¦
সমালোচনা সাহিত্য : প্রাচুর্যে মোড়ানো দীনতা

রাজু আলাউদ্দিন | প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৫

বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্য প্রাচুর্য সত্ত্বেও তার আত্মার দীনতাকে আড়াল করতে পারেনি আজও। প্রাচুর্য বললাম এ জন্য যে, প্রতি সপ্তাহেই দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী এবং অন্যান্য নিয়মিত ও অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকায় সমালোচনা সাহিত্যের ধারাটি অব্যাহত রয়েছে। হয়তো অন্যসব ভাষায় এত পরিমাণ লেখাও হয় না। কিন্তু এই প্রাচুর্যের মধ্যেও আবিষ্কারের দীনতা এতই প্রকট যে, যে কোনো বুদ্ধিদীপ্ত ও সুগভীর পাঠকের নজর তা এড়াতে পারে না। প্রবীণ-নবীন এবং সমসাময়িক কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও ঔপন্যাসিকদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রতি সপ্তাহেই আলোচনা হচ্ছে। কারো কারো সম্পর্কে সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হচ্ছে বিশেষ সংখ্যা। তাতে সমাবেশ ঘটে বহু সমালোচকের। কিন্তু এদের মধ্যে বহুপাঠের অভিজ্ঞতাকে সৌন্দর্যে রূপান্তরিত করার শক্তি যেমন চোখে পড়ে না, তেমনি এ সব আলোচনায় পুরোপুরি অনুপস্থিত আলোচিতগ্রন্থ বা লেখক সম্পর্কে নতুন কিছু আবিষ্কার। সমালোচনার এই দারিদ্র্য এক অর্থে আলোচিত সাহিত্যের সৃজনশীলতার দীনতারই প্রকারান্তর। কারণ আধুনিক যুগে উচ্চ মানের সাহিত্য সৃষ্টি হবে অথচ সমকালে ভালো সমালোচক থাকবেন না- এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
পঞ্চাশের দশকে আমাদের এ অঞ্চলে আবদুল হক এবং হাসান হাফিজুর রহমানের মাধ্যমে সমালোচনা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা তৈরি হয়েছিল। ষাটের দশকে আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং হুমায়ুন আজাদের মাধ্যমে তার একটি সফল ধারাবাহিকতাও ছিল। ভালোবাসা, দীপ্তি ও গভীরতায় তা পাঠক হৃদয়কে আন্দোলিত করার মতো ছিল। এদের পরে ওই উচ্চতা নিয়ে লেখকদের মধ্যে আর কেউ সমালোচনা সাহিত্যকে রুচির পরিচ্ছন্নতা ও উপলব্ধির গভীরতায় আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য করে তুলতে পারেননি।
এদের বাইরে আমাদের কোনো কোনো প্রবীণ লেখক গ্রন্থালোচনার নামে যে সব সমালোচনা লিখেছেন সেগুলো ব্যক্তিগত অবলোকন (Personal Reflection)-এর চেয়ে বেশিকিছু হয়ে উঠতে পারেনি। প্রকৃত সমালোচকদের সুগভীর চেতনা থেকে তা উৎসারিত হয়নি বলে ওগুলোর মধ্যে কোনো স্পন্দনও নেই। ওই সব নিষ্প্রাণ আলোচনা পড়লেই বুঝা যায়, নিতান্ত অনুরুদ্ধ হয়ে বা অন্য কোনো স্বার্থের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে লেখা। সত্যিকারের ভালোবাসা দায়িত্ব আর মননের রক্ত প্রবাহিত নয় এ সব বাক্যের ধমনীতে। এই সীমাবদ্ধতার বাইরেও আরেকটি সংকীর্ণ যে মানসিকতা তাদের সব সময় অধিকার করে রাখে তা হল : আমার নিজের সৃষ্টিশীল লেখার (সৃষ্টিশীল বলতে তারা বুঝিয়ে থাকেন কবিতা, গল্প এবং উপন্যাস) এত বেশি তাগিদ রয়েছে, সেখানে সমালোচনা লিখে সময় নষ্ট করব কেন। ব্যাপারটা এমন যেন অন্যের সম্পর্কে বলার সময় আমার নেই, তাছাড়া ওটা সৃষ্টিশীল কাজ নয়। এর সঙ্গে হীনমন্যতাও আছে। অন্যের সম্পর্কে ভালো বললে নিজের ছোট হয়ে যাওয়ার ভয়। আমাদের সমালোচনা সাহিত্য এ সব নানা জটিল আঁধিতে ম্রীয়মাণ। তরুণ প্রজন্মও এ রোগে আক্রান্ত, একই স্বার্থে শৃংখলিত। একই মুর্খতায় দীন। ফলে সমালোচনা সাহিত্যের সত্যিকারের বিকাশ ঘটেনি বাংলাদেশে।
আরও একটি ব্যাধি আছে। সেই ব্যাধির উৎস দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীর একশ্রেণীর সম্পাদক। এরা নিজের গোত্রের, নিজের স্বার্থের মানুষটির বাইরে কারোর প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য ও হীনমন্যতায় ভোগেন। এই কার্পণ্য ও হীনমন্যতা তাকে নিয়ে যার সাহিত্যিক দুর্বৃত্তপনায়। নিজের দলের মানুষ না হলে ভরসা নেই। সাময়িক সিংহাসন বেহাত হওয়ার ভয়। অতএব যা ভালো তাকে আড়াল করে দাও, যা তুচ্ছ তাকে মহান করে তোল। পাতার আড়ালে বসে সাহিত্য সমালোচনার সুস্থ্য বিকাশের বিপক্ষে এমন একটি ধারা তৈরি করেছেন তারা যা পারস্পরিক স্বার্থের কুৎসিত বিনিময়ে কলুষিত। অযোগ্য হাতে, ভুল বাক্যে, অগভীর পর্যবেক্ষণ ও অপরিপক্ব বিশ্লেষণে যা লেখা হয় সাহিত্য সম্পাদক তাই ছেপে দেন। দু’একজন ছাড়া বেশিরভাগ সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বে যারা আসীন তাদের জ্ঞানের বিস্তার এতটা নয় যে, কেউ ভুল লিখলে তা ঠিক করার যোগ্যতা রাখেন। ফলে যা লেখা হবে তা-ই ছাপার নিশ্চয়তা রয়েছে।
তবু প্রবীণরা পারতেন এই সংকট থেকে কিছুটা হলেও উদ্ধার করতে। কারণ একজন তরুণ ভালো লিখেও প্রত্যাখ্যাত হতে পারেন কিন্তু প্রবীণের সে ভয়টুকু নেই। তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের সম্পর্কে লিখতে পারতেন। তারা মাঝে মধ্যে নিতান্ত বাধ্য হয়ে লেখেন যদিও, বিশেষ করে যখন কারোর ওপর বিশেষ সংখ্যা বের হয় তখন সম্পাদকের তাগিদে বা চাপে পড়ে লেখেন। সে সব লেখায়ও তাদের দীনতা খুবই স্পষ্ট। আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের প্রধান লেখক হিসেবে যারা পরিচিত তারা কেউ ভালো সমালোচক নন। ঈর্ষা, সংকীর্ণতা, অজ্ঞতা, অযোগ্যতা ও অনুদার মানসিকতা এই গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য শাখাকে বিকশিত হতে দেয়নি। এমন সংকীর্ণ দৃষ্টান্ত কেবল আমাদের সাহিত্যেই সম্ভব। এরা ভুলে যান যে, যেমনটি বলেছেন অক্তাবিও পাস : ‘সমালোচনা ও সৃষ্টি স্থায়ীভাবে পরস্পর সম্পর্কিত। কবিতা ও উপন্যাসের ওপর ভর করেই বেঁচে আছে সমালোচনা; কিন্তু একইভাবে এই সমালোচনা সৃষ্টিরই পানি, রুটি ও বাতাস।’ আবদুল মান্নান সৈয়দ কোথাও একবার বলেছিলেন সৃষ্টি যদি হয় নদী তা হলে সমালোচনা হচ্ছে এই নদীর দুই কূল। আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যের প্রায় সব বড় লেখকরাই তাদের ‘কুল’রক্ষা করে যাচ্ছেন একেবারে শুরু থেকেই।
হোর্সে লুইস বোর্হেসকে অনেকেই চেনেন এক অসাধারণ গল্পকার ও কবি হিসেবে। কিন্তু তার পাণ্ডিত্য ও সুগভীর সাহিত্যবোধ তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে প্রবন্ধের দিকে অর্থাৎ সাহিত্য সমালোচনার দিকে। তিনি শুরুই করেছিলেন কবিতা এবং দেশী-বিদেশী সাহিত্য সমালোচনা দিয়ে। যে কারণে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বেরিয়েছিল তার তৃতীয় গ্রন্থ কিন্তু প্রথম প্রবন্ধের বই ইনকিসিসিওনেস (১৯২৫)। এতে দেশী-বিদেশী এবং অগ্রজ ও সমসাময়িক লেখকদের সম্পর্কে ছিল একাধিক স্বতন্ত্র প্রবন্ধ। শুরু কানসিনোস্ আসেন্স, নোরা ল্যাং, এদুয়ার্দো গনসালেস লানুছা, মানুয়েল মাপলেস আর্সে, রামোন গোমেস দে লা ছের্না কিংবা এর্রেরা ই রেইছিগ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন প্রবন্ধ। অসামান্য এই গল্পকারের প্রবন্ধের সংখ্যা গল্পের তুলনায় বহু গুণ বেশি। শেষ জীবনে এসে অসংখ্য দেশী-বিদেশী লেখকের বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ তার পরের প্রজন্মের যেমন হুলিয়ো কোর্তাসার, হুয়ান রুলফো কিংবা হুয়ান হোসে আররেওলা। এই উদারতা ও সাহিত্যিক দ্বায়িতবোধ দ্বারা কেবল বোর্হেসই নন, তার পরের প্রজন্মের লেখকরাও চালিত। অক্তাবিও পাসের কথা কে না জানেন। তারও কিন্তু কবিতার বইয়ের চেয়ে প্রবন্ধের বইয়ের সংখ্যাই বেশি। আর তার প্রবন্ধ, মানে সাহিত্য সামলোচনা, স্প্যানিশ সাহিত্যেই শুধু নয়, আমি মনে করি বিশ্বসাহিত্যেরই এক বিরল দৃষ্টান্ত। গভীরতা, স্বচ্ছতা আর অসাধারণ পর্যবেক্ষণে তা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।
বোর্হেস কিংবা পাসের এই সাহিত্যিক দায়িত্বের ধারাবাহিকতা কার্লোস ফুয়েন্তেস কিংবা কিছুদিন আগে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত মারিও বার্গাস যোসার মধ্যেও দেখতে পাব। দায়িত্ব, যোগ্যতা এবং পাণ্ডিত্যকে কতটা সৌন্দর্যের সঙ্গে পাঠকের কাছে হৃদয়গ্রাহী করা যায় তার অনন্য নজীর তাদের প্রবন্ধগুলো। কার্লোস ফুয়েন্তেস তার প্রজন্মের লেখক মার্কেস কিংবা কোর্তাসার, কিংবা মারিও বার্গাস যোসার কোনো লেখা গ্রন্থাকারে বেরোনোর আগে পাণ্ডুলিপি পড়েই অভিনন্দন জানিয়ে বরণ করে নিতে পারেন উচ্চতর সাহিত্যিক মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে। শতবর্ষের নির্জনতা বেরোনোর আগেই বন্ধু-বান্ধব এবং পাঠকদের তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘এই মাত্র একটা মাস্টারপিস পাঠ করলাম, গাবোর উপন্যাস আমাদের সকলকে মুক্ত করবে।’ (বুম থেকে বুমেরু, কার্লোস ফুয়েন্তেস) ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত তার প্রথম প্রবন্ধের বই লা নুয়েবা নোবেলা ইসপানোআমেরিকানা অগ্রজ সমকালীন এবং বয়োকনিষ্ঠ লেখকদের সাহিত্যকর্মের এক সুগভীর আলোচনা। বিশ্বসাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে গোটা উপমহাদেশের আধুনিক ঔপন্যাসিকদের বিষয়বস্তু ও কলাকৌশল নিয়ে এবং যে গভীরতা নিয়ে আলোচনা করেছেন তা এক কথায় অতুলনীয়। মার্কেস, কোর্তাসার, কার্পেন্তিয়ের, বার্গাস যোসা কিংবা হুয়ান গোইতিসোলো সাহিত্যিক মর্যাদা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হন স্বতন্ত্র প্রবন্ধে।
