¦
বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা

খান মাহবুব | প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৫

মুদ্রণযন্ত্র কবে, কোথায়, পূর্ববঙ্গে প্রথম স্থাপন হয়েছিল- এ তথ্য দেয়া গেলেও পূর্ববঙ্গের সৃজনশীল ধারার প্রথম প্রকাশিত বই কোনটি, সে তথ্য দেয়া মুশকিল। অনেকের মতে ১৮৮৭ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত নীলদর্পণ পূর্ববঙ্গে প্রকাশিত সৃজনশীল ধারার প্রথম বই। এ নিয়েও মতান্তর আছে। যদি নীলদর্পণকে পূর্ববঙ্গের সৃজনশীল ধারার বই প্রকাশের দ্বার উন্মোচক বলি তারপরের সময়টায় কিন্তু সৃজনশীল বই প্রকাশের তেমন একটা নজির মেলে না। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বই প্রকাশ পেলেও ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের পরই এদেশের প্রকাশনার প্রাতিষ্ঠানিক পথচলা। ১৯৪৭-এ জিন্নার দ্বিজাতিতত্ত্বের আবিষ্কার উদ্ভট রাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশ হয়ে আমরা হাজার বছরের আবহমান বাংলার খোলস পাল্টিয়ে হয়ে যাই পাকিস্তান। ইসলামের ভ্রাতৃত্বের মরীচিকায় কোমলমতি পূর্ববঙ্গের মানুষ পশ্চিমাদের শেরওয়ানির ভেতর যে শোষণ ও নিপীড়নের খর্গ ছিল তা বুঝতে পারেনি। অনিবার্যভাবে পাকিস্তান সৃষ্টিলগ্নেই ধেয়ে আসে বাঙালির শিল্প সংস্কৃতির ধ্বংসের বান। প্রকাশনার ক্ষেত্রেও এ ভাবনার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রতিকূল পরিবেশে ঢাকায় গড়ে উঠতে থাকে সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। নওরোজ কিতাবিস্তান (১৯৪৮), স্টুডেন্ট ওয়েজ (১৯৫০), আহমদ পাবলিশিং হাউস (১৯৫৪), মাওলা ব্রাদার্স (১৯৫৪), বিউটি বুক হাউস (১৯৬২), খান ব্রাদার্সসহ (১৯৬৬) কয়েকটি প্রকাশনী সংস্থা আস্তে আস্তে সৃজনশীল বইয়ের আলোর বিচ্ছুরণ ছড়াতে থাকে।
পূর্ববঙ্গের সৃজনশীল প্রকাশনায় সঞ্জীবনী এনে দেয় মহান ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছে। বাংলাভাষা ও মননের উৎকর্ষ সাধনে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল হিসেবে যুক্তফ্রন্ট সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারে ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। একাডেমির প্রকাশনা হিসেবে বাংলা একাডেমি পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে ১৯৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে। পাকিস্তান পর্বে পশ্চিমাদের বাঙালি বিদ্বেষী নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলাভাষা, সাহিত্য, প্রকাশনা কেন্দ্রীয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। ১৯৪৭-৭১ সময়কালে সৃজনশীল প্রকাশকরা কিছু বই প্রকাশ করলেও প্রকাশনা জগতকে কোনো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে পারেনি।
১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের সৃজনশীল প্রকাশনার পথিকৃত হিসেবে মান্যব্যক্তি চিত্তরঞ্জন সাহা অনেকের মতো কলকাতায় চলে যান-তবে শরণার্থী হয়ে নয়, মুক্তিযোদ্ধা হয়ে। কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একত্র করে আহ্বান করেন-‘এ বয়সে হয়তো আমার পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই যারা লেখক আছেন আপনারা লিখুন, চিত্রশিল্পীরা আঁকুন, প্রকাশক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ছাপানো।’ (সূত্র : চিত্তরঞ্জন সাহা স্মারকগ্রন্থ, প্রকাশ-২০১৩, মুক্তধারা) স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ গঠন করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব নগর থেকে ৩২টি বই প্রকাশ করেন। স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ মুক্তধারা নাম নিয়ে যাত্রা শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত ৩২টি বই দিয়ে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলা একাডেমির দক্ষিণ গেটে আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষের অনুষ্ঠানে বই বিক্রির ব্যবস্থা করেন চিত্ত বাবু। সেদিনের সেই চট বিছানো বইয়ের পসরা নানা অনুষঙ্গের মিশেলে আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
সৃজনশীল প্রকাশকরা অপর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার মধ্যেও ব্রতী হয়েছেন প্রকাশনার উন্নয়নে। প্রকাশকদের স্বল্পপুঁজির সঙ্গে সংশ্লেষ করে বৃহৎ কিছু প্রতিষ্ঠান বৃহৎ ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তির মিশেলে সৃজনশীল প্রকাশনার আঙ্গিনাকে বিস্তৃত ও সুসংহত করেছে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা দীর্ঘদিনের চেনা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের গাদাগাদি ধূলিময় পরিবেশ থেকে বেড়িয়ে গত বছর থেকে এর পরিধি সম্প্রসারণ করেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল পরিসরে। পূর্বের সেই ৬ ফুট আয়তনের প্রতিটি স্টলের পরিসর বেড়েছে এ বছর। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ২৫০-৩০০ বর্গফুট আয়তনের ১১টি প্যাভিলিয়ন। প্রকাশকরা লাখ টাকা ব্যয় করে শুধু প্যাভিলিয়নের জায়গা বরাদ্দ নিচ্ছে। রাজনীতির মন্দাদশায় ২০১৫ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রায় ৪ হাজার বই প্রকাশ হয়েছে। মেলায় বিক্রিত বইয়ের মূল্য ২৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনার আর্থিক অগ্রগতির সূচক শ্লথ হলেও মানবিক অগ্রগতির সূচক শ্লথ নয়। প্রকাশনা জগৎ অনেক লেখকের লেখা বইকে পাঠকপ্রিয়তা দিয়েছে। পাঠের প্রেরণার পাশাপাশি প্রকাশনা জগতের ব্যবস্থাপনার মধ্যে আধুনিক ধ্যান-ধারণা প্রয়োগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে প্রকাশনা জগতের আয়োজন অতিমাত্রায় একুশের বইমেলাকেন্দ্রিক। প্রকাশনার তোড়জোড় সারা বছরব্যাপী চললে বাঙালির জাতীয় চালচিত্রের ক্যানভ্যাস বিস্তৃত হবে।
প্রকাশনাকে শিল্পের মর্যাদা দিতে এ খাতের কুশীলবদের দাবির উচ্চকণ্ঠ থাকলেও শিল্পের মর্যাদাও নিতে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরালো নয়। এখনও আমাদের দেশে প্রকাশনা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদানের কোনো ব্যবস্থা নেই। সরকারও বিবৃতি-বক্তৃতায় যতটা আগ্রহী কার্যক্ষেত্রে ততটা নয়। সম্প্রতি চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সরকার ৩ ভাগ সুদে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ব্যবস্থার প্রণোদনা নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সৃজনশীল প্রকাশনার খাতকে শিল্পের মর্যাদা দিয়ে সরকারকে ১৯৯২ সালে প্রণীত গ্রন্থনীতি সময়োপযোগী করে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে দ্রুত এ খাতের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। দুঃখের বিষয় আমাদের সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে সুকুমার শিল্পের পরিতোষণে প্রণোদনার তাগিদ সত্ত্বেও সরকার বছরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের মাধ্যমে মাত্র ২ কোটি টাকার সৃজনশীল বই ক্রয় করে।
এদেশের একটা মরা খালের ওপর সেতু নির্মাণে যে বাজেট থাকে সমগ্র সৃজনশীল প্রকাশনাকে প্রণোদনা দিতে সে বাজেট ও নেই। সৃজনশীল বই নিয়ে কাজ করা সরকারি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান জাতীয গ্রন্থকেন্দ্র বেসরকারি লাইব্রেরির অনুদানের একটা বছর ওয়ারী তালিকা অবলোকন করলে দেখা যায়, দেশের বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে যত সামান্য অনুদান দেয়া হয়েছে।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃক বরাদ্দকৃত বেসরকারি লাইব্রেরির অনুদান
সাল বরাদ্দপ্রাপ্ত লাইব্রেরি অর্থের পরিমাণ
২০০০-২০০৩ ৮০৩টি ১ কোটি
২০০৩-২০০৪ ৮১৭টি ১ কোটি
২০০৪-২০০৫ ১০৯৭টি ১ কোটি ৫০ লাখ
২০০৫-২০০৬ ১৪১৫টি ১ কোটি ৫০ লাখ
২০০৬-২০০৭ ১২৯১টি ১ কোটি ৭৫ লাখ
২০০৭-২০০৮ ৮৫টি ১ কোটি ২৫ লাখ
২০০৬-২০০৭ ৪৮০টি ১ কোটি ২৫ লাখ
২০০৯-২০১০ ৪৮৯টি ১ কোটি ২৫ লাখ
২০১০-২০১১ ৫৬১টি ১ কোটি ৬০ লাখ
২০১১-২০১২ ৮২৪টি ২ কোটি
২০১২-২০১৩ ৬৪১টি ২ কোটি ২৫ লাখ
২০১৩-২০১৪ ৭২০টি ২ কোটি ২৫ লাখ
দেশের সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ২০১৫ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক (মাদ্রাসাসহ) সর্বস্তরের ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৪ শিক্ষার্থীর জন্য ৩২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৩ কপি বই বিনামূল্যে বিতরণ করেছে। একটি পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়) সরকারি অসংখ্য প্রকল্পের মহাকর্মযজ্ঞে সরকার নিয়োজিত। অথচ চিন্তার জমিনের বিস্তৃতিতে সৃজনশীল বইয়ের ব্যাপক ভূমিকা থাকলেও সরকারের উদ্যোগ বাস্তবেই নাজুক।
সরকারের পাশাপাশি এ খাতের কুশীলবদের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় মাথায় নিয়ে যুগপৎ কাজ করতে হবে। আর্থিক কাঠামো শক্তিশালীকরণের পাশাপাশি সাংগঠনিক, তথ্য, শিক্ষা-প্রযুক্তির উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রকাশনা ব্যবসা হিসেবেও এখন ছোট কোনো খাত নয়-সমগ্র বিশ্বের প্রকাশনা শিল্পের বার্ষিক ১০০ কোটি বিলিয়ন ডলারে আর্থিক মূল্যে আমাদের প্রকাশনার ভূমিকা কী? ভাবতে হবে-প্রতিবেশী ভারত যেখানে ৮০টি দেশে বই রফতানি করে গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি ডলার উপার্জন করে, সেখানে আমাদের উপার্জন কী? প্রতিবেশী ভারতে প্রকাশকদের জন্য স্বল্পমূল্যে কাগজ সরবরাহসহ নানামুখী প্রণোদনার ব্যবস্থা আছে সরকারের তরফ থেকে। এমনকি ভারতে উৎপাদিত সৃজনশীল বইয়ের একটি বড় অংশের ক্রেতা ভারত সরকার। ফলে ভারত আজ অভ্যন্তরীণ বাজারে নিজ অবস্থান দৃঢ় করে বহির্বিশ্বে নিজ প্রকাশনার রফতানি খাতকে মজবুত করছে। ভারতে ১৯০০০ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বছরে গড়ে ১ লাখের মতো বই প্রকাশ করে চলেছে। এরই মধ্যে ভারতের প্রকাশনার অগ্রগতিতে চিন্তিত বিশ্বে প্রকাশনার জগতের প্রথম কাতারের দেশ চীন। উল্লেখ্য, বর্তমানে চীনে প্রতি বছর ৮০০ কোটি কপি বই প্রকাশিত হয়।
২০১৫-এ বৈশ্বিক পুস্তক প্রকাশনা শিল্পে আর্থিক মূল্য ১১৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। এখন প্রশ্ন- আমাদের উদ্যমী তরুণ-তরুণীরা কেন এ বিশাল সম্ভাবনা থেকে দূরে থাকবে? উল্লেখ্য বর্তমানে আমাদের প্রকাশকরা বছরে মাত্র ৪০০০ টাইটেল বই প্রকাশ করে পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও মানুষের চিন্তার পরিবর্তনেও কাগজের বইয়ের উপযোগিতা এখনও হুমকির মুখে পড়েনি। যদিও আমরা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির আওতার পথে হাঁটছি, তবু কাগজের বইয়ের শরীরী উপস্থিতি এখনও জরুরি। তবে দিন দিন ই-বুক জনপ্রিয় হচ্ছে। এ বিষয়টি আমলে নিয়ে আমাদের সামনের দিনের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। সামাজিক রেঁনেসার মাধ্যমে জনগণের পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির মাধ্যমে রিডিং সোসাইটি গঠন করে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলকে এগিয়ে নিতে হবে প্রকাশনার উৎকর্ষের জন্যই।
গত ২০ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে বলেন- আমাদের কেবল পেট পুরলেই হবে না। মনের চাহিদা মেটানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য বেশি বেশি সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকারের লক্ষ্য বিশ্বের মানুষের সামনে বাংলাদেশের পরিচয় ও স্বকীয়তা তুলে ধরা।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তৃতার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়- বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির যে মণিমুক্তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সেই সম্পদ সংগ্রহ করে প্রকাশনার মাধ্যমে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার মতো এমন উপকরণ দ্বিতীয়টি নেই। এক্ষেত্রে একটি বড় সুবিধা হচ্ছে বাংলাদেশের বাইরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় হয়ে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বপরিমাণ বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আছে।
সম্প্রতি পশ্চিম বাংলার পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন- অবশ্যই একুশে বইমেলায় বাংলা ভাষায় লেখা সব বইকেই স্থান দিতে হবে।
যেমন কলকাতা বইমেলায় শিলচর, ত্রিপুরা, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশনা স্থান পায় তেমনি বাংলাদেশের প্রকাশনা স্থান পায়। তিনি আরও বলেন, একুশে বইমেলা এ আবেগ সামনে এনে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বাংলা ভাষার এ দ্বিতীয় রাজধানীর লেখক-প্রকাশকদের সেই মেলায় ঢুকতে দিচ্ছে না।
তবে ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় যাই বলুন না কেন-বাংলাদেশ একটা ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র। অন্য ভাষাভাষীদের স্বীকৃতি থাকলেও এদেশের প্রায় শতভাগ মানুষ বাংলায় কথা বলে। একুশে বইমেলা আমাদের একান্ত নিজস্ব। তবে একুশে বইমেলায় নয়, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের কলকাতা বইমেলার মতো বড় পরিসরে বহুভাষিক বইমেলার আয়োজন প্রয়োজন।
মুক্ত বাণিজ্যের হাওয়ায় পালতোলে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বই ঢুকছে বাংলাদেশে। পাশাপাশি ভারতের পাইরেসি বইও চলছে অবাধে। ভারতে আমাদের প্রকাশনাকে সঠিক পরিচর্যা দিয়ে উপস্থাপন করা হয় না বলে আমাদের বইয়ের বাজার ভারতে সংকুচিত। ভারত কৌশলে নিজেদের বাংলা বইয়ের অভ্যন্তরীণ বাজারে বাংলাদেশী বইকে কোণঠাসা করে রাখে।
এদেশে বই নিয়ে ভাবার ও কাজ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার পরিবর্তনে রঙ পাল্টিয়ে শুধু নৈমিত্তিক দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ভিশন নিয়ে কাজ করার সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেই সৃজনপ্রত্যয়ী লোকবল ও বাজেট কোথায়? পাশাপাশি বই নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের কথার ফুলঝুরি আবেগের ডামাঢোল থাকলেও বাস্তবতা অন্তঃসারশূন্য।
বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনার জগৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণের পথ পরিক্রমণে নানা সমস্যাকে সঙ্গে নিয়ে চলে। সবচেয়ে বড় সমস্যা বাজারজাতকরণের। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার চ্যানেল সংকুচিত ও অনপোযোগী। ঢাকার বাইরে তৃণমূলে বই পাঠকদের হাতের নাগালে পৌঁছে দেয়ার কোনো মানসম্মত ও নিয়মানুগ পদ্ধতি নেই। রকমারি ডটকমের মতো সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কোম্পানি সৃজনশীল বইয়ের পাঠকদের হাতে বই পৌঁছে দেয়ার কাজ করলেও অনেকাংশেও তা ঢাকানির্ভর। আর বই পৌঁছানোর ডাক মাশুলও বেশি। বইকে চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়গ্রাহী করার সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের ফটোসেশন যতটা সজীব ও বর্ণিল কিন্তু আন্তরিকতা এবং কর্মকৌশল ততটাই সঙ্গীন। ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে বিশ্বাসাহিত্য কেন্দ্রের আলোকিত মানুষে গড়ার প্রত্যয়ের ১০০টি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
গ্লোবাল কানেকটিভিটি কনসেপ্টে দেশে তথ্যের অবাধ প্রবাহের জন্য তৃণমূলে ইউনিয়ন পর্যায়ে ই-তথ্য কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর একযোগে দেশের ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে ই-তথ্য কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু তথ্য প্রবাহের সঙ্গে আমাদের দেশের বাস্তবতায় সামাজিক জাগরণে ই-তথ্যের সঙ্গে কাগজে বইয়ের সংযোগটা বড়ই প্রয়োজন। এখনও দেশে ইউনিয়ন তো দূরের কথা থানা পর্যায়ে সরকারি ব্যবস্থাপনার কোনো লাইব্রেরি নেই। বইয়ের সঙ্গে প্রাত্যহিক জীবনের সংযোগ ঘটাতে সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঠাগার আন্দোলন জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠাগারগুলোকে শুধু অলংকরণের জন্য না রেখে শিক্ষার্থীরা কীভাবে পাঠাগারে নিয়মিত আসতে পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ পাঠাগার আন্দোলন জোরদার না হলে প্রকাশনার জগৎ ও রিডিং সোসাইটি সমৃদ্ধ হবে না।
সমাজ আজ যে সামাজিক পাপে নিমজ্জিত (নীতিহীন রাজনীতি, নৈতিকতাহীন বিজ্ঞান, বিবেকবর্জিত আনন্দ, ত্যাগহীন অর্চনা) এ থেকে মুক্তির সোপানে প্রকাশনা জগতের উন্নয়নের বিকল্প আছে কি?
কাজেই প্রকাশনা নিয়ে আবেগের চাপাকণ্ঠ, রাজনীতির কথার আস্ফালন নয়, প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশল।
বাংলাদেশে ৩০০০ কোটি টাকার মুদ্রণ শিল্পের বাজার আছে। দেশে প্রায় ৭০০০টি প্রিন্টিং প্রেস আছে। মুদ্রণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিরও সুবিধা আছে। এখন কাগজ, কালিসহ আনুষঙ্গিক দ্রব্যের সহজলভ্যতা দেশের সামগ্রিক মুদ্রণ ও প্রকাশনার চেহারা পাল্টে দিতে পারে।
বাংলাভাষাকে বিশ্বময় করতে বাংলা প্রকাশনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সংশ্লেষে সারা বিশ্বে। তবে সৃজনশীল প্রকাশনার উন্নয়নে আমরা প্রযুক্তির সহযোগিতা কিংবা আধুনিকতার সংশ্লেষ যতই ঘটাই না কেন আমাদের হাজার বছরের বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা মাথায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে বাঙালির প্রকাশনার ভিৎ এ মাটির সঙ্গে যুক্ত। সৃজনশীল প্রকাশনা তার পথ চলায় ‘৫২-শহীদের স্বাক্ষর বুকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব চিহ্ন এঁকে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
e-mail: [email protected]
 

বর্ষপূর্তি সংখ্যা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close