¦
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা কি এতই কঠিন?

আলম শাইন | প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৫

এমন কোনো দিন নেই যেদিন আমরা শুনিনি দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেনি। বলা যায়, এটি এখন দেশের একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, যা দেখতে দেখতে অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গেছে আমাদের। যেন এটি ঘটারই কথা, ঘটতেই হবে। সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে সড়ক দুর্ঘটনার খবর আমরা দেখতে পাই প্রতিনিয়ত। হয়তো কোনো দুর্ঘটনায় স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তির
প্রাণনাশ ঘটেছে নয়তো সংখ্যায় বেশি, পার্থক্য শুধু এটুকুই। আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, স্থানটি হয়তো গ্রামাঞ্চলে কিংবা মফস্বলে নতুবা শহরে।
আমরা জানি, প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনাই মর্মান্তিক। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের দুটি দুর্ঘটনা হচ্ছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ৪০ ছাত্রের মৃত্যু এবং নাটোরের বড়াইগ্রামে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৫ যাত্রীর মৃত্যু। ক’মাস আগে ঘটেছে বেনাপোল এলাকায় ৭ ছাত্রের মৃত্যু। আর এই সেদিন, ৯ এপ্রিল তেমনি বড় ধরনের একটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার কইডুবি এলাকায়। ‘সোনারতরী’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে ২৫ যাত্রী নিহত হন। আহত হন আরও অনেক যাত্রী। তাদের অবস্থাও আশংকাজনক। ইতিপূর্বে সড়ক দুর্ঘটনায় রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রাণ হারানোর কথা আমরা জানি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও গণমাধ্যমকর্মী মিশুক মুনীরসহ আরও অনেকে। আমরা জানি অনেক খ্যাতিমান কিংবা অখ্যাত ব্যক্তির পঙ্গুত্ববরণের কথা, যাদের অনেকেই আজ স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। এভাবে হয়তো আরও অনেকেই হারিয়ে যাবেন, যদি সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষ এগিয়ে না আসে।
মনে রাখতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু একটি প্রাণনাশ হচ্ছে না- একটি গোটা পরিবার বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ছে, ঘটছে ব্যাপক সম্পদহানিও। বছর দুয়েক আগে ‘সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ’ (সিআইপিআরবি) নামের একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা প্রায় ৭ লাখ মানুষের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেছে, দেশে বছরে প্রায় ১২ হাজার ৮০০ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে। সেই হিসাব মোতাবেক সংস্থাটি যোগ-বিয়োগ করে বার্ষিক খতিয়ান বের করে দেখিয়েছে, দেশে বছরে ২০ হাজারের ওপরে মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন এবং পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। জরিপটির সঙ্গে সরকারি হিসাবের বিস্তর ফারাক থাকলেও সরকারি পরিসংখ্যানও বলছে, ১০ বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অপরদিকে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ) জানিয়েছে বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। ওই পরিসংখ্যানে জানা যায়, বছরে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। তারা জানিয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে প্রতি বছর ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা। অপরদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশে ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭২ হাজার ৭৪৮টি। এসব দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৫২ হাজার ৬৮৪।
আমরা উপরোক্ত পরিসংখ্যান নিয়ে কোনো বিতর্কে যাচ্ছি না। সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য সোচ্চার হতে বলছি কর্তৃপক্ষকে। যদিও তা সম্ভব নয়, তথাপি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে করণীয় দু’-একটি প্রস্তাব তুলে ধরছি তাই। প্রথমত, রাস্তায় যে গাড়িটিকে চলার অনুমতি দেয়া হবে সেটা একটি ভালো গাড়ি হতে হবে, যার অবশ্যই ফিটনেস রয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রশস্ত রাস্তা কিংবা ট্রাফিক সিস্টেম হতে হবে আধুনিক। তৃতীয়ত, চালককে হতে হবে সুশিক্ষিত। এই তৃতীয় শর্তটিই প্রথম শর্ত হওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা।
আমাদের দেশে অনেক শিক্ষিত যুবক বেকার দিনাতিপাত করছেন। আবার অনেক অর্ধশিক্ষিত যুবক রয়েছেন, যারা শহরে সিএনজি, ট্যাক্সিক্যাব কিংবা রিকশাও চালাচ্ছেন। আবার অনেক যুবক রয়েছেন যারা চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, খুন-অপহরণ, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, অথচ তারা লেখাপড়া জানেন। এ ধরনের হাজার নজিরের সাক্ষী আমরা। তাদের মাধ্যমেই কাজটি করা যেতে পারে, যদি ইচ্ছাটা থেকে থাকে কর্তৃপক্ষের। এসএসসি পাসের পর তুলনামূলক মেধাবী ছাত্রটি যেমন ভালো কলেজে কিংবা পলিটেকনিক্যালে পড়াশোনা করে, তেমনি অকৃতকার্য অথবা সি-গ্রেড বা ডি-গ্রেডপ্রাপ্ত ছাত্রের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করতে পারে সরকার। তার আগে অবশ্যই ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কার্যালয় স্থাপন করতে হবে এবং সেটি হতে হবে মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে যেসব ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সরকারি-বেসরকারি) রয়েছে সেগুলোর আধুনিকায়ন করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা ড্রাইভিং শিখতে উদ্বুদ্ধ হবে এবং প্রশিক্ষণ নিতেও স্বচ্ছন্দবোধ করবে। এতে করে লেখাপড়া থেকে ছিটকে পড়া যেমন রোধ হবে, তেমনি ছাত্রটি তার ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পাবে।
দেশে অনেক বেকার যুবক রয়েছে, যারা এসএসসি পাসের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য ধরনা দিয়েও একটি চাকরি জোটাতে পারছে না। তাদের বোঝাতে হবে, ড্রাইভিং পেশা ওইসব চাকরির চেয়ে কোনো অংশে খাটো নয়। সরকারি চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত চালক এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হতে পারে। পাশাপাশি সরকার যানবাহনের মালিকদের উদ্বুদ্ধ করবে সরকারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষিত চালক নিয়োগের ব্যাপারে। প্রয়োজনে সরকার প্রশিক্ষণার্থীদের রেজিস্ট্রিভুক্ত করে রাখবে। যানবাহনের মালিকরা তাদের চাহিদাপত্র পাঠিয়ে সেই চালকদের নিয়োগ দেবেন। পর্যায়ক্রমে এটি বাধ্যতামূলক করে দেবে সরকার, যাতে করে ইচ্ছে করলেও যানবাহনের মালিকরা অশিক্ষিত লোকের হাতে গাড়ি তুলে দিতে না পারেন। এটি তদারকি করবেন ট্রাফিক সার্জন, যিনি এখনও তদারক করছেন চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স সঠিক কি-না। আর তখন পরখ করবেন চালক সরকারিভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কি-না। এর পাশাপাশি ট্রাফিক হয়রানি রোধেও ভূমিকা নিতে হবে কর্তৃপক্ষকে। এতে করে ড্রাইভিং পেশায় দক্ষ চালকের সমাগম ঘটবে। পড়াশোনা শিখে ড্রাইভিং পেশায় নিয়োজিত হলে সে লোকটি আর কিছু না হোক মাতাল হয়ে আইনের তোয়াক্কা না করে গাড়ি চালাবে না, যা আমরা লক্ষ করি সরকারি অফিস-আদালতের গাড়ির চালকদের ক্ষেত্রে।
আশা করছি বিষয়টি নিয়ে ভাববে কর্তৃপক্ষ। এতে করে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে এবং গাড়ির চালক পেশার মর্যাদা বাড়বে। এককথায়, এটিকে সম্মানিত পেশায় নিয়ে আসতে হবে। এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা না গেলেও অনেকাংশেই রোধ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
আলম শাইন : প্রবন্ধকার
[email protected]
 

বাতায়ন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close