¦
চলচ্চিত্রের সংকট ও উত্তরণের উপায়

অনুপম হায়াৎ | প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৫

সরকার ৩ এপ্রিলকে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস’ ঘোষণা করেছে। এর ফলে যেমন চলচ্চিত্র কর্মীদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হয়েছে তেমন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পেয়েছে একটি নতুন ব্যঞ্জনা ও একটি ঐতিহাসিক দিবসের স্বীকৃতি। এ স্মরণীয় দিবসটি হচ্ছে ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন শিল্প, বাণিজ্য ও শ্রমমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রাদেশিক আইন পরিষদে বিল উত্থানের মাধ্যমে ‘চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা’ প্রতিষ্ঠার তারিখ। এই সংস্থা প্রতিষ্ঠার ফলে দেশে আধুনিক ফিল্ম স্টুডিও এবং ল্যাবরেটরির যান্ত্রিক সুুযোগ-সুবিধাসহ চলচ্চিত্র নির্মাণের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বলা যায় সমগ্র এশিয়ার মধ্যে সরকারি উদ্যোগে এ ধরনের ফিল্ম স্টুডিওর প্রতিষ্ঠা ছিল এটাই প্রথম।
চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠার ফলে এ অঞ্চলে যেমন চলচ্চিত্র প্রযোজক তৈরি হয়, পুঁজি বিনিয়োগ হয় তেমন এখানকার সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ১৯৫৯ সাল থেকে নিয়মিতভাবে প্রতি বছর নতুন নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে; এখানকার পরিচালক-শিল্পী-কুশলীরা প্রতিভা-শ্রম ও উদ্যম ব্যবহারের সুযোগ পায়। এ ধারা বর্তমানকাল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। এফডিসির সহায়তা নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্র এদিকে যেমন দেশীয় সিনেমা হলগুলোতে প্রদর্শিত হয়ে দৈনিক লাখ লাখ দর্শককে বিনোদিত করেছে তেমনি মস্কো, নিউইয়র্ক, তেহরান, বৈরুত, ফ্রাংকফুর্ট, ক্যান অস্কার, গোয়া, দিল্লি, কলকাতা, পিয়ংইয়ং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-মেলায় প্রদর্শিত হয়ে পুরস্কার-প্রশংসাও পেয়েছে। ৩ এপ্রিল এফডিসি প্রতিষ্ঠার আগে এগুলো কল্পনাও করা যেত না। যদিও এর আগে ১৯০১-১৯১৭ সালের মধ্যে মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন বাঙালিদের মধ্যে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, ১৯২০ ও ১৯৩০ দশকে ঢাকার নবার পরিবারের উদ্যোগে নির্মিত হয় প্রথম নির্বাক চিত্র ‘সুকুমারী’ ও দি ‘লাস্ট কিস’, পাকিস্তানোত্তর পরিবেশে নাজীর আহমদ নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ (১৯৪৮) ও প্রামাণ্যচিত্র ‘সালামত’ (১৯৫৪) এবং আবদুল জব্বার খান নির্মাণ করেন প্রথম সবাক বাংলা কাহিনী চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ (১৯৫৬)। এসবই নির্মিত হয়েছিল কলকাতা ও লাহোরের কারিগরি সুবিধা নিয়ে। কাজেই অতীত ইতিহাসের কথা স্মরণে রেখে এবং বর্তমানে জাতীয় ও সমাজ জীবনে চলচ্চিত্রের নানাবিধ প্রভাব বিবেচনা করে ৩ এপ্রিলকে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস ঘোষণার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। এই দিবসের তাৎপর্যের আলোকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান ও ভবিষ্যতের আদর্শ, লক্ষ্য ও কার্যক্রমের রূপরেখা প্রণয়ন হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই জাতীয় দিবসটি পালন করা হবে নানা কর্মসূচি ও উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে। দিবসটি ঘোষণার এক বছরপূর্তির প্রাক্কালে সে বিষয়টি সর্বাধিক আলোচনার দাবি রাখে তা হচ্ছে ‘চলচ্চিত্র শিল্পের সংকট ও উত্তরণের উপায়’।
চলচ্চিত্রের সংকট
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গত কয়েক বছর ধরে সংকট চলছে। এসব সংকটের মধ্যে রয়েছে:
১. সিনেমা হলের সংখ্যা ও দর্শক সংখ্যা হ্রাস।
২. স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল-ডিভিডি-ইন্টারনেট-কম্পিউটার-ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনের সেটের মাধ্যমে চলচ্চিত্র ও টিভি অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ।
৩. পুঁজির অভাব।
৪. চলচ্চিত্র নির্মাণে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তার প্রভাব।
৫. চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধি। সেই তুলনায় আয় কম।
৬. সিনেমা হলের পরিবেশে দর্শকবান্ধব সুযোগ-সুবিধার অভাব প্রদর্শনে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির অভাব।
৭. মৌলিক কাহিনী ও বিষয়বস্তুর অভাব।
৮. অশ্লীল-যৌনতা-প্রতিহিংসা-সংঘাত-অপরাধমূলক উপাদানে ভরা উদ্কট, অবাস্তব নকল ও বৈচিত্র্যহীন কাহিনীর আধিক্য।
৯. মুক্তিপ্রাপ্ত ছরির ভিডিও দস্যুতা।
১০. বিদেশী ও অন্যান্য ভিডিও চিত্রের অবাধ ও সুলভে বিক্রি।
১১. সেন্সর বোর্ড কর্তৃক ব্যতীত দৃশ্যের পুনঃসংযোজন ও অশ্লীল কার্ট পিস সংযোজনপূর্বক অসাধুপন্থায় সিনেমা হলে প্রদর্শন।
১২. প্রযোজক ও নির্মাতাদের সৃজনশীল-মননশীল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও দেশপ্রেম বোধের অভাব।
১৩. পরিচালক-পাত্র-পাত্রী ও কুশলীদের প্রশিক্ষণের অভাব।
উত্তরণের উপায় : কতিপয় সুপারিশ
১. চলচ্চিত্রের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নির্মাণ ব্যয় হ্রাস করতে হবে। এ উদ্দেশে এফসিডি, ডিএফপির আধুনিকায়ন করতে হবে।
২. সিনেমা হলগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে আধুনিকায়ন করতে হবে। হলগুলোর পরিবেশ উন্নত করতে হবে। সিনেমা হলগুলোর আধুনিকায়ন ও সংস্কারের জন্য ব্যাংক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ/অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রযোজনায় পুঁজির জোগান বাড়াতে হবে। এ উদ্দেশে শিল্প হিসেবে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক কোম্পানি ও অন্যান্য বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে চলচ্চিত্রে পুঁজি বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে।
৪. চলচ্চিত্র পরিচালক-শিল্পী-কুশলীদের প্রশিক্ষণের জন্য ফিল্ম ইন্সটিটিউট স্থাপন করতে হবে। চলচ্চিত্র বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে হবে।
৫. বছরে অন্তত পাঁচটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অনুদান প্রদান করা। প্রতিটি চলচ্চিত্রে অনুদানের পরিমাণ হবে ৫০ থেকে ৮০ লাখ টাকা। প্রবীণ ও পরীক্ষিত নির্মাতারা এ অনুদান পাবে।
৬. বছরে পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য, পাঁচটি শিশু-কিশোরতোষ এবং পাঁচটি প্রামাণ্যচিত্রে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা অনুদান প্রদান করা। এ অনুদান নবীন ও তরুণ নির্মাতাদের দেয়া হবে।
৭. নিয়মিতভাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান ও পুরস্কারের অর্থের পরিমাণ বাড়ানো।
৮. সুস্থ, শিল্পশোভন ও শিশু-কিশোরতোষ চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে প্রমোদকর হ্রাস করা।
৯. সেন্সরবিধির আধুনিকায়ন ও চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠন করা।
১০. অশ্লীল ও নকল ছবির ছাড়পত্র না দেয়া। আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১১. ভিডিও দস্যুতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১২. দেশে নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-মেলা-প্রদর্শনীর আয়োজন করা এবং বিদেশী উৎসব ও মেলায় নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করা। এজন্য আলাদা দফতর গঠন করা।
১৩. ফিল্ম আর্কাইভের ভবন নির্মাণে, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ও ডিজিটাল কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবলের ব্যবস্থা করা।
১৪. চলচ্চিত্র সংসদের কার্যক্রম সচলকরণ ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ।
১৫. চলচ্চিত্র দর্শকদের রুচি, জ্ঞানবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি উন্নতকরণ এবং তাদের ভালো ছবি দেখা ও পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্বুদ্ধ করা।
১৬. চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন। টেলিভিশনে রুচিশীল এবং সৃজনশীল চলচ্চিত্র, গান, নাচ প্রদর্শন করা।
১৭. সংস্কৃতি ও পণ্যবিনিময় চুক্তির অধীনে চলচ্চিত্র আমদানি ও রফতানি করা।
সামনে নতুন প্রত্যাশা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও ২০১১ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে জনজীবনে চলচ্চিত্রের গুরুত্ব, চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ও ইতিহাস প্রসঙ্গ এবং চলচ্চিত্রের উন্নয়নে তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জীবন ও সংস্কৃতিনির্ভর, সমাজসংস্কারমূলক, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এবং শিশু-কিশোরতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য নির্মাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তার এ আহ্বান চলচ্চিত্র নির্মাতা-শিল্পী-কুশলীদের প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। এর প্রভাব পড়বে চলচ্চিত্র শিল্পে। সবার অংশগ্রহণে চলচ্চিত্র হয়ে উঠবে সৃজন ও মননে পুষ্ট। ফিরে আসবে সুবর্ণ সময়। জীবন ও শিল্প ফ্রেমে ফ্রেমে স্মৃতি হয়ে চলচ্চিত্র সৌরভ গৌরবে হবে বলীয়ান।
 

বর্ষপূর্তি সংখ্যা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close