Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

পায়ের নিচে অদৃশ্য শহর

Icon

খালিদ মাহমুদ

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পায়ের নিচে অদৃশ্য শহর

ঢাকা শহরকে আমরা সাধারণত দেখি এর রাস্তা, ভবন আর যানজটে আটকে থাকা মানুষের ভিড় দিয়ে। কিন্তু এ শহরের আরেকটি বড় অংশ রয়েছে আমাদের চোখের আড়ালে, ঠিক আমাদের পায়ের নিচে। মাটির নিচে ছড়িয়ে আছে পানির পাইপ, পয়ঃনিষ্কাশনের লাইন, বৈদ্যুতিক কেবল, অপটিক্যাল ফাইবার, গ্যাসের পাইপ আর এখন মেট্রোরেলের সুড়ঙ্গ ও স্টেশন। এসব না থাকলে ঢাকা অচল হয়ে পড়ত। অথচ এ অদৃশ্য শহর নিয়ে আমাদের ভাবনা খুবই কম।

ইতিহাসে মাটির নিচের ভূমিকা ছিল গভীর ও বহুমাত্রিক। প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে ভূগর্ভকে অনেক সময় পবিত্র বলে মনে করা হতো। মিসর বা রোমে মাটির নিচে তৈরি হতো সমাধি ও উপাসনালয়। মানুষের বিশ্বাস ছিল, এটি আত্মা ও ঈশ্বরের কাছাকাছি যাওয়ার স্থান। পরে সময় বদলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধের সময় মাটির নিচ হয়ে ওঠে জীবন বাঁচানোর আশ্রয়। পারমাণবিক হামলার ভয়ে পাহাড় কেটে, পাথরের গভীরে তৈরি করা হয় বাংকার। তখন মাটির নিচ মানেই ছিল নিরাপত্তা। তবে আজ সেই চিত্র আবার বদলেছে। যা এক সময় ছিল বেঁচে থাকার প্রয়োজন, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। ধনী দেশগুলোতে এবং বিত্তবানদের মধ্যে ব্যক্তিগত ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র এখন মানসিক নিরাপত্তার প্রতীক।

ঢাকায় মাটির ব্যবহারে অবশ্য এমন বিলাসিতার কোনো ছাপ নেই। ব্রিটিশ আমল থেকেই পুরান ঢাকায় পয়ঃনিষ্কাশন আর পানির লাইন বসানো শুরু হয়েছিল। কিন্তু তখন শহর ছিল ছোট, চাপও ছিল কম। আজকের ঢাকা ভিন্ন। দেড়-দুই কোটি মানুষের এ শহরে প্রতিদিন পানি সরবরাহ করছে ওয়াসা, গ্যাস আসছে তিতাসের লাইনে, ইন্টারনেট চলে ফাইবার কেবলে-সবই মাটির নিচ দিয়ে। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে এক লাইনের ওপর আরেক লাইন বসানো হয়েছে বছরের পর বছর। কোথাও রাস্তা খুঁড়লে দেখা যায়-বৈদ্যুতিক তার, পানির পাইপ আর টেলিফোন কেবল একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে সামান্য কাজেই বড় ভোগান্তি তৈরি হয়।

মেট্রোরেল ঢাকার ভূগর্ভ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দিয়েছে। শাহবাগ, ফার্মগেট বা মতিঝিলের মতো ব্যস্ত এলাকায় মাটির নিচে স্টেশন আর সুড়ঙ্গ তৈরির সময় বোঝা গেছে ঢাকা শহরের নিচে কী পরিমাণ জটিল অবকাঠামো আগে থেকেই আছে। কোথাও নর্দমার লাইন, কোথাও পানির পাইপ, কোথাও আবার পুরোনো ভবনের ভিত্তি। এ বাস্তবতা দেখিয়ে দেয় ঢাকা শহর শুধু উপরের দালানে নয়, নিচের স্তরেও কতটা ঘন।

ঢাকায় ভূগর্ভ মানেই কিন্তু শুধু অবকাঠামো নয়, ভয়ও আছে। প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতার সময় মানুষ বোঝে, মাটির নিচের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করলে শহর কীভাবে অচল হয়ে যায়। বৃষ্টির পানি নামার পথ না পেয়ে রাস্তায় জমে থাকে, বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ে। তখন আমরা দোষ দিই বৃষ্টিকে, অথচ সমস্যার মূল থাকে নিচে; বন্ধ হয়ে যাওয়া নালা, অবৈধ সংযোগ আর অপরিকল্পিত পাইপলাইনে।

ডিজিটাল ঢাকাও এলো মাটির নিচেই দাঁড়িয়ে। ব্যাংকিং, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট-সবকিছুর জন্য যে তথ্য আদান-প্রদান হয়, তার বড় অংশ যায় অপটিক্যাল ফাইবার কেবল দিয়ে। এ কেবলগুলো মাটির নিচে থাকার কারণেই তুলনামূলক নিরাপদ। কিন্তু পরিকল্পনা না থাকায় একবার রাস্তা কাটলেই কেবল ছিঁড়ে যায়, হঠাৎ ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। এতে বোঝা যায় অদৃশ্য এ ব্যবস্থার ওপর আমরা কতটা নির্ভরশীল।

ঢাকা শহর এখন আর শুধু চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে না, ধীরে ধীরে উপরে ও নিচে বাড়ছে। তবে ভবন যতই উপরে উঠুক, এর ভার কিন্তু জমা হয় শহরের বুকের গভীরে। এ উল্লম্ব শহরের নিচের অংশ নিয়ে আমাদের আলোচনা খুব সীমিত। আকাশচুম্বী ভবন যেমন শহরের শক্তি ও আধুনিকতা দেখায়, তেমনি মাটির নিচের সুড়ঙ্গ, পাইপ আর তারগুলো শহরের দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে রাখে। একদিকে দৃশ্যমান চাকচিক্য, অন্যদিকে অদৃশ্য শ্রম-এ দুই মিলেই আজকের শহর। সিঙ্গাপুর, হেলসিঙ্কি বা মন্ট্রিয়ালের মতো শহরগুলো পরিকল্পিতভাবে মাটির নিচের জায়গা ব্যবহার করছে। কোথাও সেখানে তৈরি হচ্ছে পানির আধার, কোথাও খেলার মাঠ, কোথাও আবার হাঁটার পথ বা বাণিজ্যিক এলাকা। মাটির নিচের জায়গাকে তারা জাতীয় সম্পদের মতো করে দেখছে।

বিপদ হচ্ছে, যখন সবকিছু চোখের আড়ালে চলে যায়, তখন তার পেছনের দায়িত্ববোধও কমে যায়। পানির লাইন, বিদ্যুৎ বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আমরা দেখি না বলে এর অপচয়, পরিবেশগত ক্ষতি বা শ্রমের মূল্য অনেক সময় আমাদের নজরে আসে না। এতে নাগরিক ও শহরের ব্যবস্থার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এ জায়গাতেই নীতিনির্ধারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ-মাটির নিচের জটিল ব্যবস্থাকে কীভাবে মানুষের কাছে বোধগম্য ও দায়বদ্ধ করা যায়। ঢাকার সমস্যা শুধু জায়গার নয়, দৃষ্টিভঙ্গিরও। মাটির নিচের এ শহরকে গুরুত্ব না দিলে ঢাকা আরও অকার্যকর হয়ে উঠবে। শহরকে টেকসই করতে হলে শুধু উঁচু দালান নয়, মাটির সঙ্গে আমাদের নতুন করে মিতালী করতে হবে। মাটির ওপর যেমন আমরা বাস করি, তেমনি মাটির ভেতরেও শহর বাস করে। সেই অদৃশ্য শহরকে পরিকল্পনার আলোয় আনাই এখন সময়ের দাবি।

খালিদ মাহমুদ : স্থপতি, নগর উন্নয়ন পরামর্শক, এলজিইডি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম