প্রিন্ট সংস্করণ    |    
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর, ২০১৭ ০৪:১০:৫৫ প্রিন্ট
সুস্থ দাঁত নিরোগ দেহ

অধ্যাপক ডা. উম্মে সালমা আবদুল্লাহ (অনিন্দিতা আবদুল্লাহ)
পরিচালক (ডেন্টাল), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও উপদেষ্টা (বাফোপ)


বাচ্চাদের দুধদাঁত যা সাধারণত ছয় মাস বয়স থেকে মুখের ভেতরের চোয়ালের ওপর দৃশ্যমান হয় তা কখনও কখনও জন্মের পরপরই দৃষ্টিগোচরে আসতে পারে।

শুধু দাঁতই নয়, সদ্যজাত শিশুর ঠোঁট, চোয়াল, জিহ্বা প্রভৃতির যত্ন ও পরিষ্কার করার যে দায়িত্ব শিশুর অভিভাবকরা গ্রহণ করেন সেটি সাত-আট বছর পর্যন্ত তাদেরই করে যাওয়া উচিত। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের বেলায় যত্নের এ সময় সীমা বাড়াতে হয়, অনেক সময় আজীবন পর্যন্তও।

বাচ্চাদের দুধদাঁতগুলো ছয়-সাত বছর থেকে পর্যায়ক্রমে পড়া শুরু করে এবং পেছনের দুটি এগারো-বারো বছর পর্যন্ত থাকতে পারে।

এ দাঁতগুলোকে একেবারেই অবহেলা করা উচিত নয় এ জন্য যে, ওই বয়স পর্যন্ত দাঁতগুলো শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। তাছাড়া দাঁতের মধ্যম স্থানে যে দন্তমজ্জা থাকে তার রক্তনালি ও স্নায়ু জীবাণু সংক্রমণ থেকে দাঁত ও মাড়িকে রক্ষা করে। দন্তমজ্জার সংক্রমণে শিশুদের শরীরের সুরক্ষা ব্যাহত হয়। তাই শিশুদের দাঁতের যতœ নিন, যেন তারা মুক্তার মতো দাঁতের হাসিতে আমাদের চারপাশ আলোকিত করতে পারে। তাদের দাঁত যেন থাকে ক্ষয়হীন, গর্তহীন ও ব্যথাহীন। কখন, কীভাবে এ কাজগুলো করবেন তা জানতে হলে সাহায্য নিন, সরকারস্বীকৃত দন্ত চিকিৎসকের, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের অধিভুক্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও সেবা কেন্দ্রের এবং বিভিন্ন সংগঠন ও পত্রিকার পুস্তিকা ও প্রকাশনার।



মাড়ির রোগ প্রতিরোধে করণীয়

অধ্যাপক লাবুদা সুলতানা

প্রিন্সিপাল, বাংলাদেশ ডেন্টাল কলেজ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট (বাফোপ)

মাড়ির প্রদাহের সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে-

১. দাঁত ও মাড়ির নিয়মিত যত্নের অভাবে সৃষ্ট ডেন্টাল প্লাক, অর্থাৎ ক্রমাগত দাঁতের ফাঁকে জমতে থাকা খাদ্যকণা ও ব্যাকটেরিয়া।

২. সঠিকভাবে দাঁত ও মাড়ির যত্ন না নেয়া।

৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়- এ জাতীয় ওষুধ সেবন করা।

৪. বিশেষ কিছু রোগ বা সমস্যা, যেমন- রক্তরোগ, এক বা একাধিক হরমোনের তারতম্য, ভাইরাল সংক্রমণ, মানসিক চাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, তামাক ও তামাকজাতীয় দ্রব্য সেবন প্রভৃতি।

মাড়ির প্রদাহ ও মাড়ির ক্ষয়রোধে নিন্মলিখিত কিছু প্রতিরোধমূলক নিয়মাবলী অনুসরণ করা যায়

* প্রতিদিন দুইবার দাঁত ব্রাশ করা- সকালে নাশতা খাওয়ার পর এবং রাতে খাওয়ার পর অর্থাৎ ঘুমানোর আগে।

* ব্রাশ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খুব বেশি নরম বা খুব বেশি শক্ত ব্রাশ ব্যবহার না করা।

* দীর্ঘদিন একই ব্রাশ ব্যবহার না করা। ওপরের দাঁত মাড়ি থেকে নিচের দিকে সামান্য চেপে এবং নিচের দাঁত মাড়ি থেকে ওপরের দিকে সামান্য চেপে ব্রাশ করতে হবে।

* সুস্থ মাড়ির জন্য ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার, টকজাতীয় এবং তাজা, টাটকা ফল খেতে হবে।

* প্রতিবার খাওয়ার পর পানি দিয়ে কুলকুচা করা।

* এ ছাড়া তুলসী, এলাচ, লবঙ্গজাতীয় প্রভৃতি উপাদান সেবনে মুখের দুর্গন্ধজনিত সমস্যা এড়ানো যায়।

প্রতিকার

মাড়ির প্রদাহজনিত রোগ যন্ত্রণাদায়ক, অস্বস্তিকর এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়। এ জন্য নিন্মলিখিত পন্থাগুলো অবলম্বন করা উচিত-

* জিনজিভাইটিস ও পেরিওডন্টাইটিসের কারণ নির্ণয় করে ডেন্টাল সার্জনের তত্ত্বাবধানে সঠিক ব্রাশিং পদ্ধতি অনুসরণসহ স্কেলিং, পলিসিং বা পেরিওডন্টাল সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা করানো।

* খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার, তামাক ও অ্যালকোহলজাতীয় দ্রব্য সেবন পরিত্যাগ করতে হবে।

* হরমোনের তারতম্য, রক্তরোগ, মৃগী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে এসব রোগের প্রতিকার করতে হবে।



সর্দি-কাশির পরেই দাঁতের রোগের স্থান

ডা. হায়দার আলী খান

সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ও জয়েন্ট সেক্রেটারি (বাফোপ)

আমাদের সামগ্রিক রোগ ব্যাধির মধ্যে সর্দি কাশির পরই দাঁতের রোগের স্থান। মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির রোগসহ যে পাঁচটি রোগের কারণে মানুষের বেশি মৃত্যু হয় তার প্রায় সবক’টির সঙ্গেই দাঁতের রোগের যোগসূত্রতা রয়েছে। বাংলাদেশে উচ্চবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে মুখ ও দাঁতের রোগের প্রবণতা কিছুটা কমলেও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল, শহরতলী ও শহুরে নিন্ম ও মধ্যবিত্ত লোকদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনমানের পরিবর্তনের ফলে মুখ ও দাঁতের রোগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েই চলছে। সকালে ও রাতে খাবার পর সঠিকভাবে দাঁত পরিষ্কার করা, মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খাওয়ার পাশাপাশি আঁশযুক্ত খাবার ও ফলমূল বেশি খাওয়া এবং নিয়মিত ডেন্টাল সার্জনের শরণাপন্ন হলে মুখ ও দাঁতের রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব।



দাঁত ও মুখের সমস্যাকে গুরুত্ব দিন

ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ

চেয়ারম্যান, রাজ ডেন্টাল ওয়ার্ল্ড ও অর্গানাইজিং সেক্রেটারি (বাফোপ)

দাঁত শরীরের অতিক্ষুদ্র অঙ্গ হলেও দাঁতের গুরুত্ব সম্পর্কে অনেকের স্বচ্ছ ধারণা নেই। তাই দাঁতের রোগ প্রতিরোধে বা সুচিকিৎসায় আমাদের মধ্যে অবহেলা দেখা যায়। শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সমস্যা সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষ যেমন সতর্ক, দাঁতের বিষয়ে ঠিক তেমনটি লক্ষ্য করা যায় না। দাঁত শুধু খাদ্যকে ভেঙে হজম উপযোগী করে তা নয়, স্পষ্ট উচ্চারণে, মুখের আকৃতির সৌন্দর্য ধরে রাখতে, অন্যান্য দাঁতের অবস্থান ধরে রাখতে এবং সুন্দর হাসির মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব প্রকাশে দাঁত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসা গবেষকরা বলছেন, সুস্থ দাঁত মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখে, প্রাণচঞ্চল রাখে, স্মৃতিশক্তি ধরে রাখে, বিষণ্ণতা দূর করে। অন্যদিকে দাঁত ও মাড়ির দীর্ঘমেয়াদি রোগ সহজেই রক্ত বাহিকাতে মিশে শরীরের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে যেমন- হার্ট, মস্তিষ্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। শারীরিক রোগ যেমন- ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে বাধা দিতে পারে দাঁতের রোগ। অপরিণত গর্ভপাতের অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদি দাঁতের রোগ। মুখের ক্ষত থেকে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা অনেক। মুখের ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। স্বল্প খরচে অনুমোদনহীন চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণ, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ সেবন করে রোগের সাময়িক উপশম পাওয়া গেলেও রোগ আরোগ্য পদ্ধতি হয়ে উঠতে পারে জটিল, সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।



শিশুর দাঁতের যত্নে মা-বাবা যা জানবেন

ডা. হুদা মান্নান তন্বী

সহকারী অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি ডেন্টাল কলেজ ও ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার সেক্রেটারি (বাফোপ)

শিশুদের দুধদাঁত ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই দাঁতের ক্ষয় শুরু হতে পারে। তাই জন্মের পরপরই শিশুর দাঁতের যত্নে করণীয় :

* পরিষ্কার আর্দ্র কাপড় বা গজ দিয়ে জন্মের প্রথম কয়েক দিন আপনার শিশুর মুখগহ্বর পরিষ্কার করুন।

* মায়ের বুকের দুধপান শিশুর দাঁত গঠনে সহায়ক।

* বোতলে দুধ পানরত অবস্থায় শিশুকে ঘুমিয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে হবে। বোতলের দুধের সঙ্গে বাড়তি চিনি যোগ করবেন না।

* যখন প্রথম দাঁত ওঠা শুরু হয়, তখন থেকেই ঘুমানোর আগে আপনার সন্তানের ‘দাঁত পরিষ্কার করা’ শুরু করুন।

* আপনার শিশুর বয়স যদি তিন বছরের কম হয়, তবে তাদের টুথব্রাশে একটি শস্যদানার সমপরিমাণ টুথপেস্ট লাগিয়ে টুথব্রাশ করান।

* আপনার শিশুটি যদি তিন থেকে ছয় বছর বয়সী হয়, তবে তাদের টুথব্রাশে একটি মটরদানার সমপরিমাণ টুথপেস্ট ব্যবহার করুন।

* জন্মের পর থেকেই পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং একই সঙ্গে চিনিযুক্ত বা মিষ্টি খাবার কিংবা ফাস্ট ফুড খাওয়ার প্রবণতা কমান।

* প্রথম দুধদাঁত ওঠার পরপরই এবং প্রথম জন্মদিনের পর আপনি আপনার শিশুকে সরকার স্বীকৃত দন্ত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে মুখ গহ্বরের সুস্বাস্থ্যের পরামর্শ গ্রহণ করুন।


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত