¦
রোজিনা একাল আর সেকাল

অভি মঈনুদ্দীন | প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০১৫

মায়ের অনেকটা কড়া শাসনে কেটেছে রোজিনার ছোটবেলা। তবে তার বাবা একটু নরম স্বভাবের ছিলেন বলে দুষ্টুমি করলেও ছাড় পেয়ে যেতেন। ছোটবেলায় কবরী আর শাবানার ভীষণ ভক্ত ছিলেন রোজিনা। মনের অজান্তে সে সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কবরীর মতো হাসার চেষ্টা করতেন। ঢাকার আলীজান আর সোলেমানের বাবা-মায়ের সঙ্গে রোজিনার বাবা-মায়ের সম্পর্কটাও ছিল বেশ মধুর। তাদের বাসাতেও যাতায়াত ছিল রোজিনাদের পরিবারের। আলীজান, সোলেমান আর তার বন্ধুরা মিলে নাটকের ক্লাব পরিচালনা করতেন। প্রতি বছরই তারা নাটক মঞ্চস্থ করতেন। মাঝে মধ্যে তারা রোজিনাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যেতেন। তাদের কাছে রোজিনা নায়িকা হওয়ার ইচ্ছার কথা বেশ কয়েকবার প্রকাশ করেন। একবার রোজিনাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পর আলীজান ও সোলেমান রোজিনার মাকে নায়িকা হওয়ার বিষয়টি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তার মা কোনো কিছুতেই রাজি হলেন না। ভীষণ মন খারাপ হল রোজিনার। এদিকে ঢাকায় আলীজান, সোলেমান তাদের বার্ষিক নাটক শায়েস্তা খাঁর মহড়া করছেন। তাতে রোজিনাও অংশ নিলেন। লালবাগ হলে সে নাটকে রোজিনার অভিনয় দর্শককে ভীষণ মুগ্ধ করে। খল অভিনেতা দারাশিকোর সঙ্গে আলীজানের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। একদিন কালীদাস বাবুর পরিচালনায় ‘জানোয়ার’ ছবির শুটিং দেখতে গেলেন রোজিনা, আলীজান, সোলেমানসহ আরও কয়েকজন। সংসদ ভবনের খেজুর বাগানে তখন শুটিং হচ্ছিল। সেটা রোজিনার দেখা জীবনের প্রথম কোনো ছবির শুটিং। দৃশ্যটি ছিল এমন, শর্বরী নাচবেন, দারাশিকো মদপান করবেন আর তা উপভোগ করবেন। তো পরিচালক উপস্থিত দর্শকের মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে যেতে বললেন। তার কাজ হবে ট্রেতে করে মদের বোতলটা দারাশিকোকে দিয়ে আসা। রোজিনা নিজে থেকেই বললেন, আমি যাব। তাকে একটি প্যান্ট আর শার্ট দেয়া হল। তা পরিধান করলেন। এরপর দেয়া হল মেকাপ। ঘটনাটা ১৯৭৬ সালের একেবারে শুরুর দিকে। মুভি ক্যামেরার সামনে ওটাই ছিল রোজিনার প্রথম কাজ। এদিকে শুটিং শেষ হওয়ার পর ফটোগ্রাফার রোজিনার বেশকিছু ছবি তুললেন। আর সেই ছবি এ হাত ও হাত ঘুরে গিয়ে পড়ল ‘সাগর ভাসা’ ছবির প্রযোজক আফজাল সাহেব ও ফখরুল সাহেবের হাতে। তারা রোজিনার ছবি দেখে মুগ্ধ হন। খবর পাঠালেন রোজিনাকে সরাসরি দেখার জন্য। আবৃত্তি, নাচ, অভিনয় কোনোটাতেই অভ্যস্ত ছিলেন না রোজিনা। তাই সেদিন এ দুজন প্রযোজকের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলেন। এক পর্যায়ে দুজনের সামনেই রোজিনা অভিনয় করলেন। আর তার সবকিছুই প্রযোজকদের পছন্দ হল। চূড়ান্ত করা হল ‘সাগর ভাসা’ ছবিতে নবাগত নায়ক চঞ্চল মাহমুদের বিপরীতে অভিনয় করার জন্য। স্বপ্নের খুব কাছাকাছি পৌঁছতে পারার কারণে এক অনাবিল আনন্দ যেন দোলা দিয়ে গেল রোজিনার মনে। কিন্তু তারপরও যেন সেই খুশিটা স্থায়িত্ব পেল না। হঠাৎ পক্স রোগে আক্রান্ত হলেন। ছবিতে শুটিং করতেই হবে এমন ভাবনায় যত দ্রুত রোগ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় সেজন্য শুরু করলেন নিমপাতা আর হলুদের ব্যবহার। একসময় দ্রুত সেরে গেল। কিন্তু গালে ছোট্ট একটা গর্ত রয়ে গেল। সাগর ভাসা ছবির চিত্রগ্রাহক ছিলেন রফিকুল বারী চৌধুরী। তিনি মেকাপম্যানকে বললেন চুইংগাম দিয়ে গর্তটা ভরাট করে তারপর মেকাপ দিতে। মেকাপ শেষে যখন রোজিনা শুটিং স্পটে হাজির হলেন তখন তাকে দেখা মাত্রই এক নায়িকা শুটিং রেখে চলে গেলেন। কেন চলে গেলেন-এর জবাবে রোজিনা বলেন, সম্ভবত আমার চিকন পক্স হয়েছিল বিধায়, কিছুটা আতংকিত হয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমার কষ্টটা সেখানে নয়। আমি কষ্ট পেয়েছি এই ভেবে যে, যেখানে আমাকে নায়িকা হিসেবে চূড়ান্ত করা হল সেখানে অন্য আরেকজন কেন? আমি মনে মনে খুবই কষ্ট পেলাম। রোজিনা ওইদিন শুটিং করেছেন ঠিকই; কিন্তু পরে আর এ ছবির শুটিং করেননি। সেই যে রোজিনা আঘাত পেলেন তখন থেকেই জীবনের বাকিটা পথ নিজের সিদ্ধান্তেই অটল থেকেছেন। ‘সাগর ভাসা’ ছবিতে যখন রোজিনা কাজ করেন তখন পারিবারিক নাম রেণু নামেই তাকে সবাই চিনতেন। পরিচালক মোহসীন তার ‘আয়না’ ছবিতে কাস্ট করার পর তার নাম দেন শায়লা। শায়লা নামেই তখন তিনি মোহসীন, মতিউর রহমান পানুসহ সে সময়ের প্রথিতযশা পরিচালকদের ছবিতে কাজ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন মহিউদ্দীনের ‘মিন্টু আমার নাম’ ছবিতে কাজ করার জন্য নায়িকা হিসেবে তাকে চূড়ান্ত করা হয় তখন ছবির গল্পের নায়িকার নাম রোজিনা থাকায় শায়লা নাম পরিবর্তন করে রোজিনা নামেই পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় সাংবাদিকদের কাছে। আর তখন থেকেই পারিবারিক নাম রেণু আর পরিচালক মোহসীনের দেয়া নাম শায়লা নামটি আড়াল হয়ে যায় রোজিনা নামের কারণে। কিন্তু যে ছবিতে অভিনয় করার চুক্তিতে নাম হয় তার রোজিনা সে ছবিতেও কাজ করা হয়নি শেষ পর্যন্ত। তার পরিবর্তে কাজ করেন ববিতা। এরপর ১৯৭৭ সালে এফ কবীর চৌধুরীর ‘রাজমহল’ ছবিতে চিত্রনায়ক ওয়াসিমের বিপরীতে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। শুটিং শেষ হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। ছবিটি সুপার-ডুপার হিট ব্যবসা করায় রোজিনাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘কসাই’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য রোজিনা সর্বপ্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর মতিন রহমান পরিচালিত ‘জীবনধারা’ ও কবীর আনোয়ার পরিচালিত ‘দিনকাল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। কো-প্রোডাকশনের ছবি (পাকিস্তানের সঙ্গে) ‘হাম সে হায় জামানা’তে অভিনয়ের জন্য ১৯৮৬ সালে তিনি পাকিস্তান থেকে নিগার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। এ ছবিতে রোজিনার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় নায়ক নাদিম। এছাড়া রোজিনা নেপাল, শ্রীলংকার সঙ্গেও কো-প্রোডাকশনের ছবিতে অভিনয় করেছেন। ১৯৮৪ সালে রোজিনা কো-প্রোডাকশনের ছবি ‘অবিচার’-এ অভিনয় করেন বোম্বের সুপারস্টার মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে। এ ছবির পরিচালক ছিলেন হাসান ইমাম ও শক্তি সামন্ত। সময়ের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে এসে রোজিনা তখন প্রায় ২৫০ ছবি বয়সী এক অভিজ্ঞ অভিনেত্রী। আর তখনই রোজিনা ঘোষণা দেন আপাতত আর ছবিতে কাজ করবেন না। দীর্ঘদিন পর দেশে এসে ২০০৪ সালে তিনি মতিন রহমানের পরিচালনায় ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় রাক্ষুসী ছবিতে অভিনয় করেন। এ ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন ফেরদৌস। তারপর আর কোনো ছবিতে অভিনয় করেননি।
 

তারাঝিলমিল পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close