¦
দেশ এগিয়ে গেলে এগিয়ে যাবে সবকিছুই

আতাউর রহমান | প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৫

বাঙালি বরাবরই শিল্প-সংস্কৃতিমুখী। সঙ্গীত, যাত্রা, কবিতা-সাহিত্য এমনকি সামাজিক নানা আচার দেখে দেখেই শাশ্বত পথ বেয়ে আমাদের জীবন চারণ। সেখানে নাট্যসংস্কৃতি পৃথিবীর সমবয়সী আদিশিল্প। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্পমাধ্যম। তবে, আমাদের দেশে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক প্রদর্শনের ইতিহাস বেশিদিন আগের নয়। স্বাধীনতার পর নাটকের সঙ্গে দর্শনীর বিনিময়ের বিষয়টি যুক্ত হয়। ১৯৭৩ এর ৩ ফেব্র“য়ারি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজিত ‘বাকি ইতিহাস’ মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে এদেশে দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যমঞ্চায়নের প্রথা চালু হয়। আর এখন আমরা ভাবছি নাটকে পেশাবিত্তি বা পেশাদারি নাট্যচর্চা কিভাবে করা যায়। স্বাধীনতা পরবর্তী নাট্যচর্চার জন্য থিয়েটার দলগুলোকে শুধু মহিলা সমিতি ও গাইড হাউস মঞ্চের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে। সেসময় নাগরিক ছাড়াও ঢাকা থিয়েটার, থিয়েটার, পদাতিক, আরণ্যকসহ বেশ কিছু দল অনেক ভালো ভালো নাটক উপহার দিয়েছে। এখন আমাদের নাটক মোটামুটি সারা দেশে প্রসারিত হয়েছে। ঢাকায় জাতীয় নাট্যশালার তিনটি মিলনায়তনে নিয়মিত নাট্যচর্চা হচ্ছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নগরীজুড়ে জ্যামের ভয়ে গুলশান, বনানী, উত্তরা কিংবা যাত্রাবাড়ী এলাকার মানুষ নাটক উপভোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সে অর্থে হল সংকট অনেক বড় একটি সমস্যা। পাশাপাশি দেশে ২৫/২৬ টিভি চ্যানেলও আমাদের থিয়েটারকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করেছে। সব মিলিয়ে আমাদের থিয়েটারে অনেকটা দর্শক ঘাটতি রয়েছে। তবে এতগুলো টিভি চ্যানেল হওয়ায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের জন্য একটা বড় জায়গা তৈরি হয়েছে।
থিয়েটারে সম্পৃক্ত তরুণরা টেলিভিশনে কাজ করার পাশাপাশি দলেও আন্তরিকভাবে সময় দিচ্ছে, এটি ইতিবাচক। তবে হল সংকটের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের থিয়েটারচর্চার অন্যতম প্রধান সমস্যা হল পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। পৃথিবীর সব সভ্যদেশে অন্যান্য সংস্কৃতির পাশাপাশি ন্যাশনাল থিয়েটারকে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সেই সংস্কৃতি এখনও গড়ে উঠেনি। তবুও আমরা সংস্কৃতি পাগল কিছু মানুষ বিনাশ্রমে এখানে সময় দিয়ে যাচ্ছি। অবশ্য বর্তমান প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিবান্ধব সরকার সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে এরইমধ্যে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমাদের সংস্কৃতি দেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। এর আগে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য সরকারের একশ কোটি টাকা বরাদ্দ কিংবা রবীন্দ্র সার্ধশত বার্ষিকীর আয়োজনের জন্য বিশ কোটি টাকা অনুদান এ অঙ্গনের জন্য আশার সঞ্চারই বটে। সংস্কৃতির কল্যাণে এমনি নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ বা পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি আরও ব্যাপকভাবে অগ্রসর হবে। একইসঙ্গে ব্যাংক, বীমা ও বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো সংস্কৃতি তথা আমাদের থিয়েটারের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এলে এ অঙ্গনটি আরও প্রসারতা পাবে। আমি আশাকরি আমাদের বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে সামনে অনেক ভালো ভালো কাজ হবে। বিশেষ করে চলমান সব সংকটের অবসানের মধ্য দিয়ে আমাদের নাট্যাঙ্গনে নতুন গতি সঞ্চারিত হবে। নাট্যচর্চার অভ্যন্তরীণ জায়গায় বলতে হবে আমাদের দেশী নাটক অনেকাংশে কমে গেছে। তবে এক্ষেত্রে দেশীয় নাটকের পাশাপাশি বিদেশী নাটকের অনুবাদ বা নিজস্ব ঢংয়ে রুপায়নের প্রবণতা বেড়েছে। এসবও থাকতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে দেশীয় সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে বিদেশী নাটক নয়। অর্থাৎ দেশকে অবজ্ঞা করে নয়। আবার একটি কথা আছে অতি জাতীয়তাবোধও ঠিক নয়। নিজেদের সংস্কৃতিকে এক্সপেরিমেন্ট করার সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের সংস্কৃতিও জানতে হবে, দেখতে হবে। চলতি সময়ে বেশ কিছু দল এদিক থেকে বেশ ভালো করছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের নাটকগুলোতে তেমনি এক্সপেরিমেন্ট হতে দেখা যায়। দলগুলোর মধ্যে প্রাচ্যনাট, বটতলা থিয়েটার, স্বপ্নদলসহ বেশ কিছু তারুণ্যদীপ্ত দলকে অনেক বেশি এক্সপেরিমেন্ট করতে দেখা যায়। তারা বেশ ভালোও করছে। প্রাচ্যনাটের রাজা এবং অন্যান্য, বটতলার দ্যা ট্রায়াল অব মাল্লাম ইলিয়া, প্রাঙ্গণেমোরের ঈর্ষা, স্বপ্নদলের হরগজ, চিত্রাঙ্গদা, ঢাবি নাট্যকলা বিভাগের হ্যামলেট, দৃষ্টিপাত নাট্যদলের রাজা হিমাদ্রি, তীর্যক চট্টগ্রামের বিসর্জন, পদাতিকের ম্যাকবেথ এক্সপেরিমেন্টের ভাষায় উচ্চ আবেদনের দাবি রাখে। আবার দেশীয় সংস্কৃতির আদলে লোকজ ফর্মে অনেক এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে। বিশেষ করে সুবচনের মহাজনের নাও, মণিপুরি থিয়েটারের কহে বিরঙ্গনাসহ অনেক দলই নান্দনিক শিল্পালোয়ে দেশীয় ধারার নাটক উপস্থাপন করছে। দেশের বিভিন্ন মাধ্যম জাতিকে নিরাস করলেও শত সংকটের ভেতর দিয়ে আমাদের নাটক ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলছে। আসলে দেশ এগিয়ে গেলে সব কিছুই এগিয়ে যাবে। নাটক প্রতীকীর ভেতর দিয়ে বহমান। এতে হাজারও জনকল্যাণ, সমাজের অসঙ্গতি, সংস্কার, সমাজতন্ত্র, রাষ্ট্রের ক্ষমতা যেন সাধারণ মানুষের হাতে থাকে এবং মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এমনকি মানদাতা আমলের বহু নিয়ম-অনিয়ম, মুক্তি ও পরিবর্তনের বহুচিত্র নানাভাবে প্রতীকী রূপে নাটকের অনুসঙ্গ হবে এটাই স্বাভাবিক। আমি সব সময় ভিন্ন ধাঁচের কিছু করতে চাই। গতকাল বা আজকের কোনো ঘটনা নিয়ে কাজ করতে আমি আগ্রহী নই। এমন কিছু করতে চাই যেখানে এপিক কোয়ালিটি আছে। বহু পুরনো কোনো ঘটনা যেখানে চেহারা শুধু বদলেছে কিন্তু সেই অত্যাচারের যন্ত্র ওই একই জায়গায়। এ ধরনের কাজ করতে আমি উৎসাহী। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোতে আমি শিল্প মনে করি না। ‘চোখের আলোয় দেখেছিলাম চোখের বাহিরে’। রবীন্দ্র নাথের এমন কথা কিন্তু অতুলনীয়। চোখের আলো কিভাবে দেখে চোখের বাহিরে? এটি ভেবেও বুঝে নিতে হবে। আমার মতে, শিল্পের একটা আচ্ছা রূপ আছে। যেটাকে দেখতে পারি, ধরতে পারি, আবার ধরতে পারি না। সব খেয়ে পেললাম, দেখে পেললাম এটি তো শিল্প হতে পারে না। শিল্প সব সময় নব আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকবে। এক্ষেত্রে আমাদের চিন্তার জায়গা অনেক প্রসারিত হচ্ছে। শিল্পের জয়গানে তারুণ্যের জোয়ারে আমাদের সংস্কৃতি আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এটাই প্রত্যাশা।
শ্রুতিলিখন : ফারুক হোসেন শিহাব
 

বর্ষপূর্তি সংখ্যা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close