logo
জেল হত্যাকাণ্ড : নেতৃত্ব শূন্যতার ব্লুপ্রিন্ট
ড. আবু সাইয়িদ
তখন আমি ঢাকায়। সংসদ সদস্যদের খোঁজ করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমরা কিছু তরুণ সদস্য একমত হই। স্বনামধন্য অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক ও সৈয়দ হায়দার আলী এমপির বাসায় কয়েকটি বৈঠক হয়। সিদ্ধান্ত হয় খুনি মোশতাককে কোনোক্রমেই সাংবিধানিক সমর্থন দেয়া যাবে না। সে সময় বেগম সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে কীভাবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি বললেন, ইতিমধ্যে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন কাজ শুরু করেছে এবং খুনি মোশতাকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার বার্তা নিয়ে তারা এমপি হোস্টেলে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের একযোগে অনুরোধ করছে।২. দেশে সামরিক আইন বলবৎ। মিটিং, মিছিল, বিক্ষোভ এমনকি ঘরোয়া সভা-সমিতি করাও নিষিদ্ধ। প্রতিদিন বেতার ও টেলিভিশন এ কথাটি বারবার জানান দিচ্ছে। এর মধ্যেও সমমনাদের সংগঠিত করার কাজ এগিয়ে যায়। এদের মধ্যে সামনে এগিয়ে আসেন সিরাজুল ইসলাম, সিদ্দিক হোসেন, মোজাফফর হোসেন, হাসান আলী তালুকদার, সালাউদ্দিন ইউসুফ, আবদুল করিম ব্যাপারী, ড. এসএ মালেক, শামসুদ্দীন মোল্লা, মফিজুর রহমান খান কামাল, ময়েজউদ্দীন আহমেদ, অধ্যাপক আলী আশরাফ, মোশতাক আহমেদ, রাশেদ মোশাররফ প্রমুখ। সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে আমরা পালাক্রমে পার্লামেন্টে যাই। লক্ষ্য- সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ। পরিকল্পনা মোতাবেক খুনি মোশতাক চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার বিষয়ে ক্যাফেটেরিয়ায় আলোচনা হয়। দিনাজপুরের আবদুর রহিম, আবদুর রউফ চৌধুরী, কুড়িগ্রামের শামসুল হক চৌধুরী, গাইবান্ধার লুৎফর রহমান, বগুড়ার মোস্তাফিজুর রহমান পটল, নওগাঁর ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক, রাজশাহীর সরদার আমজাদ হোসেন, সিরাজগঞ্জের রওশনুল হক মতি মিয়া, দবির উদ্দিন আহমেদ, পাবনার আহমেদ তফিজ উদ্দিন, মোজাম্মেল হক সমাজী, মহিউদ্দিন আহমেদ, নড়াইলের এখলাস উদ্দিন আহমেদ, পটুয়াখালীর আবদুল আজিজ খন্দকার, টাঙ্গাইলের হাতেম আলী তালুকদার, অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান খান, ফজলুর রহমান খান ফারুক, হুমায়ুন খালিদ, জামালপুরের আবদুল হাকিম, ময়মনসিংহের নজরুল ইসলাম, রফিকুদ্দীন ভূইয়া, মানিকগঞ্জের সাইদুর রহমান, ডা. আবুল খায়ের, ঢাকার আনোয়ার জঙ্গ তালুকদার, বোরহান উদ্দিন গগন, নরসিংদীর মোসলেম উদ্দীন ভূঁইয়া, ফরিদপুরের নুরুল কাদির জুনু, আসমত আলী খান, ইমাম উদ্দিন আহমেদ, ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী, শরীয়তপুরের হাফিজুর রহমান খান, হবিগঞ্জের জনাব আলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলী আজম, চট্টগ্রামের নূর আলম চৌধুরী, আবদুল ওয়াহাব, ওসমান সারোয়ার আলম চৌধুরী, মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, নোয়াখালীর এবিএম তালেব আলী, প্রফেসর মোহাম্মদ হানিফ, শাহজাহান কামাল- এদের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় সবাই একমত পোষণ করেন যে, নিষ্ক্রিয় থাকলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব ও বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে ফেলা হবে।৩. এর মধ্যে কিছু সদস্য আলোচনা সম্পর্কে চিফ হুইপদের অবগত করেন। পার্লামেন্টের করিডোরে হুইপ আবদুর রউফ কঠোর ভাষায় সামরিক শাসন ও খুনি মোশতাকের বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডের পরিণতি কী হতে পারে তা হুশিয়ারের ভাষায় বলেন। পার্লামেন্ট থেকে বের হওয়ার পথে আমার সঙ্গে মোস্তাফিজুর রহমান পটল, হাসান আলী তালুকদার, আবদুল করিম ব্যাপারী, তফিজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন। এর মধ্যে চিফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন আমাদের বলেন, আপনারা যা করছেন তা সামরিক আইনবিরোধী, আমি এক্ষুণি আপনাদের অ্যারেস্ট করাতে পারি, সাবধান হয়ে যান, এ পথে এগোবেন না। তিনি ধমকের সঙ্গে কথাগুলো বলেন। আমরা এর উত্তরে বললাম, আমরা এখনও সংসদ সদস্য, আমাদের আবার কী করবেন? তিনি বলেন, তোমাদের দেখে নেব। হুইপ মোহাম্মদ হানিফ নীরবে আমাদের সমর্থন দেন।৪. বঙ্গভবন। ১৬ অক্টোবর। খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদ সংসদ সদস্যদের ডেকেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ অক্টোবর আমরা তেজগাঁওয়ের এমপি হোস্টেলে এক বৈঠকে বসি। আহূত বৈঠকে যোগদান করা না করা নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। ১৬ অক্টোবর সকালে এমপি হোস্টেলে সংসদ সদস্যরা আবার বৈঠকে বসেন। বৈঠকে যারা প্রবীণ তাদের কথা বলার কথা। কিন্তু কেউ বলছে না দেখে সরদার আমজাদ হোসেন ও ময়েজউদ্দীন আহমেদ প্রস্তাব করেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান জানানোর জন্য এক মিনিট নীরবতা ও তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করতে হবে। আমরা সমস্বরে তা সমর্থন করি। এবং আমাদের প্রস্তাবে যারা দ্যোদুল্যমান ছিল তারাও মুখ খোলেন। সেখানে ময়েজউদ্দীন, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, মোজাফফর হোসেন, হাসান আলী, করিম ব্যাপারীসহ অনেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অঙ্গীকারের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। চারদিকে স্লোগান ওঠে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই’। আমাদের আগ্রাসী স্লোগান ও বক্তব্যের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল থাকার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। বিচিত্র ও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল থাকার শপথ ঘোষণার পর মুহূর্তেই কিছু সংসদ সদস্য এ শর্তে যোগদানের অঙ্গীকার করেন যে, তারা জাতির পিতাকে কেন, কারা হত্যা করেছে এবং সংবিধান বহাল থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সামরিক আইন জারি ও খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তা জানা দরকার। এ সময় অধ্যাপক ইউসুফ আলী বলেন, আমরা সবাই বঙ্গভবনে গিয়ে এ প্রশ্ন করি। প্রশ্ন করার ও বক্তব্য রাখার অধিকার সবাই পাবেন এ আশ্বাস আমি দিতে পারি।৫. জাতির পিতাকে হত্যা করার পর থেকেই অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক এ প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। আমরা তরুণ সংসদ সদস্যরা সিরাজুল হকের সঙ্গে খুনি মোশতাকের সামনে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য অনুরোধ করি। তিনি সম্মতি দেন। বঙ্গভবনে দরবার হলের বৈঠকের চারদিকে খুনিরা অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়েছিল। অনুষ্ঠান শুরু হয়। খন্দকার মোশতাক এসে বসেন। তিনি বলেন, আপনারা খোলামেলা কথা বলতে পারেন। এ সুযোগে প্রথমেই অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদকে উদ্দেশ করে বলেন, যেহেতু আপনি বৈধভাবে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হননি, সেহেতু আমার বক্তৃতায় আমি আপনাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সম্বোধন না করে, প্রিয় মোশতাক ভাই হিসেবে সম্বোধন করতে চাই। অন্য বক্তারাও তাদের বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। অবস্থা বেগতিক দেখে তাড়াহুড়ো করে বৈঠক শেষ করা হয়। বৈঠকের একদিন পর সরকারি পত্রিকা বাংলাদেশ টাইমস জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়ার দাবি জানায়। এর পেছনে ছিল টাইমসের এনায়েতুল্লাহ খান।৬. সংসদ সদস্যদের ওই দিনের কর্মকাণ্ড চারটি শক্তি বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করে। ক. খুনি চক্র, খ. ক্যান্টনমেন্টে খুনিদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যারা উদ্যেগী, গ. উগ্র বামপন্থী ও জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং ঘ. খুনি চক্রের পেছনে জাতীয়-আন্তর্জাতিক শক্তি।৭. খুনি চক্রের পরিকল্পনা ছিল নেতৃত্ব শূন্য করা। সেই লক্ষ্যে ৩ নভেম্বর গভীর রাতে খুনি মেজর চক্রের একটি দল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর প্রবেশ করতে চাইলে জেলার তাদের ঢুকতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। খবর পেয়ে কারাগারগুলোর ইন্সপেক্টর জেনারেলও আইনগত বিধিনিষেধ উল্লেখ করে একইভাবে তাদের কারাগারের ভেতরে প্রবেশে বাধা প্রদান করেন। একপর্যায়ে জেলের পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে জেলরক্ষীরা জোর করে কারাগারে প্রবেশেচ্ছু খুনি মেজর চক্রের ওই দলকে প্রতিহত করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তখন খুনি মেজর চক্রের ওই দলটি জেলারকে জানায়, স্বয়ং রাষ্ট্রপতির নির্দেশে তারা এখানে এসেছে কিছু রাজবন্দিদের সঙ্গে কথাবার্তা ও আলাপ-আলোচনা করার জন্য। এ পর্যায়ে জেলার বঙ্গভবনে ফোন করেন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য। তখন খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদ লাল টেলিফোনে জেলারকে নির্দেশ দেন, ‘তারা যা চায় তা করতে দিন’। তাদের কারাগারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে জেলার জানতে চাইলে খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদ বলেন, হ্যাঁ, আমি তাদের এ ব্যাপারে অনুমতি প্রদান করেছি’ বলেই ফোনের রিসিভারটি রেখে দেন। তারপর খুনি মেজর চক্রের ওই দলটি কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে। কারাগারের বিভিন্ন কক্ষ থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামানকে এনে একটি কক্ষে বন্ধ করে ব্রাশ ফায়ার এবং বেয়নেটে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। পাল্টা আঘাত হানার এ হত্যাকাণ্ডের ব্লুপ্রিন্ট আগে থেকেই রচনা করে। জেল হত্যাকাণ্ড খুনিরা সহজেই করতে পেরেছে এ কারণে যে, তখন পর্যন্ত বঙ্গভবন, রমনা পার্ক হয়ে পুরান ঢাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।৮. খালেদ মোশাররফ, শাফায়েত জামিল ৩ নভেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে অভ্যুত্থানের কর্মতৎপরতা শুরু করে। সূর্যোদয়ের আগে ফার্মগেট এলাকায় ব্যারিকেড দেয়। বিমানবাহিনীর ঘাঁটি দখল করে। অপর ব্যাটালিয়ন সেনাপ্রধান জিয়াকে অন্তরীণ করে। অভ্যুত্থান সফল হলে জিয়া বিনা বাক্যে স্বহস্তে তার পদত্যাগপত্র ব্রিগেডিয়ার রউফের হাতে তুলে দেন। ফলে অভ্যুত্থান প্রক্রিয়া বেগবান হয়ে ওঠে।৯. তারপর শুরু হয় ষড়যন্ত্রের খেলা। ব্রিগেডিয়ার খালেদের রক্তপাতের ইচ্ছে ছিল না সে জন্য তিনি সমঝোতা আলোচনার ট্র্যাপে পা দিয়ে ৪৮ ঘণ্টা সময়ক্ষেপণ করেন। খালেদ মোশাররফ চাচ্ছিলেন মোশতাক তাকে সেনাপ্রধানের পদে নিযুক্ত করবেন আর মোশতাক চাচ্ছিলেন তার অনুসারীসহ দেশ ত্যাগের নিশ্চয়তা। না হলে তিনি খালেদকে সেনাপ্রধান করবেন না। তখন বাধ্য হয়ে স্কোয়াড্রন লিডার লেয়াকত ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আলম বঙ্গভবনে ও ট্যাংকে বিমান আক্রমণে অগ্রসর হলেন।১০. ৩ নভেম্বর ভোররাতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ খুনিদের আত্মসমর্পণ ও তাদের নিয়ন্ত্রণে ৩০টি ট্যাংক ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলে তারা তা অমান্য করে। এ পর্যায়ে একটি জিপে সাদা পতাকা উড়িয়ে ক্যান্টনমেন্টে হাজির হন জেনারেল (অব.) এমএজি ওসমানী। তিনি খালেদ মোশাররফকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে পাওয়ার প্রস্তাব দেন। সারা দিন অতিবাহিত হয় ওই আলাপ-আলোচনায়। নিরাপদে বাংলাদেশের বাইরে যাওয়ার শর্তে খুনি মেজর চক্রটি আত্মসমর্পণে সম্মত হয়। অতঃপর ৩ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে ১৭ জন খুনির মেজর চক্রটি যখন এয়ারপোর্ট থেকে রওনা হয় তখন এয়ারপোর্ট ম্যানেজার আমার মামাতো ভাই আজিজুর রহমান টেলিফোনে আমাকে জানান, এভাবে তাদের যেতে দেয়ার পরিণতি ভালো হবে বলে মনে হয় না। এখানে একটি রহস্য থেকে যায়, খালেদ মোশাররফ যেখানে খুনি চক্রকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছেন তখন মেজর নাসির তাকে সব ঘটনার পূর্বাপর বিষয়ে টেলিভিশনে ভাষণ দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। জেনারেল খালেদ বলেন, আমি রাজনীতিবিদ নই, আমি কেন ভাষণ দেব? ভারতীয় সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জেএন দীক্ষিত তার ‘লিবারেশন অ্যান্ড বিয়োন্ড ইন্দো-বাংলাদেশ রিলেশনস’ বইয়ের ২৩৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকায় অবস্থিত রাষ্ট্রদূত ডেভিড. টি বোস্টার খুনিদের ব্যাংককে নিরাপদে পাঠানো ও সমঝোতার ব্যাপারে উদ্যোগী হন। কালক্ষেপণ করেন এবং পরবর্তী পাল্টা অবস্থা সৃষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তার তৎপরতা অব্যাহত থাকে। বোস্টার খুনিদের থাইল্যান্ড পাঠান এবং রাজনৈতিক আশ্রয় পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ব্যবস্থা করে দেন। একই সঙ্গে লিবিয়ার কর্নেল গাদ্দাফি খুনি রশিদ ও ফারুককে আশ্রয় ও চাকরি প্রদান করেন।১১. খুনিরা দেশ ত্যাগের পর খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনে উপস্থিত হন এবং তাকে সেনাপ্রধান করার দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু মোশতাক চতুরতার সঙ্গে তার দাবিটি নিয়ে দু’দিন সময়ক্ষেপণ করেন। একপর্যায়ে মেজর সাফায়েত জামিল বঙ্গভবনে এসে অস্ত্রের মুখে খালেদকে সেনাপ্রধান করতে মোশতাককে বাধ্য করেন। এ সময় পুলিশের ডিআইজি ইএ চৌধুরী তাকে জেলহত্যার বিষয়টি জানান। এবং বিডিয়ারের প্রধান মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান ওই একই কথা বললে সাফায়েত জামিল তাকে অ্যারেস্ট করেন। ইতিমধ্যে রেডিও-টিভি বন্ধ থাকায় সারা দেশে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, ভারতীয় চক্রান্তে ব্রিগেডিয়ার খালেদ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, এমনকি এই কথাগুলো বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা থেকেও প্রচার করা হয়। ফলে প্রকৃত ঘটনা দেশের মানুষের অজ্ঞাত থাকে। বিভ্রান্ত ছড়িয়ে পড়ে, দেশবাসী আতংকিত। আরও গুজব ছড়ায় কয়েকজন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য ধরা পড়েছে। সীমান্তে ভারত সৈন্য মোতায়েন করেছে। গৃহযুদ্ধ আসন্ন।১২. ৪ তারিখ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামানের লাশ ময়নাতদন্তের পর বিকালে তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এম মনসুর আলীর ধানমণ্ডির বাসায় সংসদের স্পিকার আবদুল মালেক উকিল, সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান, সৈয়দ হায়দার আলী, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, ড. এসএ মালেক, টাঙ্গাইলের ফজলুল হক, বজলুর রহমান, হাসান আলী তালুকদার ও ছাত্র নেতা ইসমত কাদীর গামা, বাবলু, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দাবি তোলা হয় শহীদদের এ লাশগুলো তিন নেতার মাজারের কাছে দাফন করা হবে। এ ব্যাপারে জায়গা দেখার জন্য মহিউদ্দিন আহমেদ, আনোয়ার চৌধুরী, টাঙ্গাইলের ফজলুল হক, ছাত্র নেতা ইসমত কাদীর গামা প্রমুখ সেখানে কবর খুঁড়তে গেলে সামরিক বাহিনীর লোকরা এসে তাদের ওই স্থান থেকে তাড়িয়ে দেয়। শহীদ মনসুর আলীর বাড়ি থেকে স্পিকার আবদুল মালেক উকিল খালেদ মোশাররফ বরাবর টেলিফোন করেও তাকে পাননি। পরবর্তী সময় ডিআইজিকে টেলিফোন করে এ কথা বললে তিনি বলেন, তাদের লাশ বনানীতে কবরস্থ করা হবে। ৫ নভেম্বর বায়তুল মোকাররমে শহীদ চার নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। বিপুলসংখ্যক লোক জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। এ জানাজায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও চার নেতার হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে একটি বড় আকারের লিফলেট বিলি করা হয়।১৩. জেল হত্যাকাণ্ডের এ দিবসে আমাদের আত্মবিশ্লেষণ করতে হবে, যে মহৎ আদর্শ ও স্বপ্ন নিয়ে আপসহীন সাহসিকতার দুর্জয় মানসিকতা নিয়ে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জাতির পিতা ও জাতীয় নেতারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, বর্তমান বৈরী অবস্থার মোকাবেলায় চাই সেই সাহস, চাই দৃঢ় মানসিকতা, আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা এবং আপসহীন লড়াইয়ের জন্য আত্মত্যাগের অঙ্গীকার।ড. আবু সাইয়িদ : সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০