা ভিন্ন কথা। আমাদের টিভি নাটকে বাংলা ভাষার উচ্চারণে অশুদ্ধতা অসংলগ্নতা কখনও মেনে নেয়া যায় না। কিছু কিছু টিভি নাটকে এখন যে ধরনের সংলাপ বা দৃশ্য দেখি, তা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের বাংলা ভাষা অনেক সমৃদ্ধ এবং সুললিত। এ ভাষায় আমরা আমাদের মনের চাওয়া-পাওয়া এবং বিভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ করে থাকি। কিন্তু সেই ভাষাকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার এ প্রবণতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। নাটককে আমরা বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করে থাকি। নাটক হল শ্রেণী-সংগ্রামের সুতীক্ষè হাতিয়ার, প্রতিবাদের বাহন, নাটক আমাদের সব অবক্ষয় দূর করতে শেখায়, আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে। এখনকার কিছু নাটকের সংলাপ শুনে আহত হতে হয়। যেটা শিল্পমানে সমৃদ্ধ নয়, যার মধ্যে মাধুর্য নেই সেটা কখনোই সংলাপ হতে পারে না। অশুদ্ধ বাংলা ব্যবহার যারা করেন, তারা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, আমরা নাটকে নিজেদের জীবনটাকে তুলে ধরছি। কিন্তু কথা হল, নাটকের সংলাপে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট, সুনিয়ন্ত্রিত কাঠামো থাকতে হবে। আমার ভাষা আজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন আমাদের উচিত বাংলা ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করা। আর তা না করে, যদি আমরা বাংলা ভাষা নিয়ে নিজের মতো করে নতুন কিছু প্রবর্তনের চেষ্টা করি, সেটা বোধকরি ভালো দেখায় না। তুই-তামারি, করছি-খাইছি-গেছি, এমনকি বিভিন্ন রকম গালাগাল উচ্চারণ করতে শোনা যায়। এটা এক ধরনের অসভ্যতা। বাংলা ভাষাকে নিয়ে এ ধরনের ছেলেখেলা বন্ধ করতে হবে। যারা বাংলা ভাষাকে নিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করছেন তাদের বলব, আপনাদের দরকার নেই এত আধুনিকতা দেখানোর। উচ্চারণ নিয়ে এত গবেষণা করার আপনার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বাংলা ভাষাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন, এটি ভীষণ পীড়াদায়ক। যারা আমাদের ভাষাকে নষ্ট করে দিচ্ছে, এখনই তাদের সচেতন হওয়া উচিত। আর তা না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলা ভাষা অবক্ষয়ের চর্চা শুরু করবে। নাটকের চরিত্রের দোহাই দিয়ে অশুদ্ধ বাংলা ভাষার ব্যবহার মেনে নেয়া যায় না। মনে রাখতে হবে, টেলিভিশন হল ড্রয়িংরুম মিডিয়া। ঘরে বসে কেউ এ রকম শব্দ শুনতে চায় না। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমরা যে কোনো মাধ্যমে যা-ই করি না কেন, সেখানে প্রমিত বাংলার ব্যবহার থাকা উচিত। আমরা যখন কোনো ভাষা উচ্চারণ করতে যাই, তখন সে ভাষার অভিধানে যেভাবে উচ্চারণ রয়েছে, সেভাবেই তা করা উচিত। সংলাপ লিখতে গেলেও বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। ভাষার ক্ষেত্রে আমরা যদি যত্নশীল না হই, তা হলে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে কী শিখবে বা আমরা কী রেখে যাচ্ছি তাদের জন্য? আমরা যদি বাংলা ভাষার উন্নয়ন করতে না পারি, তা হলে তা যেন নষ্ট না করি। যারা বাংলা ভাষাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছেন, তাদের শোধরানো প্রয়োজন। সহজে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য অনেক কিছু করা যায়। আগামী প্রজন্মের কথা ভেবেই বাংলা ভাষাকে আমাদের শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা উচিত। যারা সাংস্কৃতিক কর্মী, শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চা অব্যাহত রাখা তাদেরই দায়িত্ব। পাশাপাশি টিভি বা রেডিও চ্যানেল কর্তৃপক্ষকেও এ বিষয়টির দিকে নজর দেয়া উচিত। মনে রাখতে হবে- সব পরিবর্তনই উন্নয়ন নয়, যেমন সব চলাই সামনে এগিয়ে যাওয়া নয়। আমাদের টিভি নাটকের বিষয়বস্তু ও নির্মাণে নবীন নির্মাতারা অনেক পরিবর্তন এনেছেন, একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তেমনি তাদের কারও কারও কারণেই যে টিভি নাটকে আপত্তিকর সংলাপ, অশোভন দৃশ্য এবং উদ্ভট ও অবাস্তব বিষয়বস্তু আমাদের তরুণ সমাজকে নেতিবাচক মানসিকতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে- এ কথাও মানতে হবে। মূলধারার নির্মাতা-কুশলীরা মনে করছেন, গত কয়েক বছর ধরে টিভি নাটকের সবচেয়ে বড় অধঃপতন হচ্ছে এর মাধ্যমে ভাষা বিকৃতিকে চরমে পৌঁছে দেয়া।
নাটকের সংলাপ বা বিজ্ঞাপনে আটপৌরে ভাষার ব্যবহার টেলিভিশনের পর্দায় বড় কোম্পানিগুলোর অর্থায়নে যদি হতেই থাকে- তবে বাংলা ভাষার মান তো থাকবেই না, বরং ভাষার প্রাণ নিয়েও টানাটানি হতে পারে।
নাটকে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াও শুদ্ধ ভাষা চর্চার অন্তরায়। যারা শুদ্ধ বাংলায় সংলাপ দিয়ে নাটক জমাতে পারেন না, তারাই আঞ্চলিক ভাষার রস নিয়ে নাটককে রসালো করতে চান। এ প্রবণতাও কমাতে হবে। মনে রাখতে হবে সবকিছুতেই নান্দনিকতা থাকে, শুধু বৈচিত্র্যের দোহাই দিয়ে শুধু আঞ্চলিকতার দোহাই দিয়ে অশুদ্ধ বাংলার ওপর নির্ভর করে চলতে থাকলে বাংলা ভাষা অচিরেই হারাবে তার মাধুর্য।
 

তারাঝিলমিল পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close