•       রংপুর সিটি নির্বাচন: প্রার্থীদের হলফনামায় বিভ্রান্তিমূলক তথ্য আছে: সুজন; ইসিকে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ       প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে নাটোর সদরের ১২৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণির আজকের গণিত পরীক্ষা স্থগিত       রাজধানীর শুক্রাবাদে নির্মাণাধীন ভবন থেকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের মরদেহ উদ্ধার
সিরাজুল ইসলাম    |    
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২৫:০৩ প্রিন্ট
প্রেমিক যখন সিরিয়াল অপরাধী
অপহৃত শিশুটিকে পাওয়া গেল ট্রাকে
অপরাধী লিমন ও অপহৃত জিহাদ

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর অভিনব কৌশলে একের পর এক অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে 'সিরিয়াল অপরাধী' লিমন।

গত ১৫ দিনে অন্তত ৭টি ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু খুবই ধূর্ত প্রকৃতির হওয়ায় পুলিশ তার হদিস মেলাতে পারছে না। বয়স ৩০-এর কাছাকাছি হবে। নাম লিমন।

তবে নামের সত্যতা নিয়েও পুলিশের সন্দেহ আছে। আর পুলিশ যখন তাকে নিয়ে গোলকধাঁধায় তখন সে সিরিয়াল অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে।

সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুলিশ সদস্যরাও তার প্রতারণার শিকার। এমনকি নিজের প্রেমিকার চার বছর বয়সী ভাজিতাকে অপহরণ করে সে মুক্তিপণ আদায় করেছে।

অপরাধ তৎপরতায় অন্যের মোবাইল বা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। প্রতিটি ঘটনায় পৃথক মোবাইল ফোন ব্যবহার করা হয়। একটি অপরাধ করার পর ওই মোবাইলটি আর ব্যবহার করে না। এ কারণে তাকে আইনের আওতায় আনতে বেগ পেতে হচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, অপরাধ তৎপরতায় লিমন যেসব মোবাইল সেট ব্যবহার করে সেগুলোর সিম অন্য কারও নামে রেজিস্ট্রেশন করা।

ওইসব সিমের মালিকরা জানে না যে, তাদের মোবাইল সেট ব্যবহার করে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। ১৫ দিনে লিমন বেশ কয়েকটি মোবাইল সেট এবং একাধিক মোটরসাইকেল চুরি বা ছিনতাই করেছে।

হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। সবশেষ সে চট্টগ্রাম জেলে বন্দি ছিল। সেখানে থাকা অবস্থায় কারাবন্দি অনেকের বাড়ির ঠিকানা এবং মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে।

 সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর চট্টগ্রামে পুলিশ সদস্য পরিচয়ে এক পুলিশ সদস্যের মোটরসাইকেল এবং নগদ টাকা নিয়ে লিমন চম্পট দেয়।

এর পর থেকে ওই মোটরসাইকেল ব্যবহার করে চালিয়ে যাচ্ছে একের পর এক অপরাধ কর্মকাণ্ড। তাকে গ্রেফতার করতে পুলিশের একাধিক টিম  কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোডের সিআর খোলা এলাকায় নার্গিস আক্তার বলেন, ২ ডিসেম্বর সকালে লিমনকে নিয়ে আমার ননদ সোনিয়া আমার বাসায় আসে।

সোনিয়া আমাকে জানায়, লিমন তার প্রেমিক। তাদের দু'জনের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক। তারা বিয়ে করবে জানিয়ে আমার বাসার আশপাশে একটি রুম ঠিক করে দিতে বলে।

বিয়ের কেনাকাটার প্রলোভন দেখিয়ে লিমন আমাকে নিয়ে মার্কেটে যাওয়ার অনুরোধ জানায়। লিমনের অনুরোধে আমি ওইদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোডের বাসা থেকে ওয়ারী থানাধীন রাজধানী সুপার মার্কেটের উদ্দেশে রওনা হই।

 আমার সঙ্গে বান্ধবী রহিমা, ননদ সোনিয়া এবং ছেলে জিহাদ ছিল। আমি এবং রহিমা একটি সিএনজিতে উঠি। লিমনের মোটরসাইকেলে ওঠেন সোনিয়া। ওই মোটরসাইকেলের সামনে বসানো হয় জিহাদকে।

 রাতে সাড়ে ৯টার দিকে আমরা রাজধানী সুপার মার্কেটের বিপরীত পাশে সালাউদ্দিন হাসপাতালের সামনে পৌঁছি। এর প্রায় পাঁচ মিনিট পর লিমন মোটরসাইকেল দিয়ে আমাদের সামনে আসেন।

এ সময় সোনিয়াকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। আমার ছেলে জিহাদ মোটরসাইকেলের সামনেই বসা ছিল। তখন লিমন আমাদের বলে, 'আপনারা রাজধানী সুপার মার্কেটের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়ান।

আমি সামনে থেকে মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে (ইউটার্ন করে) মার্কেটের সামনে আসছি।' তার কথামতো আমি, আমার ননদ সোনিয়া এবং বান্ধবী রাহিমা রাজধানী সুপার মার্কেটের দক্ষিণ পাশের গেটে দাঁড়াই। কিন্তু সেখানে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও লিমন বা আমার ছেলে ফিরে আসেনি।

 আমরা লিমনকে ফোন করলেও সে রিসিভ করছিল না। এরপর ছেলের জন্য খুবই চিনি্তত ও বিমর্ষ হয়ে পড়ি। ওইদিন ভোর ৪টার দিকে লিমন আমাকে ফোন করে বিকাশের মাধ্যমে ১৬ হাজার টাকা পাঠাতে বলে।

 সাফ জানিয়ে দেয়, 'টাকা না পাঠালে তোমার ছেলেকে ফেরত পাবে না।' ওইদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাকে আমি ১০ হাজার টাকা বিকাশ করি। এরপর থেকে লিমন তার মোবাইলটি বন্ধ করে দেয়।

ওয়ারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, জিহাদের ফুপু সোনিয়া গাজীপুরের টঙ্গী বাটা গেট এলাকায় থাকেন। সম্প্রতি সেখানকার 'বন্ধু' হোটেলে লিমনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

এ সময় লিমন তাকে বিয়ে করার প্রলোভন দেখায়। ওসি জানান, লিমন একজন মাদক ব্যবসায়ী। মাদক মামলায় জেল খেটে প্রায় এক মাস আগে ছাড়া পেয়েছে।

এ বিষয়টি সোনিয়ার জানা ছিল না। লিমনকে অত্যন্ত চতুর উলে্লখ করে ওসি বলেন, বিকাশে টাকা দাবি করার সময় সে জিহাদের মাকে বলে- 'আপনি টাকা পাঠালে আমি নেব না। আপনার ননদ আমার কাছ থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা এবং ছয় হাজার টাকা দামের একটি মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে। কিন্তু ফেরত দিচ্ছে না।

 তাই আমি আমার সঙ্গে এক হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে আপনার বাসায় গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল ওই ইয়াবা আপনার বাসায় রেখে পুলিশকে খবর দিয়ে আপনাদের সবাইকে ফাঁসিয়ে দেব। কিন্তু আপনার বাসায় গিয়ে আপনাকে ভালো লেগেছে। আপনার বাসার খাবারও আমার ভালো লেগেছে। তাই ইয়াবা দিয়ে ফাঁসাইনি।'

ওয়ারী থানার এসআই জাকির হোসেন বলেন, ইয়াবা মামলায় চট্টগ্রাম জেলে লিমনের সঙ্গে সারফিন এবং মহিউদ্দিনসহ কয়েকজন ছিল। তারা এখনও জেলে আছে। তাদের মধ্যে সারফিনের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। মহিউদ্দিনের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর লিমন প্রথমে চট্টগ্রামে এক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে প্রতারণা করে।

পরে সেখান থেকে সরাসরি মহিউদ্দিনের স্ত্রী রোকশানার কাছে যায়। মহিউদ্দিনকে জামিন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে রোকশানার কাছ থেকে টাকা নেয়। এরপর রোকশানাকে নিয়ে সারফিনের বাড়িতে যায় লিমন। সেখানেও সারফিনকে জামিন করাতে টাকা দাবি করে। পরে সারফিনের ভাই সাগরের মোটরসাইকেল (নম্বর- ফরিদপুর ল- ১১-১৯২৮) ও মোবাইল নম্বর নিয়ে সটকে পড়ে।

জিহাদকে অপহরণ এবং মুক্তিপণের টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে সাগরের মোটরসাইকেল এবং মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয় বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারী থানার এসআই হারুন-অর-রশিদ জানিয়েছেন। এসআই হারুন-অর-রশিদ আরও জানান, ২ ডিসেম্বর (ঘটনার দিন) রাত সাড়ে ১০টার দিকে শিশু জিহাদকে নিয়ে বাড্ডায় যায় লিমন। বাসা বদলানোর কথা বলে উত্তর বাড্ডার মিনি ট্রাকচালক শাকিলের সঙ্গেও প্রতারণা করে। তাছাড়া ট্রাকচালকের কাছে শিশু জিহাদকে ফেলে রেখে এসে জিহাদের মায়ের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা আদায় করে লিমন।

ট্রাকচালক শাকিল যুগান্তরকে বলেন, ওইদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে আমি ট্রাকের জন্য তেল নিতে উত্তর বাড্ডার মক্কা পেট্রোল পাম্পে অবস্থান করছিলাম।  এ সময় একটি মোটরসাইকেলে করে জিহাদকে নিয়ে আমার কাছে আসে লিমন। সে বাসা বদলানোর কথা বলে আমার ট্রাক ভাড়া করে। উত্তর বাড্ডা থেকে বাসার মালামাল নিয়ে চট্টগ্রাম রোডে যাবে বলে আমাকে জানায়।

এ সময় আমাকে একটি সিগারেট আনতে বলে। সিগারেট ধরানোর পর বলে, তুমি আমার ছেলেটাকে (জিহাদ) ট্রাকের সামনের সিটে তোমার পাশে বসাও। এরপর সে বলে, আমি মোটরসাইকেল নিয়ে সামনে এগোচ্ছি।

তুমি আমার পেছন পেছন আস। উত্তর বাড্ডা ওভারব্রিজের পাশে সবজি গলির সামনে গিয়ে ওষুধ কেনার কথা বলে আমার কাছে ৫০০ টাকা চায় লিমন। আমার কাছে ৩০০ টাকা আছে জানালে সে ওই টাকা নিয়ে ফের মোটরসাইকেল নিয়ে এগোতে থাকে। আমিও পেছন পেছন যেতে থাকি।

এক পর্যায়ে সে গলিপথে ঢুকে পড়ে।  ওই গলিতে ট্রাক প্রবেশ করানো সম্ভব না হওয়ায় আমি গলির মুখে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করি। কিন্তু লিমন আর আসেনি।

গভীর রাতে বিষয়টি ট্রাক মালিক নাদিমকে জানাই। রাত আড়াইটার দিকে নাইম এবং আমি মিলে শিশুকে নিয়ে বাড্ডা থানায় যাই। পরে থানা পুলিশের পরামর্শে নাদিম শিশুটিকে নিয়ে তার বাসায় চলে যায়।

ট্রাক মালিক নাদিম বলেন, শিশু জিহাদকে আমার বাসায় আনার পর প্রথমদিন খুব কান্নাকাটি করছিল। বাসায় চার বছর বয়সী ওমর নামে আমার একটি ছেলে সন্তান আছে। পরে ওমরের সঙ্গে সে খেলাধুলা করে সময় কাটাচ্ছিল।

৫ ডিসেম্বর সকালে থানা থেকে জানানো হয়, জিহাদের মা-বাবাকে পাওয়া গেছে। পরে ওয়ারী থানা থেকে পুলিশ বাড্ডা থানায় এসে জিহাদকে নিয়ে যায়। এরপর তাকে তার মা-বাবার কাছে হস্তান্তর করে।
 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত