jugantor
গানের ভাষায় দেশভক্তি

  পিয়াস রায়  

১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

বাংলা গানে দেশপ্রেম বিষয়টা শুনতে বেশ ছোট শোনালেও এর ব্যাপ্তিটা ততটাই বিশাল। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর স্বাধিকার যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয় পরাক্রমী শক্তির কাছে তখন অবশ্য সেই দেশপ্রেমকে প্রকাশের একটা পরিশিলীত মাধ্যম হয়ে ওঠে দেশের জন্য গান। কালে কালে এ বঙ্গভূমিকে স্বাধিকার আর অর্জিত স্বাধীনতার পুনরুদ্ধারে বরাবরই রক্তরাঙা হতে হয়েছে। সেই ৪৭ থেকে শুরু করে ৫২, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান কিংবা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। অথবা হালের স্বৈরাচার নিপাতের আন্দোলন কিংবা একেবারে অধুনা বাংলার যুদ্ধাপরাধী নির্মূলের গণজাগরণ যে অধ্যায়ের কথাই বলা হোক না কেন। সশস্ত্র কিংবা নিরস্ত্র সব ধরনের আন্দোলনেই সঙ্গীত রসদের সুধাটা আর অনেক মাধ্যমের চেয়েই ভূমিকা রেখেছে অনেক বেশি ক্ষুরধার। বিশেষ করে এ জন্যই অন্য যে কোনো ভাষার চেয়ে দেশের গান কিংবা ভাষান্তরে দেশপ্রেমের গানের দিক থেকে বাংলা গান অনেক বেশি ঋদ্ধ।

সেই দেশপ্রেমের রকমফেরও আবার বেশ। কোথাও দেশ-প্রকৃতির রূপবর্ণন। কোথাও বা দেশের জন্য জীবন দেয়ার আহ্বানের মাধ্যম এই গান। বিদ্রোহ থেকে শুরু করে নিছক দেশপ্রেম যেসব গানে হয়ে উঠেছে উপজীব্য বিষয় হয়ে। আর পাক্কা দুশ’ বছরের পরাধীনতার শেকলে থাকা বাংলা আর তারপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোসনের সমকালীন গানে দেশের ভালোবাসার পাশাপাশি উঠে এসেছে পরাধীনতার শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার মর্মন্তুদ আর্তনাদ।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে বলা শুরু করলে নজরুলের গানকে সম্মানিত করতে হয় দুর্দান্ত শক্তির একটা মাধ্যম হিসেবে। নজরুলের লেখা গান আর কবিতা ‘চল চল চল’ কিংবা ‘দুর্গমগীরি কান্তার মরু’। ব্রিটিশ উপনিবেশকের অপশক্তিতে যখন তাকে কারারুদ্ধ করা হয় তখন তার গানের বীণায় ঝংকার তোলে ‘কারার ওই লৌহ কপাটের মতো জাগানিয়া সব গান। তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার পিতাম্বর দাসের ‘একবার বিদায় দে মা’, মুকুন্দ দাসের ‘ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে’ গানগুলো আজও ততটুকুই রক্তস্রোতে বাণ ডেকে আনে যতটুকু প্রভাব ফেলত তৎকালীন দ্রোহী জনতার মনে। সমকালীন অশ্বিনী কুমার দত্ত কিংবা পুলিন দাসও একই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয়। কাছাকাছি সময়ের দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তার ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গানটির জন্য বাঙালি জাতির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। দুশ’ বছরের ইতিহাসে অনেকের মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামোচ্চারণও যেমন বাহুল্য ঠিক তেমনি এড়িয়ে যাওয়াটাও বেজায় ধৃষ্টতা সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলার প্রকৃতির মাঝে অনেকের মধ্যে একটি অনবদ্য রচনা ছিল ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ’। ১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের বিরুদ্ধ প্রেক্ষাপটে তার রচিত কবিতা ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলার রূপ ও প্রকৃতির এমন একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে পরিলক্ষিত হয় যে ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এর জাতীয় সঙ্গীতের স্থলাভিষিক্ত হয়।

ইতিহাসের পাতা ধরে আরও একটু সামনে এগোলে অবশ্য এ দেশপ্রেমের গানের ধারাটিকে আরেকটু পরিপুষ্ট হতে দেখা যায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন যখন থেকে বোনা শুরু হয় ঠিক তখন থেকে। তার প্রথম ধাক্কাটা আসে ৫২-তেই। ভাষা আন্দোলনে পাক-হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে তখনকার অবিস্মরণীয় সৃষ্টিগুলোর মধ্যে ছিল ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের ‘ভুলব না, ভুলব না একুশে ফেব্রুয়ারি’, মোশারফ উদ্দীন আহমেদের ‘যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে’, আবদুল লতিফের কথা ও সুরে, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’, ফজল খোদার কথা ও আবদুল জব্বারের সুরে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, শামসুদ্দীন আহমেদের গীত ও আলতাফ মাহমুদের সুরে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দলনও করিলিরে বাঙালি’র মতো অজস্র গান। তবে সবগুলোকে ছাপিয়ে ওঠে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কথা ও আলতাফ মাহমুদের সুরের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো’ গানটি। পরে বিভিন্ন সময়ে আধুনিক শিল্পীদের কণ্ঠেও শোনা যায় ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত ও সুরারোপিত দেশের অনেক গান। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘মায়ের শেখানো ভাষা’, ‘ও আমার এই বাংলা ভাষা’, ‘ও আমার বাংলা মা তোর’, রফিকুল আলমের গাওয়া ‘এক তারাতে সুর বাইন্দা’, রুনা লায়লার কণ্ঠে ‘ফসলের মাঠে মেঘনার তীর’, ‘আমায় গেঁথে দাও না মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা’, শাকিলা জাফরের গাওয়া ‘একুশ তুমি’, ‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ’, শাম্মী আক্তারের কণ্ঠে ‘বরকত সালামের রক্ত’, সুবীর নন্দী’র ‘বাউল তুমি এমন দেশের কথা বল’, এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া ‘শহীদ মিনার ভরে গেছে ফুলে ফুলে’, সৈয়দ আবদুল হাদীর কণ্ঠে ‘মুখে মধুর বাংলা ভাষা’ যার অন্যতম। এছাড়া পরবর্তীতে রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, শাকিলা জাফর, সৈয়দ আবদুল হাদী, সুবীর নন্দী, বশির আহমেদ, শাম্মী আখতারের দলগত কণ্ঠে উপহার দিয়েছেন বেশ কিছু ভাষা আন্দোলননির্ভর গান।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রাম ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের সঙ্গীত রচনা ও চর্চার একটা বড় জায়গা। যেসব গানের কথা বলতে গেলে এক নিঃশ্বাসে উঠে আসে গোবিন্দ হালদারের রচনা, আপেল মাহমুদের সুর ও স্বপ্ন রায়ের কণ্ঠে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের রচনা ও আনোয়ার পারভেজের সুরে দলগত পরিবেশনা ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, গোবিন্দ হালদারের কথা ও সমর দাসের সুরে ‘রক্ত লাল রক্ত লাল’, গোবিন্দ হালদারের কথা ও আপেল মাহমুদের সুরে ‘মোরা একটি ফুলকে’, নাঈম গওহরের কথা ও সমর দাসের সুরে ‘নোঙর তোল তোল’, সলীল চৌধুরীর ‘বিচারপতি তোমার বিচার’ আপেল মাহমুদের ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’, নাঈম গওহরের কথা-আজাদ রহমানের সুর ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘জন্ম আমার ধন্য হল’, কৃষ্ণ চন্দ্র দের কথা ও সমর দাসের সুরে ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ থেকে অজস্র গান।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলদেশে সংস্কৃতিচর্চাও অনেকটা রাজনীতিনির্ভর হয়ে পড়ায় দেশের গানগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও হস্তক্ষেপের দৃশ্য চোখে পড়লেও সমাজ সংস্কারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ জাতিতে এখনও ভালো দেশের গান রচনা হয়। যার একটা জ্বলন্ত নিদর্শন হতে পারে প্রতুলের ‘আমি বাংলায় গান গাই’। অধুনা পপ আর ব্যান্ড সংস্কৃতিতে পপগুরু আজম খান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যান্ডের ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামের গানগুলোও হতে পারে যার উদাহরণ।

তবে যত যাই হোক, দেশের গান স্থান কাল পাত্রভেদে পাবে নতুন মাত্রা। কিন্তু এসব গানের চর্চা কিংবা এসব গানের প্রতি মানুষের অনুরক্তিটা যদি বছরের বিশেষ কিছু দিনকে ঘিরেই দেখা দেয়, তবেই প্রশ্ন জাগে জাতির জাতিসত্তার প্রগাঢ়তার কিংবা দেশপ্রেমের বাঁধনটা কতটুকু শক্ত ওটার বিষয়ে। তবে নেপথ্যে যাই থাকুক না কেন, দেশের মানুষের কাছে এসব গানের বাণী ও বার্তা সবসময় সমানভাবে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটাও যে প্রথাগত মিডিয়ার সেটা অস্বীকার করার উপায়ও নেই।


 

সাবমিট

গানের ভাষায় দেশভক্তি

 পিয়াস রায় 
১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

বাংলা গানে দেশপ্রেম বিষয়টা শুনতে বেশ ছোট শোনালেও এর ব্যাপ্তিটা ততটাই বিশাল। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর স্বাধিকার যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয় পরাক্রমী শক্তির কাছে তখন অবশ্য সেই দেশপ্রেমকে প্রকাশের একটা পরিশিলীত মাধ্যম হয়ে ওঠে দেশের জন্য গান। কালে কালে এ বঙ্গভূমিকে স্বাধিকার আর অর্জিত স্বাধীনতার পুনরুদ্ধারে বরাবরই রক্তরাঙা হতে হয়েছে। সেই ৪৭ থেকে শুরু করে ৫২, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান কিংবা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। অথবা হালের স্বৈরাচার নিপাতের আন্দোলন কিংবা একেবারে অধুনা বাংলার যুদ্ধাপরাধী নির্মূলের গণজাগরণ যে অধ্যায়ের কথাই বলা হোক না কেন। সশস্ত্র কিংবা নিরস্ত্র সব ধরনের আন্দোলনেই সঙ্গীত রসদের সুধাটা আর অনেক মাধ্যমের চেয়েই ভূমিকা রেখেছে অনেক বেশি ক্ষুরধার। বিশেষ করে এ জন্যই অন্য যে কোনো ভাষার চেয়ে দেশের গান কিংবা ভাষান্তরে দেশপ্রেমের গানের দিক থেকে বাংলা গান অনেক বেশি ঋদ্ধ।

সেই দেশপ্রেমের রকমফেরও আবার বেশ। কোথাও দেশ-প্রকৃতির রূপবর্ণন। কোথাও বা দেশের জন্য জীবন দেয়ার আহ্বানের মাধ্যম এই গান। বিদ্রোহ থেকে শুরু করে নিছক দেশপ্রেম যেসব গানে হয়ে উঠেছে উপজীব্য বিষয় হয়ে। আর পাক্কা দুশ’ বছরের পরাধীনতার শেকলে থাকা বাংলা আর তারপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোসনের সমকালীন গানে দেশের ভালোবাসার পাশাপাশি উঠে এসেছে পরাধীনতার শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার মর্মন্তুদ আর্তনাদ।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে বলা শুরু করলে নজরুলের গানকে সম্মানিত করতে হয় দুর্দান্ত শক্তির একটা মাধ্যম হিসেবে। নজরুলের লেখা গান আর কবিতা ‘চল চল চল’ কিংবা ‘দুর্গমগীরি কান্তার মরু’। ব্রিটিশ উপনিবেশকের অপশক্তিতে যখন তাকে কারারুদ্ধ করা হয় তখন তার গানের বীণায় ঝংকার তোলে ‘কারার ওই লৌহ কপাটের মতো জাগানিয়া সব গান। তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার পিতাম্বর দাসের ‘একবার বিদায় দে মা’, মুকুন্দ দাসের ‘ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে’ গানগুলো আজও ততটুকুই রক্তস্রোতে বাণ ডেকে আনে যতটুকু প্রভাব ফেলত তৎকালীন দ্রোহী জনতার মনে। সমকালীন অশ্বিনী কুমার দত্ত কিংবা পুলিন দাসও একই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয়। কাছাকাছি সময়ের দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তার ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গানটির জন্য বাঙালি জাতির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। দুশ’ বছরের ইতিহাসে অনেকের মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামোচ্চারণও যেমন বাহুল্য ঠিক তেমনি এড়িয়ে যাওয়াটাও বেজায় ধৃষ্টতা সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলার প্রকৃতির মাঝে অনেকের মধ্যে একটি অনবদ্য রচনা ছিল ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ’। ১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের বিরুদ্ধ প্রেক্ষাপটে তার রচিত কবিতা ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলার রূপ ও প্রকৃতির এমন একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে পরিলক্ষিত হয় যে ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এর জাতীয় সঙ্গীতের স্থলাভিষিক্ত হয়।