স্প্যানিশ ভাষায় এদের সম্পর্কে লেখা ছাড়াও গোটা বুম প্রজন্মকে ফুয়েন্তেস আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছে পরিচিত করার জন্য ভূমিকা রেখেছিলেন অসামান্য ঔদার্যবোধ থেকে। কেবল নিচের প্রচার আর প্রসারে বুঁদ হয়ে থাকাটা অরুচিকর বলেই সবাইকে নিয়েই বড় হওয়ার উচ্চাশা ও স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য তার প্রজন্মের কিংবা পরবর্তীদেরও সাহিত্যকর্ম বিদেশী প্রকাশনা সংস্থা থেকে অনুবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। নিজের ভাষার লেখকরা তো আছেনই পাশাপাশিলিখে গেছেন বিশ্বসাহিত্যের প্রতিভাবান লেখকদের সম্পর্কেও, যাদের কেউ কেউ তার পরবর্তী প্রজন্মের।
নোবেল পুরস্কারের বদৌলতে আমাদের পাঠকরা এখন মারিও বার্গাস যোসার লেখার সঙ্গে আরও বেশি পরিচিত হবেন কোনো সন্দেহ নেই। এবং এও ঠিক তার উপন্যাস বা গল্পের প্রতি প্রকাশকদের বেশি আগ্রহ থাকার ফলে সাহিত্য সমালোচক হিসেবে তার দুর্দান্ত পরিচয়টি কিছুটা আড়ালেই পড়ে থাকবে অথচ প্রাবন্ধিক হিসেবে তার গুণাবলী অসাধারণ রকমের বিস্ময়কর। এই গুণাবলীর সঙ্গে ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ যুক্ত হলে রচিত হতে পারে ৭৭৯ পৃষ্ঠার গার্সিয়া মার্কেস, ইস্তোরিয়া দে উন দেইসিদিও (১৯৭১ সালে প্রকাশিত) বিপুল আকৃতির গ্রন্থ। মনে রাখা দরকার মার্কেস তখনও বহির্বিশ্বে অত পরিচিত কেউ নন। কিংবা আরও পরে পেরুতে অর্থাৎ নিজের দেশে উপন্যাসের অবস্থা নিয়ে লিখতে দেখব লা উতোপিয়া আর্কাইকা, হোসে মারিয়া আর্গেদাস ই লাস ফিকসিওনেস দেল ইন্দিহেনিসমো (১৯৯৬)। বছর ছয়েক আগে বেরিয়েছে উরুগুয়াইয়ের লেখক হুয়ান কার্লোস ওনেত্তিকে নিয়ে প্রায় আড়াইশ’ পৃষ্ঠার এল বিয়াহে আলা ফিফসিওন (২০০৮) নামের অসামান্য বইটি। অন্যের অসাধারণ কাজ সম্পর্কে নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ না করলে যেন নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে করেন এ লেখকরা। যে আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে তারা গল্প উপন্যাস লেখেন, একই আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে তারা সাহিত্য সমালোচনা করেন। তাই প্রতিটি বাক্য সৌন্দর্য ও সজীবতায় এত প্রাণবন্ত। এ সৃষ্টশীল লেখকরা শুধু নিজের ভাষার লেখকই নন, এমনকি পৃথিবীর অন্য সব ক্লাসিক লেখক সম্পর্কেও যখন লেখেন তা আবিষ্কার আর পর্যবেক্ষণের নতুনত্বে অনন্য হয়ে ওঠে। লা বেদার্দ দে লাস মেন্তিরাস (১৯৯০) সে রকমই এক প্রবন্ধের বই যেখানে বিভিন্ন ভাষার ৩৪ জন লেখকের একটি করে বইয়ের আলোচনা রয়েছে। বিস্তৃতি ও সুগভীর পাণ্ডিত্যই বলে দেয় বার্গাস ইয়োসা কোন উচ্চতা থেকে এক একটি বই আলোচনা করেছেন এই গ্রন্থে। আর কতখানি আবেগ, ভালোবাসা এবং মননের প্রাচুর্য থাকলে লিখে ফেলা সম্ভব লা তেন্তাসিয়ন দে লো ইম্পসিবলে : ভিক্টর হুগো ই লোস মিসেরাবলেস (২০০০) কিংবা লা ওর্গিয়া পের্পেতুয়া, ফ্লবেয়ার ই মাদাম বোবারি (১৯৭৫) সম্পর্কে আলাদা দুটো বই। আর এসব বই অ্যাকাডেমিক পণ্ডিতদের মতো তথ্যের নিষ্প্রাণ জাবর কাটা নয়, নতুন আবিষ্কার, নতুন ব্যাখ্যা, নতুন আনন্দ, নতুন অলোকা। এসব লেখায় পর্যবেক্ষণ এবং আবিষ্কার এতই প্রবল যে বোর্হেসের মতো লেখককে, যিনি কখনও উপন্যাস লেখেননি, তাকে কেন ঔপন্যাসিক বলা সম্ভব তাও প্রমাণ করার মতো যুক্তি এবং ব্যাখ্যাকে বিশ্বাস্য রূপে হাজির করার গভীর মননশীলতাকে আমাদের সামনে মেলে ধরতে পারেন। আমি আর্হেন্তিনার হুয়ান হোসে সায়েরের কথা বলছি। আর তিনি আলোচনা করছেন সেই বোর্হেস সম্পর্কে যিনি উপন্যাস তো লেখেনইনি এমনকি উপন্যাস নামক প্রচলিত সাহিত্য শাখাটিরই বিরুদ্ধে ছিলেন। অর্থাৎ সায়ের এমন এক কাজ করছেন যা বৈপরীত্যের বন্ধনে আলোকদীপ্ত।
এরকম অনেক উদাহরণ আছে। এসব বিপরীত উদাহরণ আমাদের সাহিত্য সমালোচনার সাম্প্রতিক দীনতাকেই শুধু প্রকট করে তুলবে। অথচ এমন নয় যে, আমরা বাংলা ভাষায় সে উচ্চতার লেখক কখনও পাইনি। আমি শুধু একটা উদাহরণ দেব রবীন্দ্রনাথ থেকে হুইটম্যান প্রসঙ্গে, যে হুইটম্যানের সঠিক অনুবাদ তো হয়ইনি, এমনকি বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের পর আর অন্য কোনো লেখক বা সমালোচককে দেখিনি যিনি ওই গভীরতা নিয়ে হুইটম্যান সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন : ‘প্রকাণ্ড একটা খনি, ওর মধ্যে নানা কিছুর নির্বিচারে মিশেল আছে, এরকম সর্বগ্রাসী বিমিশ্রণে প্রচুর শক্তি ও সাহসের প্রয়োজন- আদিমকালের বসুন্ধরার সেটা ছিল- তার কারণ তার মধ্যে আগুন ছিল, ছিল প্রচণ্ড- এই আগুনে নানা মূল্যের জিনিস গলে মিশে যায়। হুইটম্যানের চিত্তে এই আগুন যা-তা কাণ্ড করে বসেছে।... এক দৌড়ে সাহিত্যকে লঙ্ঘন করে গিয়েছে এই জন্য সাহিত্যে এর জুরি নেই- মুখরতা অপরিমেয়- তার মধ্যে সাহিত্য-অসাহিত্য দুই সঞ্চরণ করছে আদিম যুগের মহাকায় জন্তুদের মতো।’ বেঈমান তর্জমা, হায়াৎ মামুদ, পৃঃ ২৮)।
হুইটম্যান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তিকে তার পরবর্তী আর কোনো লেখকই অতিক্রম করতে পারেননি। এমনকি বুদ্ধদেব বসুও, যিনি বিদেশী সাহিত্যের গভীর সমঝদার এবং আমাদের বরেণ্য সাহিত্য সমালোচক হয়েও এই গভীর উপলদ্ধির পরিচয় দিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। আর এখন যারা আছেন, তারা সৃষ্টিশীল লেখক হিসেবে শুধু বামনস্য বামনই নন; সাহিত্য সমালোচক হিসেবে আরও বেশি বামন ও কৃপণ। বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে দূরে থাক, এমনকি নিজেদের সাহিত্য সম্পর্কেও এদের সত্যিকারের কোনো ধারণা নেই। এর কারণ নিজেদের লেখার বাইরে অন্য কারোর লেখার প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা নেই। মার্কেসকে এক সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী জিজ্ঞেস করেছিলেন; শত বর্ষের নির্জনতার মূল বক্তব্য কী। উত্তরে তিনি বলেছিলেন : ভালোবাসাহীনতা। এই ভালোবাসাহীনতাই হচ্ছে নির্জনতার মূল কারণ। আমাদের সাহিত্য সমালোচনা এই ভালোবাসাহীনতায় আক্রান্ত। আমাদের লেখকরা নিতান্ত বামন বলেই এই উচ্চাশার ধারে কাছে আসতে পারেননি।
 

বর্ষপূর্তি সংখ্যা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close