¦
ক্রিকেট এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন

ফরিদুর রেজা সাগর | প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৫

১. বাংলাদেশ টেলিভিশনের তৎকালীন ব্যবস্থাপক মোস্তফা কামাল সৈয়দ যখন বললেন, বিটিভির পর্দায় নতুন করে আবার পুরনো ক্রিকেট খেলা দেখাবেন, তখন অনেকেই আপত্তি করলেন। সবার সন্দেহ পুরনো ক্রিকেট খেলা দর্শকরা দেখবেন কিনা?
কামাল সাহেবের সঙ্গে ছিলেন ফখরুজ্জামান চৌধুরী। তিনিও কামাল সাহেবকে সমর্থন দিলেন। বললেন, ক্রিকেট খেলা মানুষ সব সময়ই পছন্দ করবে। আর মিটিংয়ে কেউ কেউ বললেন, আপনারা দুজনে ক্রিকেট দেখতে ভালোবাসেন। কিন্তু বিটিভির কত পার্সেন্ট দর্শক ক্রিকেট খেলা দেখতে পছন্দ করে।
প্রশ্নটা একটু জটিল ছিল কামাল সাহেবের কাছে। কিন্তু দমলেন না। কারণ তিনি নিজে ক্রিকেট দেখতে ভালোবাসেন, এবং ধারণা করেন বাংলাদেশের প্রচুর মানুষ ক্রিকেট দেখতে চায়, কিন্তু ঠিকভাবে দেখানো হয় না বলে তারা সেই ক্রিকেট দেখা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
খেলাধুলার ক্ষেত্রে বিটিভি প্রথম সম্প্রচার করেছিল মোহাম্মদ আলীর বক্সিং। সরাসরি সেই বক্সিং দেখানোর কারণে ঢাকায় তো বটেই, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়, পাড়ায় পাড়ায় যে ক্লাবগুলো ছিল সেখানে তৈরি হয়েছিল বক্সিং ক্লাব। তরুণরা উৎসাহী হয়ে উঠেছিল বক্সিং চর্চায়। এমনকি বাংলাদেশ টেলিভিশনও তাদের স্টুডিওতে বক্সিংয়ের রিং বানিয়ে এই তরুণদের নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান তৈরি করেছিল। বেলাল বেগ ছিলেন সেসব অনুষ্ঠানের প্রযোজক।
বক্সিংয়ের মতো একটি খেলা যদি টেলিভিশনে দেখানোর কারণে পুরো দেশজুড়ে তরুণদের মনে ওই রকম উৎসাহ জাগাতে পারে তবে ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো খেলা দেশের তরুণ-যুবকরা দেখবে না এটা মোস্তফা কামাল সৈয়দ কিছুতেই মানতে রাজি নন।
টেস্ট ক্রিকেটের পর এখন ওয়ানডে ক্রিকেটের জয়জয়কার। এবং এই ওয়ানডে ক্রিকেটের সঙ্গে টেলিভিশনের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার টিভি চ্যানেল, চ্যানেল নাইনে কেরি প্যাকার ছিলেন এই ধারার ক্রিকেটের প্রবর্তক। প্রথমবার ক্রিকেটের বিশ্বকাপেই সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। ক্রিকেট রাজকীয় খেলা। টেস্ট ম্যাচ মানেই রাজকীয় ব্যাপার। সেখানে রঙিন পোশাক পরিহিত খেলোয়াড়রা পাঁচ দিনের খেলা একদিনেই শেষ করে দেবেন- এটা কোনো কথা হল। লাল বলের বদলে সাদা বল। কখনও কখনও দিন-রাতের খেলা।
চারদিকে এত হইচই। কিন্তু তারপরও একদিনের ক্রিকেট ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হওয়া শুরু করে। অনেক বড় বড় ক্রিকেটারও তখন বলতেন, একদিনের খেলা কোনো খেলাই নয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াতে বসে কেরি প্যাকার যেভাবে বুঝতে পেরেছিলেন একইভাবে বাংলাদেশে বসে মোস্তফা কামাল সৈয়দ বা ফখরুজ্জামান চৌধুরী বুঝতে পেরেছিলেন যে, টেলিভিশনে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে ক্রিকেটকে বরণ করবে বাংলাদেশের মানুষ।
সেই কারণে মোস্তফা কামাল সৈয়দ বাংলাদেশে সরাসরি ক্রিকেট খেলা দেখানোর ‘রাইট’ তো নিলেনই একই সঙ্গে বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পুরনো খেলা কিনে এনে এডিট করে সেগুলো টেলিভিশনের দর্শকদের দেখানো শুরু করলেন।
পুরনো খেলার অনুষ্ঠান এডিট করে চুম্বক অংশ দেখানোর ফলে দর্শকরা নতুনভাবে সেই খেলা দেখা শুরু করল। এডিট করে খেলার উল্লেখযোগ্য অংশ দেখানো এবং সাধারণ সম্প্রচার দুটোই বিটিভির দর্শকদের কাছে বিরাট আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটও নতুন করে চাঙ্গা হওয়া শুরু করে।
আজ বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ক্রিকেট তিনটি চ্যানেলে দেখানো হচ্ছে। প্রায় সব চ্যানেলই ক্রিকেট নিয়ে নানা আলোচনা অনুষ্ঠান করছে। সংবাদের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে ক্রিকেট আর ক্রিকেট। কেউ প্রসঙ্গ তুলছে না বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় ক্রিকেটের দর্শক কত।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ক্রিকেট নিয়ে সেই সময় সাহসী সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল বলে সারা পৃথিবীর মতো ক্রিকেট খেলা বাংলাদেশেও এত জনপ্রিয়।
১৯৯৯ সালে চ্যানেল আইয়ের যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই একটি খেলায় পাকিস্তানকে পরাজিত করেছিল বাংলাদেশ। সেই খেলাটির রাইট চ্যানেল আই গ্রহণ করে। সরাসরি সম্প্রচার না করতে পারলেও পরে খেলাটি যখন চ্যানেল আই দেখায় তখন অনেক দর্শকই সেটি উপভোগ করে। চ্যানেল আইয়ের এ ধরনের উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানায়।
পরবর্তী সময়ে চ্যানেল আই জিম্বাবুয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলাও সরাসরি সম্প্রচার করে। আজ চ্যানেল আইয়ের যে জনপ্রিয়তা তার ভিত্তিপ্রস্তর সেই খেলাগুলোতেই তৈরি হয়েছিল।
উল্লেখযোগ্য একুশে টেলিভিশনও তাদের যাত্রার শুরুর দিকে ইউরোপিয়ান ফুটবল প্রতিযোগিতা সরাসির সম্প্রচার করত। খেলাগুলোর প্রচার সময় মাঝরাতের পর। তারপরও রাত জেগে দর্শকরা সেই খেলা দেখত। মূলত ২ হাজার শতকের শুরুতে টেলিভিশনের পর্দায় শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বজুড়েই খেলাধুলার ব্যাপারে এক বিরাট বিপ্লব গঠিত হয়। ভারতের আইপিএল এ ব্যাপারে একটি বিশাল সংযোজন। আইপিএল থেকে যে শুধু ভারতবর্ষ নতুন নতুন খেলোয়াড় উপহার পাচ্ছে তাই নয়, মিডিয়ার ক্ষেত্রেও আইপিএলের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বিশাল অংকের টাকা দিয়ে প্রথম দশ বছর আইপিএলের রাইট নিয়েছিল সনি টেলিভিশনের সেট ম্যাক্স। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, পৃথিবীর সব বড় বড় খেলার রাইট স্টার স্পোর্টস এবং ইএসপিএনের কাছে। সেখানে সেট ম্যাক্স শুধু আইপিএলের রাইট নিয়ে কিভাবে দর্শক ধরে রাখে? কিন্তু ইতিহাস আজ বলে দিয়েছে সেট ম্যাক্সের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল ছিল না। তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যে কারণে তারা পরবর্তী পর্যায়ে স্টার এবং ইএসপিএনকে নিয়ে একসঙ্গে আইপিএলের প্রচার স্বত্ব পাওয়ার জন্য সেট ম্যাক্সের সঙ্গে লাড়ই করতে হয়েছিল।
ইএসপিএনই বলি, আর স্টার স্পোর্টস বলি বা সেট ম্যাক্স বলি- বিশাল টাকা নিয়ে বড় বড় সব খেলা নেয়ার জন্য ব্যস্ত এসব চ্যানেল। কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশন যখন খেলা নিয়ে দর্শকদের মন জয় করার কথা ভেবেছিল, তখন খুবই সীমিত ছিল টেলিভিশনের চিন্তাভাবনা ও কর্মপরিধি। সেই সময় মোস্তফা কামাল সৈয়দের মতো মানুষ ছিলেন বলে কিংবা ফখরুজ্জামান চৌধুরীর মতো মানুষ ছিলেন বলেই আজও বাংলাদেশের মানুষ বলে, অনেক অবিস্মরণীয় খেলা তারা টেলিভিশনে দেখেছেন।
আজ বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার জন্য বাংলাদেশের অনেক মানুষ যখন সুদূর ব্রাজিল যায় কিংবা চলতি বিশ্বকাপ ক্রিকেট দেখার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় বা নিউজিল্যান্ডে ভিসার জন্য ভিড় করে তখন কেউ কি মনে করেন-খেলার প্রতি সাধারণ মানুষের এই আগ্রহ তৈরির জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশনের কি বিরাট ভূমিকা রয়েছে?
সরকারি টেলিভিশনে চাকরি করেও মোস্তফা কামাল সৈয়দ আট বা দশ বছরের জন্য বিশ্বের সব বড় বড় ক্রিকেট খেলার প্রচার স্বত্ব গ্রহণ করতে পেরেছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য। তারই ধারাবাহিকতায় এখন বাংলাদেশের প্রাইভেট চ্যানেলগুলো বহু গুরুত্বপূর্ণ খেলা দর্শকদের উপহার দিচ্ছে। খেলাগুলোর প্রচার স্বত্ব এখন যে শুধু বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোই গ্রহণ করছে তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মাটি থেকে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করছে। আর সেই খেলা দেখাচ্ছে বিদেশের নামি প্রতিষ্ঠানগুলো।
শুধু ক্রিকেট নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেভাবে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, টেলিভিশন, সর্বোপরি এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা যে দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখিয়েছে তার পেছনে অবশ্যই বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিরাট অবদান রয়েছে। সেই কারণে বাংলাদেশ টেলিভিশন যখন বাংলা টেলিভিশনের পঞ্চাশ বছর পালন করে তখন এই পঞ্চাশ বছরে যে মানুষগুলো এই প্রতিষ্ঠানে জড়িয়ে ছিলেন তাদের কথাও মনে রাখা প্রয়োজন।
 

বর্ষপূর্তি সংখ্যা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close