Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

লাতিন আমেরিকায় ‘ব্যানানা রিপাবলিকের’ প্রত্যাবর্তন

Icon

ফ্যাবিও আন্দ্রেস দিয়াজ পাবন ও পেদ্রো আলারকন

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

লাতিন আমেরিকায় ‘ব্যানানা রিপাবলিকের’ প্রত্যাবর্তন

পেরুর রাস্তায় পুলিশি পাহাড়া। সংগৃহীত ছবি

দক্ষিণ আমেরিকা এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কারাকাসে হামলা, নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ এবং কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টদের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি-সবই ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। বাইরের দেশের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের পাশাপাশি লা পাজ থেকে সান্তিয়াগো এবং বুয়েনস আইরেস থেকে কুইটো পর্যন্ত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হচ্ছে। ২০২৬ সালের শেষের দিকে এ অঞ্চলের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আবারও নির্বাচন হতে যাচ্ছে।

কয়েক দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে না পৌঁছানো এবং মহামারি-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কমে যাওয়ায় মানুষ এখন কট্টরপন্থি ও চটকদার (পপুলিস্ট) নেতাদের প্রতি ঝুঁকছে। বিপদটা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; রাজনীতির সামরিকীকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য হুমকি অঞ্চলটিকে আবারও ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ (দুর্বল ও অস্থিতিশীল রাষ্ট্র) এবং জোরজবরদস্তিমূলক কূটনীতির যুগে ঠেলে দিচ্ছে। এসব ঘটনা মিলে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। বাড়তে থাকা নিরাপত্তাহীনতা, অন্তঃসারশূন্য রাজনীতি এবং বাইরের চাপ-সব মিলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলটি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বদলে আবারও অন্যের আধিপত্যের শিকার হতে চলেছে।

পেরুর উদাহরণটি এ ক্ষেত্রে বেশ সতর্কবার্তামূলক। দুই দশক ধরে ভালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে স্থিতিশীল মুদ্রা (সল) থাকা সত্ত্বেও দেশটি রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হতে পারেনি। গত নয় বছরে সাতজন প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন গভীর রাজনৈতিক সমস্যারই ইঙ্গিত দেয়। সমাজবিজ্ঞানী জুলিও কোটলারের মতে, পেরুর ধনীরা কাঁচামাল রপ্তানি করে লাভবান হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তা ভাগ করে নেয়নি বা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়েনি। ফলে সেখানে ঔপনিবেশিক মানসিকতা, লিঙ্গ ও জাতিগত বৈষম্য এবং অকার্যকর সরকারি সেবা রয়ে গেছে, যা সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে।

এই ভঙ্গুর অবস্থার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। লিমায় চাঁদাবাজি ও সহিংসতার কারণে পরিবহণ ধর্মঘট শহরকে বারবার অচল করে দিয়েছে; ২০২৫ সালে অনেক বাসচালককে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট হোসে জেরির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে এক র‌্যাপার ও পথশিল্পী গুলিবিদ্ধ হন। কংগ্রেসের স্পিকার তাকে ‘তেরুকো’ (অতীতে সন্ত্রাসীদের বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ) বলে অভিহিত করেন। ভিন্নমতাবলম্বী, বিশেষ করে আদিবাসী বা কৃষকদের দাবিকে অবৈধ ঘোষণা করতে এবং তাদের দমানোর জন্য এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়। এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সমস্যাগুলোকে আলোচনার বদলে পুলিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এর জবাবে পেরু সরকার জনসমাগমস্থলে সামরিকায়ন ঘটিয়েছে। জরুরি অবস্থা জারি করে ‘নিরাপত্তাহীনতার অবসান না হওয়া পর্যন্ত’ রাস্তায় সেনা নামানো হয়েছে। ইকুয়েডরও একই পথে হেঁটেছে, এমনকি ‘অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত’ ঘোষণা করেছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন রাজনৈতিক দাবিগুলোকে উপেক্ষা করে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তখন রাজনীতি ভয়ের বিষয়ে পরিণত হয়। পেরুর কংগ্রেস এখন সংস্কারের জায়গার বদলে কায়েমি স্বার্থরক্ষার একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনি প্রচারণায় এ প্রবণতা আরও বাড়ছে। শীর্ষ প্রার্থীরা বড় কারাগার তৈরি, ড্রোন নজরদারি এবং বন্দিদের সালভাদরের কারাগারে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির মেয়ে কেইকো ফুজিমোরি প্রকাশ্যে ‘মানো দুরা’ বা কঠোর হাতে দমনের কথা বলছেন। পুরো আন্দিজ অঞ্চলে ‘শৃঙ্খলা’-কেই জাদুকরি সমাধান হিসাবে দেখা হচ্ছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রেরও সমর্থন রয়েছে। কিন্তু এটি সহিংসতার মূল কারণ, যেমন সামাজিক বঞ্চনা ও বিচারহীনতা দূর করতে ব্যর্থ।

চিলির উদাহরণও লক্ষণীয়। নির্বাচনে হোসে আন্তোনিও কাস্তের জয়ের পর স্বৈরাচারী পিনোশের পক্ষে স্লোগান শোনা গেছে, যা একনায়কতন্ত্রের প্রতি মানুষের আকুলতা প্রকাশ করে। মানুষ যখন মনে করে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কথা ভাবছে না, তখন তারা ‘কঠোর শাসনের’ দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে সেনাবাহিনী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং সমাজ সামরিকায়িত হয়। রাজনীতিক এবং সামরিক বাহিনী তখন নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে স্থানীয় বা বিদেশি স্বার্থ রক্ষা করতে শুরু করে।

এ অঞ্চলে কট্টর পপুলিজম এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সামরিক হস্তক্ষেপ বা বোমা হামলা একই সূত্রে গাঁথা। ক্যারিবীয় অঞ্চলে মনরো ডকট্রিনের পুনরুত্থান এবং শক্তির ব্যবহার (যাকে তথাকথিত ‘ডন ডকট্রিন’ বলা হচ্ছে) প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক বৈধতার বদলে জবরদস্তিই এখন শাসনের মূলমন্ত্র। আর্জেন্টিনার নির্বাচনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি বা মাদক পাচারকারীদের বিনা বিচারে হত্যা-সবই একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এর ফলে রাষ্ট্র দুর্বল হয় এবং সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে, যা বিদেশি হস্তক্ষেপকে আরও সহজ করে তোলে।

নেতারা যখন ভিন্নমত দমনে সামরিকীকরণের পথ বেছে নেন, তখন তারা রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে ফেলেন-ঠিক যেমনটা অতীতে ‘ব্যানানা রিপাবলিক’গুলোর ক্ষেত্রে ঘটেছিল। দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দুর্নীতিগ্রস্ত আইনসভা এবং রাজনীতিকৃত নিরাপত্তা বাহিনী আবারও রাজনীতির নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেনিজুয়েলায় মিসাইল হামলা এবং মাদুরোকে অপহরণের ঘটনা প্রমাণ করে, আজকের এই চিত্রনাট্য আরও বেশি নগ্ন, হিংস্র এবং লেনদেনভিত্তিক।

তবে ভিন্নপথও খোলা আছে, কিন্তু তা শুরু করতে হবে সমস্যাটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে। সহিংসতা বাস্তব, কিন্তু বৈধতা ছাড়া নিরাপত্তা ক্ষণস্থায়ী। জরুরি অবস্থা জারি বা জেলখানা বাড়িয়ে আন্দিজ অঞ্চলের অস্থিরতা দূর করা যাবে না। একমাত্র উপায় হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সেই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যগুলো দূর করা, যা সহিংসতাকে লাভজনক করে তোলে। বর্তমানের এই লুটেরা রাজনীতির খোলস পালটানো ছাড়া এটি সম্ভব নয়।

২০২৬ সালে যদি ডানপন্থী পপুলিজম চলতে থাকে, তবে আরও জরুরি অবস্থা, আরও অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং আরও সামরিক অভিযান দেখা যাবে। বিদেশিরাই তখন এ অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এটি হবে ‘ব্যানানা রিপাবলিকের’ একটি আধুনিক সংস্করণ, যার সঙ্গে যুক্ত হবে ‘নিরাপত্তা’ নামক তকমা। এটি হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘ফিফা পিস প্রাইজের’ মতো ভূরাজনৈতিক কোনো পুরস্কার এনে দিতে পারে, যা দেখতে সফল মনে হলেও বাস্তবে ব্যর্থ। এই পথ থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো রাজনীতিকে উর্দির ছায়া এবং পপুলিজম থেকে মুক্ত করা, যাতে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর কায়েমি স্বার্থের আড়ালে হারিয়ে না যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অনৈতিক চাপের মুখে এই কাজটি কঠিন হবে, তবুও গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় এর বিকল্প নেই।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তরিত

ফ্যাবিও আন্দ্রেস দিয়াজ পাবন : আফ্রিকান সেন্টার অব এক্সিলেন্স ফর ইনইকুয়ালিটি রিসার্চের গবেষক

পেদ্রো আলারকন : ইউনিভার্সিটি অব কেপ টাউনের গ্লোবাল ফোরাম ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের রিসার্চ ফেলো

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম