¦
জনগণের আস্থা পরিমাপের মাধ্যম নির্বাচন

মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন | প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৫

জাতির প্রত্যাশা ছিল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলমান অশান্ত রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ তৈরি হবে। কিন্তু তাদের সেই প্রত্যাশায় গুড়েবালি পড়েছে, উপরস্তু সিটি নির্বাচন রাজনীতিকে আরও অনিশ্চয়তার গহ্বরে নিক্ষিপ্ত করেছে। দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে শংকা এবং উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপি ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল; কিন্তু দুঃখজনক হল, ভোটগ্রহণের ৪ ঘণ্টা আগেই কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, জাল ভোট প্রদানসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ এনে তারা নির্বাচন বর্জন করেছে। বর্জন করল অন্যান্য রাজনৈতিক দলও। তাদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় তিন সিটি নির্বাচনের পরের দিন দেশের সব জাতীয় দৈনিকের খবর পড়ে। এসব খবর বিশ্লেষণ করে মনে হয়েছে, নির্বাচন বর্জন করা ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিল না। সিটি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি হয়েছে। এবং তা হয়েছে আইন-শৃংখলা বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চোখের সামনে।
দলসমর্থিত প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে দিনের প্রথম ভাগেই তিন সিটির অধিকাংশ কেন্দ্র দখলে নেয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। মনে হয়েছে এ যেন নির্বাচন নয়, ভোট ডাকাতির মহোৎসব। বিরোধী পক্ষের সমর্থিত প্রার্থীদের বর্জনের ফলে নির্বাচনটি কার্যত অনেকটা একদলীয় নির্বাচনে পরিণত হয়। বাস্তবেও নির্বাচনটি একপেশে এবং একদলীয় নির্বাচনের মতোই মনে হয়েছে। কেননা নির্বাচনে মেয়র ও কমিশনার প্রার্থীর ছড়াছড়ি থাকলেও ভোট কেন্দ্রে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ছাড়া অন্যদের পোলিং এজেন্টের অস্তিত্ব তেমন একটা দেখা যায়নি। একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন এটিকে কোনোভাবেই বলা যাবে না। এ নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ-হতাশা প্রকাশ করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন বার্নিকাট। তিনি মঙ্গলবার বেলা ১১টায় বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের কাছে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সেখানে আরও প্রত্যক্ষ করেন, ২৫ মিনিটে ভোট পড়েছে মাত্র ৪টি। তিনি কেন্দ্রে সরকারি দলের এজেন্ট ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীর এজেন্ট দেখেননি। আর তাতেই নির্বাচনে অনিয়মের দিকটি স্পষ্ট হয়। আরও প্রতীয়মান হয়, এটি একটি বিতর্কিত ও একপেশে নির্বাচন।
এটি যে একটি তুঘলকি মার্কা নির্বাচন হবে, তা নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ধরপাকড়, পোলিং এজেন্টদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলার ঘটনায় নির্বাচনটা যে প্রহসনে পরিণত হবে তাও কার্যত আঁচ করা গিয়েছিল। তবে আশংকা যতটুকু ছিল- অনিয়মের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে তার চেয়েও বহু গণ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভিনব কায়দায় কেন্দ্র দখল করে প্রতিপক্ষের এজেন্টদের বের করে দিয়ে ইচ্ছামতো ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়েছে পুলিশের সহায়তায়। এর প্রতিবাদ করতে গেলে হামলা, বাধা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা, তাদের করা হয়েছে আহত; ভাংচুর করা হয়েছে ক্যামেরা, কেড়ে নেয়া হয়েছে মেমোরি কার্ড। সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেয়ার অর্থ হচ্ছে, সেখানে এমন কিছু ঘটছিল, যা প্রশ্নবিদ্ধ ও অন্যায়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বহু কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারার দৃশ্য সাংবাদিকদের নজরে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এসব ঘটনার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয়েছে।
আসলে আগের দিন রাতেই নির্বাচনে অনিয়ম ও শক্তি প্রয়োগের দিকটি অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। সোমবার মধ্যরাতে বিডিনিউজে খবর বের হয়, গুলশান ১৮নং ওয়ার্ডের কালাচাঁদপুর ভোট কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী আফরোজ সমর্থকরা অভিযোগ করে, সরকার সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থী জাকির হোসেন বাবুলের সমর্থকরা পুলিশের সহায়তায় কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারছে। এ নিয়ে উভয় প্রার্থীর মধ্যে শুরু হয় সংঘর্ষ। এখান থেকে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাসহ ১০ জন আফরোজ সমর্থককে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তখন ওই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ভোট চুরি ধরার কারণে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। এতে স্পষ্ট যে, পুলিশ নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব করেছে; তারা ক্ষমতাসীন দলের হয়ে কাজ করেছে। এটি আরও স্পষ্ট হয় নির্বাচনের দিন সকালে। ভোট কেন্দ্রে প্রবেশে নির্বাচন কমিশনের কোনো বাধা না থাকলেও পুলিশ সকালে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেয়। এ নিয়ে সাংবাদিকরা সোচ্চার হলে পুলিশ পিছু হটে। প্রশ্ন হল, সকালে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশে পুলিশ কেন বাধা দিল? এর তাৎপর্য কী? এটা কি অনিয়ম করতে ক্ষমতাসীন দলকে সুযোগ করে দেয়া নয়? আসলে অনিয়মের মূল খেলাটা ওই সময়ই হয়েছে। অবাধে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ভোট কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নিয়েছে এবং এমন প্রাচীর তৈরি করেছে, এ প্রাচীর ভেদ করা বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য শুধু কষ্টসাধ্যই নয়, রীতিমতো অসম্ভবও। বাস্তবেও তাই হয়েছে, বিএনপির নেতাকর্মীরা কেন্দ্রের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে, পুরো নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণটাই চলে গেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হাতে। আর এ কাজের প্রেক্ষাপটই তৈরি করে দিয়েছে পুলিশ। সেনা বাহিনী মোতায়েন থাকলে এটি করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। তাই প্রথমে সেনা মোতায়েন করেও পরে ক্ষমতাসীনদের চাপে নির্বাচন কমিশন পিছু হটে। অথাৎ পুরো ব্যাপারটিই একটি পরিকল্পিত ছকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।
দৃশ্যত যে কোনো নির্বাচন নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশন, সিভিল প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন, সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করলে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কিছুতেই আশা করা যায় না। নির্বাচন কমিশন, সিভিল প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনী ইচ্ছা করলে একটি নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি বা ফলাফল যে কোনো দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। তাদের ওপরই নির্ভর করে নির্বাচনের ভাগ্য। জনগণের প্রশ্নাতীত সমর্থন থাকার পরও এ তিন শক্তির পক্ষপাতিত্বের কারণে নির্বাচন থেকে বিএনপিকে সরে আসতে হয়েছে। তাদের নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু চলমান রাজনীতিতে এর একটা মারাত্মক প্রভাব যে পড়বে-এটি বলাই বাহুল্য। তাছাড়া তিন সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে, যার পরিণতি কোনোভাবেই রাষ্ট্রের জন্য সুখকর হবে না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক দল এবং জনগণের একটি আস্থা তৈরি হতো, যা বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে রাখতে পারত ইতিবাচক ভূমিকা। কিন্তু তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রমাণ হল, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারে না, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন, সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী যে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হল।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের পর বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর কার্যত অনাস্থা তৈরি হয়। এ অনাস্থা থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে ও উত্তপ্ত হয়। চলমান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে বিরোধী দল আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা নিয়ে তিন সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু তাদের সে আশায় কার্যত গুড়েবালি পড়েছে। এখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সমূহ আশংকা তৈরি হয়েছে। সিটি নির্বাচনে কারচুপি ও অনিয়ম করায় বিরোধী দলের প্রতি জনগণের সহানুভূতিও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিরোধী দলের নির্বাচন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তকে সঠিক এবং যথাযথ বলে জনগণ অভিহিত করেছে। কেননা নির্বাচন কমিশন, সিভিল প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনী নিরপেক্ষ না হলে শুধু জনগণের শক্তি বিজয় ঘরে তোলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিরোধী দলের নির্দলীয় সরকারের দাবিটিকেই আরও জোরালো করল। এর মাধ্যমে রাজনীতি এবং দেশ কার্যত অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে নিক্ষিপ্ত হল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য দেয়া একজন রাজনীতিকের প্রথম কাজ। জনগণ না চাইলে কোনো রাজনীতিক বা রাজনৈতিক দলের জোর করে ক্ষমতায় থাকা কোনোভাবেই উচিত নয়। জনগণ তাকে চায় কি-না, এটি পরিমাপ করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নির্বাচন। পৃথিবীর বহু দেশে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা অটুট আছে কি-না তা দেখার জন্য আগাম নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। এশিয়ার উন্নত দেশ জাপানে এর উদাহরণ রয়েছে। সেখানে জনমত যাচাইয়ের জন্য মাত্র ২ বছরে তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ারও ইতিহাস রয়েছে। তারা ইচ্ছা করলে জোর করে ক্ষমতায় থাকতে পারত। কিন্তু তারা সেটি করেননি। বাংলাদেশের রাজনীতিকরা কি এ থেকে শিক্ষা নিতে পারেন না?
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]
 

বাতায়ন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close