¦
মানুষের মতো মানুষ

আসিফ রশীদ | প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

কৈশোরে বরিস পলিভয়ের মানুষের মতো মানুষ বইটি পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছেন অনেকেই। সোভিয়েত বৈমানিক আলেক্সেই মেরেসিয়েভের জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ এটি। এ বৈমানিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার দুটি পা-ই হারিয়েছিলেন। তারপরও শত বাধা পেরিয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে পরিণত হয়েছিলেন সফল এক বৈমানিকে। অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলে অজেয়কে জয় করার উদাহরণ এ দেশেও মাঝে মাঝে দেখা যায়। অতি দরিদ্র পরিবারের কোনো শিক্ষার্থী যখন প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করে তখন সে গণমাধ্যমে খবর হয়। কিন্তু সত্যিকার মানুষের মতো মানুষ হতে পারে কজন?
কতগুলো বৈশিষ্ট্য মানুষকে অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। এর অন্যতম হল ইচ্ছাশক্তি, আবেগ-অনুভূতি, বিবেক-বুদ্ধি, সততা, সংযম, আদর্শ, ত্যাগ, দেশপ্রেম ইত্যাদি। এগুলো না থাকলে প্রাণিবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মানুষ আর অন্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য থাকত সামান্যই। বর্তমান পুঁজিবাদী-ভোগবাদী সমাজে মানুষের মধ্য থেকে এ বৈশিষ্ট্যগুলো ক্রমেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষের ইচ্ছাশক্তি যেসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, তার মূল লক্ষ্য থাকে সম্পদ অর্জন- সেটা সৎ পথেই হোক অথবা অসৎ পন্থায়। একসময় বাম রাজনৈতিক আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে শামিল হতে অনেকে নিজের সহায়-সম্পদ, স্বার্থ, আয়েশি জীবন ত্যাগ করতে দ্বিধা করেনি। সেই রাজনীতি এখন আর নেই। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে মানুষ ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছে। কোথায় সেই ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন? কোথায় সেই দেশপ্রেম? আর বিবেক? যে মানুষটিকে আপনি নীতিবান, বিবেকবান ভেবে মনের ভেতর শ্রদ্ধার উচ্চ আসনে স্থান দিয়েছেন, তার কর্মকাণ্ড দেখেই একসময় আপনার মনে হবে- মানুষ এমন মতলববাজও হতে পারে!
এই ভোগবাদী সমাজে সবকিছুই নির্ধারিত হয় অর্থমূল্যে। আমরা সম্পদকে পরিমাপ করতে শিখেছি বাজারমূল্য দিয়ে। যে বস্তুর বা গুণের বাজারমূল্য নেই, সেটা পুঁজিবাদী সমাজে কোনো সম্পদই নয়। কেউ বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ অর্জন করলে লোকে বলে আর্থিকভাবে সফল; আর লুণ্ঠন ও প্রতারণার মাধ্যমে সেই সম্পদ জোগাড় করলে তাকেও আজকের দিনে সফলই বলা হয়। সম্পদ জোগাড় করার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে খুব কম মানুষই প্রশ্ন তোলে। সম্পদ জোগাড় করার যে নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা সমাজে শুরু হয়েছে, এর মূলেই আছে ভোগবাদ। সমাজের অধিকাংশ মানুষ মনে করে, সম্পদ সম্মান আনে, সম্পদ উন্নত জীবন নিশ্চিত করে, সম্পদ মানুষের প্রতিভা বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।
সম্পদকে শুধু অর্থের মানদণ্ডে মূল্যায়ন করায় মানুষের অন্য গুণগুলো হয়ে পড়েছে মূল্যহীন। সমাজ থেকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য হয়েছে তিরোহিত; বিদায় নিয়েছে নীতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। প্রকৃত সৎ সমাজে সততার মূল্য অনেক। তবে মাফিয়া শাসিত সমাজে সততার তেমন মূল্য নেই। আমরা নৈতিকতার কথা বলি। কিন্তু নৈতিকতার মূল্য কত? এর কি কোনো বাজার আছে যে এ গুণের জন্য একটি মূল্য পাওয়া যাবে? আসলে সবকিছু বাজারমূল্যে পরিমাপ করা যায় না।
২.
নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন সম্পদের বিবরণী তৈরি করতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্থাবর-অস্থাবর কোনো সম্পদ নেই। কোনো জমিজমা, ব্যাংক ব্যালেন্স, এমনকি ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নেই। নেই কোনো ব্যবসা-বাণিজ্যও। তার সম্পদ বলতে রয়েছে মোটে তিনটি মোবাইল ফোন সেট, যার একটি আবার অকেজো। অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যার কিছুই নেই, তিনি তিন-তিনটি মোবাইল সেটের অধিকারী হলেন কীভাবে? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাকে একটি মোবাইল সেট উপহার দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে সুশীল কৈরালা কাঠমান্ডুতে একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। সেই বাড়ির ভাড়া পরিশোধ করত তার দল নেপাল কংগ্রেস। কারণ তিনি এ দলের সভাপতি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি চলাফেরা করতেন দলের একজন শুভাকাক্সক্ষীর গাড়িতে।
উরুগুয়ের সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হোসে মুজিকের কোনো পাকা দালান বাড়ি এবং বিলাস সামগ্রী নেই। সাদামাটা জীবনযাপন করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি রাষ্ট্রীয় ভবনে থাকতে অস্বীকৃতি জানান। রাজধানীর উপকণ্ঠে এক-বেডরুমের একটি ছোট আধাপাকা বাড়িতে সস্ত্রীক থাকেন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে বেতনের ৯০ ভাগ অর্থ সমাজের কল্যাণে দান করে দিয়েছেন। বিমানের ইকোনমি শ্রেণীতে ভ্রমণ করেন। সম্পদ বলতে ১৯৮৭ মডেলের একটি ভক্সওয়াগন বিটলস গাড়ি রয়েছে তার। প্রেসিডেন্ট থাকাবস্থায় তার নিরাপত্তার জন্য বাড়ির সংলগ্ন সড়কে মাত্র দুজন প্রহরী নিয়োজিত রেখেছিলেন। আর আছে ম্যানুয়েলা নামে একটি তিন পেয়ে কুকুর।
এ দুই রাষ্ট্রনায়কের অর্থসম্পদ বলতে বিশেষ কিছু না থাকলেও দুজনেই অনেক বড় একটি সম্পদের অধিকারী, যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না- তারা সৎ ও নির্লোভ। মানুষের মতো মানুষ বললে কল্পনায় এমন ব্যক্তির অবয়বই ভেসে ওঠে।
৩.
তলস্তয়ের হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান রিকয়্যার (একজন লোকের কতটুকু জমি প্রয়োজন) অনেকেই পড়েছেন। সংক্ষেপে গল্পটি এরকম : পাহোম নামে এক কৃষক মনে করত তার যদি অনেক জমি থাকত, তাহলে সে আরাম-আয়েশে জীবনটা পার করে দিতে পারত না শুধু, তার আর শয়তানকে ভয় করারও কোনো কারণ থাকত না। পাহোমের এ মনোভাব বুঝতে পেরে শয়তান ঠিক করল সে তাকে অনেক জমির মালিক হওয়ার সুযোগ করে দেবে, তারপর সব ছিনিয়ে নেবে। পাহোমের ভাগ্যে একের পর এক কম দামে জমি কেনার সুযোগ আসতে থাকল। অনেক জমির মালিক হল পাহোম। এরপর সে জানতে পারল, বাশকির গোষ্ঠীর সরলমনা মানুষের অনেক জমিজমা আছে। তখন সে বাশকিরদের কাছে গেল। বাশকিররা পাহোমের কাছে কম দামে জমি বিক্রি করতে রাজি হল, তবে এক শর্তে। তারা বলল, মাত্র এক হাজার রুবলে (রুশ মুদ্রা) বিশাল একটি এলাকা বিক্রি করতে রাজি আছে তারা। তবে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পাহোমকে সেই বিশাল এলাকার একপ্রান্ত থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে, তারপর সম্পূর্ণ এলাকা ঘুরে সূর্য ডোবার আগে সেই জায়গায় আবার ফিরে আসতে হবে। যদি সে পারে, তবে গোটা এলাকাটি তার হবে। আর না পারলে সে ওই জমি তো পাবেই না, নিজের টাকাও হারাবে। পাহোম ভাবল, তার জন্য এটা খুবই সহজ একটি কাজ। সে সানন্দে রাজি হয়ে গেল। তারপর সে কথামতো প্রত্যুষে যাত্রা শুরু করল। কিন্তু দিনের প্রায় শেষে এসে সে বুঝতে পারল, যে স্থান থেকে সে যাত্রা শুরু করেছে, তা এখনও অনেক দূরে। প্রাণপণ দৌড়ে অবশেষে ঠিক সূর্য অস্ত যাওয়ার মুহূর্তে সে সেখানে এসে পৌঁছাল ঠিকই; কিন্তু ঢোলে পড়ল মৃত্যুর কোলে। পাহোমের ভৃত্যরা তাকে ছয় ফুট দৈর্ঘের এক সাধারণ কবরে সমাহিত করল।
এ গল্পের মর্মবাণীটি খুব পরিষ্কার। অঢেল ধন-সম্পদ অর্জন করেও মানুষ তা চিরকাল ভোগ করতে পারে না। সুতরাং অর্থের পেছনে ছোটা অর্থহীন। আসলে অর্থ দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায় ঠিকই; কিন্তু সুখ কেনা যায় না। তাই হয়তো সুখের মাত্রার ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য। আসলে সেই মানুষের জীবনই সার্থক এবং সে-ই সুখী, যে ক্ষণিকের এই জীবনে অনেক বেশি অজেয়কে জয় করতে পারে, অনেক বেশি অজানাকে জানতে পারে এবং নিজের সম্পদ অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারে। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, নীতি, নৈতিকতা, সততা ও বিবেকই পারে মানুষকে সে পর্যায়ে নিয়ে যেতে।
আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক
[email protected]
বাতায়ন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close