¦
আমাদের ফুটবল

মোঃ জাকারিয়া পিন্টু | প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৫

অনেকে মনে করেন ক্রিকেটের বন্যায় আমাদের দেশের ফুটবল ভেসে গেছে। আসলে কি তাই? এক সময়ের উন্মাদনা ফুটবল আজ মিয়ম্রাণ। কিন্তু কেন? আশির দশকে যে মানের ফুটবল ছিল এখন কি তা আছে? খেলোয়াড়দের নৈপূণ্যের সঙ্গে সঙ্গে সম্মিলিত ফুটবল দেখতেই দর্শক-সমর্থক মাঠে ভিড় জমায়। কিন্তু এখন এর অভাব প্রকট আর এ সুযোগে উপমহাদেশের ক্রিকেট বাণিজ্যের মূল লক্ষ্যেই ক্রিকেটকে প্রাধান্য দেয়া হয়। আজ এ কারণেই প্রিন্ট মিডিয়াও ক্রিকেটের ওপর কয়েক কলাম বরাদ্দ রাখে। দর্শক-পাঠক স্বাভাবিকভাবেই মনোস্তাত্ত্বিক কারণে ক্রিকেটের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন মাঠের অভাবে সময়মতো ফেডারেশন কাপ, জাতীয় ফুটবল, পেশাদার লীগ, জুনিয়র লীগ, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিযোগিতা সিডিউল মোতাবেক করতে ব্যর্থ হয়। সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলো যেমন প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ, বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ, এককালের হারিয়ে যাওয়া রমরমমা ক্লাব টুর্নামেন্ট, আগা খান গ্লোডকাপের আসর বসানোর ব্যর্থতা আমাদের ফুটবলের উৎকর্ষ বিধানে এবং ফুটবলের মানকে সর্বকালের সর্বনিুস্তরে নিয়ে এসেছে। সেই কারণেই ফুটবলের আজ হতশ্রী দশা।
ফুটবল ও ক্রিকেট কোনো দ্বন্দ্ব নয়। আমি মনে করি বাংলাদেশে দুটি খেলারই খুব প্রয়োজন ও দুটিই জনপ্রিয়। আমাদের হৃদয়ের খেলা ফুটবল, ১৬ কোটি মানুষের স্পন্দনের খেলা। আমাদের গ্রাম-শহর, পাড়া-মহল্লায়, ফুটবল নিয়ে যে চর্চা হয় তা পৃথিবীর কোনো দেশেই হয় না। আমাদের শৈশব, আমাদের তারুণ্য এ ফুটবলের সঙ্গেই এককার হয়ে আসছে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের ফুটবলের এত দীনতা কেন? দিন দিন কেন জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। এ মনমাতানো খেলাটি?
কয়েক বছর ক্রমাগত দুর্নীতি, পাতানো খেলা, পরিকল্পনাহীন, স্বেচ্ছাচারিতা তারকাশূন্য দল এবং অসহযোগিতা ফুটবলকে এমনই অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে যে সেখান থেকে ফের আলোর পথ দেখা খুবই কষ্টকর। তবুও ফুটবলের স্বার্থে কষ্টকর সে পথ থেকে উঠে আসতে হবে। আমি বাফুফের বর্তমান নন্দিত সভাপতি অনুজপ্রতিম কাজি সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে বাফুফের নির্বাচিত কয়েক ঝাঁক ফুটবল তারকার সমন্বয়ে মৃতপ্রায় ফুটবলের পূর্ণজাগরণ ঘটবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ইতোমধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ ও টুর্নামেন্ট তা প্রমাণ করেছে। তবে এ ব্যাপারে মিডিয়া পারে সমর্থন ও প্রেরণা দিয়ে সহযোগিতা করতে।
আমাদের দেশের ফুটবলের এক অনন্য ইতিহাস রয়েছে। যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। যে দেশের ফুটবলাররা মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৪ জুলাই ভারত সরকারের স্বীকৃতি ছাড়াই সে দেশের মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা অন্য দেশের পতাকার সঙ্গে উত্তোলন করেছেন, যারা ভারতের বিভিন্ন জায়গায় প্রীতি ম্যাচ খেলে ভারতের মুদ্রায় ৫ লাখ রুপি মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে জমা দিয়েছেন, সে দেশের ফুটবল কেন উন্নতি করতে পারবে না? সেই টিমেরই একজন অনন্য সদস্য বাফুফের বর্তমান সভাপতি। তাই ফুটবল এদেশ থেকে কেন হারিয়ে যাবে, এ প্রশ্ন আপামর জনগণের।
দেশের সব ফুটবলপ্রেমিকের বহুদিনের দাবি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ফিরে পেলেই ফুটবল তার হৃদ গৌরব ফিরে পাবে। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর স্টেডিয়ামটি ফুটবলের জন্য পেয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে মতিঝিলে অবস্থিত একটি সুন্দর ফুটবল ভবন পেয়েছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে স্টেডিয়াম আর ভবনের চাকচিক্য খেলার মান বাড়ায় না। খেলার মান তখনই বাড়ে যখন খেলোয়াড়রা ভালো খেলেন। ভালো খেলা দেখতে না পারলে দর্শকরা কেনইবা আসবে পয়সা খরচ করে ফুটবল খেলা দেখতে। ফুটবলের এক ঘোর সমর্থকের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর আগে এক বিয়ের মজলিসে দেখা। ভদ্রলোকের বয়স হয়েছে। গাল তোবরানো, মাথার চুল সবই সাদা। এককালে আমার এবং আমার দল মোহামেডানের গোঁড়া সমর্থক ছিলেন। তিনি ৪০ বছর ধরে ঢাকা ফুটবলের একজন নিয়মিত দর্শক ছিলেন। কয়েকবছর হল আর ফুটবল খেলা দেখেন না। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি হেসে বললেন, আপনারা তো খেলতেন খেলার জন্য। আপনারা ছিলেন অ্যামেচার। এখন খেলার ধরন বদলে গেছে। আসলে এ দেশে এখন জাত খেলোয়াড়ের আকাল চলছে। মিুমানের বিদেশি খেলোয়াড় এনে ফূটবলের মানকে ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। তাই কষ্ট করে স্টেডিয়ামে না গিয়ে বাসায় বসে টিভিতে বিদেশি ফুটবল দেখি। তাছাড়া কষ্ট করে ব্ল্যাকে টিকিট কিনতে হয় না। জানের নিরাপত্তাও থাকে।
উঁচু মানের জাত খেলোয়াড় হতে যে নিষ্ঠা, সংযম ও আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন তা আর কোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে বড় একটা চোখে পড়ে না। ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত দেখেছি ছোট কিংবা মাঝারি দলের খেলা দেখতে প্রতিদিনই মাঠের চার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসতেন কিছু ফুটবলপাগল দর্শক। তারা জুনিয়রদের খেলা দেখে তারিফ করতেন। উপভোগ করতেন নির্মল আনন্দ। এখন আর সে দৃশ্য চোখে পড়ে না। সেই পরিবেশও এখন আর নেই।
সমর্থক ভদ্রলোকের ক্ষোভের কারণটা একেবারে উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। আমাদের দেশে জাত ফুটবলারদের সংখ্যা কমতে কমতে বর্তমানে প্রায় শূন্যের কোটায় এসে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে ঢাকা মাঠে যারা খেলছেন তাদের কারও খেলা ফুটবল রসিকদের তেমন টানতে পারছে না। বড় দলগুলো দেশের ফুটবলের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত কল্যাণকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। তাদের লক্ষ্য পয়েন্ট, ট্রফি কিংবা চ্যাম্পিয়নশিপ। এ মনোভাব নিয়েই তারা প্রসন্ন। সেখানে জাত খেলোয়াড় তৈরির সময় কই তাদের হাতে। জেতা বা হারা ছাড়াও স্টেডিয়ামে যে জিনিসগুলো ফুটবল রসিকদের মন কাড়ত সে সবের কিছুই আর এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। ফুটবলারদের ব্যক্তিগত বুদ্ধিমত্তার এখন বড় অভাব। নবী চৌধুরীর হেড, নান্নুর ট্যাকলিং, প্রতাপের সেন্টার, সারী ও হাফিজের ড্রিবলিং, সালাউদ্দিনের গোল করা দেখার আশায় মাঠে দর্শক ঠাসা থাকত একসময়। আর এখন? বিশেষ কোনো ফুটবল খেলোয়াড়ের নাম বলব, যিনি ফুটবল রসিকদের আইডল হতে পেরেছেন?
অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে এ অপ্রিয় সত্যটি আমাকে বলতে হচ্ছে, এখন খেলোয়াড়দের ক্লাব ও জাতির প্রতি যে দায়বদ্ধতা ও আনুগত্য, তার ভিত বড়ই নড়বড়ে। ফুটবলাররা এখন যেন পারচেচিবল কমোডিটি অর্থাৎ বিক্রয়যোগ্য পণ্য। যেখানে টাকার হাতছানি, সেখানে তারা হাজির। ভাবটা এমন, দর থাকতেই দামটুকু উসুল করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কথায় বলে অর্থই সব অনর্থের মূল। আর এ অর্থের জন্য বর্তমান খেলোয়াড়দের সঙ্গে ক্লাব কর্মকর্তাদের ব্যবধান অনেক। কিন্তু সুযোগ সন্ধানী ক্লাবকর্তারা নিজের স্বার্থের অলিগলি ধরে ঘোরাফেরা করেচোরাপথ অপেশাদার খেলোয়াড়দের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিচ্ছেন। দল ভাঙতে আরও মোটা টাকার থলি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এর ফলে একদিকে যেমন নিুবিত্তের ঘরে হঠাৎ প্রাচুর্যে অন্যদিকে খেলোয়াড়দের স্বাভাবিক প্রতিভা উন্মেষের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাত খেলোয়াড় তৈরির পথ হয়ে পড়েছে রুদ্ধ।
আমাদের সময় ক্লাবকর্তাদের প্রতি যেমন ছিল আমাদের শ্রদ্ধা, তেমনি ছিল তাদের সঙ্গে অকৃত্রিম হৃদ্যতা। যে ক্লাব খেলোয়াড়দের দিত সম্মান ও মর্যাদা, সে ক্লাবের পতাকা সমুন্নত রাখার আদর্শ নিয়েই আমরা প্রাণপণে খেলতাম। আর তাই বেশি সময় ধরে সে ক্লাবের পতাকা তলে খেলার প্রবণতাও আমাদের মধ্যে ছিল প্রবল। যে ক্লাবকে একবার কথা দিতাম, সেই ক্লাবেই খেলতাম দিনের পর দিন। আর এখন, বছরান্তে ক্লাব পরিবর্তন ও টাকার প্রতি ঝোঁক খেলোয়াড়দের একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি নির্দিষ্ট ক্লাবের হয়ে বেশিদিন খেললে লড়াই করার অদম্য স্পৃহায় নিজকে উদ্বুদ্ধ করা যায়। দলের উন্নয়ন বা উত্তরণ ঘটানো যায় বলে আমি মনে করি। তার প্রমাণ আমি নিজে অনেক বড় বড় লোভনীয় অফার পাওয়া সত্ত্বেও অন্য ক্লাবে না গিয়ে আমি দীর্ঘ ১৬টি বছর মোহামেডানের হয়ে খেলেছি। যার জন্য পরপর ৮ বার অধিনায়কের দায়িত্ব দিয়ে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব আমাকে সম্মানিত করেছে। এমন বিরল সম্মান পৃথিবীর অন্য কোনো ফুটবলারের ভাগ্যে জুটেছে কিনা তা আমার জানা নেই।
আগেই বলেছি, ফুটবল আমাদের দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ফুটবলের উন্নতি করতে হলে আমাদের সাংগঠনিক দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে। অন্যান্য দেশের ফুটবল সংস্থার কর্তাদের সঙ্গে আমাদের দেশের ফুটবল কর্তাদের তুলনা না করাই ভালো।
কারণ, এ দেশে ক্লাব বা ফেডারেশনে সর্বত্রই এমন কিছু লোক বিভিন্ন পদে আছেন, যারা কখনও ফুটবলের ধারে কাছে যাননি। ফুটবল যে কি, তাই তারা জানেন না। সুতরাং তারা ফুটবলের উন্নতির জন্য যে চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা করেন তা কোনো কাজে আসে না। যারা অন্তত কিছু জানেন, তারা যদি ফুটবলের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে আন্তরিকভাবে এখন থেকেই তৃণমূল পর্যায়ে থেকে ছোটদের বেছে নিয়ে, বিশেষ করে স্কুল পর্যায় কোচিং করার কথা ভাবেন তবে হয়তো ফুটবলের জন্য তারা কিছু করতে পারবেন। শুধু লীগ কিংবা টুর্নামেন্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই চলবে না, সঙ্গে সঙ্গে নতুন খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। বিদেশে ফুটবল এত জনপ্রিয়, সেই ফুটবলকে যদি আন্তর্জাতিক পর্যায় নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা না যায় তাহলে আগামী দিনে জাতির কাছে জবাবদিহি করতে হবে বর্তমানের আমাদেরই।
একজন বড় মাপের খেলোয়াড় হতে হলে আত্মবিশ্বাস হচ্ছে একটি বড় দিক। আর এ আত্মবিশ্বাসই একজন জাত খেলোয়াড়ের জন্য যে কতখানি অপরিহার্য সেটা দেখেছি আমার শ্রদ্ধভাজন জহির ভাইয়ের কাছে। মোহামেডানের বিগত দিনের এ প্রখ্যাত ফুটবলার যে কোনো বড় ম্যাচের আগে, এমনকি খেলা শুরুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত চুপচাপ থাকতেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলতেন, আরে ঘাবড়াও কেন মাঠে নামলে দেখা যাবে। দেখছি দলকে জেতানোর জন্য যা কিছু করা দরকার তা তিনি করতেন। দেখা যেত খেলতে নেমে জহির ভাই অন্য ধরনের মানুষ। দলকে জেতানোর জন্য কি খেলাই না তিনি খেলতেন। তাই তো তিনি আজও প্রবাদপুরুষ। প্রচণ্ড মনের জোর আর আত্মবিশ্বাসই তাকে একজন জাত খেলোয়াড় হওয়ার গৌরব দিয়েছিল।
 

বর্ষপূর্তি সংখ্যা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close