• বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৭
সালমা ইসলাম    |    
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০২:০৯:২৯ | অাপডেট: ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০২:০৯:৩৪ প্রিন্ট
বাড়ছে ঝুঁকি, আমরা কতটা প্রস্তুত

গ্রীষ্মকালে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যেভাবে উষ্ণতা বাড়ছে, তাতে অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ নিয়ে মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া যে আমূল বদলে যাচ্ছে- এটা সবার কাছেই স্পষ্ট। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স এডভান্সেস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা কাক্সিক্ষত মাত্রায় কমানো না গেলে ২১০০ সালের শেষ নাগাদ আর্দ্র-গরম আবহাওয়া চরম অবস্থায় পৌঁছাবে, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। আবহাওয়া চরম আকার ধারণ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিপুলসংখ্যক মানুষ যারা কর্ম উপলক্ষে দিনের বেশিরভাগ সময় ফসলের মাঠে কিংবা ঘরের বাইরে অবস্থান করেন, আবহাওয়া চরম আকার ধারণ করলে তারাই সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে। যারা সব সময় সুরক্ষিত ভবনে থাকেন, যে কোনো চরম পরিস্থিতিতে তারা কি নেতিবাচক প্রভাবের বাইরে থাকবেন? মোটেই না। কারণ আবহাওয়া চরম আকার ধারণ করলে শস্যের উৎপাদনে বিশেষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা বাড়বে। অর্থাৎ আবহাওয়া অনাকাক্সিক্ষতভাবে চরম আকার ধারণ করলে কমবেশি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

বৈশ্বিক উষ্ণতা কাক্সিক্ষত মাত্রায় কমানো না গেলে ২১০০ সালের শেষ নাগাদ দক্ষিণ এশিয়ার বিপুলসংখ্যক মানুষের চরম দাবদাহের শিকার হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। ‘সায়েন্স এডভান্সেস’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব দেশ আগামী কয়েক দশকে সবচেয়ে বেশি তাপপ্রবাহের কবলে পড়বে বাংলাদেশ তার অন্যতম। এ প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। যারা ফসল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমাদের দেশের বিপুলসংখ্যক সাধারণ কৃষকের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান না থাকলেও অভিজ্ঞতার আলোকে তারা বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে আবহাওয়া যেভাবে বদলে যাচ্ছে, এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। আগামীতে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ যে আরও বাড়বে, এটা বহুল আলোচিত। এ প্রেক্ষাপটে তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা জরুরি। তা না হলে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কতটা দিশেহারা হবেন, তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। চরম আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব না দিলে আগামীতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। গ্রীষ্মে চরম দাবদাহসহ প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। উষ্ণতা বাড়লে নানা রোগ-ব্যাধির প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচিত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হবে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
২.
এবার বর্ষাকালে বাংলাদেশ, ভারত, চীনসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোতে বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বস্তুত অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতি আগামীতে আরও বাড়বে কিনা এ নিয়ে সবার উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি সহজে কাটিয়ে উঠতে পারে না। যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আগামীতে বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে, সেহেতু এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় কী করণীয় তা এখনই স্থির করতে হবে।
ইয়াংজি, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় চীন, ভারত ও বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করে। উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে এই তিন নদ-নদীর আশপাশের বাসিন্দাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের মানুষ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এবার বর্ষায় তা স্পষ্ট হয়েছে। আগামীতে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কার কথা বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন। কাজেই উল্লিখিত সমস্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশ, ভারত ও চীন যৌথভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে। বর্ষায় অতিবৃষ্টি আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিলেও শীতকালে আবার পানির জন্য হাহাকারের বিষয়টি বহুল আলোচিত। অথচ সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে শীতকালের পানি সমস্যাও সমাধান করা যায় সহজে। বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের যৌথ উদ্যোগে ভূপৃষ্ঠের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হলে একদিকে বর্ষায় ক্ষয়ক্ষতি কমবে, অন্যদিকে শীতকালে পানির সংকটও অনেকটা কমবে। অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনায় বহুপক্ষীয় উদ্যোগ নিলে অনেক অনাকাক্সিক্ষত সমস্যা থেকে পরিত্রাণ মিলবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা অস্বাভাবিক হারে বাড়লে কৃষি ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে, তা মোকাবেলায় বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের যৌথ উদ্যোগ থাকা দরকার। বিভিন্ন ফসলের নতুন জাত আবিষ্কারের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পে এককভাবে কোনো দেশের সফল হওয়া বেশ কঠিন।    
৩.
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমগ্র বিশ্বে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি বহুল আলোচিত। যেহেতু দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রতিকূল পরিবেশে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে অক্ষম, সেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সারা বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ বেড়ে যায়। টেকসই আবাসনের অভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ বাড়ে। প্রতি বর্ষায় বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। এসব ক্ষতি মোকাবেলায় এ দেশের দরিদ্র মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলেও গত কয়েক দশক ধরে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দরিদ্র মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সামুদ্রিক ঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা যে বাড়বে, এটি বহুল আলোচিত। উন্নত দেশগুলোতে তীব্র মাত্রায় সামুদ্রিক ঝড়ে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হলেও প্রাণহানি হয় কম। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সামুদ্রিক ঝড়ে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এ অবস্থায় অধিক ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর দরিদ্র মানুষের আবাসনসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলোর বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন।
৪.
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কত মিটার বাড়লে বাংলাদেশের কতভাগ এলাকা সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাবে- এ নিয়ে বহুমুখী আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। জোয়ারের পানি আর বৃষ্টির পানি মিলে এবার চট্টগ্রাম শহরে যে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে, এটা কেউ কখনও কল্পনাও করেনি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে পরোক্ষভাবে সারা দেশের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লোনা পানির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে তা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যে কোনো মূল্যে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা দরকার, অনেক সময় পর্যাপ্ত অর্থের বিনিময়েও খাদ্যশস্য আমদানিতে বহুমুখী সংকট দেখা দিতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে আশ্রয় নিচ্ছে। এসব ভাসমান মানুষ রাজধানীসহ অন্যান্য শহরে নানারকম সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করছে।
৫.
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পেলে বহুমুখী বিপদ থেকে মুক্তি মিলবে, এটি সবার জানা থাকলেও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে শিল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে বড় ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে সবাই আন্তরিকতার পরিচয় না দিলে বিশ্ববাসীর জন্য কী বিপদ অপেক্ষা করছে, এ বিষয়ে বহুমুখী গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। এ বিষয়ক গবেষণা খাতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ বরাদ্দ অব্যাহত থাকবে, এটাই প্রত্যাশিত। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে উপকূলীয় এলাকার মানুষ। তাই তাদের সুরক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকলে উল্লিখিত সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
৬.
এবার দীর্ঘস্থায়ী বন্যা এবং বৃষ্টির কারণে দেশের কত দরিদ্র মানুষ শেষ সম্বল হারিয়ে পথে বসেছে তার সঠিক হিসাব পাওয়াও বেশ কঠিন। বর্তমানে সারা দেশে সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বাজারের অস্থিরতা নিয়ে সীমিত আয়ের মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। বন্যা ও বৃষ্টির কারণে আমাদের দেশের মানুষের দুর্ভোগ কত বাড়ে, সাম্প্রতিক সময়ের বাজারের অস্থিরতার দিকে তাকালেই তা কিছুটা বোঝা যায়। আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণে দেশে চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ অবস্থায় দেশের সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় না রাখলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : প্রকাশক, যুগান্তর
 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত