Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

নির্বাচন, জাল কনটেন্ট এবং শনাক্তকরণ প্রযুক্তি

Icon

ড. শাহ জে মিয়া

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন, জাল কনটেন্ট এবং শনাক্তকরণ প্রযুক্তি

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কনটেন্ট তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বিশ্বজুড়ে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কোনটি মানুষের লেখা আর কোনটি এআই দ্বারা তৈরি, তা শনাক্ত করা এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ফেক কনটেন্ট এবং ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহারের ঝুঁকি প্রবল। গ্রামীণফোনের মতে, দেশে প্রায় ১২ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন, যারা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন ধরনের ফেক কনটেন্টের সম্মুখীন হতে পারেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনটি প্রধান উপায়ে ডিপফেক বা ফেক কনটেন্ট ব্যবহার করা হতে পারে। প্রথমত, চরিত্র হনন, যেখানে কোনো প্রার্থীর চলাফেরা বা কর্মকাণ্ড নিয়ে এআই ব্যবহার করে মিথ্যা ভিডিও তৈরি করা হতে পারে, যা দেখাবে তিনি কোনো নিষিদ্ধ স্থানে গিয়েছেন বা খারাপ কাজ করেছেন। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগ, যেখানে সংস্কারমূলক কাজের সময় প্রার্থীর কণ্ঠে নকল অডিও তৈরি করে প্রচার করা হতে পারে যে, তিনি অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা করছেন। তৃতীয়ত, কেলেঙ্কারি সৃষ্টি, যেখানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অশ্লীল বা অপ্রীতিকর ভিডিও তৈরি করে তাদের সামাজিক মর্যাদা ধ্বংস করার চেষ্টা করা হতে পারে।

বর্তমান যুগে কনটেন্ট তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনটি মানুষের লেখা আর কোনটি এআই দ্বারা তৈরি, তা শনাক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তির হাত ধরেই আসছে সমাধান। কনটেন্ট শনাক্তকরণের এ সমস্যার সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেক্সট শনাক্তকারী টুলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ সরঞ্জামগুলো কিছু দিক থেকে ৯৯ শতাংশেরও বেশি নির্ভুলতার সঙ্গে এআই দ্বারা তৈরি কনটেন্ট খুঁজে বের করতে সক্ষম; এমনকি যখন সেটি মানুষের লেখার সঙ্গে খুব সতর্কভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন জাগতে পারে, এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেক্সট ডিটেক্টরগুলো আসলে কীভাবে কাজ করে? এটি মেশিন লার্নিং (এমএল) অ্যালগরিদম ব্যবহার করে, যা এআই এবং মানুষের লেখা টেক্সটের মধ্যে ভাষাগত ও পরিসংখ্যানগত প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে থাকে। এ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার মূল বিষয়গুলো হলো ফ্রিকোয়েন্সি রেশিও, পার্টস অব স্পিচ, সিলেবল বা শব্দাংশের প্রবাহ এবং হাইফেনের ব্যবহার। এ টুলগুলো ফ্রিকোয়েন্সি রেশিওর মাধ্যমে বিশাল ডেটাসেটের সঙ্গে ইনপুট করা কনটেন্টের তুলনা করে এমন সব বাক্যাংশ খুঁজে বের করে, যা সাধারণত এআই লিখিত টেক্সটে বেশি দেখা যায়। পার্টস অব স্পিচ লেখার ব্যাকরণগত গঠন এবং সিনট্যাক্স বিশ্লেষণ করে এআইর মতো বা অন্য কোনো বিশেষ প্যাটার্ন আছে কিনা তা যাচাই করে। পুরো টেক্সটে সিলেবল বা শব্দাংশের ছন্দ এবং প্রবাহ পরীক্ষা করে। পরিশেষে এআই অনেক সময় যান্ত্রিকভাবে হাইফেন ব্যবহার করে, যা এ টুলগুলো সহজেই শনাক্ত করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেক্সট ডিটেক্টরগুলো ‘এআই লজিক’ নামক একটি প্রযুক্তির মাধ্যমে টেক্সট কেন এআই-জেনারেটেড হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার কারণ ব্যাখ্যা করে। ‘এআই ফ্রেজেস’ ডকুমেন্টের সেই অংশগুলোকে চিহ্নিত করে, যা পরিসংখ্যানগতভাবে মানুষের চেয়ে এআই উৎস থেকে আসার সম্ভাবনাই বেশি। এছাড়া, ‘এআই সোর্স ম্যাচে’র মাধ্যমে এটি শনাক্ত করে যে, টেক্সটের কোনো অংশ অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়েছে কিনা, যে কোনো কনটেন্ট বা সোশ্যাল মিডিয়া টেক্সটের সত্যতা বা ইন্টিগ্রিটি বজায় রাখতে সাহায্য করে। এ টুলগুলো অনেক ভাষা সমর্থন করে। বিভিন্ন ভাষায় এর নির্ভুলতার হার অত্যন্ত চমৎকার। উদাহরণস্বরূপ, বেশকিছু প্রচলিত টুলসের মাধ্যমে ইংরেজিতে এআই দ্বারা লেখা শনাক্তকরণের নির্ভুলতা ৯৫ শতাংশেরও বেশি।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু টেক্সট বা লেখার মধ্যেই এ জালিয়াতি সীমাবদ্ধ নেই। এর বাইরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ও অডিওর জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি বিতর্কিত রূপ হলো ‘ডিপফেক’। ডিপফেক হলো একটি এআই দিয়ে তৈরি মিডিয়া ফাইল, যেমন একটি ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং, যা দেখতে আসল বলে মনে হলেও আসলে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি, যার কোনো সত্যতা নেই। ডিপফেকের কার্যপ্রণালিতে প্রধানত দুটি বিষয় দেখা যায়। প্রথমত, ভয়েস সংশ্লেষণ বা ভয়েস সিন্থেসিস, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কণ্ঠস্বরের ছন্দ, স্বর, গতি ও বিরতির মতো বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করে হুবহু নকল করতে শেখে এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কণ্ঠস্বরে যে কোনো বক্তব্য তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ফেস সোয়াপিং বা মুখমণ্ডল পরিবর্তন। এ প্রযুক্তিতে একটি ভিডিও বা ছবিতে মানুষের মুখের বদলে অন্য একটি মুখের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। ডিপফেক প্রযুক্তির প্রভাবে সমাজে এক ধরনের ‘হ্যালুসিনেশন’ তৈরি হয়, যেখানে মানুষ সত্য ও মিথ্যার তফাত করতে পারে না। এরিক এন্ডারসন নামের একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, ডিপফেকের পেছনের মনোবিজ্ঞানের ধারণাটি হচ্ছে, ‘আমরা যা দেখি, আমাদের মন বা মস্তিষ্ক তা-ই বিশ্বাস করে বা বিশ্বাস করতে চায়।’

ডিপফেক বা এআই জেনারেটেড কনটেন্ট ছড়ানোর মূল মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় তথ্য সম্প্রচারের মাধ্যম হিসাবে পরিগণিত হয়েছে, যা যে কোনো সময়, যে কোনো গোষ্ঠীর কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে সক্ষম। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় যেসব কনটেন্ট আমাদের সামনে আসে, তার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ আর্টিফিশিয়াল অ্যালগরিদম দিয়ে তৈরি করা বলে ধারণা করা হয়। এ ফেক কনটেন্টগুলোকে বৃহৎ পরিসরে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো, মিসইনফরমেশন বা ভুল তথ্য, যা অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয় এবং এর পেছনে কোনো স্পষ্ট ক্ষতি করার উদ্দেশ্য থাকে না। অসৎ উদ্দেশ্য না থাকা সত্ত্বেও ভুল তথ্য খুব সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যটি হলো, ডিসইনফরমেশন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল তথ্য, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা ফেক কনটেন্ট, যা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয় তাদের হেয়প্রতিপন্ন করা বা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য। এমআইটির গবেষকদের ২০১৮ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টুইটারে সঠিক তথ্যের চেয়ে মিথ্যা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

এ বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যেই কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ফেক কনটেন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়া একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের নিচে কিশোর-কিশোরীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে না, যা ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এ উদ্যোগটি মূলত পরবর্তী প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণের কথা চিন্তা করে নেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান সরকার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও টুইটারকে মৌলিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং ইউটিউবের কিছু কনটেন্ট রেস্ট্রিক্টেড রাখার ব্যবস্থা করেছে। ই-সেফটি কমিশন এ উদ্যোগটি চালু করেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর জন্য ৪৯.৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানার অপশন রাখা হয়েছে, যদি তারা উপযুক্ত ফিচার ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট অনুমোদন করে। অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি উদ্যোগটি ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্তকরণ এবং নাগরিকদের নিরাপদ অনলাইন অনুশীলন সম্পর্কে অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্যও কাজ করে।

প্রযুক্তির এ উৎকর্ষের ভিড়ে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণে ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ভুয়া খবর এবং এআই-জেনারেটেড বিভ্রান্তি মোকাবিলার জন্য ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ বা সত্যতা যাচাইকরণ অত্যন্ত জরুরি। ফ্যাক্ট-চেকিং হলো যে কোনো প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়বস্তু, প্রতিবেদন বা বিবৃতির নির্ভুলতা ও সত্যতা যাচাই করার একটি প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক গবেষণা নিশ্চিত করেছে, ফ্যাক্ট-চেকিং মানুষের বিশ্বাসের নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।

আগামীর বাংলাদেশ গঠনে এ সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত সচেতনতাই হবে আমাদের প্রধান হাতিয়ার। এ প্রেক্ষাপটে আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য ফ্যাক্ট-চেকিং এবং এআই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ডিপফেক ও অন্যান্য এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করতে পারে। নেতিবাচক এআই কনটেন্ট মোকাবিলার জন্য তরুণ প্রজন্মকে ‘প্রতিরোধক এআই’ তৈরির শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই ফেক নিউজ শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিপফেক প্রযুক্তি আমাদের সামনে যেমন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, তেমনি এর সমাধানও প্রযুক্তির হাতেই রয়েছে। সরকার, মিডিয়াকর্মী, অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার এবং প্রযুক্তিবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডিপমাইন্ড ও জেমিনির মতো উন্নত এআই সিস্টেমগুলো মানবজাতির কল্যাণে এবং জটিল সমস্যার সমাধানে ব্যবহৃত হতে পারে, যদি আমরা একটি দায়িত্বশীল এআই ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারি।

ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অব বিজনেস অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া; উপদেষ্টা, বিএনপি অস্ট্রেলিয়া এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম