¦
রুনা লায়লা একজনই

এফ আই দীপু ও অভি মঈনুদ্দীন | প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

অনেকেই রুনা লায়লাকে খুব গম্ভীর ভাবেন। আদপে মোটেও তিনি তা নন। অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে থেকেও খুব সহজ, সরল আর প্রাণবন্ত একজন মানুষ তিনি। নতুন কিংবা পুরনো কারও সঙ্গে কথা বলতে গেলে ঠোঁটের কোণে সহজ-সরল হাসি লেগেই থাকে। রুনা লায়লা এমনই। চারপাশের মানুষগুলো যেন তার মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে থাকেন। বিশেষ করে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে কেউ এলে যদি প্রশ্ন করা হয় কার গান শুনেছেন? জবাবে ‘রুনা লায়লা’র নামটিই আসে সবার আগে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়া রুনা লায়লা’র কণ্ঠে গান এলেই যেন সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বিগত পাঁচ দশক ধরে সুরেলা কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে আসছেন কিংবদন্তি এই গায়িকা। তার গানে মুগ্ধ হয়ে প্রতিনিয়ত ভক্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের কোনো শিল্পী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এতটা সুনাম অর্জন করতে পারেনি।
মাত্র ৬ বছর থেকেই গানের প্রতি অসীম ভালোবাসা জমে উঠে তার মনে। সে বয়সেই তার জন্য বাসায় গান শেখার ব্যবস্থা করা হয়। পুরো পরিবারই তখন করাচিতে। বড় বোন দীনাও গান করেন। ঢাকা ওল্ড বয়েজ এসোসিয়েশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে দীনার গাইবার কথা। কিন্তু হঠাৎ করেই দীনার গলা খারাপ হয়ে গেল। আয়োজকরা পড়ল বিপদে। তারা বাসায় এলে দীনার মা বললেন, ‘দীনা না গাইতে পারলে রুনা গাক’। এ কথা শুনে আয়োজকরা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। এতটুকুন মেয়ে কী গান গাইবে? শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানে রুনা লায়লা একটি ক্ল্যাসিকাল রাগ গাইলেন। তাক লেগে গেল সবার মনে। সবাই দেখল মাত্র ছয় বছরের একটি মেয়ে, তানপুরা যার চেয়ে অনেক বড় সে বসে বসে গাইছে। বিমুগ্ধ শ্রোতা হয়ে থাকল সবাই। গান শুনে শেষে সবাই খুশি, অ্যাওয়ার্ড পেলেন রুনা, সঙ্গে কিছু ক্যাশপ্রাইজও।
বয়স যখন নয় বছর তখন ইন্টার স্কুল মিউজিক কম্পিটিশন হয়েছিল রেডিও পাকিস্তানের উদ্যোগে। কিন্তু রুনা লায়লা ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্রী বলে আয়োজকরা নিতে চাননি। তাদের কথা শুধু উর্দু মিডিয়ামের যারা তারাই অংশ নিতে পারবেন। বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ওই অনুষ্ঠানে রুনাকে গাইবার সুযোগ দেয়া হল। সুযোগটি মোটেও হাতছাড়া করেননি তিনি। আয়োজকদের অবাক করে দিয়ে একটি গজল গেয়েই প্রথম পুরস্কার নিজের ঝুলিতে ভরে নেন। ওই সময় থেকেই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় তার। গানের চর্চা আরও বেশি করে শুরু হল রুনার।
পাকিস্তান আমলে ‘জুগনু’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাকে যাত্রা শুরু হয় কিংবদন্তি এ গায়িকার। গানের শিরোনাম ছিল ‘গুড়িয়াসি মুন্নী মেরি ভাইয়া কী পেয়ারি।’ ১৯৭৪-এ বাংলাদেশে এলেন রুনা লায়লা। সে বছরের শেষে প্রথমবারের মতো ভারত সফরে গেলেন তিনি। সেখানেই প্রথম পরিচয় হয় লতা মুঙ্গেশকরের সঙ্গে। ১৯৭৪ সালের শুরুতে দেশে ফিরে প্রয়াত সত্য সাহার সুরে ‘জীবন সাথী’ ছবির মাধ্যমে প্রথম বাংলা ছবিতে গান করেন। গানের শিরোনাম ছিল ‘ও জীবন সাথী তুমি আমার’। এ গানে তার সঙ্গে কণ্ঠ দেন খন্দকার ফারুক আহমেদ। ইন্দিরা রোডের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডিওতে গানটি ধারণ করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বহু চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করেছেন তিনি। একই বছর বিটিভিতে একটি অনুষ্ঠানে গাইবার সুযোগ পান রুনা লায়লা। দেবু ভট্টাচার্যের সুরে ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের লেখা পাঁচটি গান ধারণ করা হল অনুষ্ঠানটির জন্য। সে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের গেটাপে পরিবর্তন নিয়ে আসেন। গানের সঙ্গে একটু নাচ হলে মন্দ হয় না। স্টেজে নেচে গেয়ে পারফর্ম করলেন। ব্যস, আর যায় কোথায়! সবার দৃষ্টি রুনা লায়লার দিকে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে রুনার গায়কীর সুনাম।
১৭ নভেম্বর জন্ম নেয়া রুনা লায়লাকে প্রশ্ন করা হয়, জন্মদিনের বিশেষ কোনো তাৎপর্য কী বহন করে? জবাবে রুনা লায়লা বলেন, ‘প্রতিদিনই আমার কাছে একটি নতুন দিন, জন্মদিনও তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। সূর্যের আলো, বিকেলের মৃদু হাওয়া, সাঝের মায়া, চাঁদের আলো সবই নতুন মনে হয়। এভাবেই ভাবতে ভালো লাগে আমার।’ শৈশবের আবদার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিশেষ কোনো দিন এলেই নতুন জামা, নতুন জুতা, চুলের ফিতা এগুলোর প্রতি আবদান থাকত বেশি। ছোটবেলায় জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বন্ধুরা বিভিন্ন অতিথিরা মোড়কে আচ্ছাদিত উপহার নিয়ে আসত। ওগুলো খুলে অন্যরকম আনন্দ পেতাম। এখন সেই আনন্দটা খুব মিস করি।’ বিদেশী তারকারা বাংলাদেশে এলে রুনাকে চেনেন কিংবা তার গান মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন, এমন মন্তব্যে রুনার অনুভূতি কী? কিছুটা ভাবান্তর নিয়ে তিনি বলেন ‘খুবই ভালো লাগে। একজন বাংলাদেশী হিসেবে এটা আমার জন্য অবশ্যই গর্বের ব্যাপার। বাইরের দেশে গেলে অনেকে সৌজন্য দেখিয়ে প্রায়ই বলেন, বাংলাদেশ মানেই রুনা লায়লা। এটা অবশ্যই বিরাট পাওয়া।’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িতও¡ পালন করছেন রুনা লায়লা। ঘুরেছেন বিভিন্ন দেশ। বাংলাদেশের সংস্কৃতি নিয়ে বিদেশীদের মনোভাব কেমন লক্ষ্য করেন? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সুর-ক্ষেত্র’ প্রতিযোগিতায় ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিযোগীদের সামনে বিচারক হিসেবে কাজ করেছি। ওখানে অনেকেই বলেছেন, বাংলাদেশের প্রতিযোগী থাকলে আরও ভালো হতো। আগামীতে ‘সুর-ক্ষেত্র’র নতুন আসর হলে বাংলাদেশের নবীনদেরও গাওয়ার সুযোগ দিতে চায় ওরা। এতেই বোঝা যায়, আমাদের দেশের গান-বাজনা নিয়ে তাদের ইতিবাচক ধারণা রয়েছে।’
সঙ্গীত জীবনে ১৯টি ভাষায় অসংখ্য গান গেয়েছেন। আগামী প্রজন্মের জন্য আপনার গাওয়া গানগুলো সংরক্ষণের বিষয়ে কিছু ভেবেছেন কী? এমন প্রশ্নে রুনা বলেন, ‘এ নিয়ে ভেবেছি। তবে কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় কাজটি করব তা এখনও চূড়ান্ত করিনি। হয়তো খুব শিগগিরই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিব।’ গান গাওয়ার পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন রুনা লায়লা। সে স্মৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে কী অভিনয় করার অনেক প্রস্তাব পেয়েছি। বলিউডের প্রয়াত সুপারস্টার রাজেশ খান্নাও তার চলচ্চিত্রে আমাকে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজি হইনি। আমি গান নিয়েই থাকতে চেয়েছি। কিন্তু চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘শিল্পী’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি এক বছর ভাবার পর। এর গল্প ছিল আমাকে নিয়েই। কিছুদিন আগে আমি এবং আমার স্বামী আলমগীর একটি বিজ্ঞাপনে মডেল হয়ে কাজ করেছি। একটি পরিবারের গল্প, তাই কাজটি করা। সত্যি বলতে কী গান গেয়ে শ্রোতাদের ভালোবাসা পেয়েছি সবসময়। তারা আমার গান পছন্দ করেছেন, করছেন এখনও। তাদের জন্য চিরকাল গাইব।’ ঢাকার চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত তিনি সর্বোচ্চ পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথম এই পুরস্কার লাভ করেন ‘যাদুর বাঁশি’ চলচ্চিত্রে গাওয়ার জন্য। পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার জন্য পেয়েছেন দু’বার ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’। বরেণ্য এই কণ্ঠশিল্পী এখন পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন।
 

তারাঝিলমিল পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close