ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ তরুণ শিক্ষার্থী ও পরিবর্তনসাধক- ফারিহা ইসলাম, সুমাইয়া তাবাসসুম, মেফতাহুল জান্নাত, ইয়াসিন বিন সিহাম এবং তানজিনা রহমান প্রমির হাত ধরে- একটি স্বপ্ন নিয়ে প্রজেক্ট নান্দনিকের যাত্রা শুরু হয়। যেই যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল- টেকসই উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক প্রভাবকে একসূত্রে বাঁধা।
আজকের পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিনিয়ত লাখো মানুষের জীবনে আঘাত হানছে। এই কঠিন বাস্তবতাই তাদের ভাবতে বাধ্য করে- তারা জলবায়ুজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য কিছু করতে পারে কিনা? কিংবা জলবায়ুর জন্য ইতিবাচক কিছু রেখে যেতে পারে কিনা?
ঠিক এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার পথেই জন্ম নেয় প্রজেক্ট নান্দনিক- একটি স্বপ্ন, যেখানে বর্জ্য রূপ নেয় সৌন্দর্যে, আর নারীরা খুঁজে পান আত্মমর্যাদা ও স্বনির্ভরতার নতুন আলো।
কমিউনিটির সঙ্গে পরিচয়
যেহেতু তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রতিদিন শাটলে যাতায়াত করতে করতে তাদের চোখে পড়ে শহরের পাশে গড়ে ওঠা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বসতি। একদিন কৌতূহলবশত তারা ঝাউতলা কমিউনিটিতে (বসতিতে) যায় এবং ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। সেখানে তারা জানতে পারে এখানকার বেশিরভাগ মানুষ নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, ঘরবাড়ি হারানোর মতো জলবায়ুজনিত কারণে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে ঠাঁই নিয়েছে। কিন্তু তারা চায় তাদের সন্তানরা পড়াশোনা করুক, উচ্চশিক্ষা লাভ করুক, বাল্যবিয়েতে না জড়াক। তবে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে কোনোকিছুই তাদের আশানুরূপ করতে পারে না।
বিশেষ করে নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে- তারা পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চায়, কিন্তু বাইরে গিয়ে গার্মেন্টস বা গৃহকর্মীর কাজ করলে সম্মান পায় না। নানারকম হেনস্তার পাশাপাশি পরিবহণ ঝক্কি, সেফটির অভাব, প্রেগন্যান্সি হলে চাকরিচ্যুত হওয়া- এসব মিলে তারা বিপাকে পড়েন। তন্মধ্যে গৃহস্থালির কাজ আর অধিকাংশ পরিবারই অভাব অনটনের মাঝেও ঘরের নারীদের বাইরে কাজ করতে দিতে চায় না। কথা বলে তারা জানে- তাদের সবচেয়ে বড় ইচ্ছা হলো- বাসায় বসে স্বাধীনভাবে, সম্মানের সঙ্গে কাজ করার মতো সুযোগ পাওয়া। এতে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনের সাথে ঘরে বসে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবেন তারা।
ফুলের অপচয় থেকে নতুন চিন্তার উদ্ভব
নান্দনিকের হাত ধরে বর্জ্য হয়ে উঠছে সৌন্দর্যের প্রতীক। এরই মধ্যে তারা পরলক্ষিত করে শহরের বিভিন্ন দিবস, অনুষ্ঠান ও উৎসবে বিপুল পরিমাণ ফুল ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া হয়। এই ফুলগুলো আবার কয়েক দিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে মাটিতে, ড্রেনে বা পানিতে গিয়ে পরিবেশ দূষণ করে। তাছাড়া যশোরসহ দেশের বিভিন্ন ফুল উৎপাদন এলাকায়ও প্রতিদিন টনের পর টন ফুল নষ্ট হয়।
ঘাটাঘাটি করে তারা জানতে পারলো- এসব ফুল সংরক্ষণের জন্য কেমিক্যাল ব্যবহার হয়, যা পরবর্তীতে পানি ও মাটিকে দূষিত করে। অথচ প্রতিটি ফুলেরই নিজস্ব রং (পিগমেন্ট) আছে, যা দিয়ে কাপড়ে প্রিন্ট করা সম্ভব এবং এটাই পরিবেশবান্ধব বিকল্প।
এভাবেই তাদের মাথায় আসে ইকোপ্রিন্টিং-এর আইডিয়া। যার মাধ্যমে তারা ইকোপ্রিন্টিং-এর ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে বেশকিছু ট্রায়াল এবং সম্পূর্ণরুপে ব্যবহারযোগ্য পণ্য প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছে।
ফেলে দেওয়া কাপড় জুড়ে দিয়ে স্বপ্নের সৃষ্টি
প্রথম দিকে নতুন কাপড় কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই তারা বেছে নিয়েছিল- গার্মেন্টসের রিজেক্টেড কাপড়, ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারযোগ্য নয় এমন পুরোনো কাপড়, টেইলার্সের কাটিং ওয়েস্ট।
এই কাপড়গুলো সাধারণত ল্যান্ডফিলে পড়ে থাকে বা ড্রেনে গিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। গার্মেন্টস (আরএমজি) কারখানার বর্জ্য কাপড় এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া ফুলকে প্যাচওয়ার্ক ডিজাইন করে এবং তার ওপর ফুল দিয়ে ইকোপ্রিন্ট করে তৈরি হচ্ছে ফ্যাশন পণ্য যা দেশ-বিদেশে ধূতি ছড়াচ্ছে।
নারীদের সম্পৃক্ততা
বিষয়টি সম্বন্ধে আলোচনা করলে তাদের আইডিয়া শুনে কমিউনিটির নারীরা দারুণ উৎসাহী হয়ে ওঠেন। প্রাথমিক পর্যায় তারা সেল্ফ ফান্ড থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরকে কাজে যুক্ত করে। তারা দক্ষভাবে কাজ শুরু করে এবং দ্রুতই সুন্দর প্রোডাক্ট তৈরি করতে থাকে। ক্রমান্বয়ে বাকি নারীরাও উৎসাহিত হচ্ছে এই কাজে।
তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় শাড়ি ও শার্টসহ ট্র্যাডিশনাল ও ওয়েস্টার্ন দুই ধরনের প্রোডাক্ট প্রমোট করতে থাকে। পণ্য তৈরি করে বিক্রয়ের জন্য প্রচার করার পর থেকেই অফলাইন এবং অনলাইনে তারা মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছে।
সামাজিক অবদান
সামাজিক ও আত্মিক দায়বদ্ধতা থেকে লভ্যাংশের একটি অংশ দিয়ে কাজের সাথে যুক্ত নারীদের মজুরি দিতে থাকে তারা পাশাপাশি আরেকটি অংশ দিয়ে কমিউনিটির নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করতে থাকে।
প্রজেক্ট নান্দনিক শুধু আয়ের সুযোগই তৈরি করছে এমন নয় বরং কারিগর ও আশেপাশের নারীদের সুস্থতা নিশ্চিত করতেও কাজ করছে। এ উদ্দেশ্যে তারা দ্বি-মাসিক বা ত্রি-মাসিক স্বাস্থ্যসেবা সেশনের আয়োজন করে, যেখানে অভিজ্ঞ এমবিবিএস চিকিৎসকরা মাতৃস্বাস্থ্য, মাসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা ও করণীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।
সেশনগুলোতে প্রথমেই অংশগ্রহণকারীদের সমস্যা শোনা হয়, এরপর ডাক্তাররা সেই সমস্যার সমাধান, করণীয় এবং প্রয়োজনীয় সচেতনতা নিয়ে আলাপ করেন। এই সেবাগুলো কমিউনিটির সব নারীর জন্য উন্মুক্ত এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হয়ে থাকে।
নান্দনিকের অর্জন
শুরু করার মাত্র ছয় মাসেই ৯০ হাজার টাকার অধিক আয় ও ৬০টিরও বেশি পণ্য বিক্রি করে তারা। সুবিধাবঞ্চিত ১০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগর ও কর্মক্ষম জনশক্তিতে রূপান্তর। চট্টগ্রামের জলবায়ু-অভিযোজিত ও সুবিধাবঞ্চিত নারীরা, যারা এখন শুধু কারিগরই নন বরং আত্মমর্যাদা ও স্বনির্ভরতার প্রতীক।
দেশের বাইরেও পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে যার ফলে সুদূর কানাডায় পণ্য বিক্রয়, ব্র্যাক সেন্টার ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের পণ্যের স্টলে তরুণ প্রজন্ম ও অফিসিয়ালসদের কাছে ব্যাপক সাড়া জাগে। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব প্রোগ্রাম (UIHP Cohort-6) থেকে সর্বোচ্চ প্রি-সিড ফান্ড (৭৫,০০০ টাকা) অর্জন করেন তারা।
নান্দনিকের অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ
নান্দনিকের স্বপ্ন শুধু ফ্যাশন নয়। এটি একটি যাত্রা যেখানে বর্জ্য রূপ নিবে সৌন্দর্যে, নারীরা খুঁজে পাবে নতুন শক্তি, আর পরিবেশ পাবে তার সুরক্ষা।
তারা বিশ্বাস করে, প্রতিটি বর্জ্যের ভেতর লুকিয়ে থাকে নতুন সৌন্দর্য, প্রতিটি নারীর ভেতর লুকিয়ে আছে পরিবর্তনের আভাস, প্রতিচ্ছবি। নান্দনিক সেই সৌন্দর্য ও শক্তিকেই আলোয় নিয়ে আসছে- গড়ে তুলবে এক টেকসই ভবিষ্যৎ, সৃজনশীল সমাজ এবং ক্ষমতায়িত নারী।
এ যাত্রা শুধু একটি কমিউনিটিতে থেমে থাকবে না বরং একের পর এক সুবিধাবঞ্চিত নারীকে ক্ষমতায়িত করবে এবং পরিবেশ রক্ষার মাধ্যমে নান্দনিক এগিয়ে যাবে একটি বড় স্বপ্নের পথে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
