মো. বশিরুল ইসলাম    |    
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০১:৩৯:৩৭ প্রিন্ট
চালের দাম ও দায়বদ্ধতা

যে সময়ে ধান ওঠে, সেই সময়ে মিল মালিক বা বড় বড় ব্যবসায়ীরা মজুদ করে। যখন কৃষকের কাছে ধান থাকে না, তখন তারা বেশি মূল্যে ধান বাজারজাত করে। কৃষকরা যখন ধান বিক্রি করে, তখন দাম থাকে না। আর এখন চাল কিনতে গেলে চালের দাম বেশি। মোটা চালের দাম এখন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। এক কেজি চাল কিনতে হচ্ছে ৫২ টাকায়। শুধু মোটা চাল নয়, সব ধরনের চালের দামই বিগত বছরের চেয়ে অনেক বেড়ে যাওয়ায় কষ্টের মধ্যে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষসহ স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো। এভাবে চলতে থাকলে এ দেশে অচিরেই ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হবে আর এক শ্রেণীর মানুষ বিপুল অর্থের মালিক হয়ে যাবে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এ মুহূর্ত থেকে চালের বাজার মনিটরিং প্রয়োজন।

আমরা দেখেছি, হাওরাঞ্চলে বন্যা ও ১৯ জেলায় ধানক্ষেতে ব্লাস্টের কারণে এ বছর ২০ লাখ টনের বেশি বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। আর এই ঘাটতি মেটাতে সরকার গত জুলাইয়ে ভিয়েতনাম থেকে ২ লাখ টন চাল আমদানি করে। বর্তমানে সাড়ে চার লাখ টন চাল আমদানি প্রক্রিয়াধীন আছে। এরপরও দেশে বর্তমানে এক কোটি টন চালের মজুদ আছে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী। তবে সারা দেশের মিল মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরকারকে জানিয়েছে, তাদের কাছে সর্বসাকুল্যে প্রায় ৬ হাজার টন ধান ও সাড়ে ৫ হাজার টন চাল আছে।

নয় মাসে বাংলাদেশে চালের দাম বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে মাত্র ৬ শতাংশ। অন্যদিকে অনেক দেশে চালের দাম কমলেও দেশের বাজারে প্রতিদিনই বাড়ছে। এর কারণ কী? দৃশ্যত কোনো কারণ নেই। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৩৯৬ লাখ ৯০ হাজার টন। পূর্ববর্তী বছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩৯০ লাখ টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়েছিল ৬ লাখ টন। বর্তমান অর্থবছরেও খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়েছে ৬ লাখ টন। তথ্যে কোনো সমস্যা নেই। তাহলে বাজারে এমন গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য নিয়ে কারা ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে? যখনই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হয়, তখন সরকার ‘ট্রাক সেল’, ওপেন মার্কেট অপারেশন করে বাজারকে স্থিতিশীল করে। এটা শুধু চালের ক্ষেত্রে সত্যি নয়, প্রায় সব ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রেই সত্যি। এতে কাজ হয়। ব্যবসায়ীদের ধমক দিয়ে কোনোদিন কোনো লাভ হয়নি। কাজেই সরকারের উচিত, বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তা না হলে সমস্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। আজ চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, এর পর আদা, রসুন, পেঁয়াজ, ডাল প্রভৃতি মজুদ মূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারা করবে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

সরকারের নির্দেশে চাল আমদানির শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং পরে ২ শতাংশ করা হয়েছে। এতে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম অনেকটাই কমে যাওয়ার কথা। অথচ আমরা দেখছি, বর্তমানে চালের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বাজারে পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ থাকার পরও চালের বাজার অস্থির কেন, এ এক বিরাট প্রশ্ন। দেশে শুধু বেসরকারি পর্যায়ে যে চাল আমদানি হয়েছে, তাতে কোনো সংকট হওয়ার কথা নয়। দেশে যথেষ্ট চাল আছে কিন্তু সেই চাল ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে মজুদ রেখেছে। সরকারের মজুদ কমে যাওয়ায় চালের বাজারের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে। চালের বাজারের এ অস্থিরতার পেছনে আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও মিলারদের হাত রয়েছে। এটা মূলত অসৎ ও অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারসাজি। তারা প্রতিবছরই নানা অজুহাতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায়। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এমনকি একটি মহল চালের মূল্য অস্থিতিশীল করতে অপপ্রচারের আশ্রয়ও নেয়। আমরা দেখেছি, ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের মিনিস্ট্রি অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের স্বাক্ষরবিহীন একটি ভুয়া চিঠি বেনাপোল এলাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রচার করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছিল- ১৫ সেপ্টেম্বরের পর ভারত বাংলাদেশে চাল রফতানি করবে না। চিঠির সূত্র ধরে আমদানিকারকরা ইচ্ছামতো চালের মূল্য কেজিপ্রতি ৮-১৫ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোটা চালের কেজি ৪০ টাকা এবং চিকন চাল ৫৬ টাকায় উঠেছিল। সেই থেকে বাড়তে থাকা চালের দাম আজও স্থিতিশীল হয়নি। পরিস্থিতি ২০০৮ সালের রূপ নেবে কিনা, বোঝা যাচ্ছে না। ওই সময়ে টাকা দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে চাল মেলেনি। সে সময় মানুষকে আলু খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, বেশি করে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান। বিষয়টি নিয়ে গানও বানানো হয়েছিল।

মনে রাখতে হবে, খাদ্য নিরাপত্তার কারিগর বা পাহারাদার হচ্ছে কৃষক। কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত, এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে, প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে আমাদের জন্য ফসল উৎপাদন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের কৃষি খাতে যে সমৃদ্ধির ধারা সূচিত হয়েছে, তা কেবল কৃষকের জন্য। সরকারও কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। সার, বীজ, কীটনাশকসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করলেও কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় সরকার অনেকটাই ব্যর্থ। ধান, চাল, গম, আলুসহ অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছে। কৃষক জানে না, এ বঞ্চনার শেষ কোথায়?

ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। কাজেই চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনে। দুর্ভোগ কমাতে এদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। একদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে মিল মালিক ও মজুদদারদের যোগসাজশে মানুষকে বেশি দাম দিয়ে চাল কিনতে হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান চাই। আমরা মনে করি, সরকারের কার্যকর উদ্যোগই পারে এর সমাধান দিতে।

কম শুল্কে আমদানি করা চাল কোথায়, কত দামে বিক্রি হচ্ছে, তা কে মনিটরিং করবে? শুল্ক কমানোর ফলে চালের বাজারে যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা, তা কি পড়েছে? যদি না পড়ে, তাহলে এর জন্য কারা দায়ী? দায়ীদের শনাক্ত করা হবে কি, তারা শাস্তি পাবে কি? এসব সহজ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। আমরা দেখছি, শুল্কহার কমানোয় চাল ব্যবসায়ীরা দ্বিগুণ লাভবান হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি মাথায় রেখে এ মুহূর্ত থেকে চালের বাজার মনিটরিং প্রয়োজন।

মো. বশিরুল ইসলাম : জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত