¦

এইমাত্র পাওয়া

  • ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া থকলে ঋণ পুন:গ্রহণের আবেদন করা যাবে: বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত
তিন জোটের রূপরেখা সম্ভব হলে এখন কেন হবে না?

ড. বদিউল আলম মজুমদার | প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৫

বর্তমান সময়ে জাতি হিসেবে আমরা দুটি গুরুতর হুমকির সম্মুখীন। প্রথমটি হল বাংলাদেশ একটি অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। দ্বিতীয়টি হল জঙ্গিবাদের। অনেকের আশংকা, বাংলাদেশে একটি উগ্র ধর্মভিত্তিক জঙ্গি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনেক লক্ষণ এরই মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। আবার অনেকের ধারণা, এ দুটি গুরুতর হুমকির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে এবং এগুলো সাহসিকতা ও সফলতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে না পারলে আমরা এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত হতে পারি।
আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা ও সর্বস্তরের জনগণের সম্পৃক্ততায় পরিচালিত একটি গণআন্দোলনের সুবাদে এরশাদ সরকারের পতনের পর একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে আমাদের দেশে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রচলন করা হয়। তবে এর মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার বহুলাংশে নিশ্চিত হলেও দেশে একটি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক, দায়বদ্ধ ও জনকল্যাণে নিবেদিত উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বস্তুত গত ২৩ বছরে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতাবিবর্জিত এবং চরম দুর্নীতিগ্রস্ত এক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যে ব্যবস্থায় আইনের শাসন চরমভাবে পদদলিত ও মানবাধিকার ভয়াবহভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমাদের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্রমাগতভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেছে, সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নগ্ন দলতন্ত্রের চর্চার কারণে পুরো জাতি চরম অসহিষ্ণু দুটি যুদ্ধংদেহী ক্যাম্পে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে ‘স্টেট বিল্ডিং’ বা রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। এছাড়াও গত ২৩ বছরে ক্ষমতার রাজনীতিতে বিভোর আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মাশ্রিত দল ও সংগঠনগুলোকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা ও আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে এবং নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণকে রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আর মালিক হিসেবেই জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং এসব প্রতিনিধির জনগণের পক্ষে ও স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করার কথা। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর থেকে বাংলাদেশে এক ধরনের নির্বাচনসর্বস্ব ‘একদিনের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হলেও পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে মূলত ব্যক্তি, গোষ্ঠী, কোটারি ও দলীয় স্বার্থে। এর মাধ্যমে রাজনীতি পরিণত হয়েছে জনসেবার পরিবর্তে বহুলাংশে লাভজনক পেশায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপশাসনই হয়ে পড়েছে ক্ষমতাধরদের লাভের উৎস। আর এ প্রক্রিয়ায় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে গজিয়ে উঠেছে এক ভয়াবহ লুটেরা শ্রেণী। এ লুটেরা শ্রেণী সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অঢেল অর্থের মালিক হয়েছে ও হচ্ছে এবং অন্যায়ভাবে অর্জিত এ অর্থ ক্রমাগতভাবে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে (প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪), যার কারণে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন এবং শাসন প্রক্রিয়ার চরম অপশাসন সত্ত্বেও সৌভাগ্যবশত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গত ২৩ বছরে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। যদিও এ অগ্রগতি অনেক দেশের তুলনায় আশাপ্রদ নয়। এ সময়ে বৈদেশিক অনুদান ও সাহায্যের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা ব্যাপকভাবে কমেছে। জনগণের আয় বেড়েছে, যদিও একই সঙ্গে আয় ও সুযোগের বৈষম্য গুরুতরভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক সূচকেও বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে অগ্রগতি হলেও রাজনীতিতে আমাদের পশ্চাৎপদতাই ঘটেছে। তবে অর্থনৈতিক এ অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে হলে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন ও শাসন প্রক্রিয়াকে কলুষমুক্ত করতে, রাজনীতিতে অনৈতিকতা, হানাহানি ও নগ্ন দলতন্ত্রের অবসান ঘটাতে, ভোটাধিকারসহ মানুষের কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা বদলের রুদ্ধ পথকে উন্মুক্ত করতে হবে। গত ২৩ বছরে অনুষ্ঠিত সব কটি জাতীয় নির্বাচনে- ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের তথাকথিত নির্বাচন ছাড়া, যে নির্বাচনের ফলাফল টিকে থাকেনি- জনগণ মোটামুটি সঠিকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলেও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল তার ব্যতিক্রম। ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে অনুষ্ঠিত এ বিতর্কিত নির্বাচনে প্রথমবারের মতো মোট ৩০০-এর মধ্যে ১৫৩টি আসন থেকে সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী জনগণের প্রত্যেক্ষ ভোটের পরিবর্তে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন। এ নির্বাচনে ৪১টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে মাত্র ১২টি দল অংশ নিয়েছে। এসব কারণে অধিকাংশ নাগরিক তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নির্ভরযোগ্য হিসাব অনুযায়ী, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গড়ে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ১০ শতাংশেরও কম, যেখানে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ হার ছিল ৮৭ শতাংশেরও বেশি। আমাদের উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, বিকৃত (pervert) ও ভোটারবিহীন নির্বাচন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে [এএফএম শাহ আলম বনাম মজিবুর রহমান, ৪১ ডিএলআর (এডি) ১৯৮৯], যদিও বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। গণতন্ত্র হল জনগণের সম্মতির শাসন, যে সম্মতি অর্জিত হয় নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে। তাই ভোটারবিহীন নির্বাচন ও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জনসম্মতির অভাবে বাংলাদেশে এখন এক অস্বাভাবিক ও সম্ভাব্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় গত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের ফলে সৃষ্ট অস্বাভাবিকতা আরও তীব্র হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন ধরনের দমন-পীড়নমূলক পদক্ষেপ ও জনগণের কণ্ঠরোধের উদ্যোগ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। এর ফলে এখন আমাদের দেশে মানবাধিকার চরমভাবে লংঘিত হচ্ছে। বিঘিœত হচ্ছে আইনের শাসন এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নমুক্ত সমাজ গঠন তথা সুশাসন কায়েম। এমন অবস্থা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ একটি ভয়াবহ কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতে বাধ্য। আমাদের বর্তমান শাসনব্যবস্থা শুধু শাসকশ্রেণীর চরম স্বার্থপরতা ও দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের কবলেই নিপতিত নয়, ফায়দাতন্ত্র এবং দলতন্ত্রের ভিত্তিতে এটি পরিচালিত। আর ফায়দাতন্ত্র ও দলতন্ত্র যেখানে, সাধারণ মানুষ বঞ্চিতও হয় সেখানে। তবে দলতন্ত্রের কারণে সাধারণ মানুষ শুধু বঞ্চিতই হয় না, তারা বিভিন্ন ধরনের অন্যায়, অবিচার ও ভোগান্তিরও শিকার হয়। যেমন, বর্তমানে অর্থ ও তদবির ছাড়া সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়রিও দাখিল করতে পারে না। টাকা বা প্রভাব খাটানো ছাড়া প্রশাসন থেকেও জনগণ সাধারণত তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ও সেবা পায় না। এটি রূঢ় বাস্তবতা যে, সাধারণ মানুষের টাকা ও তদবিরের জোর কোনোটাই নেই। ফলে আজকের বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ, দলমত নির্বিশেষে, প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের বঞ্চনা ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, যার প্রতিকার তারা চায়, কিন্তু পায় না। সাধারণ মানুষের নানা বঞ্চনা ও ভোগান্তি উগ্রবাদী শক্তির বিস্তারের জন্য আমাদের দেশে এক উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছে। বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় এবং বিভ্রান্তিমূলক ধর্মীয় স্লোগান ব্যবহার করে উগ্রবাদী শক্তি এ অনুকূল পরিবেশের সুযোগ নিতে পারে। এছাড়া বিশ্ব পরিস্থিতিও যেন বর্তমানে ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদকে উসকে দিচ্ছে। উপরন্তু আন্তর্জাতিকভাবে আমরা ধর্মীয় উগ্রবাদের টার্গেটও হয়ে আছি বলে অনেকের ধারণা। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আমাদের দেশেও জঙ্গিবাদের ভয়াবহ উত্থানের আশংকা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। রাজনৈতিক অঙ্গনে অনৈতিকতা, হানাহানি ও সহিংসতা এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের সংকোচন এসব অপশক্তির পালে নতুন করে হাওয়া দিচ্ছে বলেও অনেকের আশংকা। কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা আমাদের ওপর জেঁকে বসা থেকে অব্যাহতি পেতে এবং ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদকে এড়াতে হলে আমাদের সমাজে বিরাজমান অন্যায় ও অসঙ্গতিগুলো আজ দূর করতে হবে। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন এবং অপশাসন রোধ করতে হবে। সাধারণ মানুষের বঞ্চনা ও ভোগান্তির প্রতিকার করতে হবে। তাদের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হবে। সংবিধানের বিরাজমান সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে হবে। সর্বোপরি নিয়মতান্ত্রিকভাবে, ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের পথকে সুদৃঢ় করতে হবে। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে আজ প্রয়োজন কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি। আমরা মনে করি যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এড়াতে হলে মোটাদাগে তিনটি ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত
প্রয়োজন পরবর্তী নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে একটি ঐকমত্য, যা নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নিশ্চিত করবে। দ্বিতীয়ত প্রয়োজন নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা নিয়ে ঐকমত্য, যাতে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়। ঐকমত্যের অন্য ক্ষেত্রটি হতে হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত পরবর্তী সরকারের জন্য করণীয় সম্পর্কে। ঐকমত্যের প্রথম দুটি ক্ষেত্রে চিহ্নিত করণীয় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আশু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হলেও নতুন সরকারের জন্য করণীয় বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচন-পরবর্তী সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এ তিনটি ক্ষেত্রে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হতে পারে, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূরীভূত এবং সামাজিক সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের পথ সুগম হবে।
নির্বাচনকালীন সরকার
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কয়টি নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার সব কটিতেই ক্ষমতাসীনরা বিজয়ী হয়েছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। অভিজ্ঞতার আলোকে এবং প্রশাসন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলতন্ত্রের ভয়াবহ প্রভাব বিস্তারের কারণে ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোও যে কারচুপি ও কারসাজিমুক্ত হবে না- তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাই ভবিষ্যতের নির্বাচন যাতে দলীয় প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে সেই লক্ষ্যে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ মুহূর্তেই নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে একটি সমঝোতা হওয়া জরুরি।
প্রসঙ্গত, দলীয় সরকারের অধীনে আমাদের দেশে যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভবপর নয়, সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগসহ অনেক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি উত্থাপন করা এবং ১৯৯৬-এর বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিএনপি তা আমাদের সংবিধানে সংযোজন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মহাজোট সরকারের উদ্যোগে উচ্চ আদালতের একটি বিভক্ত রায়ের দোহাই দিয়ে তড়িঘড়ি করে ২০১১ সালে এ ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দেয়া হয়, যদিও আদালত আরও দুবার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে মত দেন। সংশ্লিষ্ট সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠিত নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব হবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের (যেমন, ৯০ দিনের) মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশন এবং কমিশনের সদস্যরা যোগ্য ও নিরপেক্ষ না হলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা করা দুরাশা মাত্র। তাই সঠিক ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এ লক্ষ্যে অবশ্য কমিশনে নিয়োগদান সম্পর্কিত একটি আইন প্রণয়ন করতে হবে, যে ব্যাপারে সুস্পষ্ট সাংবিধানিক (অনুচ্ছেদ ১১৮) বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে হুদা কমিশনের রেখে যাওয়া আইনের একটি খসড়া কাজে লাগানো যেতে পারে। কমিশন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি অনুসন্ধান কমিটির সহায়তা নিতে হবে, যে কমিটি স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগদানের জন্য সুপারিশ করবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কমিশনে নিয়োগ প্রদান করবেন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে। একটি সঠিক ভোটার তালিকা প্রণয়ন এ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। ভোটার তালিকার সঠিকতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে হুদা কমিশনের মেয়াদকালে একটি ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন ছিল জাতি হিসেবে আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন। কিন্তু বর্তমান কমিশনের অধীনে হালনাগাদ করা ভোটার তালিকা নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক প্রশ্ন উঠেছে, তাই আগামী নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার সঠিকতা প্রতিষ্ঠা করা হবে পরবর্তী নির্বাচন কমিশনের অন্যতম করণীয়। এছাড়াও কমিশনকে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ ও একটি যুগোপযোগী আচরণবিধি প্রণয়ন করতে হবে। আচরণবিধি প্রণয়নের ক্ষেত্রে ১৯৯০ সালে প্রণীত ও ‘তিন জোটের রূপরেখা’য় অন্তর্ভুক্ত আচরণবিধিটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।
নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা
সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য শুধু নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের দক্ষতাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য নির্বাচনকালীন আইনকানুন ও বিধিবিধানও যথার্থ হতে হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও); ভোটার তালিকা আইন, ২০১০; নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০১০; জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪- এগুলো নির্বাচন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন। এছাড়াও রয়েছে নির্বাচনী আচরণবিধি। বিদ্যমান আইনি কাঠামো বহুলাংশে গ্রহণযোগ্য হলেও, এগুলোতে কিছু সংস্কার আনতে হবে এবং নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে মোটাদাগের কিছু সংস্কারের ব্যাপারেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আরপিও’-তে ‘না-ভোটে’র এবং দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের সুস্পষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়াও নির্বাচনী ব্যয়ে লাগাম টানার লক্ষ্যেও আইনি সংস্কারের প্রয়োজন হবে। আমাদের দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষমুক্ত করতে হলে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মানদণ্ড আরও কঠোর এবং আদালত নির্দেশিত হলফনামার মাধ্যমে তাদের প্রদত্ত তথ্য নির্বাচন কমিশনের জন্য পদ্ধতিগতভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করতে হবে। যেহেতু আরপিও’র বিধান অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী হলফনামায় তথ্য গোপন করলে কিংবা এতে ভুল তথ্য দিলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হবেন না এবং নির্বাচিত হলেও সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না, তাই হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য কঠোরতার সঙ্গে নিরীক্ষণ করলে অর্থলোভী অনেক বসন্তের কোকিলকেই নির্বাচনী অঙ্গন থেকে দূরে রাখা যাবে। প্রসঙ্গত, সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা বলে কমিশনের হলফনামা নিরীক্ষণের, এমনকি সুষ্ঠু নির্বাচনের খাতিরে আইনি বিধানের সঙ্গে সংযোজনেরও এখতিয়ার রয়েছে, যদিও কমিশনকে তা প্রয়োগ করতে দেখা যায় না।
নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের করণীয়
নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার এবং সেই সরকার কর্তৃক নিয়োগ দেয়া একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারলেও আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজমান অসহিষ্ণুতা ও হানাহানি তথা দৈন্যের সমস্যা দূরীভূত হবে না। এর জন্য প্রয়োজন হবে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের করণীয় সস্পর্কে একটি ঐকমত্য সৃষ্টি। আর তা করতে পারলেই আমরা সমস্যার টেকসই সমাধান আশা করতে পারি। যথাযথ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের জন্য মোটাদাগে বাধ্যতামূলক করণীয় বিষয়গুলো হতে পারে :
১. যুদ্ধাপরাধের বিচার দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন এবং রায় কার্যকর করা, যাতে ইতিহাসের এ কালো অধ্যায় পেছনে ফেলে আমরা কলংকমুক্ত হতে পারি।
২. জাতীয় সংসদকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, যাতে সংসদ যথাযথভাবে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে। একইসঙ্গে সংসদ সদস্যদের সততা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন এবং সংবিধান নির্দেশিত সংসদ ও সংসদ সদস্যদের জন্য একটি বিশেষ অধিকার আইন বা প্রিভিলেইজ অ্যাক্ট প্রণয়ন করা।
৩. রাজনৈতিক দলের সংস্কারের মাধ্যমে দলগুলোকে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ করা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বস্তরে দলতন্ত্রের অবসান ঘটানো। কারণ যুগোপযোগী দল ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে সহিংসতা পরিহার করার এবং সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ ও সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্যও অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে তাদের বিশ্বাসী হতে হবে।
৪. রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত করা এবং লেজুড়ভিত্তিক শিক্ষক, ছাত্র ও শ্রমিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা।
৫. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য একটি আইন প্রণয়ন করা। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারকদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা তদন্ত করে এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিচার বিভাগের সত্যিকার পৃথকীকরণের মাধ্যমে নিু আদালতের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের অপসংস্কৃতি বন্ধের অঙ্গীকার করতে হবে।
৬ আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগদানের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা, যাতে কমিশনের পক্ষে একটি সর্বোব্যাপী দুর্নীতি দমন অভিযান পরিচালনা করা সম্ভবপর হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের মতো দুর্নীতিবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা। একইসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন প্রভৃতি সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নিরপেক্ষ ও নির্ভিক ব্যক্তিদের নিয়োগদানের মাধ্যমে কার্যকর করা।
৭. একটি সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট প্রণয়ন, পুলিশ আইনের আধুনিকায়ন এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দৈনন্দিন আইনশৃংখলা রক্ষার কাজের পরিবর্তে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য র‌্যাবকে সামরিক বাহিনীর অধীনে একটি কমান্ডো ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা।
৮. প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে একটি বলিষ্ঠ কর্মসূচি গ্রহণ করা এবং এ লক্ষ্যে অন্তত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ন্যূনতম ৫০ শতাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ব্যয় করা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপ তথা এমপিতন্ত্র ও দলতন্ত্রের অবসান ঘটানো এবং যথাসময়ে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন নিশ্চিত করা।
৯. সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা, যে কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তী সরকার উদ্যোগ নেবে। সংবিধান সংশোধনের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো হতে পারে : রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা; প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া; মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীকে ‘সমদের মধ্যে প্রথম’ বা ফার্স্ট এমাং দি ইকোয়েল করা; ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধে একই ব্যক্তির একাধারে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলের প্রধান হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা; যোগ্য ব্যক্তিদের রাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য গঠিত ‘ইলেক্টরাল কলেজে’ স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা; সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার করে সংসদ সদস্যদের মতপ্রকাশের সুযোগ করে দেয়া; বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কারের মাধ্যমে একক আঞ্চলিক এলাকাভিত্তিক নির্বাচন এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতির প্রবর্তন করা; দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন করা; সংসদের ন্যূনতম এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত এবং এসব আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা; সংবিধানকে প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রে ফিরিয়ে আনা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণসহ রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা; রিকল বা ভোটারদের অনাস্থা প্রদানের বিধান প্রবর্তন করা; আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা; গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তন করা ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ সংসদে অনুমোদনের পর তা গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানে সংযোজন করা যেতে পারে।
১০. সরকারি ও বেসরকারি সব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং নাগরিক সমাজের কাজের পরিধি যাতে সংকুচিত না হয় সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। কারণ স্বাধীন গণমাধ্যম এবং নিরপেক্ষ ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হয় না।
১১. গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সংখ্যালঘুসহ সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখা।
১২. প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে ‘পলিটিক্যাল ফাইন্যান্স’ বা রাজনীতির অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা, যাতে নির্বাচনী ব্যয় ও রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের ওপর লাগাম টানা সম্ভবপর হয়। এর ফলেই হয়তো ‘বেস্ট ডেমোক্রেসি মানি ক্যান বাই’ বা টাকা দিয়ে কেনা যার এমন উৎকৃষ্ট গণতন্ত্র হওয়ার বদনাম আমরা ঘোচাতে পারব।
১৩. একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’তে উপনীত হওয়া, যাতে সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সম্পদে তাদের ন্যায্য হিস্যা পেতে পারে।
একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
১৪. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে জাতিকে রক্ষা করার লক্ষ্যে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
গত ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন ও বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে বাংলাদেশে যে অস্বাভাবিকতা ও সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি। কিন্তু এ মুহূর্তে একটি নির্বাচন, এমনকি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এর পরিণতিতে সৃষ্ট ভয়াবহ অনিশ্চয়তার সমস্যার টেকসইভাবে সমাধান করতে হলে উপরোল্লেখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। আশা করি, আমাদের সম্মানিত রাজনীতিবিদরা জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন, সংলাপে নিয়োজিত হবেন, সমঝোতায় উপনীত হবেন এবং একটি নাগরিক সনদে স্বাক্ষর করবেন। একই সঙ্গে তারা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আলোকে পরস্পরের সঙ্গে সহাবস্থানের ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করবেন। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনীতিবিদদের দায়িত্বশীল আচরণ করার উদাহরণ আমাদের রয়েছে। যেমন, ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারকে মোকাবেলা করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল, যার ভিত্তিতে ১৯৯১ সালে একটি সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটেছিল। আশা করি, আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে ও কার্যকর করতে এবং আমাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে তারা আবারও এগিয়ে আসবেন।
২৭ ডিসেম্বর ২০১৪ সুজন-এর পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে উত্থাপিত ও অনুমোদিত
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সাধারণ সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)
[email protected]
 

বাতায়ন পাতার আরো খবর
    ৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

    ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

    প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

    পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

    Developed by
    close
    close