Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

ইরানে জনবিক্ষোভের পেছনের কারণ

Icon

মাহজুব জুবাইরি

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানে জনবিক্ষোভের পেছনের কারণ

ইরানে বিক্ষোভ এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন দেশটি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে একটি বছর পার করেছে। ২০২৫ সালে ইসরাইল ইরানে ১২ দিনব্যাপী হামলা চালায়, যার ফলে ইরানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা নিহত হন এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ফোরদো, ইসফাহান এবং নাতানজের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়।

২০২৫ সালের শেষ সপ্তাহ থেকে ২০২৬-এর শুরুর দিনগুলোতে রাজধানী তেহরানসহ মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের শহরগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ইরানে এ ধরনের বিক্ষোভ নতুন কিছু নয়; ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ইরানি সমাজ হাজার হাজার ছোট-বড় প্রতিবাদ দেখেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিবাদের কারণগুলো বদলেছে-কখনো সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি, আবার কখনো চরম অর্থনৈতিক সংকট।

অর্থনৈতিক সংকট ও বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট? ২০২৫ সালের শেষে এই বিক্ষোভ শুরু হয় মূলত ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মাধ্যমে। মুদ্রাস্ফীতি এবং ইরানি রিয়ালের মান ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ায় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৫ শতাংশে।

অতীতেও অর্থনৈতিক কারণে ইরানে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। ২০০৮ সালে ভ্যাট বৃদ্ধির প্রতিবাদে এবং ২০১০ সালে আয়কর ৭০ শতাংশ করার চেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের আন্দোলনে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর হিজাব আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে বিশাল আন্দোলন হয়েছিল, সেখানেও সামাজিক স্বাধীনতার দাবির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষোভ মিশে ছিল।

প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি (১৯৯৭-২০০৫) তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতি সংস্কারের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারমাণবিক সংকটের কারণে তা সফল হয়নি। মাহমুদ আহমাদিনেজাদ (২০০৫-২০১৩) জনমোহিনী নীতি গ্রহণ করলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তা ব্যর্থ হয়।

সুশাসন নাকি নিষেধাজ্ঞা? ইরানের এই সংকটের জন্য দায় কার? পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা নাকি অভ্যন্তরীণ অপশাসন? ইরানের অর্থনীতি ১৯৮০ সাল থেকে কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। বৈপ্লবিক আদর্শ এবং এর খরচ মেটাতে গিয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় অর্থনীতি গড়ার বিষয়টি সব সময় অবহেলিত থেকেছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বিশাল অঙ্কের কৌশলগত চুক্তি করেও ইরান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। এই অংশীদারত্বগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইরানি জনগণের মধ্যে একটি ধারণা ছিল যে, দেশের টাকা লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন বা ফিলিস্তিনের মতো আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোতে খরচ করার কারণেই দেশের এই দশা। কিন্তু ২০২৫ সালের শুরু থেকে দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলে ইরানের প্রভাব অনেকটা কমে গেছে। এমনকি সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইরানের দেওয়া ঋণ শোধ করতে অস্বীকার করেছে। ফলে আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সংকট হচ্ছে-এই যুক্তি এখন আর সাধারণ মানুষের কাছে ততটা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন যে, সব দোষ শুধু নিষেধাজ্ঞার নয়, বরং শাসনের ব্যর্থতাও এখানে একটি বড় কারণ।

দ্বিধাগ্রস্ত নেতৃত্ব ও আসন্ন ঝুঁকি? ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে এখন দুটি ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে : ১. রাজনৈতিক নেতৃত্ব (খামেনি ও পেজেশকিয়ান), যারা মনে করছেন অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাই মূল সংকট। ২. নিরাপত্তা সংস্থাগুলো : তারা এখনো দাবি করছে, এই বিক্ষোভ বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্র এবং শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য হুমকি।

এ দুই ধরনের বক্তব্যের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এদিকে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্যে নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। লিবিয়ার মতো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাও ধ্বংস করে দিতে চায় তারা। এ পরিস্থিতির চাপে পড়ে ইরান সরকার যদি অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন না আনে, তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে শেষ পর্যন্ত দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তরিত

মাহজুব জুবাইরি : ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম