Logo
Logo
×

বাতায়ন

নবাব সলিমুল্লাহ: সমাজ সংস্কারক

Icon

আসাদ পারভেজ

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম

নবাব সলিমুল্লাহ: সমাজ সংস্কারক

বিংশ শতাব্দির প্রথমভাগে ভূরাজনীতির কঠিন সমীকরণ বিশ্বকে করেছে টালমাটাল। অস্থির এ সময়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সমাজ সংস্করণে বলিষ্ট এক মহাপুরুষ ছিলেন নবাব খাজা স্যার সলিমুল্লাহ। ১৮৭১ সালের ৭ জুন পৃথিবী নামক ধরাধামে মহা এ মানবের জন্ম- যিনি মুসলিম সমাজের ইতিহাসে নিঃশব্দে কিন্তু গভীর প্রভাব রেখে গেছেন। তার বাবা নবাব স্যার আহসানুল্লাহ (১৮৪৬-১৯০১) এবং দাদা নবাব স্যার আবদুল গনী (১৮১৩-১৮৯৬)। জমিদার পরিবার হওয়াতে এ বঙ্গে তাদের কদরের কমতি ছিল না। নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকা নবাব পরিবারের উত্তরসূরি। তিনি রাজকীয় পরিচয়ে কেবল সীমাবদ্ধ ছিলেন না। শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও মুসলিম রাজনৈতিক জাগরণের এক দূরদর্শী স্থপতি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনে বাংলায় মুসলমানদের আত্মপরিচয় ও অধিকার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। কিন্তু তিনি সচেতন করে তোলেন এই বঙ্গের মানুষদের। তাইতো তিনি উপমহাদেশে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্যভাবে অংশীদার হলেন। 

অবশ্য ধুরন্ধর ব্রিটিশ চক্রান্তে নবাব পরিবারের পূর্বপুরুষের আর্থিক স্থিতিশীলতা থাকার পরও নবাব সলিমুল্লাহর সময়ে এসে তা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। ১৯০১ সালে পিতার প্রয়াণে ‘নবাব এস্টেটে’র দায়িত্ব তার ওপর অর্পন হয়েছিল। সমাজ সংস্কারক এই মানুষটি নবাব হিসেবে দায়িত্ব পালনের শুরুতেই ঢাকার সবকয়টি মহল্লায় স্থাপন করেন নৈশ বিদ্যালয়। ব্রিটিশ সরকার তাকে ১৯০২, ১৯০৩, ১৯০৯ এবং ১৯১১ সালে যথাক্রমে নবাব বাহাদুর; কেসিএসআই এবং জিসিএসআই উপাধি প্রদান করেন। সেসময়কার পূর্ববাংলার ভাগ্যহত মানুষের উন্নতি-সমৃদ্ধি এবং পশ্চাৎপদ ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে তার প্রচেষ্টায় ১৯০৫ সালে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে স্বতন্ত্র প্রদেশ’ সৃষ্টি হয়- ঢাকা যার রাজধানী। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ প্রশ্নে তার অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট ও সাহসী। তিনি বিশ্বাস করতেন, পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠনের মাধ্যমে মুসলমানদের শিক্ষা, প্রশাসনিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এই বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে তৎকালীন মুসলিম নেতৃত্বের মধ্যে আলাদা মর্যাদা দেয়। 

নবাব সলিমুল্লাহ পূর্ব বাংলায় একটি জ্ঞানবিভাসিত আধুনিক মধ্যবিত্ত সমাজ গড়তে সুনিপুনভাবে কাজ করেছেন। ১৯০৬ সালের ২৭-২৯ ডিসেম্বর শাহবাগ বাগানবাড়িতে অনুষ্ঠিত ‘অল-ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স’-এর ২০তম সভায় নবাব সলিমুল্লাহর দেওয়া ভাষণের (আমাদের শিক্ষার অবস্থা খুবই শোচনীয়। কলকাতায় ৩ জন অশিক্ষিতের অনুপাতে ১ জন শিক্ষিত, অথচ ঢাকায় ৮ জন অশিক্ষিতের অনুপাতে মাত্র ১ জন শিক্ষিত লোক রয়েছে। অন্য কথায়, সমগ্র বঙ্গে প্রতি ১৬ জন মুসলমানের মধ্যে ১৫ জনই অশিক্ষিত। এতে আপনারা অনুধাবন করতে পারবেন আমরা তথা মুসলমানরা শিক্ষায় কত পশ্চাৎপদ)। ক্ষুদ্রাংশ পাঠ করেও তার চিন্তা-চেতনার গভীরতা পাওয়া যায়। 

শাহবাগের বাগান বাড়িতে (৩০ ডিসেম্বর, ১৯০৬) সলিমুল্লাহর প্রস্তাবে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ গঠিত হয়। ১০৯৫ সালে নতুন প্রদেশ গঠনের সময় থেকেই নবাব সলিমুল্লাহ, নবাব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ অন্য নেতারা দাবি তুলেন ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ ২১ জানুয়ারি ১৯১২-এ ঢাকায় আসেন। সলিমুল্লাহ ও তার সহযোগী নেতাদের সাথে বৈঠকে হার্ডিঞ্জ প্রদেশ বাতিলের ক্ষতিপূরণস্বরূপ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। মুসলিম নগরী ঢাকা- যেটি অবহেলিত ও অনগ্রসর প্রাচীন নগরী। এমন একটি নগরে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি কবি রবি ঠাকুরের মতো লোকেরা চিন্তায় করতে পারেনি বলেই -এর প্রকট বিরোধীতা করেছে। গত ১০৪ বছরে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, সমাজসংস্কারক, প্রশাসকসহ যেসব বিদ্বৎসমাজ তৈরি হয়েছে, তার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা নবাব সলিমুল্লাহর অবদান অনস্বীকার্য। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমি ও অর্থ দিয়ে নবাব সলিমুল্লাহ -এর গোড়া পত্তন করেন। এসকল জমি ছিল তাদের লিজ নেওয়া (১৮৮৮ সালে নবাব আহসানুল্লাহ: ২৪৩ একর)। সূত্রমতে, বঙ্গভবন ও দিলকুশা এলাকাও তাদের লিজি ভূমি। মুসলিম হল, ইসলামিয়া এতিমখানা, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও সার্ভে স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও সলিম্ল্লুাহ নামটিকে ঘিরে বেশ কিছু জনশ্রুতি রয়েছে। 

শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান ছিল গভীর ও স্থায়ী। স্কুল, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ঢাকা নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে খাজা স্যার সলিমুল্লাহর চিন্তা ও উদ্যোগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত- যা বাংলার উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক। 

পূর্ব বাংলার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নবাব সলিম্ল্লুাহর নানামুখী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রদের প্রথম ছাত্রাবাসের নাম রাখা হয় ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’। সলিমুল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামিয়া এতিমখানাটি তার মৃত্যুর পর নামকরণ করা হয় ‘সলিমুল্লাহ এতিমখানা’। কালের পরিক্রমায় ১৮৭৫ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা মেডিকেল স্কুল। মিডফোর্ড হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে এই মেডিকেলে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অধ্যয়ন চলমান থাকে। ১৯৬২ সালে স্কুলটিকে কলেজে রূপান্তর করা হয়। নামকরণ করা হয় ‘মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ’। পরবর্তী সময়ে ‘স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ’। বর্তমানে হাসপাতাল ও কলেজ মিলে পূর্ণ নাম ‘স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল’। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় তথা বুয়েটের শুরু ১৮৭৬ সালে ঢাকা সার্ভে স্কুলের মাধ্যমে। ১৯০২ সালে তৎকালীন সরকার সার্ভে স্কুলকে ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল না। নবাব আহসানুল্লাহ সে সময় ১ লক্ষ ১২ হাজার টাকা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে তিনি ইন্তেকাল করলে পরবর্তী সময়ে নবাব সলিমুল্লাহ সেই অর্থ পরিশোধ করেন। বিদ্যায়তনটির নামকরণ করা হয় ‘আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল’। ১৯৪৭ সালে এটি কলেজে উন্নীত করা হয়। ১৯৬২ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নাম দেওয়া হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়’। মহান মুক্তিযুদ্ধের পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’। 

ঢাকার সমাজ জীবনে পঞ্চায়েত পদ্ধতিকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে নবাব সলিমুল্লাহর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষকতা যেমন করতেন, তেমনি করতেন গান-বাজনা, বায়োস্কোপ প্রদর্শনী, নাট্যাভিনয় প্রভৃতির পৃষ্ঠপোষকতাও। ঈদ, ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম প্রভৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় জার্মানির খ্যাতিমান আলোকচিত্রী ফ্রিৎজ ক্যাপ ঢাকায় স্টুডিও স্থাপন করেন। স্বনামধন্য সেই আলোকচিত্রীর ছবি ঢাকার অনেক সামাজিক ইতিহাসের সাক্ষী। বঙ্গভঙ্গ রদের ঘটনায় নবাব সলিমুল্লাহ দারুণ মর্মাহত হন। তার রাজনৈতিক জীবনে স্থবিরতা আসে। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন। মাত্র ৪৪ বছরের জীবনে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ সর্বভারতীয় পর্যায়ে যতটুকু প্রভাব ফেলতে পেরেছিলেন তা তার উত্তর ও পূর্বপুরুষদের কেউই পারেনি। 

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন বিনয়ী, দায়িত্বশীল ও মানবিক। সমাজসেবায় অকাতরে ব্যয় করতে গিয়ে জীবনের শেষভাগে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন। ক্ষমতা বা সম্পদের মোহ নয়, জাতির ভবিষ্যৎই ছিল তার প্রধান চিন্তা। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তার ইন্তেকালে বাংলার মুসলমানরা হারান একজন অভিভাবকসুলভ নেতাকে। তবে তার আদর্শ ও কর্ম আজও প্রাসঙ্গিক। খাজা স্যার সলিমুল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন- শিক্ষা, রাজনৈতিক সচেতনতা ও নৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া কোনো জাতির টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। মুসলিম জাগরণের এক নীরব, দৃঢ় ও আত্মত্যাগী পথপ্রদর্শককে সম্মান জানাই। 

লেখক: আসাদ পারভেজ লেখক, গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম