jugantor
ঢাকাই ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের সংজ্ঞা
ঢাকার চলচ্চিত্রে দেশপ্রেমের ইতিবৃত্ত পর্যালোচনা করতে গেলে শুরুতেই মানসপটে ভেসে উঠবে মুক্তিযুদ্ধের ছবি। শুরু থেকে আজ অবধি স্বাধীনতা কিংবা বিজয়ের মাস এলেই মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রতি দরদ দেখা যায় সবার মধ্যে। দেশপ্রেমী নির্মাতাদের উদ্দীপনা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ আর দেশপ্রেমের ছবির মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, সেটা তারা গুলিয়ে ফেলেন। বিস্তারিত লিখেছেন-

  এফ আই দীপু  

১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

দেশপ্রেম মানেই কি মুক্তিযুদ্ধ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হামেশাই ঢাকার ছবির নির্মাতারা সব গুলিয়ে ফেলেন। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা দেশপ্রেমের প্রসঙ্গ এলেই বছরের দুটি মাসকে কেন্দ্র করে নির্মাতারা উঠে পড়ে লাগেন। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশপ্রেমের জন্য বছরের বিশেষ দুটি মাস কেন্দ্র করে পথ চলতে হবে কেন? শুধু মার্চ কিংবা ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের ছবি মুক্তি দিতে হবে কেন? কিংবা এ দু’মাসেই কেন শুধু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবির প্রতি দরদ দেখাতে হবে? বাকি সাত মাস কি যুদ্ধ হয়নি? কিংবা ওই সাত মাসের যুদ্ধের স্মৃতি কি কারও মনে পড়ে না? এমন হাজারও প্রশ্ন দেশপ্রেমী মানুষের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায় নিত্য। এর অবশ্য কারণও আছে। বছরের এ দুটি মাসেই স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের কথা সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। সে কারণেই হয়তো নির্মাতারাও এ দুটি মাসকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি মুক্তি দেয়ার মিছিলে শামিল হন। এমন প্রশ্ন যখন ঢাকাই ছবির নির্মাতাদের সামনে এসে দাঁড়ায় তখন তারা একটি খোঁড়া উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন। বলে থাকেন, বছরের অন্য সময়গুলোতে যুদ্ধের ছবি দর্শকরা দেখতে চান না। কিন্তু যুদ্ধের ছবি মানেই যে শুধু যুদ্ধ তা কিন্ত নয়। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ছবি নির্মাণ করলে দর্শকদের ওপর খুব বেশি একটা দোষ দেয়া যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, দেশপ্রেমের সংজ্ঞা তো শুধু মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে আবদ্ধ নেই। তাহলে শুধু যুদ্ধের ছবির মধ্যেই দেশপ্রেম দেখাতে হবে কেন? কোনো কোনো নির্মাতা অবশ্য আলাদাভাবে দেশপ্রেমের ছবি নির্মাণ করে প্রশংসিতও হয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে অনেক ছবি নির্মিত হয়েছে। ‘ওরা ১১ জন’ স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। সদ্য যুদ্ধফেরত দুই তরুণ খসরু ও মাসুদ পারভেজ চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী কঠিন সময়টিকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে। এজন্য তারা চলচ্চিত্রকেই উৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন, যা দেশ-বিদেশের মানুষের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও হয়ে থাকবে একটি প্রামাণ্য দলিল। তাদের ভাবনায় যোগ দিলেন চাষী নজরুল ইসলাম। তিনজনের সমন্বিত প্রয়াসে তৈরি হল ‘ওরা ১১ জন’। চার মাসের টানা খাটুনির পর ১৯৭২ সালের ১১ আগস্ট আলোর মুখ দেখে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র। এরপর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রায় ৫০টিরও বেশি ছবি নির্মিত হয়েছে। ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে চাষী নজরুল ইসলামের ওরা ১১ জন (১৯৭২), সংগ্রাম (১৯৭৩), হাঙ্গর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), ধ্র“বতারা (২০০৬), মমতাজ আলীর রক্তাক্ত বাংলা (১৯৭২), আনন্দের বাঘা বাঙ্গালী (১৯৭২), হাসি কে হাসে (১৯৭৪), ফকরুল আলমের জয় বাংলা (১৯৭২), সুভাষ দত্তের অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী (১৯৭২), আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), আলমগীর কুমকুমের আমার জন্মভূমি (১৯৭৩), খান আতাউর রহমানের আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩), এখনো অনেক রাত (১৯৯৭), নারায়ণ ঘোষ মিতার আলোর মিছিল (১৯৭৪), মোহাম্মদ আলীর বাংলার ২৪ বছর (১৯৭৪), হারুন-অর রশীদের মেঘের অনেক রঙ (১৯৭৬), এ জে মিন্টুর বাঁধনহারা (১৯৮১), শহীদুল হক খানের কলমীলতা (১৯৮১), মতিন রহমানের চিৎকার (১৯৮১), তানভীর মোকাম্মেলের নদীর নাম মধুমতি (১৯৯০), রাবেয়া (২০০৮) ও জীবনঢুলী (২০১৩), মোরশেদুল ইসলামের আগামী (১৯৮৪), খেলাঘর (২০০৬) ও আমার বন্ধু রাশেদ (২০১১), নাসির উদ্দীন ইউসুফের একাত্তরের যিশু (১৯৯৩) ও গেরিলা (২০১১), হুমায়ূন আহমেদের আগুনের পরশমণি (১৯৯৫) ও শ্যামল ছায়া (২০০৪), তারেক মাসুদের মুক্তির গান (১৯৯৫), মুক্তির কথা (১৯৯৯), ও মাটির ময়না (২০০২), তৌকীর আহমেদের জয়যাত্রা (২০০৪), রুবাইয়াত আহমেদের মেহেরজান (২০১০), বদরুল আলম সৌদের খণ্ডগল্প ১৯৭১ (২০১১), মাসুদ আখন্দের পিতা (২০১২), মিজানুর রহমান শামীমের ৭১-এর গেরিলা (২০১৩), মনসুর আলীর ৭১-এর সংগ্রাম (২০১৪), জাহিদুর রহিম অঞ্জনের মেঘমল্লার (২০১৪), গোলাম মোস্তফা শিমুলের অনুক্রোশ (২০১৪), সাদেক সিদ্দিকীর হৃদয়ে ৭১ (২০১৪), শাহ আলম কিরণের ৭১-এর মা জননী (২০১৪) ও সোহেল আরমানের এই তো প্রেম (২০১৫)। ১১ ডিসেম্বর মুক্তি পাচ্ছে আরও দুটি ছবি। একটি হুমায়ূন আহমেদের গল্প অবলম্বনে ‘অনিল বাগচির একদিন’ ও অন্যটি ‘শোভনের স্বাধীনতা’। এছাড়াও যুদ্ধভিত্তিক কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। যা দেশ-বিদেশে প্রশংসিতও হয়েছে।

সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছিল সোহেল আরমান পরিচালিত ‘এই তো প্রেম’। ছবির স্লোগানে তিনি যুদ্ধ ও প্রেমের ছবি হিসেবেই বর্ণনা দিতে চেয়েছেন। অর্থাৎ শুধু যুদ্ধের ছবি নিয়ে তিনি হয়তো সন্দিহান ছিলেন। স্বভাবতই যুদ্ধের পাশাপাশি প্রেম শব্দটির প্রচারণা চালাতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তারপরও ব্যবসায়িকভাবে রক্ষা হয়েছে। উত্তরটা দর্শক এবং পরিচালক ভালো করেই জানেন। উপরোক্ত ছবিগুলো কিন্তু শুধু যুদ্ধের ছবি নয়। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করেই ছবিগুলো নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, সমাজপ্রেম, সর্বোপরি একজন নির্মাতার দেশাত্মবোধ। আবার প্রেম আছে বলে এগুলোকে শুধু দেশপ্রেমের ছবি বলেও এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যুদ্ধ, এবং দেশপ্রেম দুটিই রয়েছে এসব ছবিতে। এর মধ্যে ব্যবসায়িকভাবে অনেক ছবিই ছিল বেশ সফল। কিছু ছবি অবশ্য নির্মাণশৈলী এবং দুর্বল গল্পের কারণে মার খেয়েছে। সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে যুদ্ধের ছবিতে যে আরও বেশ কিছু বিষয় সন্নিবিশিত ছিল সেটা অনুমেয়। কিছু ছবি নিয়ে আবার বিতর্কও রয়েছে। যেমন রুবাইয়াত আহমেদের ‘মেহেরজান’। যুদ্ধের ছবি বানাতে গিয়ে তিনি প্রকারান্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করেও বসেছেন। আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই। মূল কথা হচ্ছে ছবিতে দেশপ্রেম আছে কিনা? কিছু নির্মাতার ধারণা, যুদ্ধের ছবি মানেই গুলি, কামান, মিছিল-মিটিং- এ সবকিছু। আসলে কিন্তু তা নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের যুগে এসে পুরনো লড়াই নিয়ে ছবি নির্মাণ করতে কতটা সফলতা পাবে, কিংবা দর্শক মনে কতটা জায়গা করে নিতে পারবে সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। এ প্রশ্নের উত্তরণ ঘটাতেই যুদ্ধের ছবিতে দেশপ্রেমের কথা বলা হয়েছে। দেশপ্রেমের ছবিতে যুদ্ধের বর্ণনা থাকতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের ঘটনা হুবহু দৃশ্যের মাধ্যমে কামান-গোলা নিয়ে তুলে ধরতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দেশপ্রেমের ছবিকে আরও একভাবে বর্ণনা করা যায়। এসব ছবিতে যুদ্ধের প্রসঙ্গ না আনলেও কোনো ক্ষতি নেই। দেশের সামাজিক হাজারও সমস্যা রয়েছে। সেটাকে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়া এবং সেই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের পথ বাতলে দেয়ার ক্ষেত্রে একটি ছবি মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। আর সেটিই হচ্ছে দেশপ্রেমের ছবি। এ দেশপ্রেমের মাধ্যমে বাণিজ্যিক চিন্তা-ভাবনারও প্রসার ঘটানো সম্ভব। যেমনটি দক্ষিণ ভারতীয় কিংবা বলিউডের ছবিতে হরহামেশাই দেখা যায়। আশার কথা হচ্ছে, আমাদের তরুণ প্রজন্মের কিছু মেধাবী নির্মাতা বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। যেমন- বাংলাদেশের গর্বিত সেনাবাহিনীর দেশপ্রেম নিয়ে চিত্রনায়ক অনন্ত জলিল নির্মাণ করতে যাচ্ছেন ‘সৈনিক : দেশের অগ্রযাত্রার মহানায়ক’ এবং কুচক্রীদের হাত থেকে দেশ রক্ষার গল্প নিয়ে তৈরি করছেন ‘দ্য স্পাই’ নামের দুটি ছবি। এ ধরনের ছবির ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী এবং একজন স্পাই প্রকাশ্যে এবং গোপনে যুদ্ধের মাঠে যে নৈপুণ্য প্রদর্শন করে সেটাও তুলে ধরা সম্ভব। বাণিজ্যিকভাবেও ছবির প্রদর্শন সম্ভব এবং সেটা দর্শকপ্রিয়তা পেতে বাধ্য। তবে অবশ্যই একটি নিখুঁত দেশপ্রেমের গল্প হতে হবে সেটিকে। ঠিক যেমনটি দেখিয়েছেন চিত্রপরিচালক কাজী হায়াৎ। তার নির্মিত ছবি দাঙ্গা ছিল নিঃসন্দেহে একটি দেশপ্রেমের ছবি। আরও বেশ ক’টি দেশপ্রেমের ছবি নির্মাণ করেছেন তিনি। প্রত্যেকটি ছবিতে দেশের মানুষের প্রতি, সরকারের প্রতি কিছু মেসেজও দিয়েছেন। অন্যদিকে যুদ্ধের ছবিতে দেশপ্রেমের পাশাপাশি যুদ্ধভিত্তিক গল্প থাকা বাঞ্ছনীয়। যুদ্ধের আবহকে ধারণ করে কামান-গোলা ছাড়াই যুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণ করা সম্ভব। তাই, নিঃসংকোচে বলা যায়, স্বাধীনতা কিংবা বিজয়ের মাসে শুধু যুদ্ধের ছবি নয়, দেশপ্রেমের ছবি দিয়ে জাতিকে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল বোঝানো এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা যায়। তার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের অপেক্ষা করতে হয় না। নতুন প্রজন্মকে পুরনো কিছু দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। ইতিহাসের পাশাপাশি বাস্তবতাকেও তাদের সামনে তুলে ধরা অতীব জরুরি।


 

সাবমিট

ঢাকাই ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের সংজ্ঞা

ঢাকার চলচ্চিত্রে দেশপ্রেমের ইতিবৃত্ত পর্যালোচনা করতে গেলে শুরুতেই মানসপটে ভেসে উঠবে মুক্তিযুদ্ধের ছবি। শুরু থেকে আজ অবধি স্বাধীনতা কিংবা বিজয়ের মাস এলেই মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রতি দরদ দেখা যায় সবার মধ্যে। দেশপ্রেমী নির্মাতাদের উদ্দীপনা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ আর দেশপ্রেমের ছবির মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, সেটা তারা গুলিয়ে ফেলেন। বিস্তারিত লিখেছেন-
 এফ আই দীপু 
১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

দেশপ্রেম মানেই কি মুক্তিযুদ্ধ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হামেশাই ঢাকার ছবির নির্মাতারা সব গুলিয়ে ফেলেন। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা দেশপ্রেমের প্রসঙ্গ এলেই বছরের দুটি মাসকে কেন্দ্র করে নির্মাতারা উঠে পড়ে লাগেন। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশপ্রেমের জন্য বছরের বিশেষ দুটি মাস কেন্দ্র করে পথ চলতে হবে কেন? শুধু মার্চ কিংবা ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের ছবি মুক্তি দিতে হবে কেন? কিংবা এ দু’মাসেই কেন শুধু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবির প্রতি দরদ দেখাতে হবে? বাকি সাত মাস কি যুদ্ধ হয়নি? কিংবা ওই সাত মাসের যুদ্ধের স্মৃতি কি কারও মনে পড়ে না? এমন হাজারও প্রশ্ন দেশপ্রেমী মানুষের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায় নিত্য। এর অবশ্য কারণও আছে। বছরের এ দুটি মাসেই স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের কথা সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। সে কারণেই হয়তো নির্মাতারাও এ দুটি মাসকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি মুক্তি দেয়ার মিছিলে শামিল হন। এমন প্রশ্ন যখন ঢাকাই ছবির নির্মাতাদের সামনে এসে দাঁড়ায় তখন তারা একটি খোঁড়া উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন। বলে থাকেন, বছরের অন্য সময়গুলোতে যুদ্ধের ছবি দর্শকরা দেখতে চান না। কিন্তু যুদ্ধের ছবি মানেই যে শুধু যুদ্ধ তা কিন্ত নয়। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ছবি নির্মাণ করলে দর্শকদের ওপর খুব বেশি একটা দোষ দেয়া যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, দেশপ্রেমের সংজ্ঞা তো শুধু মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে আবদ্ধ নেই। তাহলে শুধু যুদ্ধের ছবির মধ্যেই দেশপ্রেম দেখাতে হবে কেন? কোনো কোনো নির্মাতা অবশ্য আলাদাভাবে দেশপ্রেমের ছবি নির্মাণ করে প্রশংসিতও হয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে অনেক ছবি নির্মিত হয়েছে। ‘ওরা ১১ জন’ স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। সদ্য