যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর, ২০১৭ ০১:১০:২১ প্রিন্ট
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব
একযুগের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি
দেড়যুগের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঢাকায় * উপকূলে ১-২ ফুট জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা * সাগরে ৩ ও ১৯ জেলার নদীতে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত * মৌসুমের প্রত্যাবর্তন প্রায় ১৫ দিন বিলম্বিত
নিন্মচাপের প্রভাবে সারা দেশে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে এ বৃষ্টি শুরু হয়। শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। একযুগের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড। এর আগে এ ধরনের নিন্মচাপের প্রভাবে সারা দেশে ২০০৪ সালের জুলাইয়ে টানা তিনদিন ভারি বৃষ্টিপাত হয়। এছাড়া দেড়যুগের মধ্যে ঢাকায় এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। এর আগে ২০০০ সালের ২৯ অক্টোবর ঢাকায় ২৪ ঘণ্টায় ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। শনিবার আবহাওয়া বিভাগ (বিএমডি) জানায়, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ রোববার থেকে কমে যেতে পারে।
 
আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস যুগান্তরকে বলেন, বৃহস্পতিবার মধ্য বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীকালে তা স্থলভাগে উঠে স্থল নিন্মচাপে পরিণত হয়। এটা উড়িষ্যার দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের উপকূলে বিস্তৃৃত হয়। স্থল নিন্মচাপের প্রভাবে রোববার সকাল পর্যন্ত ভারি বৃষ্টি হতে পারে। এরপর এটি দুর্বল হয়ে যাবে। রোববার দুপুরের পর থেকে বৃষ্টিপাত ধীরে ধীরে কমে যাবে। নিন্মচাপে শুধু ভারি বৃষ্টিপাতই নয়, সাগরও উত্তাল হয়ে উঠেছে। উপকূলীয় এলাকায় স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়েও ১-২ ফুট জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে। এছাড়া দেশের ১৯ জেলার নদী বন্দরগুলোতে ২ নম্বর নৌ হুশিয়রি দেখাতে বলা হয়েছে।
 
পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে।
 
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদরা জানান, এ বছর মৌসুমের প্রত্যাবর্তন প্রায় ১৫ দিন বিলম্বিত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুম সাধারণত ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রস্থান করে। জুন-জুলাইতে বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে আসা মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে হিমাচল প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এরপর তা সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে প্রস্থান শুরু করে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা বাংলাদেশের উপকূল ছেড়ে সাগরের দিকে যায়। 
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কোনো বৈরী প্রাকৃতিক পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মেলানো যায় না। তবে এটা ঠিক, এবার বাংলাদেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে তা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ পরিস্থিতির প্রভাবেই ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতির সঙ্গে মৌসুমের বিলম্বিত প্রস্থান একটি কারণ। তিনি বলেন, বৈরী পরিস্থিতির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণকে মেলানোর আরও বেশকিছু দৃষ্টান্ত আছে। এবার বাংলাদেশে আগাম আকস্মিক বন্যা হয়েছে। হাওরাঞ্চলে এপ্রিলের শেষের দিকে বন্যা হয়ে থাকলেও এবার তা এক মাস আগে মার্চের শেষের দিকে হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। ১০০ বছরের মধ্যে যমুনার বাহাদুরাবাদ পয়েন্ট দিয়ে সবচেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, যমুনেশ্বরী, তিস্তা, ধরলায়ও একই অবস্থা। বিশেষ করে এবার দিনাজপুরে বন্যা অস্বাভাবিক ঘটনা। এসবের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবকে দায়ী করা যায়।
বিএমডি’র তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় প্রায় সারা দেশেই ভারি বৃষ্টি হয়েছে। সংস্থাটি দেশের ৪২ স্টেশনে আবহাওয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে, প্রতিটি স্টেশনেই কমবেশি বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে সিলেটে ৬ মিলিমিটার। এ সময়ের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে গোপালগঞ্জে ২৭১ মিলিমিটার। একই সময়ে ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ১৪৯ মিলিমিটার। তবে শনিবার নিন্মচাপের বলয় সরে যায় চট্টগ্রামের দিকে। এদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় ফেনীতে ১৩৩ মিলিমিটার। 
 
বিএমডির কর্মকর্তারা জানান, ২৪ ঘণ্টায় ১০ মিলিমিটারের কম বৃষ্টি হলে তাকে হালকা বৃষ্টিপাত বলা হয়। এছাড়া ১০ থেকে ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত মাঝারি বৃষ্টিপাত, ২০ মিলিমিটার থেকে ৪৩ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতকে মাঝারি ধরনের ভারি ও ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে তাকে ভারি এবং ৮৯ মিলিমিটার বা এর বেশি বৃষ্টি হলে তাকে অতি ভারি বৃষ্টি বলা হয়। গত তিন দিনে ঢাকা, বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারি থেকে অতিবৃষ্টি হয়েছে।
 
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম আজাদ মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, এ সময় বাংলাদেশে এমন বৃষ্টিপাতের বিষয়টি নজিরবিহীন নয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া এমন। মৌসুম শুরু ও শেষে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ হয়। কারণ ওই দুই সময় বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রির ওপরে উঠে যায়। তখনই লঘুচাপ তৈরি হয়। এর কোনোটি নিন্মচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ে পর্যন্ত পরিণত হয়। অর্থাৎ অক্টোবর-নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়ের একটা সময়। ১৯৭০ সালে নভেম্বরে ঝড় হয়েছিল। সিডরও হয়েছে নভেম্বরে। তিনি আরও বলেন, ‘বরং এবার আমরা বেঁচে গেছি। লঘুচাপটির গতি কম হলে ও এটি সাগরে আরও থাকার সুযোগ পেলে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতেও পারত।
 
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ জানান, নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং তাদের কাছাকাছি দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে এক থেকে ২ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। সাগরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
 

আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত