Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

শিক্ষকের উন্নয়নই শিক্ষার উন্নয়ন

Icon

ড. মোহাম্মদ আসিরুল হক

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষকের উন্নয়নই শিক্ষার উন্নয়ন

সংগৃহীত ছবি

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলো দেশের উচ্চশিক্ষার এক বিশাল অংশ ধারণ করে। প্রায় ২২০০ কলেজে দেড় লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মরত, যারা দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। কিন্তু এ বিশাল ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকট-অধিকাংশ শিক্ষকই কার্যকরভাবে পেডাগোজির জ্ঞান, বিষয়বস্তুভিত্তিক জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সমন্বিত ধারণা অর্থাৎ TPACK (Technological Pedagogical Content Knowledge) সম্পর্কে পর্যাপ্তভাবে অবগত নন। ফলে শিক্ষকরা পাঠদান প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীরা শিখনফল অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। এটি এক ধরনের ‘নির্বাক সংকট’-যেখানে শিক্ষক পড়ান, ছাত্র শোনে, কিন্তু শিক্ষণ ঘটে না।

TPACK মডেল কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে দক্ষ ও ভালো রেজাল্টধারী হলেই একজন যে ভালো শিক্ষক হবেন এবং ছাত্রদের কার্যকর শিক্ষণে সহায়তা করতে পারবেন, বিষয়টি এমন নয়। TPACK মডেলটি মূলত একটি কাঠামো যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে শিক্ষকরা প্রযুক্তি, বিষয়বস্তু ও শিক্ষণপদ্ধতির সমন্বয় ঘটিয়ে কার্যকর পাঠদান করতে পারেন। TK (Technological Knowledge) বা প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা-যেমন মাল্টিমিডিয়া, অনলাইন রিসোর্স, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম; PK (Pedagogical Knowledge) অর্থাৎ কীভাবে শেখানো যায়, কোন শিক্ষণ কৌশল কার্যকর, শিক্ষার্থীর মানসিকতা ও শিখন প্রক্রিয়ার বোঝাপড়া এবং CK (Content Knowledge) অর্থাৎ শেখানোর বিষয়বস্তুর গভীর জ্ঞান-এ তিনটি উপাদান যখন পরস্পর মিশে যায়, তখন শিক্ষক শুধু তথ্য দেন না, শিক্ষার্থীর চিন্তা, বোঝা ও প্রয়োগের দক্ষতা তৈরি করেন। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোয় এ ত্রিমাত্রিক জ্ঞানের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন-প্রযুক্তি আছে, বিষয় আছে, কিন্তু শিক্ষণ পদ্ধতি ও মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়া অনুপস্থিত।

সমস্যার শিকড় : শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থার ঘাটতি

অধিকাংশ কলেজ শিক্ষক নিয়োগ পান শুধু বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার ভিত্তিতে। শিক্ষকতার পেশায় প্রবেশের জন্য পেডাগোজির প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক নয়। ফলে তারা ‘শিক্ষক’ হলেও প্রকৃত অর্থে ‘ট্রেইন্ড ফ্যাসিলিটেটর’ নন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা জরুরি হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজ শিক্ষকদের জন্য এরূপ পদ্ধতিগত পেডাগোজির প্রশিক্ষণ এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলাফল : শিক্ষকরা পাঠদান করেন লেকচারভিত্তিক পদ্ধতিতে, শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বা প্রযুক্তি ব্যবহার ছাড়াই। শিক্ষকরা ক্লাসের চেয়ে বেশি সময় দেন প্রশাসনিক ও পরীক্ষাসংক্রান্ত কাজে। ফলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়। প্রযুক্তি বা নতুন শিক্ষণ কৌশল নিয়ে চিন্তা করার সময়ই থাকে না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা প্রধানত একাডেমিক ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল। কোনো পেডাগোজির সার্টিফিকেশন বা প্রশিক্ষণকে যোগ্যতার মানদণ্ড হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। ফলে ‘কে ভালো শেখাতে পারে’ নয়, বরং ‘কার রেজাল্ট ভালো’-এটাই নিয়োগের মূল মাপকাঠি। এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার গুণগতমান ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কলেজ পর্যায়ে শিক্ষণ কার্যক্রম মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধান কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে পাঠদান কার্যক্রমের মান যাচাই হয় না। ফলে কোনো শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না নিলেও, প্রযুক্তি ব্যবহার না করলেও, তার ওপর কোনো প্রশাসনিক বা পেশাগত চাপ পড়ে না। অনেক কলেজেই পর্যাপ্ত আইটি ল্যাব, স্মার্ট ক্লাসরুম, কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ নেই। কিন্তু মূল সমস্যা অবকাঠামো নয়, বরং ‘ব্যবহারের অজ্ঞতা’-যেখানে প্রযুক্তি আছে, কিন্তু শিক্ষক তা ব্যবহার করতে জানেন না বা আগ্রহী নন।

যখন শিক্ষকরা পেডাগোজিতে দুর্বল হন, তখন শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে নিষ্ক্রিয়, মুখস্থকেন্দ্রিক ও পরীক্ষানির্ভর। ফলে তারা সমালোচনামূলক চিন্তা, বিশ্লেষণী দক্ষতা বা সৃজনশীল সমস্যা সমাধানে পিছিয়ে পড়ে। এটি সরাসরি দেশের এসডিজি-৪ (গুণগত শিক্ষা) অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এমন শিক্ষার্থী বের হচ্ছে, যারা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতায় দক্ষ নয়।

উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা

ফিনল্যান্ডে শিক্ষক হতে চাইলে প্রথমেই পেডাগোজির ট্রেনিং বাধ্যতামূলক। প্রত্যেক শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে teacher education program সম্পন্ন করতে হয়, যেখানে TPACK ধারণাটি শিক্ষার কেন্দ্রে থাকে। সিঙ্গাপুর সরকার প্রত্যেক শিক্ষককে বছরে ন্যূনতম ১০০ ঘণ্টা পেশাগত উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে বাধ্য করেছে। সেখানে TPACK মডেলের ওপর ভিত্তি করে ‘ICT-in-Education Masterplan’ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষকরা প্রযুক্তির সঙ্গে পাঠদানের নতুন রূপ আবিষ্কার করছেন। যুক্তরাজ্যে প্রতিটি কলেজে OFSTED (Office for Standards in Education) নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে শিক্ষণ কার্যক্রমের মান যাচাই করা হয়। যেসব শিক্ষক উদ্ভাবনী শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন, তাদের জন্য পুরস্কার, পদোন্নতি ও গবেষণা অনুদান রয়েছে। দায়বদ্ধতা ও প্রণোদনার এ ভারসাম্য শিক্ষকের মনোভাব বদলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেকসই সমাধান

ক. বাধ্যতামূলক পেডাগোজির প্রশিক্ষণ প্রবর্তন : প্রথমেই শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য পেডাগোজির প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার ট্রেনিং দপ্তরের অধীনে Teacher Development Institute (TDI) প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যেখানে শিক্ষকদের TPACK কাঠামোর ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যারা ইতোমধ্যে শিক্ষক হিসাবে আছেন, তাদের জন্য জরুরিভিত্তিতে এ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

খ. ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন : প্রশিক্ষণ এককালীন নয়, বরং চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। প্রতিবছর শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সময়ের প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করলে ব্যয়ও কমবে, অংশগ্রহণও বাড়বে।

গ. পাঠ্যসূচি ও সময়সূচির পুনর্গঠন : বছরজুড়ে পরীক্ষার কারণে ক্লাসে অরাজকতা দূর করতে একাডেমিক ক্যালেন্ডার জরুরি। ক্লাস ও পরীক্ষা পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হলে শিক্ষকদের শেখানোয় মনোযোগ বাড়বে। এক্ষেত্রে বছরের ৩ মাস শুধু পরীক্ষার জন্য রেখে (যেমন, অক্টোবর-ডিসেম্বর) বাকি ৯ মাস নিবিড়ভাবে শ্রেণি কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে।

ঘ. প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ : প্রতিটি কলেজে কমপক্ষে একটি স্মার্ট ক্লাসরুম ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের হাতে প্রযুক্তি দিলেই হবে না-তাদের তা ব্যবহার শেখাতে হবে, এবং তা কীভাবে পাঠদানে অর্থবহভাবে যুক্ত হয়, সেটি বোঝাতে হবে।

ঙ. মনিটরিং ও দায়বদ্ধতার কাঠামো গঠন : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি Teaching Quality Assurance Cell (TQAC) গঠন করতে হবে, যারা নির্দিষ্ট মানদণ্ডে শিক্ষকদের পাঠদান পর্যবেক্ষণ করবে। শিক্ষণ কার্যক্রমকে বার্ষিক মূল্যায়নের অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেখানে ছাত্রদের প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় থাকবে।

চ. প্রণোদনা ব্যবস্থা ও পেশাগত সম্মান বৃদ্ধি : উদ্ভাবনী শিক্ষকরা যেন প্রণোদনা পান; যেমন-গবেষণা অনুদান, প্রশিক্ষণ ভাতা, পদোন্নতি বা স্বীকৃতি। শিক্ষকতার পেশাকে ‘প্রেরণার ক্ষেত্র’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, শুধু চাকরি নয়।

ছ. নীতিগত সংস্কার ও সহযোগিতা : শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বিত নীতি দরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর বা যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম শুরু করতে পারে-‘টিচিং ফেলোশিপ’ মডেলে।

শিক্ষকের উন্নয়নই শিক্ষার উন্নয়ন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো বাংলাদেশের মানবসম্পদ গঠনের এক বিশাল ক্ষেত্র। কিন্তু যদি শিক্ষক নিজেই প্রযুক্তি ও শিক্ষণ পদ্ধতিতে দক্ষ না হন, তবে সেই ক্ষেত্র অনুর্বরই থেকে যাবে। TPACK মডেল আমাদের শেখায়-প্রযুক্তি কোনো যন্ত্র নয়, বরং চিন্তার পদ্ধতি। শিক্ষক যদি তা আয়ত্ত করেন, শিক্ষার্থীরা তখন শিখতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে, চিন্তা করতে শেখে। দেশে গুণগত শিক্ষা অর্জনের একমাত্র পথ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি। যতদিন না শিক্ষক ‘পড়ানো’ নয়, ‘শেখানো’কে কেন্দ্রীয় দায়িত্ব হিসাবে নেবেন-ততদিন প্রযুক্তি, নীতি বা অবকাঠামো কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।

ড. মোহাম্মদ আসিরুল হক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, এমসি কলেজ, সিলেট

asirul@gmail.com

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম