Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫

Icon

আবুল কাসেম হায়দার

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী দেশে ১১৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকার অনুমোদন দিয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয়ে আসছে। তাতে কোনো অসুবিধা আমরা দেখছি না। অথচ এ আইন সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫ (খসড়া) গেজেট আকারে জারি করার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এমনিতেই দেশের শিক্ষা খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। সরকার এ খাতে কোনো কমিশনও গঠন করেনি। নানা বিষয়ে মোট ১৪টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। অথচ জরুরি শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এ নিবন্ধে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫ (খসড়া)-এর কিছু ধারা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব।

এক. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫-এর ৯ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের লক্ষ্যে সাত সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটির সভাপতি থাকবেন মঞ্জুরি কমিশনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধ্যাপক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন প্রতিনিধি, যিনি যুগ্ম সচিবের নিচে নন; একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রবীণ অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি/জেনারেল সেক্রেটারি, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান মনোনীত দুজন সদস্য। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ওই কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন।

শিক্ষানুরাগীরা নিজস্ব অর্থায়নে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করবেন। আর তার উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের চেয়ারম্যান হবেন সরকারি আমলা তথা কমিশনের একজন সদস্য। থাকবেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য, থাকবেন সরকারি আমলা, আরও থাকবেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি/সেক্রেটারি। প্রশ্ন হলো, তখন কি এ প্রতিষ্ঠান আর বেসরকারি থাকবে? উদ্যোক্তাদের আর আগ্রহ থাকবে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উন্নতির গতি হারিয়ে যাবে।

আবার তিনজনের একটি প্যানেল জমা দিতে হবে। কেন তিনজনের প্যানেল? বিদ্যমান আইনে এসব বিষয় ছিল না। প্রয়োজনও হয়নি। প্যানেল কেন করতে হবে? আগের নিয়ম অনুযায়ী ট্রাস্টি বোর্ড শুধু একজনকে মনোনীত করে অনুমোদনের জন্য পাঠাবেন।

দুই. ধারা ১৩ : উপাচার্য : এ ধারায় বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসহ ২০ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। Scopus ইনডেক্স জার্নালে মোট কমপক্ষে ৫টি, মোট উদ্ধৃতি (Citation) কমপক্ষে ২০০টি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সংখ্যা ন্যূনতম ৫টি, স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজের সংখ্যা ৫, গুগল স্কলার এবং অভিজ্ঞ অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।

উল্লিখিত শর্তগুলো একজন উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য বা ট্রেজারার হওয়ার জন্য অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয়। উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য একজন প্রশাসক। প্রশাসনিক যোগ্যতার বিশেষ প্রয়োজন। দক্ষতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করাই একজন উপাচার্যের মূল কাজ। এসব শর্ত না রাখাই যুক্তিযুক্ত।

তিন. ধারা ১৯ : সিন্ডিকেট গঠন সম্পর্কে নতুন আইনে বলা হয়েছে-প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সিন্ডিকেট থাকবে। তাতে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ বোর্ড অব ট্রাস্টি কর্তৃক একজন নারীসহ তিনজন সদস্য, উপাচার্য কর্তৃক একজন নারীসহ তিনজন সদস্য, সরকার কর্তৃক মনোনীত একজন অধ্যাপক, শিক্ষার্থী কল্যাণ উপদেষ্টা, তিনজন অ্যালামনাই সদস্য। এ ধারায় দেখা যাচ্ছে, নারীসহ সরকার ও কমিশনসহ চারজন নতুন করে যুক্ত হলেন। তবে এ ধারায় নারীসহ সংযুক্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে সহায়ক হবে।

চার. ধারা ২৩ : কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো সরকারি বেতন স্কেলের অন্যূন ২০ শতাংশের বেশি হবে। এ সংযোজন অন্যায় হস্তক্ষেপ। স্বাধীনতার ওপর চরম নজরদারি।

পাঁচ. ধারা ২৯ : অর্থ কমিটি : বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষকে অর্থ কমিটির সভাপতি প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি কর্মকর্তা। ট্রাস্টি নন। এ কমিটির সদস্য হবেন, উপ-উপাচার্য, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ কর্তৃক একজন নারীসহ দুজন, উপ-উপাচার্য কর্তৃক একজন, সিন্ডিকেট কর্তৃক নারীসহ দুজন, বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই কর্তৃক একজন। পরিচালক (অর্থ) সদস্য সচিব হবেন।

২০১০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সভাপতি অর্থ কমিটিতে ট্রাস্টি থেকে ছিলেন। প্রস্তাবিত কমিটিতে অতিরিক্ত বহিরাগত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাদের অর্থ সংগ্রহ বা জোগানে কোনো ভূমিকা থাকবে না। তা হলে বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ জোগানে ভাটা পড়বে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হবে।

এ কমিটিতে একজন নারী সদস্য রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে ৩২ ধারায়ও একজন নারীসহ দুজন সদস্য রাখতে হবে, যারা ট্রাস্টি সদস্য নন। কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে এ ক্ষেত্রেও বহিরাগত সদস্যদের প্রাধান্য রয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্য ঠেকানোর ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে কঠিন হবে।

ছয়. ধারা ৪১ : বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের উৎস : এ ধারায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আয়ের উৎসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফি থেকে অর্থ দিয়ে কোনো মানসম্মত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা যায় না। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে হবে। এ বিষয়টি সুস্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

সাত. ধারা ৪৪ : শিক্ষার্থী ফি : এ ধারায় শিক্ষার্থী ফি কাঠামো প্রস্তুত করে কমিশনের অনুমোদন গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতারা ছাত্রছাত্রীদের ফি নির্ধারণ করবেন। যেহেতু সরকার কোনো অনুদান দেয় না, তাই ফি নির্ধারণের জন্য সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের ফি ওই বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারণ করে থাকে। সেক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে না।

আট. ধারা-৫০ : চাকরি প্রবিধানমালা : এ ধারায় ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উহার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন কাঠামো ও চাকরি প্রবিধানমূলক কমিশন থেকে অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। স্বাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন কমিশন থেকে এ বিষয় অনুমোদন নিতে হবে? বিষয় শুধু অবহিত করা যাবে মর্মে থাকা উচিত।

নয়. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫ (খসড়া) : কোথাও উল্লেখ নেই যে, ওই বিশ্ববিদ্যালয় লাভজনক বা অলাভজনক হবে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লাভজনক বা অলাভজনক উভয় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা যাবে। তাতে প্রতিষ্ঠাতারা নিজেদের ইচ্ছা মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে থাকবেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উভয় প্রকারের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে।

আমাদের দেশে শুরু থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়েছে। ১৯৯২ সালের আইনে কোনো বাধা ছিল না। ২০১০ আইনে অলাভজনক উল্লেখ করা হয়েছে। লাভজনক না হওয়ার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন কোনো বিনিয়োগ করেন না। নতুন বিনিয়োগ না করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত মানে পৌঁছানো কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। শুধু ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজ করা যাচ্ছে না। তাই অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক দৈন্যে ভুগছে। লেখাপড়ার মানও উন্নত হচ্ছে না। নানা অনিয়মে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোক্তারা জড়িয়ে পড়ছেন। লাভজনক হলে উদ্যোক্তারা নতুন নতুন বিনিয়োগ করতেন। লাভের আশায় বিনিয়োগে উৎসাহ থাকত।

দশ. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫ (খসড়া) পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, তাতে কোনো ভালো দিক নেই। বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ সবার জন্য গ্রহণযোগ্য, উপযোগী ও আধুনিক। তাই প্রস্তাবিত খসড়া আইন বাতিল করা হোক। শুধু দুটি ধারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এ সংযুক্ত করলে তা আরও আধুনিক ও উন্নত হবে দুভাবে : ১. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক ও লাভজনক উভয় ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারবে। ২. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য যে কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে।

আবুল কাসেম হায়দার : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি, সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

aqhaider@youthgroupbd.com

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম