¦
সংকটে-সংগ্রামে লোকসঙ্গীত

ইন্দ্রমোহন রাজবংশী | প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৫

মহান ভাষা আন্দোলনের মাসে ষোল বছর আগে যাত্রা শুরু করে দৈনিক ‘যুগান্তর’। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সংবাদ, দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিজ্ঞান, পরিবেশ-প্রকৃতি, সাহিত্য ও বিনোদনবিষয়ক সামগ্রিক প্রকাশনা এবং শৈল্পিক আঙ্গিক সৌষ্ঠবগুণে পত্রিকাটি ইতিমধ্যেই এর পাঠক-পাঠিকাদের কাছে দেশের সর্বাধিক প্রচারিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতীয় দৈনিকের মর্যাদায় ষিক্ত হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে তিন দিনব্যাপী বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে গৌরবময় ষোলতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। বাংলাদেশের বিগত ৫ জানুয়ারির পরবির্তী চলমান রাজনৈতিক সমস্যার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট দেশব্যাপী অচলাবস্থার এ ঘোর সংকটকালে পত্রিকাটির মূল প্রতিপাদ্য ‘সংকটে, সম্ভাবনায় স্বপ্নের বাংলাদেশ’ নির্বাচনও সময়োপযোগী দূরদর্শিতার পরিচায়ক। আর তাই লোকসঙ্গীতের একজন ছাত্র হিসেবে ‘বাংলা ও বাঙালি’র ‘সংকটে ও সংগ্রামে’ লোকসঙ্গীত কতখানি ভূমিকা রেখেছে- সে বিষয়ে জানার বাসনা থেকেই বক্ষমাণ লেখাটি উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।
আমরা জানি, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তানি শাসকদের সৃষ্ট নানা কুটচক্রজালের অনেক বাধা-বিপত্তি ও আন্দোলন ছিন্ন করে ১৯৭১-এ দু’লক্ষাধিক মা-বোনের সযত্নলালিত আত্মসম্ভ্রম ও ত্রিশ লাখ বাঙালির তাজা প্রাণের বিনিময়ে ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি নতুন পতাকা খচিত একটি সম্ভাবনাময় নতুন ভূখণ্ড- আমাদের ‘স্বপ্নের বাংলাদেশ’।
ইতিহাসের পাতায় সামান্য একটু চোখ বুলিয়ে এলেই আমরা দেখতে পাব, হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত ‘অবিভক্ত বাংলা’ যেমন ছিল সম্পদশালী, তেমনই সমৃদ্ধ ছিল এ অঞ্চলের ভাষা, শিল্প, সাহিত্য ও ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত। তাই তো বারবার বর্গি এসেছে এ দেশে। লুটে নিয়েছে সম্পদ শত শত বছর ধরে। কিন্তু হার মেনেছে বারবার আমাদের মাতৃভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও গীতিময়তার কাছে। বাংলাকে লুণ্ঠন করে ওরা ধনী ও বিত্তশালী হয়েছে বটে, তবে বড় ও সম্পদশালী হতে পারেনি। অন্তত প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক মতে প্রাপ্ত অতীতের শিলালিপি, মুদ্রা, পুঁথি-সাহিত্য, গদ্যও কবিতা থেকে সে আভাসই মেলে। তাই বলা চলে গোটা বাংলাই শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে যেমন ছিল সম্ভাবনাময়, তেমনই বাঙালিরা ছিল গীত, বদ্য ও নৃত্যে সঙ্গীতময়। বিশেষত লোকসাহিত্য ও সঙ্গীতে।
লেখার এ ছোট্ট পরিসরে এবার আমরা এ ঐতিহ্যবাহী লৌকিক গীতিময় বাংলার অতলান্ত সাগরকূল থেকে অতি সামান্য কিছু উপমার ঝিনুক কুড়িয়ে নিয়ে তার বিশালত্বের অস্তিত্বকে খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করব। আমি ছোটবেলায় গ্রামের বিভিন্ন হাট-বাজারে গান গেয়ে অনেক ছিন্নমূল মানুষকে জীবিকা নির্বাহ করতে দেখেছি। তাদের অনেকের কণ্ঠে শোনা একটি গান এখনও আমার মনে আছে। সেটি হল-
‘একদিন নবী মোস্তফায়, রাস্তা দিয়া হাঁইটা যায়
হরিণ একটি বান্ধা ছিল গাছেরই তলায় (গো)।’
গানটি কাহিনীমূলক ও অনেক বড়। তাই পুরোটা না লিখে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক কাহিনীটি অতি সংক্ষেপে ব্যক্ত করছি। একদিন নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় গাছের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা একটি হরিণ দেখতে পান। হরিণটি সকাতরে নবীজীকে গলার বাঁধন খুলে দিতে অনুরোধ জানিয়ে অঙ্গীকার করে যে, এক দৌড়ে গিয়ে সে ওর দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাদের দুধ খাইয়ে আবার ফিরে আসবে। তাকে অবিশ্বাস করে কেউ খুলে দেয়নি। কিন্তু মহান দ্বীনের নবী ওকে খুলে দিলেন। কথামতো সে ফিরে এলো। নবীজী ওকে আর না বেঁধে চলে যেতে বলেন। গানটির মূল বিষয় ছিল- ‘কথা দিলে কথা রাখতে হয়’।
সহস্রাধিক বছরের কাহিনীও বাংলার কোনো এক অজ্ঞাত লোককবির বয়ানে কতটা ফুটে উঠেছে।
বাল্যকালেই কালজয়ী শিল্পী আব্বাউদ্দীনের গাওয়া অত্যন্ত বিখ্যাত একটি সম্ভাবনাময় মুসলিম জাগরণী গান শুনেছিলাম, যে গানের বাণী ও সুর আমার মতো হয়তো অনেকের হৃদয়ে আজও স্থায়ীভাবে গেঁথে আছে। গানটি হল-
‘শোন মুমিন মুসলমান, করি আমি নিবেদন
এই দুনিয়া ফানা হবে জেনেও জান না।’
এমন আরও একটি কাহিনীমূলক গান। কারবালারই কাহিনী। এ গানটির বাণী ও সুর রচনা করেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সেটি হল-
‘ওগো মা, ফাতেমা- ছুটে আয়
তোর, দুলালের বুকে হানে ছুরি।’
সে কারণেই আব্বাসউদ্দীনকে মুসলিম রেঁনেসাস বা মুসলিম জাগরণের শিল্পী বলা হয়।
এবারের গানটিও খুবই জনপ্রিয় এবং অজ্ঞাত কোনো লোককবির রচিত। কারবালারই কাহিনী। যে গানটি পরিচালক আজিজুর রহমান নির্মিত শ্রদ্ধেয় সত্য সাহার সঙ্গীতে ‘গরমিল’ বাণীচিত্রে (১৯৭৫) সংযোজিত হয়েছে। বরেণ্য শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গানটি আমারও গাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। গানটি হল-
‘মহররমের দশ তারিখে করলি কিরে রব্বানা,
হায় হাসান, হায় হোসেন বলে কাঁদে সোনার মদিনা।’
এমন আরও বহু প্রাচীন ও ধর্মীয় কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে প্রচুর লোকগান।
ইতিহাস বলে, সুলতানী আমলে বাংলা ও বাঙালির ভাষা ও জাতীয়তাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই বাংলার দক্ষ প্রশাসক সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস (১৩৪২-১৩৫৮) লক্ষণাবতি ও বাংলাকে একত্রিত করে যুক্ত এ অঞ্চলকে ‘বাঙ্গাল’ নামে অভিহিত করেছিলেন এবং নিজে ‘শাহ-ই-বাঙালি’ উপাধিও গ্রহণ করেছিলেন। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে আফগানদের কাছে সুলতান গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহের পরাজয়ের মাধ্যমে সুলতানী আমলের অবসান ঘটলে পরবর্তী ৪০০ বছরেরও অধিককাল (১৫৩৮-১৯৪৭) চলে আফগান, মোগল, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজদের হাতে সম্পদশালী বাংলাকে সহায়-সম্বলহীন করার কাল। চলে সীমাহীন অত্যাচার, শোষণ ও লুণ্ঠন।
এ শোষণ-বঞ্চনার মাঝেও বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর কিছুটা প্রয়াস দেখা যায় মধ্যযুগীয় কীর্তিমান কবি মুকুন্দরামের ‘চণ্ডিমঙ্গল’ কাব্যে। সামন্ত প্রভুদের রাজস্ব আদায়কারীরা কীভাবে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষদের অত্যাচার ও নিপীড়নের মাধ্যমে শোষণ করত, তারই প্রমাণ পাওয়া যায় লৌকিক গীতিআঙ্গিকে তার এ গীতিকবিতাংশে। তিনি লিখেছেন-
‘নৃপতি অধর্ম্মশীল দয়া নাই একতিল
নিষ্ঠুর স্বভাব যতলোক,
কৃপণ দারুণ ভণ্ড লঘুপাপে গুরুদণ্ড
পরধন খেতে যেন জোঁক।’
মধ্যযুগীয় আরেক শক্তিশালী বাঙালি কবি নোয়াখালী জেলার অধিবাসী আবদুল হাকিম লৌকিক আঙ্গিকে তার ‘নূরনামা’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। সে কাব্যে অপরিণামদর্শী কিছু বাঙালির ইংরেজি ভাষাপ্রীতি লক্ষ্য করে অত্যন্ত তীব্রভাবে তার আঞ্চলিক ভাষায় প্রতিবাদ করেছিলেন এভাবে-
‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী,
সে সবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়,
নিজ দেশ তিয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।’
কর্নওয়ালিসের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’-র পর ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা প্রতিহত করার জন্য বাংলাজুড়ে জ্বলে ওঠে ‘সন্যাসী বিদ্রোহ’ ও ফকির বিদ্রোহ থেকে ‘সিরাজগঞ্জ বিদ্রোহ’-র মতো অনেক বিদ্রোহের আগুন (১৭৭৮-১৮৭৩)। বাংলার সম্পদ তো ওরা লুট করেছেই, নীলচাষ করে করে বাংলার মাটিকে ওরা তামাটে করে দিয়েছে। বাংলার খ্যাতিমান কবিয়াল নিবারণ পণ্ডিত (১৯১৫-১৯৮৫) রচিত একটি জারিগানে তা উঠে এসেছে এভাবে-
‘শোন কথা বলছি ভাইরে শোন দিয়া মন,
বহুদিনের কথা এযে অতি পুরাতন।
প্রাচীনকাল হইতে বাংলায় চলতো নীলচাষ,
নীলচাষ করিয়া চাষীর চলতো বারোমাস।
অত্যাচারের ফলে চাষী ক্ষেপিয়া উঠিল,
জেলায় জেলায় চাষীরা সব জমায়েত হইল।’
অনেক কষ্টের সাগর পেরিয়ে উনবিংশ ও বিংশ শতকে আমাদের ভাগ্যগুণে আবির্ভূত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন ও কাজী রজরুল ইসলামের মতো জাতির ঘুম-ভাঙানিয়া পঞ্চপ্রধান-গীতিকবিরা এবং সমসাময়িক অন্যান্য বরেণ্য কবি ও সাহিত্যকরা- যারা গণজাগরণের ক্ষেত্রে বাঙালির মনোজগতের কাণ্ডারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
অসংখ্য দেশপ্রেমমূলক গান, ভাষার গান ও বিপ্লবী জাগরণী গান রচনা করে তারা বাংলার গণমানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাদের রচিত জাগরণী গীতধারার অমিত তেজে ১৯০৫-এর ইংরেজদের বঙ্গভঙ্গ ষড়যন্ত্রও রহিত হয় ১৯১১ সালে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের অপরাধে ১৯০৮ সালের ১৪ বছরের কিশোর ক্ষুদিরামের ফাঁসির আদেশ হলে সে সময়ের এক অজ্ঞাত লোক গীতিকবি রচনায় দেখতে পাই এ কালজয়ী গানটি-
‘একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি।
হাসি হাসি পরবো ফাঁসি দেখবে ভারতবাসি।’
গানটি গোটা বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে যেভাবে কাঁদিয়েছে তার দৃষ্টান্ত বাংলা সঙ্গীতে অদ্যাবধি যেমন বিরল, তেমন সারা বাংলার মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আক্রোশে ফুঁসে ওঠে ওদের বাংলা ছাড়ার পথ করেছিল ত্বরান্বিত।
ব্রিটিশরা বাংলা ভাষাকে তাচ্ছিল্য করত বলে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় অতুল প্রসাদ সেন লৌকিক কীর্ত্তনাঙ্গের সুরে রচনা করেছিলেন এই অতুলনীয় গানটি-
‘মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা।
মাগো, তোমার কোলে তোমার বোলে কতই শান্তি ভালোবাসা
আ-মরি বাংলা ভাষা॥
কী যাদু বাংলা গানে, গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে
গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা॥’
১৯১৩ সালে ভাষা ও সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বস্বীকৃতি ‘নোবেল পুরস্কার’ প্রাপ্তি বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। বাংলা ও বাঙালির গণজাগরণে দিশেহারা ব্রিটিশরা নবকৌশলে ঘটায় মন্বন্তর (১৩৫০ বঙ্গাব্দ)। সে মন্বন্তরে সারা বাংলার বহু মানুষ অনাহারে প্রাণ হারায়। সে সংকটেও বাংলার লোককবিরা নীরব থাকেননি। তারই প্রমাণ মিলে লোকসাধক কৃষ্ণসাধু (১৮৬৮-১৯৬৬) রচিত এই লোক গানে-
‘আইলোরে ঘোর কলিকাল কি দেখি হাল পথেঘাটে।
চাউলের সের আনা-আনা, ইলিশজোড়া চায় আটআনা
কিনে খাবো তেমন কড়ি নাই যে গাঁইটে,
এ যেন, সব বেসামাল তালে বেতাল আইসাছি পাগলের হাটে।’
ফলে কেবল শহর-বন্দরেই নয়, গ্রামে-গঞ্জেও পড়ল গণজাগরণের সাড়া। এরপর একপর্যায়ে কুটচালে পারদর্শী ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী রেডক্লিফের মাধ্যমে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়ে ষড়যন্ত্রের শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় ১৯৪৭ সালে।
সে কথাটিই লোকসঙ্গীতের অমর গীতিকবি, সুরকার ও শিল্পী আবদুল লতিফ তার ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’ শীরোনামে বর্ণনামূলক ইতিহাসভিত্তিক গানে ব্যক্ত করেছেন এভাবে-
‘বৃটিশ গেলো সঁইপা গেলো জল্লাদেরই হাতেরে,
তারা মোদের খুন কইরাছে নানান অজুহাতেরে।’
প্রথমেই ওরা ভাষার ওপর আঘাত হানল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মি. কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহ্ ‘শুধু উর্দু, এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’- এই দম্ভোক্তি করে বাংলার ছাত্র-জনতাকে ক্ষেপিয়ে তোলেন। সংখ্যাগুরু পূর্বাংশের দেশপ্রেমিক ছাত্র-জনতা পশ্চিমাংশের সংখ্যালঘুদের এ দম্ভোকি মেনে নিতে পারেনি। মায়ের ভাষার মুক্তির দাবিতে গর্জে উঠল বাঙালি। চলে মিটিং-মিছিল। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে-স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা।
তীব্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দিশেহারা পাকিস্তান সরকার ১৯৫২ সালে জারি করে ১৪৪ ধারা। ২১ ফেব্র“য়ারি সে ১৪৪ ধারা ভাংলো ছাত্র-জনতা। পুলিশ গুলি চালাল। ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হল সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর এবং আরও নাম না জানা শহীদদের বুকের রক্তে। সারা দেশে বিদ্যুৎ গতিতে সে দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। ভাষা আন্দোলনের এ সংকটকালে বরেণ্য লোকসঙ্গীত রচয়িতা, সুরকার ও শিল্পী আবদুল লতিফ গ্রাম্য ভাষায় লিখে নিজের সুরে নিজেই গেয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সাবলীলভাবে জানিয়ে দিলেন তার জাগরণী প্রতিবাদ-
‘ওরা, আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়॥
ওরা, কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে পায়॥
কইতো যাহা আমার দাদায়, কইছে তাহা আমার বাবায়
এখন, কও দেখি ভাই মোর মুখে কি অন্য কথা শোভা পায়?’
মাতৃভাষার দাবিতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়ার এ হৃদয়বিদারক ঘটনা বাগেরহাটের ক্ষুদ্র তেল ব্যবসায়ী শাসুদ্দিনের বক্ষও বিদীর্ণ করেছিল। তার লেখনীতেও সৃষ্টি হয়েছিল স্বজন হারানোর বেদনা-
‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালী
তোরা, ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি।’
গানটি আবদুল লতিফ সাহেব তার কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিজে গেয়েছেন ও বরেণ্য শিল্পী আবদুল আলীমসহ অনেক শিল্পীর কণ্ঠে তুলে দিয়ে গাইয়েছেন। যা আজও অনেক শিল্পীই গাইছেন।
পরের বছর খুব উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে প্রথম শহীদ দিবস পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করল বাঙালি। তৈরি হল অস্থায়ী শহীদ মিনার। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখলেন তার অমর গীতিকবিতা, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি।’ (যা প্রথমে আবদুল লতিফ ও পরে চূড়ান্তভাবে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আলতাফ মাহমুদ কর্তৃক সুরারোপিত হয়ে এখন সারা বিশ্বে গীত হচ্ছে। ‘শহীদ দিবস’ রূপ নিয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এ।) ভাষাসৈনিক গাজীউল হক লিখলেন, ‘ভুলবোনা ভুলবোনা, একুশে ফেব্রুয়ারী ভুলবোনা’। রোপিত হল ‘স্বাধীনতা’র বীজ।
সে আন্দোলনের পথ বেয়েই ১৯৬৬ সালে এলো বাংলার ‘মুক্তির সনদ’ বলে খ্যাত বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ও ছাত্রদের এগারো দফা। বিপাকে পড়ল পাকিস্তান সরকার। সে সময়ে গীতিকার, সুরকার ও লোকসঙ্গীতশিল্পী হাফিজুর রহমান লিখলেন-
‘আরে, ও আমার বাংলাদেশের মাঝিভাই,
জয়বাংলা বলিয়া আইসো রঙিন পাল উড়াই,
আমার, বাংলাদেশের মাঝিভাই।।
মাঝি ও- ছয় দাঁড়েতে নৌকা চলে মুখে আল্লাজী
ওরে, পাছানায়ে হাইল ধইরাছে গোপালগঞ্জের মাঝি॥’
জন্ম হল আরও অনেক প্রতিবাদী পল্লী গান, গণসঙ্গীত ও উদ্দীপনামূলক দেশাত্মবোধক গানের। সঙ্গে পঞ্চকবিদের গান তো ছিলই।
এবার পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রহসনে বন্দি করল দেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার নিত্য সহচর অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে। আবার তীব্র অন্দোলনের মুখে তাদের সসম্মানে মুক্তিও দিতে বাধ্য হল।
তারই ধারাবাহিকতায় পর্যায়ক্রমে এলো অগ্নিঝরা ঊনসত্তরের গণআন্দোলন ও সত্তরের নির্বাচন। পাকিস্তানের উভয় অংশ মিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল তার দল আওয়ামী লীগ। আবারও হাফিজুর রহমানের বাণী ও সুরে সৃষ্টি হল গ্রাম-বাংলার সম্ভাবনার গান-
‘আমার নেতা শেখ মুজিব, তোমার নেতা শেখ মুজিব
দেশের নেতা শেখ মুজিব, দশের নেতা শেখ মুজিব
আজি, বাংলা মা’র কোল কইরাছে উজল-
ওরে, মনের আশা আল্লায় তারে কইরা দিক সফলরে
আশার আলো করতাছে ঝলমল।’
আনন্দিত আমরা গলা খুলে গাইলাম সে গান। নির্বাচনে বাঙালির নিরংকুশ বিজয় পশ্চিমাদের আরও দিশেহারা করে দিল। আবার স্বভাবজাত কুটকৌশলের আশ্রয় নিল তারা। চালাল আন্দোলনের নামে কালক্ষেপণ। এলো অসহযোগ আন্দোলন। আবার লিখলেন আবদুল লতিফ-
‘টাল-বাহানা করবি কত বল্ ও পশ্চিমার দল
টাল-বাহানা করবি কত বল্।’
একইভাবে হাফিজুর রহমানও লিখলেন-
‘হুলো বিড়াল সামাল থাইকো থাবা আর বাড়াইও না-
রুইমাছের মাথা খাইও না (ও বিড়াল)।
শেখের হাতে শক্ত লাঠি বুইঝা আইসো ঘরে,
তোমার মত লক্ষ বিড়াল এক বাড়িতে মরে।’
এই গানটি অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমার বহু অনুষ্ঠানে গাওয়ার সুযোগ ঘটে। আমি গানের গীতিকার ও সুরকারকে ছয় দফার সময় লেখা ‘ছয় দাঁড়েতে’, ’৭০-এর নির্বাচনের আগে লেখা ‘জয়বাংলা জয়বাংলা বইলারে’ আর নির্বাচনের পরে লেখা ‘আমার নেতা শেখ মুজিব’ এবং অসহযোগ আন্দোলনের সময় লেখা ‘হুলো বিড়াল’- এই চারটি গানের একটি গ্রামোফোন ডিস্ক বের করতে অনুরোধ করি। শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় আমাদের সঙ্গে যোগদান করলে তার সঙ্গে আমি প্রথম তিনটি গানে নেতৃত্ব দেই এবং ‘হুলো বিড়াল’ গানের নেতৃত্বে ছিলাম আমি ও গানগুলোর গীতিকার-সুরকার জনাব হাফিজুর রহমান স্বয়ং। সমবেত অংশে আমাদের সঙ্গে ছিলেন আমার একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের দু’কন্যা লিলি হক, জলি হক ও আরেকজন মহিলা শিল্পী (এ মুহূর্তে তার নামটি মনে না হওয়ায় আমি দুঃখিত)।
সে সময় আমাদের ঢাকায় ‘ডিস্ক’ হতো না। করাচি থেকে করিয়ে আনতে হতো (এ ক্ষেত্রেও ছিল পাকিস্তানিদের বৈষম্য)। আমরা উপায়ান্তর না দেখে এইচ. এম. ভি-র পূর্বাংশের তৎকালীন প্রধান শিল্পী কলিম শরাফির শরণাপন্ন হই। তিনি বেশ ঝুঁকি নিয়ে করাচি থেকে গানগুলো ‘ডিস্ক’ করিয়ে আনেন।
‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ ২৫ মে, ১৯৭১ বালিগঞ্জে স্থানান্তরিত না হওয়া অবধি এ গানগুলো প্রতিদিন বহুবার প্রচারিত হয়েছে এবং পরে চূড়ান্ত বিজয় না আসা পর্যন্ত অন্যান্য গানের সঙ্গেও বেজেছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বাংলা গানের পঞ্চপ্রধান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন ও আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন পর্যায়ের উদ্দীপনামূলক ও দেশাত্মবোধক অনেক গান ছাড়াও ছিল সুকান্ত ভট্টাচার্য্য, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সলিল চৌধুরী, গোবিন্দ হালদার, শামসুর রাহমান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, ফজল-এ-খোদা, আপেল মাহমুদ, নইম গওহর এবং আরও অনেক গীতিকার রচিত গান এবং একই সঙ্গে ছিল আবদুল লতিফ, হাফিজুর রহমান, সরদার আলাউদ্দিন, মকসেদ আলী সাঁই, ইন্দ্র্র মোহন রাজবংশী, মোঃ মোশাদ আলী, অনিল বাউল এবং আরও অনেক গীতিকার রচিত অসংখ্য জনজাগরণমূলক পল্লী গান। স্থানাভাবে সেগুলোর মধ্যে সামান্য কিছু গানের অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত হল-
গীতিকার ফজল-এ-খোদার বাণীতে বিখ্যাত লোকসুরে মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতার প্রতি শিল্পী আবদুল জব্বারের আবেগপ্রবণ আবেদন-
‘মুজিব, বাইয়া যাওরে-
নির্যাতিত দেশের মাঝে জনগণের নাও
ওরে মুজিব, বাইয়া যাওরে।’
নিজের বাণী, সুর ও কণ্ঠে দেশবাসীর প্রতি শিল্পী ইন্দ্র মোহন রাজবংশীর আকুল আবেদন-
‘কে কে যাবি আয়রে, চল্ যাইরে,
আয় বাঙালি মুক্তিসেনা বাংলার মান বাঁচাইরে।
জেগেছি আজ কুলি-ঢুলি, হাইলা-জাইলা ভাই,
গোঁজামিলে মোদের বোকা বানানোর দিন নাই,
মোরা নিজের বাহুবলে, বাধা-বিঘ্ন যাবো ঠেলে,
শান্তি নাই আর যতক্ষণ না নিজের অধিকার পাইরে।’
শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়ের দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারিত হল বাংলার সব মানুষের অধিকারের প্রত্যয় গানটির গীতিকার মরহুম মহসীন আলী। সুরারোপ করেছিলেন বাংলাদেশ বেতারের অবসরপ্রাপ্ত সঙ্গীত প্রযোজক খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া। গানটির বাণী ছিল এরকম-
‘ছোটদের-বড়দের সকলের, গরীবের-নিঃস্বের-ফকিরের,
আমারই দেশ সব মানুষের।
নেই ভেদাভেদ হেথা চাষা আর চামারে,
নেই ভেদাভেদ হেথা কুলি আর কামারে।
হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খৃস্টান, দেশমাতা এক সকলের।’
নিজের রচনা, সুর ও কণ্ঠে শিল্পী মোশাদ আলী ব্যক্ত করেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলদেশের করুণ কাহিনী-
‘এইনা, বাংলাদেশের গান গাইতেরে
দয়াল, দুঃখে আমার পরান কান্দেরে’
আপন বাণী ও সুরে অনিল বাউলের শান্ত কণ্ঠেও ঝরে পড়ে পশ্চিমাশাসক ইয়াহিয়ার প্রতি তীব্র ঘৃণা- ‘লাথি মার লাথি মার- ইয়াহিয়ার গদিতে লাথি মার’-ইত্যাদি গানের মতো প্রচুর গান মুক্তিযুদ্ধের সময় রচিত ও গীত হয়েছে। চূড়ান্ত বিজয় সাধিত হওয়ার পর থেকেও দেশ ও সমাজ গঠনে আমাদের লোকসঙ্গীত অবিরাম অবদান রেখে চলেছে। গ্রামবাংলার হাটে, মাঠে, ঘাটে খুঁজে বেড়ালে আমরা তার বহু নজির দেখতে পাব।
শুধু লোকসঙ্গীতই নয়, সঙ্গীতের সব ক্ষেত্রেই মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বল্প সময়ে আমাদের যেসব অমূল্য সম্পদ অর্জিত হয়েছিল, সংরক্ষণের অভাবে আমরা সেসব সম্পদ হেলায় হারিয়ে ফেলতে বসেছি। গবেষণা না করলে যা হয়তো আমরা আর কোনোদিনই ফিরে পাব না। সরকারের সংশ্লিষ্টদের উচিত অনতিবিলম্বে সেদিকে নজর দেয়া।
 

বর্ষপূর্তি সংখ্যা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close