jugantor
ডিসেম্বরের কল্পনাবিলাস

  মাহবুব কামাল  

১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

ডিসেম্বরের দিনগুলোয় পণ্ডিতজনের ভাবনার সঙ্গে একজন গ্রামীণ সাধারণ মানুষের চিন্তাগুলো কি মিলে যায় কাঁটায় কাঁটায়? মনে হয় হুবহু মেলে না। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক, দার্শনিক ইত্যাদি কোনো ভঙ্গি থাকে না। ফলে কোনো ঘটনাকে উপলব্ধি করার সময় সেকেলে বৃদ্ধার কনে দেখার মতো ঘটনাটিকে হাঁটতে বলে পা দেখা, চুল ছাড়তে বলে চুলের দৈর্ঘ্য মাপা কিংবা পায়ের গোড়ালি দেখে সম্ভ্রম বোঝার মতো খুঁতখুঁতে নন তারা। ঘটনাটির মুখাবয়বই দেখেন তারা এবং দেখে সন্তুষ্ট অথবা অসন্তুষ্ট হন। ভাষাজ্ঞান সীমিত হওয়ায় উপলব্ধিটুকুও পণ্ডিতজনের মতো সাহিত্যের প্রসাধনী মেখে প্রকাশ করতে পারেন না। শুধু বলে দেন- হ্যাঁ কিংবা না। এই সূত্র ধরেই ভৌগোলিক বিজয়ের মাস এই ডিসেম্বরে একজন সাধারণ মানুষকে যদি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মন্তব্য করতে বলা হয়, আমি নিশ্চিত তিনি বীর উত্তম-বীর বিক্রম-বীর প্রতীকদের মতো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্মৃতিচারণে মুক্তিযুদ্ধে তার দুঃখ-বেদনা, ভয়-ভীতি, সাহস-উদ্যম ইত্যাদিকে সুখশ্রাব্য করে তুলতে পারবেন না; সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী কেন উপস্থিত ছিলেন না অথবা মুক্তিযুদ্ধ একটি রাজনৈতিক জনযুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সর্বোচ্চ ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবটি কেন শুধু সামরিক বাহিনীর শহীদ সদস্যদের জন্যই বরাদ্দ করা হল কিংবা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী বিশ্বস্ত তাজউদ্দীনকে যুদ্ধশেষে বঙ্গবন্ধু কেন দূরে ঠেলে দিয়ে সন্দেহভাজন খন্দকার মোশতাককেই কাছে টেনেছিলেন- ইত্যাকার কঠিন প্রশ্নে তিনি শ্রোতাকে ভারাক্রান্ত করবেন না। দুর্ধর্ষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জিঘাংসা থেকে রক্ষা পেয়েও স্বাধীনতার মাত্র ১০-১১ বছরের মাথায় কার পাপে, কোন্ অভিসন্ধির কারণে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চার মূল নেতৃত্ব এবং জিয়া-খালেদ মোশাররফ-তাহের-হায়দার-মঞ্জুরসহ বাঘা বাঘা সেনা নেতৃত্ব প্রকৃতির ইচ্ছায় মারা না গিয়ে বাঙালির ইচ্ছায়ই প্রাণ হারালেন- এসব বিষয় তার হৃদয় স্পর্শ করবে বটে; কিন্তু সেই কাহিনী তিনি সবিস্তারে বলতে পারবেন না, খেই হারিয়ে ফেলবেন বারবার এবং পূর্বাপর মিল হারিয়ে নিজেই হারিয়ে যাবেন চোরাগলিতে। ভারত আমাদের শত্রু, না বন্ধু- সাক্ষ্য-প্রমাণাদি হাজির করে কোনোটাই প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না তিনি, এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির নব পর্যায়ের উত্থানের পেছনের গল্পটাও ঠিকঠাক জানা নেই তার। তিনি শুধু জানেন, ’৭১-এর এই দিনগুলোয় তিনি মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন।

আমি কি সাধারণ মানুষের পর্যায়ে পড়ি? আমি সাধারণ, তবে সাংবাদিক বলে সমাজের অগ্রবর্তী শ্রেণীর সদস্যও বটে। এখন যা বলতে থাকব, সেগুলো আমার সাংবাদিক সত্তারই উপলব্ধি।

এ যাবতকালের বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে যদি ১০০ ধরা যায়, তাহলে তার ২০ ভাগ অর্জিত হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে, বাকি ৮০ ভাগই গত একশ’ বছরে। এই সাদৃশ্যে বাঙালি সমাজের হাজার বছরের ঘটনাবলী যা, স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৪ বছরের ঘটনাপ্রবাহ তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি বিচিত্র, অনেক অনেক বেশি নাটকীয়, অনেক অনেক বেশি কাহিনীতে ভরপুর। বস্তুত স্বাধীনতার পর সময়ের চেয়ে দ্রুত গতিতে ঘটেছে পরিবর্তন আর চক্রবৃদ্ধি হারের সুদের মতো লাফানো ঘটনার ঘনঘটায় বয়স্করা এখন আর পঞ্চাশ বছর আগের শান্ত-সুস্থির বাঙালি সমাজের সঙ্গে বর্তমানেরটা মেলাতে পারছেন না কিছুতেই। তবে কি মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দিয়েছে শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা আর কিছুটা অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য? বাকি সবই নিয়েছে কেড়ে?

পাঠক দেখুন, এই ৪৪ বছরে গড়ে প্রতি তিন বছরে একবার করে সংশোধিত হয়েছে সংবিধান, জন্ম নিয়েছে শতাধিক রাজনৈতিক দল, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সত্তর জন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও দেখতে হয়েছে আমাদের। এই সময়ে দু’জন রাষ্ট্রপ্রধান নিহত হয়েছেন নির্মমভাবে, একজন ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন গণঅভ্যুত্থানে, একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে ঠেকাতে হয়েছিল কমবেশি ২২টি সেনা-অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কত হয়েছে হিসাব দেয়া মুশকিল, তবে ঢাকা এখন আর মসজিদ কিংবা রিকশার শহর নয়, এটা পরিণত হয়েছে মিছিল-জনসভার শহরে। এই শহরেই আবার জনসভায় গ্রেনেড বিস্ফোরণ এবং সাপ ছেড়ে দেয়ার মতো কল্পনাতীত ঘটনাও দেখতে হয়েছে আমাদের। কল্পনাতীতেরও অতীত, দেখতে হয়েছে জেলের অভ্যন্তরে হত্যা। আবার কী অসম্ভব বৈপরীত্য লক্ষ করুন। আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও মত প্রকাশের জন্য শিশু যেমন কাগজ-কলম হাতে পেলেই আঁকিবুকিতে ভরিয়ে ফেলে কাগজ, তেমন দু’-চারজন একত্র হয়েই কাগজে-কলমে বানিয়ে ফেলছে রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি; অন্যদিকে এই মত প্রকাশের দায়েই হত্যা করা হয়েছে বেশ কিছু চিন্তাশীল ব্যক্তিকে। এই ৪৪ বছরে সেনাসরকার দেখেছি যেমন, দেখেছি পিকিউলিয়ার ধরনের সেনা-সমর্থিত সরকারও। দেখেছি ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে তিন মাস ধরে নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে অঙ্গার করার অদ্ভুত, মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ।

কথাটা দেশদ্রোহিতার শামিল হবে কি-না জানি না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, লাখো শহীদের আত্মত্যাগ ইত্যাদি রুটিন কথাবার্তা আমার মধ্যে বাড়তি কোনো ব্যঞ্জনাই সৃষ্টি করতে পারে না আর, অথচ এসব প্রেরণা কোনোদিনই নষ্ট হওয়ার কথা ছিল না। আওয়ামী লীগের একজন নেতা যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন প্রকারান্তরে তাকেই বা তার দলকে ভোট দেয়ার ইঙ্গিত করে অথবা বিএনপির একজন নেতা যখন মুক্তিযুদ্ধের কমপক্ষে একটি চেতনাও ধারণ না করে ১৬ ডিসেম্বর সাভার স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে আসেন, তখন মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র দর্শনটিই আমার কাছে খেলো হয়ে যায়। অনেকে হয়তো বলবেন, মুক্তিযুদ্ধের কী দোষ? আরও বলবেন, দোষ তো ধর্ষকের, ধর্ষিতার দোষ ধরছেন কেন? একথা মেনে নিয়েও বলি- মুক্তিযুদ্ধ একটি চমৎকার, স্বচ্ছ ঘাট-বাঁধানো সরোবর, সময়ে সময়ে চিন্তার বিশুদ্ধতা ও কর্মের প্রেরণার উদ্দেশ্যে কোটি কোটি মানুষের সেই সরোবরে অবগাহন করার কথা ছিল; আজ কিছু মানুষ সেখানে ত্যাগ করছে মল-মূত্র- ইচ্ছে হয় না আর নেয়ে ওঠার। তারচেয়ে কিছুক্ষণ কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠলে কেমন হয়?

হ্যাঁ, এই ডিসেম্বরে বেশ কিছু হাইপোথিসিস জেগে উঠছে মনে। প্রথমটি এমন, আচ্ছা ’৭১-এর রক্তস্রাবী দিনগুলোয় আমিও তো একাধিকবার সার্কাস দলের দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার মতো ভূপাতিত হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলাম। তো আমাকে যদি মেরে ফেলা হতো, এখন যে লাখো শহীদের রক্তের কথা বলা হয়, সেই রক্তের সঙ্গে আমার রক্তও যোগ হতো এবং যেভাবে বলা হয়- আমার রক্তও আপাতত বৃথাই থাকত। সেই রক্তদান কবে সার্থক হবে আমি নিশ্চয়ই জানতে পারতাম না, যেমন জানতে পারতাম না ১৬ ডিসেম্বর সাভারের স্মৃতিসৌধে অনেকের সঙ্গে আমার উদ্দেশ্যেও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করছে দেশবাসী। কল্পনাবিলাসটি হল, কোনটি ভাগ্যের কথা- শহীদের মর্যাদার সেই পুষ্পার্ঘ্য গ্রহণ, নাকি আজ অবদি বেঁচে থেকে দীর্ঘ ৪৪ বছর যে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করলাম- সেটা। কম তো উপভোগ করিনি- শচীনের ক্রিকেট, ম্যারাডোনার ফুটবল, এ আর রহমানের মিউজিক, কারিনার নাচ, বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গ, নেলসন ম্যান্ডেলার বিজয়, ওবামার বক্তৃতা, আরও কত কী!

দ্বিতীয় হাইপোথিসিসটি বেশ ভাবাচ্ছে- বঙ্গবন্ধু যদি জন্ম না নিতেন অথবা জন্ম নিলেও যদি রাজনীতিতে প্রকাশ না করতেন আগ্রহ, ’৭১ খ্রিস্টাব্দটিকেই কি আমরা পেতাম বিজয়ের বছর হিসেবে? অনেককে তত্ত্বকথা বলতে শুনি- শূন্যস্থান বলে কিছু থাকে না, কেউ না কেউ, কিছু না কিছু শূন্যস্থান দখল করবেই নাকি! কথাটা বিজ্ঞানসম্মত মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথ না জন্মালে আর কি কেউ দখল করতে পারতেন তার জায়গা? অথবা রবীন্দ্রনাথই কি বলে যেতে পেরেছেন আমাদের হৃদয়ের সব কথা? আমরা যা পেয়েছি তা অনেক, যা পাইনি তা আরও অনেক। এই শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। শূন্যতা বলে যদি কিছু না-ই থাকে, তাহলে যা হওয়া স্বাভাবিক ছিল- মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি মনমাতানো উপন্যাস, কী একটা ভালো সিনেমা- আমরা পাচ্ছি না কেন? এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসছেন না কেন কেউ? আমি নিশ্চিত, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে ’৭১ খ্রিস্টাব্দটি বিজয়ের বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে পারত না। হতে পারত সেই বিজয়ের বছর ’৮১, ’৯১ অথবা ২০০১ কিংবা তারও পর। অথচ এই ব্যক্তিটিকে নিয়ে কতই না উপহাস দেখতে হয়েছে আমাদের!

তৃতীয় কল্পনাটি হচ্ছে, এখন থেকে দুইশ’ কী পাঁচশ’ বছর পর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরিবর্তিত সংস্করণটি কেমন হবে? অক্টোবর বিপ্লবের মহিমা, মহানত্ব ফুরিয়ে গেছে ৭০ বছরের মাথায়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ফুরিয়ে যেতে কতদিন লাগবে? আবার ধরুন, ইতিহাসের বড় বড় ঘটনার ক্ষেত্রে যেমনটা হয়, সময়ের তালে তালে সেই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছোট ছোট চরিত্র ও উপঘটনাসমূহ ফিকে হতে হতে একসময় শুধু মূল দু’-একটি চরিত্র এবং ঘটনার মর্মবস্তুটিই থাকে জনগণের কাছে, বাকিটা চলে যায় গবেষকদের টেবিলে। আবার দূর অতীতের কোনো বড় ঘটনা যে গবেষকদের কাছে অবিকল উঠে আসে তা-ও নয়, কখনও কখনও বাদ পড়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, প্রবেশ করানো হয় কাল্পনিক উপঘটনা। ‘বিষাদ সিন্ধু’ নামের দীর্ঘ পুস্তকটিতে আমরা কারবালার যে মর্মন্তুদ কাহিনী পড়ি, তা পড়ার সময় রবীন্দ্রনাথের সেই কথাই মনে পড়ে যায়- ঘটে যা তা সব সত্য নহে, সেই সত্য যা রচিবে তুমি। রামায়ণ রচনার সময় বাল্মিকী শুধু জানতেন রাম হচ্ছে অযোধ্যার অধিপতি দশরথের পুত্র, আর কিছুই জানতেন না তিনি। অথচ তিনি লিখে ফেলেছেন মহাকাব্য এক। আবার দীর্ঘ সময় পর ইতিহাসের কোনো ঘটনার একেবারে মর্মবস্তুটিও আলাদাভাবে দেখা দেয় আলাদা আলাদা মানুষের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭০ বছর পর এখন অনেকে হিটলারকে দেখেন আদর্শ জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে, আবার কারও চোখে তিনি মানবতাবিরোধী ফ্যাসিস্ট। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দীর আওতায় রয়েছি, তারা শত অপপ্রচার সত্ত্বেও মোটামুটি এই যুদ্ধের সত্যটা ধরতে পারছি, যুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য চরিত্রের ভূমিকাগুলোও স্পষ্ট এখনও। কিন্তু এমন দিন হয়তো আসবে, যেদিন হারিয়ে যাবে সব, গবেষক-অনুসন্ধিৎসুদের বাইরে ব্যাপক জনতার কাছে থাকবে নাম কয়েকটি মাত্র- শেখ মুজিব, আয়ুব, ইয়াহিয়া। কেমন হবে তখন বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি? অথবা উপরের নামগুলোর সঙ্গে যুক্ত হবে কি জিয়াউর রহমানের নামও এবং সেই নাম ছাড়িয়ে যাবে বঙ্গবন্ধুকেও? না, না তা কেমন করে হয়!

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

mahbubkamal08@yahoo.com



সাবমিট

ডিসেম্বরের কল্পনাবিলাস

 মাহবুব কামাল 
১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 
ডিসেম্বরের দিনগুলোয় পণ্ডিতজনের ভাবনার সঙ্গে একজন গ্রামীণ সাধারণ মানুষের চিন্তাগুলো কি মিলে যায় কাঁটায় কাঁটায়? মনে হয় হুবহু মেলে না। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক, দার্শনিক ইত্যাদি কোনো ভঙ্গি থাকে না। ফলে কোনো ঘটনাকে উপলব্ধি করার সময় সেকেলে বৃদ্ধার কনে দেখার মতো ঘটনাটিকে হাঁটতে বলে পা দেখা, চুল ছাড়তে বলে চুলের দৈর্ঘ্য মাপা কিংবা পায়ের গোড়ালি দেখে সম্ভ্রম বোঝার মতো খুঁতখুঁতে নন তারা। ঘটনাটির মুখাবয়বই দেখেন তারা এবং দেখে সন্তুষ্ট অথবা অসন্তুষ্ট হন। ভাষাজ্ঞান সীমিত হওয়ায় উপলব্ধিটুকুও পণ্ডিতজনের মতো সাহিত্যের প্রসাধনী মেখে প্রকাশ করতে পারেন না। শুধু বলে দেন- হ্যাঁ কিংবা না। এই সূত্র ধরেই ভৌগোলিক বিজয়ের মাস এই ডিসেম্বরে একজন সাধারণ মানুষকে যদি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মন্তব্য করতে বলা হয়, আমি নিশ্চিত তিনি বীর উত্তম-বীর বিক্রম-বীর প্রতীকদের মতো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্মৃতিচারণে মুক্তিযুদ্ধে তার দুঃখ-বেদনা, ভয়-ভীতি, সাহস-উদ্যম ইত্যাদিকে সুখশ্রাব্য করে তুলতে পারবেন না; সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী কেন উপস্থিত ছিলেন না অথবা মুক্তিযুদ্ধ একটি রাজনৈতিক জনযুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সর্বোচ্চ ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবটি কেন শুধু সামরিক বাহিনীর শহীদ সদস্যদের জন্যই বরাদ্দ করা হল কিংবা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী বিশ্বস্ত তাজউদ্দীনকে যুদ্ধশেষে বঙ্গবন্ধু কেন দূরে ঠেলে দিয়ে সন্দেহভাজন খন্দকার মোশতাককেই কাছে টেনেছিলেন- ইত্যাকার কঠিন প্রশ্নে তিনি শ্রোতাকে ভারাক্রান্ত করবেন না। দুর্ধর্ষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জিঘাংসা থেকে রক্ষা পেয়েও স্বাধীনতার মাত্র ১০-১১ বছরের মাথায় কার পাপে, কোন্ অভিসন্ধির কারণে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চার মূল নেতৃত্ব এবং জিয়া-খালেদ মোশাররফ-তাহের-হায়দার-মঞ্জুরসহ বাঘা বাঘা সেনা নেতৃত্ব প্রকৃতির ইচ্ছায় মারা না গিয়ে বাঙালির ইচ্ছায়ই প্রাণ হারালেন- এসব বিষয় তার হৃদয় স্পর্শ করবে বটে; কিন্তু সেই কাহিনী তিনি সবিস্তারে বলতে পারবেন না, খেই হারিয়ে ফেলবেন বারবার এবং পূর্বাপর মিল হারিয়ে নিজেই হারিয়ে যাবেন চোরাগলিতে। ভারত আমাদের শত্রু, না বন্ধু- সাক্ষ্য-প্রমাণাদি হাজির করে কোনোটাই প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না তিনি, এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির নব পর্যায়ের উত্থানের পেছনের গল্পটাও ঠিকঠাক জানা নেই তার। তিনি শুধু জানেন, ’৭১-এর এই দিনগুলোয় তিনি মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন।

আমি কি সাধারণ মানুষের পর্যায়ে পড়ি? আমি সাধারণ, তবে সাংবাদিক বলে সমাজের অগ্রবর্তী শ্রেণীর সদস্যও বটে। এখন যা বলতে থাকব, সেগুলো আমার সাংবাদিক সত্তারই উপলব্ধি।

এ যাবতকালের বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে যদি ১০০ ধরা যায়, তাহলে তার ২০ ভাগ অর্জিত হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে, বাকি ৮০ ভাগই গত একশ’ বছরে। এই সাদৃশ্যে বাঙালি সমাজের হাজার বছরের ঘটনাবলী যা, স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৪ বছরের ঘটনাপ্রবাহ তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি বিচিত্র, অনেক অনেক বেশি নাটকীয়, অনেক অনেক বেশি কাহিনীতে ভরপুর। বস্তুত স্বাধীনতার পর সময়ের চেয়ে দ্রুত গতিতে ঘটেছে পরিবর্তন আর চক্রবৃদ্ধি হারের সুদের মতো লাফানো ঘটনার ঘনঘটায় বয়স্করা এখন আর পঞ্চাশ বছর আগের শান্ত-সুস্থির বাঙালি সমাজের সঙ্গে বর্তমানেরটা মেলাতে পারছেন না কিছুতেই। তবে কি মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দিয়েছে শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা আর কিছুটা অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য? বাকি সবই নিয়েছে কেড়ে?

পাঠক দেখুন, এই ৪৪ বছরে গড়ে প্রতি তিন বছরে একবার করে সংশোধিত হয়েছে সংবিধান, জন্ম নিয়েছে শতাধিক রাজনৈতিক দল, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সত্তর জন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও দেখতে হয়েছে আমাদের। এই সময়ে দু’জন রাষ্ট্রপ্রধান নিহত হয়েছেন নির্মমভাবে, একজন ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন গণঅভ্যুত্থানে, একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে ঠেকাতে হয়েছিল কমবেশি ২২টি সেনা-অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কত হয়েছে হিসাব দেয়া মুশকিল, তবে ঢাকা এখন আর মসজিদ কিংবা রিকশার শহর নয়, এটা পরিণত হয়েছে মিছিল-জনসভার শহরে। এই শহরেই আবার জনসভায় গ্রেনেড বিস্ফোরণ এবং সাপ ছেড়ে দেয়ার মতো কল্পনাতীত ঘটনাও দেখতে হয়েছে আমাদের। কল্পনাতীতেরও অতীত, দেখতে হয়েছে জেলের অভ্যন্তরে হত্যা। আবার কী অসম্ভব বৈপরীত্য লক্ষ করুন। আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও মত প্রকাশের জন্য শিশু যেমন কাগজ-কলম হাতে পেলেই আঁকিবুকিতে ভরিয়ে ফেলে কাগজ, তেমন দু’-চারজন একত্র হয়েই কাগজে-কলমে বানিয়ে ফেলছে রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি; অন্যদিকে এই মত প্রকাশের দায়েই হত্যা করা হয়েছে বেশ কিছু চিন্তাশীল ব্যক্তিকে। এই ৪৪ বছরে সেনাসরকার দেখেছি যেমন, দেখেছি পিকিউলিয়ার ধরনের সেনা-সমর্থিত সরকারও। দেখেছি ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে তিন মাস ধরে নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে অঙ্গার করার অদ্ভুত, মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ।

কথাটা দেশদ্রোহিতার শামিল হবে কি-না জানি না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, লাখো শহীদের আত্মত্যাগ ইত্যাদি রুটিন কথাবার্তা আমার মধ্যে বাড়তি কোনো ব্যঞ্জনাই সৃষ্টি করতে পারে না আর, অথচ এসব প্রেরণা কোনোদিনই নষ্ট হওয়ার কথা ছিল না। আওয়ামী লীগের একজন নেতা যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন প্রকারান্তরে তাকেই বা তার দলকে ভোট দেয়ার ইঙ্গিত করে অথবা বিএনপির একজন নেতা যখন মুক্তিযুদ্ধের কমপক্ষে একটি চেতনাও ধারণ না করে ১৬ ডিসেম্বর সাভার স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে আসেন, তখন মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র দর্শনটিই আমার কাছে খেলো হয়ে যায়। অনেকে হয়তো বলবেন, মুক্তিযুদ্ধের কী দোষ? আরও বলবেন, দোষ তো ধর্ষকের, ধর্ষিতার দোষ ধরছেন কেন? একথা মেনে নিয়েও বলি- মুক্তিযুদ্ধ একটি চমৎকার, স্বচ্ছ ঘাট-বাঁধানো সরোবর, সময়ে সময়ে চিন্তার বিশুদ্ধতা ও কর্মের প্রেরণার উদ্দেশ্যে কোটি কোটি মানুষের সেই সরোবরে অবগাহন করার কথা ছিল; আজ কিছু মানুষ সেখানে ত্যাগ করছে মল-মূত্র- ইচ্ছে হয় না আর নেয়ে ওঠার। তারচেয়ে কিছুক্ষণ কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠলে কেমন হয়?

হ্যাঁ, এই ডিসেম্বরে বেশ কিছু হাইপোথিসিস জেগে উঠছে মনে। প্রথমটি এমন, আচ্ছা ’৭১-এর রক্তস্রাবী দিনগুলোয় আমিও তো একাধিকবার সার্কাস দলের দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার মতো ভূপাতিত হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলাম। তো আমাকে যদি মেরে ফেলা হতো, এখন যে লাখো শহীদের রক্তের কথা বলা হয়, সেই রক্তের সঙ্গে আমার রক্তও যোগ হতো এবং যেভাবে বলা হয়- আমার রক্তও আপাতত বৃথাই থাকত। সেই রক্তদান কবে সার্থক হবে আমি নিশ্চয়ই জানতে পারতাম না, যেমন জানতে পারতাম না ১৬ ডিসেম্বর সাভারের স্মৃতিসৌধে অনেকের সঙ্গে আমার উদ্দেশ্যেও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করছে দেশবাসী। কল্পনাবিলাসটি হল, কোনটি ভাগ্যের কথা- শহীদের মর্যাদার সেই পুষ্পার্ঘ্য গ্রহণ, নাকি আজ অবদি বেঁচে থেকে দীর্ঘ ৪৪ বছর যে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করলাম- সেটা। কম তো উপভোগ করিনি- শচীনের ক্রিকেট, ম্যারাডোনার ফুটবল, এ আর রহমানের মিউজিক, কারিনার নাচ, বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গ, নেলসন ম্যান্ডেলার বিজয়, ওবামার বক্তৃতা, আরও কত কী!

দ্বিতীয় হাইপোথিসিসটি বেশ ভাবাচ্ছে- বঙ্গবন্ধু যদি জন্ম না নিতেন অথবা জন্ম নিলেও যদি রাজনীতিতে প্রকাশ না করতেন আগ্রহ, ’৭১ খ্রিস্টাব্দটিকেই কি আমরা পেতাম বিজয়ের বছর হিসেবে? অনেককে তত্ত্বকথা বলতে শুনি- শূন্যস্থান বলে কিছু থাকে না, কেউ না কেউ, কিছু না কিছু শূন্যস্থান দখল করবেই নাকি! কথাটা বিজ্ঞানসম্মত মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথ না জন্মালে আর কি কেউ দখল করতে পারতেন তার জায়গা? অথবা রবীন্দ্রনাথই কি বলে যেতে পেরেছেন আমাদের হৃদয়ের সব কথা? আমরা যা পেয়েছি তা অনেক, যা পাইনি তা আরও অনেক। এই শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। শূন্যতা বলে যদি কিছু না-ই থাকে, তাহলে যা হওয়া স্বাভাবিক ছিল- মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি মনমাতানো উপন্যাস, কী একটা ভালো সিনেমা- আমরা পাচ্ছি না কেন? এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসছেন না কেন কেউ? আমি নিশ্চিত, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে ’৭১ খ্রিস্টাব্দটি বিজয়ের বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে পারত না। হতে পারত সেই বিজয়ের বছর ’৮১, ’৯১ অথবা ২০০১ কিংবা তারও পর। অথচ এই ব্যক্তিটিকে নিয়ে কতই না উপহাস দেখতে হয়েছে আমাদের!

তৃতীয় কল্পনাটি হচ্ছে, এখন থেকে দুইশ’ কী পাঁচশ’ বছর পর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরিবর্তিত সংস্করণটি কেমন হবে? অক্টোবর বিপ্লবের মহিমা, মহানত্ব ফুরিয়ে গেছে ৭০ বছরের মাথায়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ফুরিয়ে যেতে কতদিন লাগবে? আবার ধরুন, ইতিহাসের বড় বড় ঘটনার ক্ষেত্রে যেমনটা হয়, সময়ের তালে তালে সেই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছোট ছোট চরিত্র ও উপঘটনাসমূহ ফিকে হতে হতে একসময় শুধু মূল দু’-একটি চরিত্র এবং ঘটনার মর্মবস্তুটিই থাকে জনগণের কাছে, বাকিটা চলে যায় গবেষকদের টেবিলে। আবার দূর অতীতের কোনো বড় ঘটনা যে গবেষকদের কাছে অবিকল উঠে আসে তা-ও নয়, কখনও কখনও বাদ পড়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, প্রবেশ করানো হয় কাল্পনিক উপঘটনা। ‘বিষাদ সিন্ধু’ নামের দীর্ঘ পুস্তকটিতে আমরা কারবালার যে মর্মন্তুদ কাহিনী পড়ি, তা পড়ার সময় রবীন্দ্রনাথের সেই কথাই মনে পড়ে যায়- ঘটে যা তা সব সত্য নহে, সেই সত্য যা রচিবে তুমি। রামায়ণ রচনার সময় বাল্মিকী শুধু জানতেন রাম হচ্ছে অযোধ্যার অধিপতি দশরথের পুত্র, আর কিছুই জানতেন না তিনি। অথচ তিনি লিখে ফেলেছেন মহাকাব্য এক। আবার দীর্ঘ সময় পর ইতিহাসের কোনো ঘটনার একেবারে মর্মবস্তুটিও আলাদাভাবে দেখা দেয় আলাদা আলাদা মানুষের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭০ বছর পর এখন অনেকে হিটলারকে দেখেন আদর্শ জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে, আবার কারও চোখে তিনি মানবতাবিরোধী ফ্যাসিস্ট। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দীর আওতায় রয়েছি, তারা শত অপপ্রচার সত্ত্বেও মোটামুটি এই যুদ্ধের সত্যটা ধরতে পারছি, যুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য চরিত্রের ভূমিকাগুলোও স্পষ্ট এখনও। কিন্তু এমন দিন হয়তো আসবে, যেদিন হারিয়ে যাবে সব, গবেষক-অনুসন্ধিৎসুদের বাইরে ব্যাপক জনতার কাছে থাকবে নাম কয়েকটি মাত্র- শেখ মুজিব, আয়ুব, ইয়াহিয়া। কেমন হবে তখন বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি? অথবা উপরের নামগুলোর সঙ্গে যুক্ত হবে কি জিয়াউর রহমানের নামও এবং সেই নাম ছাড়িয়ে যাবে বঙ্গবন্ধুকেও? না, না তা কেমন করে হয়!

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

mahbubkamal08@yahoo.com



 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র