যুদ্ধফেরত দুই তরুণ খসরু ও মাসুদ পারভেজ চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী কঠিন সময়টিকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে। এজন্য তারা চলচ্চিত্রকেই উৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন, যা দেশ-বিদেশের মানুষের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও হয়ে থাকবে একটি প্রামাণ্য দলিল। তাদের ভাবনায় যোগ দিলেন চাষী নজরুল ইসলাম। তিনজনের সমন্বিত প্রয়াসে তৈরি হল ‘ওরা ১১ জন’। চার মাসের টানা খাটুনির পর ১৯৭২ সালের ১১ আগস্ট আলোর মুখ দেখে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র। এরপর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রায় ৫০টিরও বেশি ছবি নির্মিত হয়েছে। ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে চাষী নজরুল ইসলামের ওরা ১১ জন (১৯৭২), সংগ্রাম (১৯৭৩), হাঙ্গর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), ধ্র“বতারা (২০০৬), মমতাজ আলীর রক্তাক্ত বাংলা (১৯৭২), আনন্দের বাঘা বাঙ্গালী (১৯৭২), হাসি কে হাসে (১৯৭৪), ফকরুল আলমের জয় বাংলা (১৯৭২), সুভাষ দত্তের অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী (১৯৭২), আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), আলমগীর কুমকুমের আমার জন্মভূমি (১৯৭৩), খান আতাউর রহমানের আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩), এখনো অনেক রাত (১৯৯৭), নারায়ণ ঘোষ মিতার আলোর মিছিল (১৯৭৪), মোহাম্মদ আলীর বাংলার ২৪ বছর (১৯৭৪), হারুন-অর রশীদের মেঘের অনেক রঙ (১৯৭৬), এ জে মিন্টুর বাঁধনহারা (১৯৮১), শহীদুল হক খানের কলমীলতা (১৯৮১), মতিন রহমানের চিৎকার (১৯৮১), তানভীর মোকাম্মেলের নদীর নাম মধুমতি (১৯৯০), রাবেয়া (২০০৮) ও জীবনঢুলী (২০১৩), মোরশেদুল ইসলামের আগামী (১৯৮৪), খেলাঘর (২০০৬) ও আমার বন্ধু রাশেদ (২০১১), নাসির উদ্দীন ইউসুফের একাত্তরের যিশু (১৯৯৩) ও গেরিলা (২০১১), হুমায়ূন আহমেদের আগুনের পরশমণি (১৯৯৫) ও শ্যামল ছায়া (২০০৪), তারেক মাসুদের মুক্তির গান (১৯৯৫), মুক্তির কথা (১৯৯৯), ও মাটির ময়না (২০০২), তৌকীর আহমেদের জয়যাত্রা (২০০৪), রুবাইয়াত আহমেদের মেহেরজান (২০১০), বদরুল আলম সৌদের খণ্ডগল্প ১৯৭১ (২০১১), মাসুদ আখন্দের পিতা (২০১২), মিজানুর রহমান শামীমের ৭১-এর গেরিলা (২০১৩), মনসুর আলীর ৭১-এর সংগ্রাম (২০১৪), জাহিদুর রহিম অঞ্জনের মেঘমল্লার (২০১৪), গোলাম মোস্তফা শিমুলের অনুক্রোশ (২০১৪), সাদেক সিদ্দিকীর হৃদয়ে ৭১ (২০১৪), শাহ আলম কিরণের ৭১-এর মা জননী (২০১৪) ও সোহেল আরমানের এই তো প্রেম (২০১৫)। ১১ ডিসেম্বর মুক্তি পাচ্ছে আরও দুটি ছবি। একটি হুমায়ূন আহমেদের গল্প অবলম্বনে ‘অনিল বাগচির একদিন’ ও অন্যটি ‘শোভনের স্বাধীনতা’। এছাড়াও যুদ্ধভিত্তিক কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। যা দেশ-বিদেশে প্রশংসিতও হয়েছে।

সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছিল সোহেল আরমান পরিচালিত ‘এই তো প্রেম’। ছবির স্লোগানে তিনি যুদ্ধ ও প্রেমের ছবি হিসেবেই বর্ণনা দিতে চেয়েছেন। অর্থাৎ শুধু যুদ্ধের ছবি নিয়ে তিনি হয়তো সন্দিহান ছিলেন। স্বভাবতই যুদ্ধের পাশাপাশি প্রেম শব্দটির প্রচারণা চালাতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তারপরও ব্যবসায়িকভাবে রক্ষা হয়েছে। উত্তরটা দর্শক এবং পরিচালক ভালো করেই জানেন। উপরোক্ত ছবিগুলো কিন্তু শুধু যুদ্ধের ছবি নয়। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করেই ছবিগুলো নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, সমাজপ্রেম, সর্বোপরি একজন নির্মাতার দেশাত্মবোধ। আবার প্রেম আছে বলে এগুলোকে শুধু দেশপ্রেমের ছবি বলেও এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যুদ্ধ, এবং দেশপ্রেম দুটিই রয়েছে এসব ছবিতে। এর মধ্যে ব্যবসায়িকভাবে অনেক ছবিই ছিল বেশ সফল। কিছু ছবি অবশ্য নির্মাণশৈলী এবং দুর্বল গল্পের কারণে মার খেয়েছে। সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে যুদ্ধের ছবিতে যে আরও বেশ কিছু বিষয় সন্নিবিশিত ছিল সেটা অনুমেয়। কিছু ছবি নিয়ে আবার বিতর্কও রয়েছে। যেমন রুবাইয়াত আহমেদের ‘মেহেরজান’। যুদ্ধের ছবি বানাতে গিয়ে তিনি প্রকারান্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করেও বসেছেন। আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই। মূল কথা হচ্ছে ছবিতে দেশপ্রেম আছে কিনা? কিছু নির্মাতার ধারণা, যুদ্ধের ছবি মানেই গুলি, কামান, মিছিল-মিটিং- এ সবকিছু। আসলে কিন্তু তা নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের যুগে এসে পুরনো লড়াই নিয়ে ছবি নির্মাণ করতে কতটা সফলতা পাবে, কিংবা দর্শক মনে কতটা জায়গা করে নিতে পারবে সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। এ প্রশ্নের উত্তরণ ঘটাতেই যুদ্ধের ছবিতে দেশপ্রেমের কথা বলা হয়েছে। দেশপ্রেমের ছবিতে যুদ্ধের বর্ণনা থাকতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের ঘটনা হুবহু দৃশ্যের মাধ্যমে কামান-গোলা নিয়ে তুলে ধরতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দেশপ্রেমের ছবিকে আরও একভাবে বর্ণনা করা যায়। এসব ছবিতে যুদ্ধের প্রসঙ্গ না আনলেও কোনো ক্ষতি নেই। দেশের সামাজিক হাজারও সমস্যা রয়েছে। সেটাকে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়া এবং সেই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের পথ বাতলে দেয়ার ক্ষেত্রে একটি ছবি মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। আর সেটিই হচ্ছে দেশপ্রেমের ছবি। এ দেশপ্রেমের মাধ্যমে বাণিজ্যিক চিন্তা-ভাবনারও প্রসার ঘটানো সম্ভব। যেমনটি দক্ষিণ ভারতীয় কিংবা বলিউডের ছবিতে হরহামেশাই দেখা যায়। আশার কথা হচ্ছে, আমাদের তরুণ প্রজন্মের কিছু মেধাবী নির্মাতা বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। যেমন- বাংলাদেশের গর্বিত সেনাবাহিনীর দেশপ্রেম নিয়ে চিত্রনায়ক অনন্ত জলিল নির্মাণ করতে যাচ্ছেন ‘সৈনিক : দেশের অগ্রযাত্রার মহানায়ক’ এবং কুচক্রীদের হাত থেকে দেশ রক্ষার গল্প নিয়ে তৈরি করছেন ‘দ্য স্পাই’ নামের দুটি ছবি। এ ধরনের ছবির ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী এবং একজন স্পাই প্রকাশ্যে এবং গোপনে যুদ্ধের মাঠে যে নৈপুণ্য প্রদর্শন করে সেটাও তুলে ধরা সম্ভব। বাণিজ্যিকভাবেও ছবির প্রদর্শন সম্ভব এবং সেটা দর্শকপ্রিয়তা পেতে বাধ্য। তবে অবশ্যই একটি নিখুঁত দেশপ্রেমের গল্প হতে হবে সেটিকে। ঠিক যেমনটি দেখিয়েছেন চিত্রপরিচালক কাজী হায়াৎ। তার নির্মিত ছবি দাঙ্গা ছিল নিঃসন্দেহে একটি দেশপ্রেমের ছবি। আরও বেশ ক’টি দেশপ্রেমের ছবি নির্মাণ করেছেন তিনি। প্রত্যেকটি ছবিতে দেশের মানুষের প্রতি, সরকারের প্রতি কিছু মেসেজও দিয়েছেন। অন্যদিকে যুদ্ধের ছবিতে দেশপ্রেমের পাশাপাশি যুদ্ধভিত্তিক গল্প থাকা বাঞ্ছনীয়। যুদ্ধের আবহকে ধারণ করে কামান-গোলা ছাড়াই যুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণ করা সম্ভব। তাই, নিঃসংকোচে বলা যায়, স্বাধীনতা কিংবা বিজয়ের মাসে শুধু যুদ্ধের ছবি নয়, দেশপ্রেমের ছবি দিয়ে জাতিকে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল বোঝানো এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা যায়। তার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের অপেক্ষা করতে হয় না। নতুন প্রজন্মকে পুরনো কিছু দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। ইতিহাসের পাশাপাশি বাস্তবতাকেও তাদের সামনে তুলে ধরা অতীব জরুরি।


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র