¦
বাংলাদেশের চিত্রকলা : প্রবণতা ও স্বরূপ সন্ধান

রফি হক | প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৫

বাংলাদেশের চিত্রকলা নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বুঝে নিতে হবে বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রবণতা ও এর গতিপ্রকৃতিকে। মনে রাখা জরুরি যে বাংলার লোকশিল্প হাজার বছর ধরে প্রবহমান থাকলেও প্রতিষ্ঠানিক শিল্পের শেকড় খুব গভীরে নয়। সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পরই ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকায় চারুকলা (অধুনালুপ্ত গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস) নামে চারুকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। এ ইন্সটিটিউটের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের চিত্রকলা চর্চার ইতিহাস সমান্তরাল।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইতালীয় রেনেসাঁর সময় আলো ছায়ার বিপরীত চিত্র, পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা, অস্থিবিদ্যা জ্ঞান ইত্যাদির প্রয়োগ ঘটিয়ে দ্বিমাত্রিক পটে ত্রিমাত্রিক ইমেজের জোয়ার বয়েছিল এবং তৎপরিবর্তে সূচনা হয়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক শিল্পচর্চার। ইতালীয় রেনেসাঁর আদলে ইংরেজদের আনুকূল্যে অবিভক্ত বাংলায় কলকাতায় ১৮৫৪ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস। এ হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানিকভাবে চারুশিল্প শিক্ষা সূচনা ঘটে অনেক বিলম্বে।
কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের সঙ্গে সূচনাতে ঢাকার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে বিংশ শতকের শুরুতে যে বঙ্গীয় শিল্পধারার (বেঙ্গল স্কুল) মাধ্যমে যে স্বদেশ চেতনার জাগরণ ঘটে তাতেও ঢাকা এবং এর কোনো শিল্পীর অংশগ্রহণ ছিল না। যদিও পাশ্চাত্যের আধুনিকতার জোয়ারে এ ধারা খুব বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি; কিন্তু এটিই সত্য যে বেঙ্গল স্কুল ভারতীয় তথা বাঙালি শিল্পীদের ভেতরে একটি আত্ম-অনুসন্ধানের বীজ রোপণ করতে পেরেছিল।
এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলা যায়, চীনা এবং জাপানিজ শিল্পীরা অদ্যাবধি তাদের চিত্রকলায় আদি ঐতিহ্যের ধারাকে অব্যাহত রেখেছেন। তবে পাশ্চাত্য প্রভাবিত শিল্পের চর্চাও সমান্তরালভাবে হয় সেখানে। এক্ষেত্রে আমাদের শিল্পকলার ঐতিহ্যগুলো এবং তার অনুষঙ্গগুলো এক অর্থে বিলুপ্ত প্রায়। অজান্তার চিত্রাদর্শ, পাহাড়ি চিত্রধারা, পাল পুঁথিচিত্র, কালিঘাটের পটচিত্র, মোগল মিনিয়েচার ইত্যাদির চর্চার মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্য আধুনিক ধারার বিপরীতে সমান্তরাল আরেকটি ধারা গড়ে উঠতে পারত। তবে বাংলাদেশের আধুনিক সমকালীন চিত্রকলায় লোকশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্প ধারাগুলো বারবার ক্যানভাসে উঠে এসেছে। এ লক্ষ্যে জয়নুল আবেদিন নিজেই গড়ে তুলেছিলেন লোকশিল্প জাদুঘর। যা বর্তমানে বটবৃক্ষের মতো শাখা-প্রশাখা মেলে দাঁড়িয়েছে।
২.
বস্তুত, জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে গড়া ঢাকার গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস প্রতিষ্ঠিতার পূর্ব পর্যন্ত ঢাকা তথা পূর্ব বাংলার অবস্থান ছিল প্রান্তিকে, কলকাতা ছিল কেন্দ্রে। কলকাতা আর্ট কলেজে জয়নুল আবেদিন পড়তে গিয়েছিলেন ১৯৩৩ সালে। জয়নুলেরও আগে কলকাতা আর্ট কলেজে পূর্ব বাংলার আরও কয়েকজন সেখানে শিক্ষা নিয়েছিলেন বটে তারা কালের বহমানতায় হারিয়েও গেছেন। সেক্ষেত্রে জয়নুলই বাংলাদেশের চারুকলার পথিকৃৎ। তবে তিনিই ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান এবং নিুমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে পড়তে গিয়েছিলেন কেবল নিজের ইচ্ছের জোরে।
অবিভক্ত বাংলায় তেতাল্লিশের মন্বন্তর দুর্ভিক্ষের স্কেচ করে জয়নুল কলকাতায় সবা নজরে আসেন। কালো কালিতে অবিন্যস্ত ব্রাশের রাগী টানে তিনি দুর্ভিক্ষের করুণ সুর আর সময়টিকে যথাযথভাবে তার স্কেচের মধ্যে উঠিয়ে এনেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সমাজ সচেতন, সমাজকর্মী-সংগঠক এবং অসম্ভব নিখাদ দেশপ্রেমিক একজন শিল্পী। তার সহকর্মী শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, দেশবিভাগের আগেই তিনি পূর্ব বাংলায় নিজস্ব একটি আর্ট সেন্টারের কথা ভাবতেন। সাংস্কৃতিক আয়োজনের ভেতর দিয়ে একটা উন্নত রুচির সমাজ ব্যবস্থার কথা তিনি বলতেন সব সময়।
তাই দেশবিভাগের পর পরই তার কাছে চারুশিল্পের জাগরণ হয়ে উঠে প্রথম প্রত্যয়। কলকাতা আর্ট কলেজে শিক্ষিত এবং পরবর্তীতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত একদল তরুণ মেধাবী প্রতিভাবান শিল্পীদের নিয়ে ঢাকায় শিল্প আন্দোলনের সূচনা করেন। ওই সময় তার সহকর্মীরা ছিলেন সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, আনোয়ারুল হক এবং হাবিবুর রহমান। কিছু দিন পরেই এ শিল্পর আন্দোলনে যোগ দেন বাংলাদেশের বিমূর্তধারা চিত্রকলার পথিকৃৎ মোহাম্মদ কিবরিয়া।
এছাড়া ঢাকায় চারুকলা ইন্সটিটিউট স্থাপনের পেছনে একটা রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অনিবার্যতা ছিল। যেমন বাংলার শিল্পকলার ইতিহাস দীর্ঘ হলেও উপনিবেশি শাসনের ফলে শিল্পকলা চর্চার বিকাশ এখানে রুদ্ধ হয়েছে। আর কলকাতা ছিল অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক রাজধানী। সংস্কৃতির সব আয়োজন যেমন, নাটক-থিয়েটার, সাহিত্য-সঙ্গীত-শিল্পের উচ্চমার্গীয় মূলধারার সব কিছুই ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। এদিকে ঢাকায় যারা ক্ষমতাবান ছিলেন তারা নানা কারণে শিল্পকলার পৃষ্টপোষকতা করেনি। ধর্মীয় নিরুৎসাহিতা, শিল্প-রুচির অভাব, স্থূল আনন্দ অনুসন্ধানের আগ্রহ এসব নানা কারণেও তারা শিল্পের প্রতি আগ্রহ দেখাননি। যারাও বা পৃষ্ঠপোষকতা করতেন তাদের যোগাযোগটি ছিল কলকাতার সঙ্গেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় একটি সংস্কৃতি কেন্দ্র গঠন খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল।
৩.
বস্তুত, দেশবিভাগের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাঙালি মুসলমান ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ রদের বহু বছর পর একটা নতুন সম্ভাবনার সন্ধান পেল। আত্মপ্রকাশের একটা তাগিদ অনুভব করল। অন্যদিক থেকে এ তাগিদ এক ধরনের উন্মাদনারও সৃষ্টি করল। ফলে, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে ভেবে দেখার সময় পেল না কেউ। এটি যে নতুন রূপে পুরনো উপনিবেশি শাসন, সেটি বুঝতে আরও বেশকিছু দিন সময় লাগল।
সাতচল্লিশের আগে বাঙালি মুসলমান শিক্ষা-দীক্ষায় ছিল অনগ্রসর। ব্যবসা-বাণিজ্যে একটি প্রান্তিক অবস্থানে। ভূমি সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধানত প্রজার ভূমিকায়। সাতচল্লিশের দেশবিভাগ তাকে ভূমি মালিকানা দিল, শিক্ষার সুযোগ দিল এবং ব্যবসা বাণিজ্যে উন্নতির পথ করে দিল। কিন্তু ওই পথও যখন পাকিস্তানিরা রুদ্ধ করে দিল তার সমৃদ্ধির বস্তুগত দিকটি অনার্জিত রয়ে গেল। কাজেই সে মনোনিবেশ করল তার বৌদ্দিক এবং মানসিক উন্নতিতে, তার শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নতিতে। এসবের উল্লেখযোগ্য প্রকাশ দেখা যায় তৎকালীন পাকিস্তানের ন্যাশনাল এক্সিভিশনগুলোতে। পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পীরা নিয়মিত ভিত্তিতে প্রথম পুরস্কার পেতেন। শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীর, আবদুল বাসেত, মোবিনুল আজিম, সৈয়দ জাহাঙ্গীরের চিত্রকর্মের প্রভাব বিস্তর পড়েছিল পাকিস্তানের চিত্রকলায়।
এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, তৎকালীন সামাজিক রাজনৈতিক বিবেচনায় জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠিত চারুকলা ইন্সটিটিউট বাঙালির আত্ম-পরিচিতির ও আত্ম-প্রকাশের একটা পথ, একটা অনন্য সাংস্কৃতিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান। নানা সময়ে বাঙালির অস্তিত্ব¡ যখন বিপন্ন হয়েছে, তখনই বাঙালি শিল্পীরা প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের দীপ্ত শপথ নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে। ১৯৫২ -এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ -এর গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালি শিল্পীদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক সংস্কার আর অসুস্থ রাজনীতির বিরুদ্ধে শিল্পীরা সব সময়ই ব্যক্ত করেছেন অঙ্গীকারাবদ্ধ দ্রোহ।
এই দ্রোহ বা আন্দোলনের শিল্পিত হাতিয়ার হতে গিয়ে পঞ্চাশ দশকের শুরুতেই এদেশের চিত্রশিল্প বাস্তববাদে অভিষিক্ত হয়। জয়নুল আবেদিনের শিল্পদীক্ষাতেও এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চারুকলা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি চেয়েছিলেন অনগ্রসর মুসলিম সমাজের রুচি পরিবর্তন করতে। জয়নুল বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতিক জাগরণই পারে একটি সংস্কারমুক্ত উন্নত সমাজ ব্যবস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে। তাই পুরো পঞ্চাশ দশক ধরে এদেশের চিত্রকলা চর্চায় ছিল রিপ্রেজেন্টেশনাল শৈলীর একচ্ছত্র বিস্তার।
ষাটের দশকে বাংলাদেশের শিল্পধারায় পরিবর্তন সূচিত হয়। বাস্তববাদের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন নিরীক্ষাধর্মী নির্মাণ। এ নিরীক্ষানিষ্ঠ শিল্পীরা আর্ট ইন্সটিটিউটের প্রথম প্রজন্মের শিল্পী। তাদের অনেকেই দেশের বাইরে শিল্প শিক্ষালাভ করে বুঝতে পারেন যে স্বদেশে চিত্রকলা চর্চায় একটি অচলায়তন সৃষ্টি হয়েছে, এ থেকে মুক্ত হতে না পারলে নতুন শিল্প নির্মাণ সম্ভব নয়। সেই প্রথম অবয়মধর্মী শিল্পকর্মে এলো নতুন ব্যাখ্যা। বহুলচর্চিত অবয়ব মুছে গিয়ে ক্যানভাসে উঠে এলো আধাবিমূর্ত ও শুদ্ধ বিমূর্তের গড়ন। কেউ কেউ বাঙলার লোকশিল্পের শৈলীর সঙ্গে পাশ্চাত্যশৈলীর মেলবন্ধন পরস্পরিত করে একটি নতুন আঙ্গিক সৃষ্টি করলেন। স্বাধীনতাপূর্ব কালে এদেশের শিল্পপ্রবণতার ভেতর ছিল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের প্রকৃতলগ্ন মানুষের রহস্যাবৃত জীবন এবং আধ্যাত্মিকতা।
৪.
স্বাধীনতা যুদ্ধোত্তর কালের চিত্রকলায় প্রকাশ ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন, নতুন নির্মাণের প্রেরণা। স্বাধীনতার পূর্বে অবাধে শিল্পর্চচা করা এবং চিত্র প্রদর্শনী আয়োজন করাটাই ছিল যেন বৈপ্লবিক কাজ। তাই স্বাধীনতা-পরবর্তীতে শিল্পীরা একত্রিত হয়েছিলেন, সংঘবদ্ধ হয়েছিলেন নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করবার অভিপ্রায়ে। এদেশের প্রথম শিল্পীসংঘ ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ।’ এই গ্রুপের উদ্দেশ্য ছিল, শুধু ছবি আঁকবো, আর ছবি আঁকবো। কারও প্রতি, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত না থেকে আমরা আমাদের মতো করে ছবি আঁকবো, -এই তাগিদটা অনেক দীপ্ত হয়েছে স্বাধীনতা উত্তরকালের শিল্পীদের চিত্রপটে। ফলে বাংলাদেশের চিত্রকলায় অবয়বনির্ভর ও নির্বস্তুক চিত্র, দুটোই খুব বিচিত্রগামী হয়ে উঠেছে। আশা-নিরাশা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের দোলাচালে পুরো সত্তরদশক অস্থির সময় কেটেছে শিল্পীদের। সেই পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীরা একত্রিত হতে চেয়ে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে আরও নতুন নতুন শিল্পীসংঘ গড়ে তুলেছিলেন। এ শিল্পী সংঘের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ‘স্কেচগ্রুপ’, ‘সেঁজুতি’, ‘ফাইভ ফিঙ্গারস’, ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’, ‘আর্ট গ্রুপ’ ‘ঢাকা আর্ট সার্কেল’, ‘সময়’ এবং ‘ঢাকা প্রিন্টমেকারস’।
স্কেচ গ্রুপের ছায়াতলে যারা একত্রিত হয়েছিলেন তাদের উদ্দেশ্য ছিল, কোনো স্টাইলকে প্রচার করা নয়, বরং শিল্পচর্চা নিরবচ্ছিন্নভাবে সজীব রাখা। অর্থাৎ এরা প্রত্যেকে নিজের নিজের ধারায় ছবি আঁকবেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে পরস্পরকে অনুপ্রাণিত করবেন।
এ ধারার শিল্পীদের কাজে মূল প্রেরণা দুটি। প্রথমটি বাংলার লোকশিল্প। দ্বিতীয়টি কিউবইজমের ললিত বিন্যাস। স্কেচগ্র“পের সদস্যরা হলেন- কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুল বাসেত, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, রফিকুন নবী, হাশেম খান।
অন্যান্য শিল্পীসংঘের শিল্পীরাও প্রধানত জীবনের ইতিবাচকতায় শিল্পের বিকাশ চেয়েছেন। নিসর্গলগ্নতা ও প্রফুল্ল জীবনের অনাবিল সুখ ও ফ্যান্টাসি কীভাবে শিল্পিতরূপ পেতে পারে তা-ই ছিল এসব শিল্পীসংঘের শিল্পীদের আরধ্য। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল স্বপ্নময় মানবচৈতন্য এবং স্বদেশ চেতনার সংকল্প।
অন্যদিকে ঢাকা আর্ট সার্কেলের শিল্পীদের চিত্রচর্চার আরধ্য বিষয় ছিল স্মৃতি। স্মৃতির মধ্যে যে নস্টালজিয়া, ফ্যান্টাসির একটা জগৎ- সেই জগতের দরজা খুলতে চেয়েছেন আর্ট সার্কেলের শিল্পীরা। এ সার্কেলের সদস্যরা হলেন- আবু তাহের, শামসুল ইসলাম নিজামী, প্রাণেশ মণ্ডল, রেজাউল করিম, বীরেন সোম, চন্দ্র শেখর দে।
কোনো শিল্পী সংঘের সদস্য না হয়েও সৃজনীশক্তিতে নিজে একাই সমকালের শিল্পাকাশে উজ্জ্বল তারার মতো দেদীপ্যমান, এমন শিল্পীর সংখ্যাও কম নয়। এ সূত্রে সবার আগে মনিরুল ইসলামের নাম উল্লেখের দাবি রাখে। নিসর্গ বিশ্লেষণে এবং মনের প্রতিক্রিয়া চিত্রিত করতে গিয়ে তিনি নতুন শিল্পভাষা সৃষ্টিতে প্রয়াসী হয়েছেন। তার চিত্রকর্মে রোমান্টিকতার সঙ্গে মরমিয়া বোধ যুক্ত হয়েছে, রঙ ও রেখার সতত সচল প্লাবনে। বায়ু, অগ্নি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এসব মৌলিক উপাদান তার চিত্রকলায় বারবার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। এ সময়ের আরেকজন উল্লেখযোগ্য শিল্পী কালিদাস কর্মকার। যিনি সমকালের ঘটনা ও তন্ত্র-শিল্পের যোগসাজশে আত্মার সত্তাকে অনুভব করতে চেয়েছেন।
৫.
স্বাধীনতাযুদ্ধে একটি জাতির শক্তির জোরালো উন্মেষ ঘটে। মুক্তিযুদ্ধকে চিত্রায়ণ করতে গিয়ে শাহাবুদ্দিন আহমেদ অবয়বধর্মী ছবির জোরালো প্রকাশ ঘটিয়েছেন।তার ক্যানভাসে ফিগারগুলো ধূমকেতুর মতো সাদা মেঘে ভাসমান থাকে। মানবদেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গের পরিমিত ইঙ্গিতে এবং সামান্য বর্ণছোপে যুদ্ধনিষ্ঠ গেরিলার মনোজগতের ব্যাপ্তিকে অসামান্য দ্যোতনায় ও শক্তিতে চিত্রিত করেছেন। শাহাবুদ্দিনের ছবিতে এমন একটি শিল্পভাষা তৈরি হয়েছে যাকে অবয়বধর্মী চিত্রকলা নতুন এক নিরীক্ষা বলা যেতে পারে।
একাত্তর-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের চিত্রকলা নতুন এক দিগন্তের বাঁক নিয়েছিল চট্টগ্রামে অবস্থানকারী শিল্পীদের নতুন নির্মাণে। লোকশিল্পের পুনর্বিন্যাসে প্রকৃতির রঙ রূপ নতুন করে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছিলেন রশীদ চৌধুরী। প্রকৃতির রহস্যঘন পটভূমি যতটা দক্ষতার সঙ্গে উন্মোচিত করতে পেরেছেন চট্টগ্রামের শিল্পীরা যা রাজধানী ঢাকাতে শিক্ষাদীক্ষা পাওয়া শিল্পীরা ততটা পারেনি। অনেকে বলেন বাউহাউসের আদর্শ প্রতিফলনে উৎসাহী ছিলেন রশীদ চৌধুরী। জয়নুল আবেদিনের পরে রশীদ চৌধুরী বাংলাদেশের দ্বিতীয় কোনো শিল্প সংগঠক যিনি চট্টগ্রামের মতো প্রান্তিক বন্দরনগরে শিল্পকলার দুটি ইন্সটিটিউশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিজেও ছিলেন একজন প্রতিভাবান শিল্পী। তিনিই বাংলাদেশে ট্যাপেস্ট্রি শিল্পমাধ্যমের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন।
রশীদ চৌধুরীর দীক্ষা এবং চট্টগ্রামের ভূ-প্রকৃতির প্ররোচনায় পরাবাস্তববাদী ছবি নির্মাণ করেছেন চট্টগ্রামের অনেক শিল্পী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন : হাসি চক্রবর্তী, চন্দ্র শেখর দে, মনসুর-উল-করিম। এরা প্রত্যেকে নিসর্গের কুহকী পরিধিতে দাঁড়িয়ে অবচেতনার অচেনা অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। এদের মধ্যে রূপবন্ধের স্নিগ্ধ পরিবেশনে মনসুর-উল-করিমের পারমিতা সবচেয়ে বেশি।
চট্টগ্রামে রশীদ চৌধুরীর দীক্ষা পাওয়া শিল্পীরা ‘ঢাকা পেইন্টার্স’ নামে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শিল্পের তত্ত্বগত ব্যাখ্যা। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এই সংঘ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুষ্টিয়াতে মোট পাঁচটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ঢাকা পেইন্টার্স গ্রুপ সম্পর্কে কড়াসমালোচক কায়সার হক বলেন : The members sought a balance between theory and practice, read and discussed varied writing of an art, and held group shows'. ঢাকা পেইন্টার্স গ্রুপের সদস্য ছিলেন : কাজী রকিব, দীপা হক, উত্তম দে ও তরুণ ঘোষ। এদের মধ্যে অকাল প্রয়াত দীপা হক এবং তরুণ ঘোষ পাওয়ারফুল শিল্পী। দীপা কাজ করেছেন দেহপোজীবীনীদের নিয়ে। তরুণের ক্যানভাসে প্রকাশ হয়েছে লোকপুরাণ বেহুলা। পুরাণ কথার গভীরতা এবং বেহুলা মনের আকুতি, করুণ আর্তি প্রকাশিত হয়েছে তরুণের ঘোষের ভাবনায়।
৬.
বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলা বর্তমানে আরেকটি বাঁকে এসে পৌঁছেছে, যেখানে প্রভাসিত হয়েছে মৌলবাদের উত্থান, ধর্ষণ, মিডিয়ার আগ্রাসন ও সমকালীন অস্থিরতা। দুঃসময়ের চিকিৎসা করতে হবে, এ প্রতিজ্ঞায় সংঘবদ্ধ ‘সময়’ গ্রুপের শিল্পীরা ১৯৭৯ সালে একত্রিত হয়েছিলেন। পশ্চিমী শিল্পচর্চা ঘরানার ঘোরবিরোধী ছিল সময় গ্রুপ। এক্সিভিশন উপলক্ষে প্রকাশিত ক্যাটালগে তারা লিখেছিলেন, ষাট দশকে পশ্চিম থেকে অনুলিপির মতো যে আধুনিক ধারাকে বিনাবিচারে বিশ্লেষণে ফ্যাশনের মতো আমদানি করা হয়েছিল এবং এখনও অনেক ক্ষেত্রেই যা অবিকৃতভাবে বিশুদ্ধ শিল্পকলার মাপকাঠি হয়ে আছে সেই রক্ষণশীল মানসিকতার বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে কালের উদ্দীপনায় আজকের তরুণ উন্মাদনায় বিশ্ব-নন্দনে নতুন সচেতনা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য কিনা তারও একটা উত্তর এখান থেকে পাওয়া যেতে পারে। সময় সংঘের শিল্পীরা হলেন : ঢালী আল মামুন, দিলারা বেগম জলি, ওয়াকিলুর রহমান, নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্য, মাইদুল হাসনাইন।
সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে পুরো আশির দশকজুড়ে ছিল সামরিক এবং ছদ্ম-সামরিক শাসকদের শাসনকাল। আশির দশকে বাংলাদেশে শিল্পকলায় তারুণ্যের একটা বুদ্ধিদীপ্ত মনোযোগ ঘটে। সামরিক দুঃশাসনের বিরুদ্ধে শিল্পীরা একত্রিত হয়ে শিল্পিত প্রতিবাদে শিল্পের অঙ্গন মুখর হয়ে উঠে। একথা সত্য যে এদেশে এসময় রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে শিল্পের সবচেয়ে বড় আয়োজন প্রথম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী ১৯৮০ অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়মিতভাবে এ আয়োজন তরুণ এবং নবীন শিল্পীদের কাছে অনুপ্ররেণার একটা প্লাটফরম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। প্রথমে আটটি দেশের অংশগ্রহণে দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হলেও এখন এ দ্বিবার্ষিকীতে চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশটি দেশ অংশগ্রহণ করে থাকে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে শিল্পকলার পারস্পরিক যোগাযোগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের চিত্রকলাও নতুন একটি বাঁক নিতে শুরু করে।
আশির দশকের আলোচিত শিল্পীরা হলেন নাজলী লায়লা মনসুর, অলোক রায়, রনজিৎ দাস, রোকেয়া সুলতানা, জামাল আহমেদ, মোমিনুল রেজা। লোকশিল্পের শরণাপন্ন হয়ে শিল্পে আধুনিকতার মাত্রা সংযোজন সব দেশের শিল্পীদের একটা মৌল প্রবণতা। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এখানে ধারার অন্যতম স্বাক্ষর আব্দুস শাকুর। অনেক শিল্পী নিসর্গের সূক্ষ্ম রূপটি বুদ্ধিদীপ্ত শৈল্পিক চাতুর্যে ক্যানভাসে উপস্থাপন করেছেন। তাদেরর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ফরিদা জামান, মাহমুদুল হক, আবদুস সাত্তার, মোহাম্মদ ইউনুস, জিএস কবীর, শামসুদ্দোহা শেখ আফজাল।
নব্বইয়ের দশকে কয়েকজন তরুণ শিল্পী এ প্রতিজ্ঞায় সংঘবদ্ধ হলেন, চিত্রকলাকে মধ্যবিত্ত সাধারণের ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। তারা ঢাকা প্রিন্টমেকারস নামে একটি গ্রুপ ফর্ম করলেন। মূলত এটি বাংলাদেশের প্রথম ছাপচিত্র শিল্পীদের সংঘ। এই শিল্পী সংঘের বক্তব্য ছিল, ছাপচিত্র সহজ যোগাযোগের মাধ্যম, অল্প মূল্যে তা শিল্পানুরাগী সংগ্রাহক ও সাধারণের কাছে পৌঁছে যেতে পারে সহজেই। এ সংঘের সদস্যরা হলেন রোকেয়া সুলতানা, আহমেদ নাজির, রফি হক, রশীদ আমিন, মোস্তাফা জামান, হুমায়রা রহমান। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ শিল্পী সংঘ দেশে-বিদেশে এ পর্যন্ত পাঁচটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এ গ্রুপের সর্বশেষ প্রর্দশনী অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকাতে ২০১৩ সালে।
২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের শিল্পকলার পরিপ্রেক্ষিত দ্রুত বদলে যেতে থাকে। শিল্পকলা চর্চা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতায় রূপান্তর ঘটে। একাধিক ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসে। প্রতিষ্ঠা পায় শিল্পাঙ্গন কনটেমপোরারি আর্ট গ্যালারি, বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস, সোসাইটি ফর প্রোমশন অব বাংলাদেশ আর্ট, কসমস গ্যালারি অব আর্টস ইত্যাদি। নিয়মিত ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতে থাকে আর্ট ক্যাম্প, আর্ট ওয়ার্কশপ, আর্ট সামিট, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আর্ট টক, এবং চিত্রকলার ওপর মনোরম তথ্যবহুল গ্রন্থ, আর্ট ম্যাগাজিন এবং চিত্রকলা সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনা। সোসাইটি ফর প্রমোশন অব বাংলাদেশ আর্ট (SPBA) ২০০৩ সালে প্রকাশ করে 'BANGLADESH ART: a collection of contemporary paintings'.
বাংলাদেশের চিত্রকলা এখন ভেনিস বিয়েনাল, ফুকুওকা বিয়েনাল, টোকিও বিয়েনাল, বেইজিং বিয়েনাল, টেট মিউজিয়াম, গুগেনহেইম মিউজিয়ামে নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের চিত্রকলার পরিমাপের সাম্প্রতিকতম বিকাশের পরিমাপ করা সম্ভব নয়। কারণ এ সময়ের অনেক শিল্পীই প্রদর্শনীর আয়োজন করেন না। সমকালের চিত্রশিল্পের নিত্য পরিবর্তনশীল ধারা অনুধাবন করা বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদের জন্য কষ্টকর হলেও তারা এসব ধারার সঙ্গে সম্যক পরিচিত। উন্নত বিশ্বের সমকালীনতায় পৌঁছানোর দায় বাংলাদেশের কতটুকু তা তর্কের বিষয়।
বাংলাদেশের শিল্পীরা বিশ্বাস করেন নিজের ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত থেকে হতে হয় আধুনিক। পৃথিবীজুড়ে চলছে এখন ঐতিহ্য উদ্ধারের প্রয়াস এবং ঐতিহ্যের নতুন ব্যাখ্যায় চিত্রকলা নতুন মাত্রা পেতে শুরু করেছে। এই শেকড় অনুসন্ধানের অভিযাত্রায় দিকে এখন বাংলাদেশের চিত্রকলা....
নোট : শিল্পী রফি হক মার্কিন যুক্ররাষ্ট্রের দ্য ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো থেকে আমন্ত্রিত হয়ে ইইনিভার্সিটির ফস্টার হলে ২০১৪ সালের ১০ এপ্রিল প্রবন্ধটি পাঠ করেন।
 

বর্ষপূর্তি সংখ্যা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close