ইতিহাসের পাতা ধরে আরও একটু সামনে এগোলে অবশ্য এ দেশপ্রেমের গানের ধারাটিকে আরেকটু পরিপুষ্ট হতে দেখা যায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন যখন থেকে বোনা শুরু হয় ঠিক তখন থেকে। তার প্রথম ধাক্কাটা আসে ৫২-তেই। ভাষা আন্দোলনে পাক-হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে তখনকার অবিস্মরণীয় সৃষ্টিগুলোর মধ্যে ছিল ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের ‘ভুলব না, ভুলব না একুশে ফেব্রুয়ারি’, মোশারফ উদ্দীন আহমেদের ‘যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে’, আবদুল লতিফের কথা ও সুরে, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’, ফজল খোদার কথা ও আবদুল জব্বারের সুরে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, শামসুদ্দীন আহমেদের গীত ও আলতাফ মাহমুদের সুরে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দলনও করিলিরে বাঙালি’র মতো অজস্র গান। তবে সবগুলোকে ছাপিয়ে ওঠে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কথা ও আলতাফ মাহমুদের সুরের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো’ গানটি। পরে বিভিন্ন সময়ে আধুনিক শিল্পীদের কণ্ঠেও শোনা যায় ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত ও সুরারোপিত দেশের অনেক গান। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘মায়ের শেখানো ভাষা’, ‘ও আমার এই বাংলা ভাষা’, ‘ও আমার বাংলা মা তোর’, রফিকুল আলমের গাওয়া ‘এক তারাতে সুর বাইন্দা’, রুনা লায়লার কণ্ঠে ‘ফসলের মাঠে মেঘনার তীর’, ‘আমায় গেঁথে দাও না মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা’, শাকিলা জাফরের গাওয়া ‘একুশ তুমি’, ‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ’, শাম্মী আক্তারের কণ্ঠে ‘বরকত সালামের রক্ত’, সুবীর নন্দী’র ‘বাউল তুমি এমন দেশের কথা বল’, এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া ‘শহীদ মিনার ভরে গেছে ফুলে ফুলে’, সৈয়দ আবদুল হাদীর কণ্ঠে ‘মুখে মধুর বাংলা ভাষা’ যার অন্যতম। এছাড়া পরবর্তীতে রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, শাকিলা জাফর, সৈয়দ আবদুল হাদী, সুবীর নন্দী, বশির আহমেদ, শাম্মী আখতারের দলগত কণ্ঠে উপহার দিয়েছেন বেশ কিছু ভাষা আন্দোলননির্ভর গান।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রাম ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের সঙ্গীত রচনা ও চর্চার একটা বড় জায়গা। যেসব গানের কথা বলতে গেলে এক নিঃশ্বাসে উঠে আসে গোবিন্দ হালদারের রচনা, আপেল মাহমুদের সুর ও স্বপ্ন রায়ের কণ্ঠে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের রচনা ও আনোয়ার পারভেজের সুরে দলগত পরিবেশনা ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, গোবিন্দ হালদারের কথা ও সমর দাসের সুরে ‘রক্ত লাল রক্ত লাল’, গোবিন্দ হালদারের কথা ও আপেল মাহমুদের সুরে ‘মোরা একটি ফুলকে’, নাঈম গওহরের কথা ও সমর দাসের সুরে ‘নোঙর তোল তোল’, সলীল চৌধুরীর ‘বিচারপতি তোমার বিচার’ আপেল মাহমুদের ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’, নাঈম গওহরের কথা-আজাদ রহমানের সুর ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘জন্ম আমার ধন্য হল’, কৃষ্ণ চন্দ্র দের কথা ও সমর দাসের সুরে ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ থেকে অজস্র গান।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলদেশে সংস্কৃতিচর্চাও অনেকটা রাজনীতিনির্ভর হয়ে পড়ায় দেশের গানগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও হস্তক্ষেপের দৃশ্য চোখে পড়লেও সমাজ সংস্কারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ জাতিতে এখনও ভালো দেশের গান রচনা হয়। যার একটা জ্বলন্ত নিদর্শন হতে পারে প্রতুলের ‘আমি বাংলায় গান গাই’। অধুনা পপ আর ব্যান্ড সংস্কৃতিতে পপগুরু আজম খান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যান্ডের ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামের গানগুলোও হতে পারে যার উদাহরণ।

তবে যত যাই হোক, দেশের গান স্থান কাল পাত্রভেদে পাবে নতুন মাত্রা। কিন্তু এসব গানের চর্চা কিংবা এসব গানের প্রতি মানুষের অনুরক্তিটা যদি বছরের বিশেষ কিছু দিনকে ঘিরেই দেখা দেয়, তবেই প্রশ্ন জাগে জাতির জাতিসত্তার প্রগাঢ়তার কিংবা দেশপ্রেমের বাঁধনটা কতটুকু শক্ত ওটার বিষয়ে। তবে নেপথ্যে যাই থাকুক না কেন, দেশের মানুষের কাছে এসব গানের বাণী ও বার্তা সবসময় সমানভাবে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটাও যে প্রথাগত মিডিয়ার সেটা অস্বীকার করার উপায়ও নেই।


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র