Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

জিয়া : বাস্তববাদী রাজনীতির এক অনিবার্য নাম

Icon

শায়রুল কবির খান

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জিয়া : বাস্তববাদী রাজনীতির এক অনিবার্য নাম

১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, দেশ ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে। হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী দল চৌকশ সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

ফলে দেশের সাধারণ মানুষ ও সিপাহিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বমহলে, বিশেষত সৈনিকদের কাছে ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। বিচক্ষণতার সঙ্গে তারা পালটা ব্যবস্থা গ্রহণ ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঘটে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ এক বিপ্লব, যা জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসাবে মর্যাদার আসন লাভ করেছে।

বিগত ১৭ বছর ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার ইতিহাস বিকৃতি করেছিল। ইতিহাসের অমোঘ সত্য আবারও জাগ্রত হয়ে ফিরে এসেছে সিপাহি-জনতার পাশে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসাবে। শেখ হাসিনা সরকার ইতিহাস থেকে ৭ নভেম্বরকে চিরতরে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করেছিল। সর্বশেষ ২০১০ সালে বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে ৭ নভেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে গণতন্ত্রের মাতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন। এরপর আর ৭ নভেম্বর তারিখে কোনো সমাবেশ করতে দেয়নি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার।

২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে তিনি সর্বশেষ বক্তব্য রেখেছেন। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সে কারণেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৭ নভেম্বর চেতনা জনতার মাঝে ফিরে এসেছে সমহিমায়। বিপ্লব ও সংহতি, দুটি শব্দের মধ্যে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সত্তা নিহিত আছে। এর প্রেক্ষাপটের মধ্যে দিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়েছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের নাগরিকদের জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ৭ নভেম্বরের চেতনার পরিপূরক।

দেশবাসী সেদিন জিয়াউর রহমানের হাতেই তুলে দিয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব। ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চক্রান্তকারীদের খপ্পর থেকে দেশকে উদ্ধার করে, ২৫ বছরের গোলামি চুক্তিকে নিকুচি করে সত্যিকার স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে স্থান করে দেয়। ওই সময় বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ (গুটিকয় বৈদেশিক অনুচর ছাড়া) সশস্ত্রবাহিনীর পূর্ণ সমর্থন ও আস্থা নিয়ে দেশকে উন্নতি, অগ্রগতি ও শান্তির পথে নিয়ে যায়। সিপাহি-জনতার মিলিত বিপ্লবে নস্যাৎ হয়ে যায় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী, দেশীবিরোধী সব অকৌশল, আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন থেকে রক্ষা পায় বাংলাদেশ।

৭ নভেম্বরের বিপ্লব সম্পর্কে তদানীন্তন দৈনিক বাংলার রিপোর্টে বলা হয়, সিপাহি ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চারদিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহি-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহিরা।

সেই ৭ নভেম্বর ছিল শুক্রবার। সেদিন ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।’ জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। বলেছিলেন, সশস্ত্র বাহিনী দেশবাসীর পাশে আছে, আপনারা ধৈর্য ধারণ করুন, মহান আল্লাহ আমাদের সহায়। ওইদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পথে পথে সিপাহি-জনতা আলিঙ্গন করেছে একে অপরকে। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ নেমে আসেন রাজপথে। সাধারণ মানুষ ট্যাঙ্কের নলে পরিয়ে দেন ফুলের মালা। বারুদের গন্ধ ছাপিয়ে ভেসে আসে ফুলের সুবাস। এ আনন্দের ঢেউ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছে যায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাঁক বদলের তিনটি বড় গণ-অভ্যুত্থানেই দৃশ্যত দেশের কল্যাণে বিএনপি এগিয়ে এসেছে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমেও আবারও দেশের কল্যাণে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাঈদ ইফতেখার বলছেন, দুটি গণ-অভ্যুত্থানের পরে রাজনৈতিক শূন্যতার সুবিধা পেয়েছে বিএনপি। প্রতিটি ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আ’লীগ অত্যন্ত নেতিবাচক হিসাবে জনগণের কাছে প্রতিভাত হয়েছে। সে সুযোগ বিএনপি পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জন-বিদ্রোহ বা জনরোষের ফলে যে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, সেটার রাজনৈতিক ফসল বিএনপি ঘরে তুলেছেন। ফ্যাসিস্ট সরকার একজন জনবিপ্লবীকে মেরে ফেলতে পারবে, কিন্তু বিপ্লবকে মেরে ফেলতে পারবে না।

‘সত্যিই তাই, বিপ্লব চিরঞ্জীব’-আজকের বাস্তবতায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ইতিহাসও তাই অমোচনীয়, অনস্বীকার্য। প্রতিষ্ঠিত হবে আগামীর ‘সোনালি বাংলাদেশ’ ‘৩১-দফার’ ভিত্তিতে।

শায়রুল কবির খান : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম