Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

ডিপফেক রোধে পৃথক আইন জরুরি

Icon

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ডিপফেক রোধে পৃথক আইন জরুরি

তথ্যপ্রযুক্তির নানাবিধ ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর অপব্যবহার। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীরা নিত্যদিন নানা ধরনের সাইবার অপরাধ সংঘটিত করে চলেছে। এ ধরনেরই একটি অপরাধ হচ্ছে ডিপফেক, যার একক কোনো উদ্ভাবক নেই। ইন্টারনেট জগতে বর্তমানে ডিপফেক শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিত। ২০১৭ সাল থেকেই তৈরি হয়ে আসছে ডিপফেক ভিডিও।

ডিপফেক হলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা ছবি, ভিডিও বা অডিও; যা প্রথমে সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও বাস্তবিক অর্থে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বা ভুয়া। ডিপফেক শব্দটি ‘ডিপ লার্নিং’ এবং ‘ফেক’ (নকল) শব্দ দুটি থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় গভীর-নকল। ডিপফেকভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে এর মাধ্যমে এমনভাবে কনটেন্ট তৈরি করা হয়, যেখানে কাউকে এমন কিছু বলতে বা করতে দেখানো হয়, আসলে যা তিনি করেননি বা বলেননি। ডিপফেক সাধারণত মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, যা বিদ্যমান ছবি বা ভিডিও থেকে ব্যক্তির চেহারা ও কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করে। ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও মুখ অন্য কারও ভিডিওতে বসানো হয়, অথবা এমন একটি অডিও বা ভিডিও তৈরি করা হয়, যা দেখে মনে হয় ওই ব্যক্তিই এগুলো করেছেন বা বলেছেন, যা আসলে সত্য নয়। জানা গেছে, দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক নেতাদের মুখ ও কণ্ঠস্বর নকল করে তৈরি হচ্ছে ডিপফেক অডিও ও এআই ভিডিও এবং তা হয়ে উঠেছে ডিজিটাল অপপ্রচারের নতুন অস্ত্র। এ ব্যাপারে সবার সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের এ যুগে ডিপফেক প্রযুক্তি নানাভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অনেকে তার নির্মম বলি হচ্ছেন, খোয়াচ্ছেন মানসম্মান। যেমন-ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও বিরুদ্ধে ভুয়া খবর ছড়ানো, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করা বা মানহানি ঘটানো, জাল বা নকল পর্নোগ্রাফি তৈরি করা ইত্যাদি। ফলে ডিপফেকের মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তির নামে সমাজবিরোধী, রাষ্ট্রবিরোধী বা উদ্দেশ্যমূলক যে কোনো রাজনৈতিক ভিডিও তৈরি করা যায়। প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক তথ্যমতে, ২০১৯ সালের শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই পনেরো হাজারের মতো ডিপফেক ভিডিও অনুসন্ধান করে পেয়েছে ডিপট্রেস নামক একটি এআই ফার্ম। আর এগুলোর ৯৬ শতাংশই পর্নো ভিডিও। আবার ৯৯ শতাংশ ভিডিওর টার্গেট ছিল বিনোদন জগতের নারী তারকা। বিখ্যাতদের মুখবয়ব পর্নোস্টারের মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে ভিডিওগুলো সাজানো হয়েছিল। তবে আমাদের দেশে বর্তমানে ডিপফেকের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন বিনোদন জগতের তারকা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। অনেক সময় সাধারণ মানুষও এ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি করে তাদের নামে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে শত্রুপক্ষ বা বিরোধী পক্ষ দ্বারা। এভাবে ধীরে ধীরে এ ডিপফেক প্রযুক্তি হুমকি, ভয়-ভীতি, মানসম্মান খোয়ানো, অর্থ আদায়সহ নানা অপকর্ম সম্পাদন করে চলেছে। ফলে এ প্রযুক্তি গুজব গুজব ছড়াচ্ছে এবং বাড়ছে জাতিগত বিদ্বেষ, ঘটছে নানা সংঘাত। তাই এখনই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে একপর্যায়ে তা এক কঠিন সমস্যায় পরিণত হবে, যা কারও কাম্য হতে পারে না। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন ডিপফেক শনাক্ত করার দক্ষতা অর্জন, এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কার্যকর আইন প্রণয়নসহ ডিপফেক-সংক্রান্ত অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা।

এখানে বলা প্রয়োজন, ডিপফেক থেকে সৃষ্ট এ ভয়ংকর বিপদ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ইউরোপের অন্যতম উন্নত দেশ ডেনমার্ক। ডিপফেকের বিস্তার রোধে কপিরাইট আইন সংশোধন করে নতুন আইনও করতে যাচ্ছে দেশটি। শুধু ডেনমার্ক নয়-ভারত, বাহরাইনসহ অনেক দেশই ইতোমধ্যে ডিপফেক প্রতিরোধে শক্তিশালী পৃথক আইন প্রণয়ন করেছে এবং করার উদ্যোগ নিচ্ছে। আবার কিছু দেশে অসম্মতিমূলকভাবে অন্তরঙ্গ ভিজুয়াল চিত্র প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে এ ধরনের কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ডিপফেক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। কারণ, সেসব দেশে ডিপফেক কনটেন্ট অবৈধ। যুক্তরাষ্ট্রে ডিপফেক পর্নোবিষয়ক আইন রয়েছে। আরেকটি ধারায় ডিপফেক বিষয়বস্তু নিষিদ্ধের কথাও রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিপফেক বিতরণ অবৈধ করে এবি-৭৩০ আইন করা হয় ২০১৮ সালে। সেখানে বলা আছে, নির্বাচনের ৬০ দিনের মধ্যে রাজনীতিকদের সমন্বিত নকল ফিল্ম, ছবি বা অডিও ফাইলের প্রচার নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ রহিতক্রমে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন ও ওই অপরাধের বিচার এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান প্রণয়নকল্পে একটি অধ্যাদেশ প্রণীত হয়, যা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ (২০২৫ সালের ২৫নং অধ্যাদেশ) নামে পরিচিত। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনায় এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার আর এর অপব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ডিপফেক বন্ধে পৃথক আইন প্রণয়ন করা জরুরি।

বলা হয়ে থাকে, বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। আর প্রযুক্তি তো স্থির নেই, নিত্যনতুন প্রযুক্তি বের হচ্ছে। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি বিশারদদের এখন সময় এসেছে এ ডিপফেক নামক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় বের করার। তাদের চালাতে হবে গবেষণা। বের করতে হবে এ থেকে মুক্তির পথ। পাশাপাশি সরকার, বেসকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজসহ সবাইকে একযোগে এগিয়ে এসে বের করতে হবে ডিপফেক থেকে মুক্তির সমাধান। নতুবা এ ডিপফেক প্রযুক্তির তথাকথিত অগ্রযাত্রা চলতে থাকলে একসময় আসল-নকল পার্থক্য করা যাবে না এবং সমাজে তখন কারও পক্ষেই ভালোভাবে বসবাস করা সম্ভব হবে না।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : অধ্যাপক, আইন বিভাগ ও সহযোগী ডিন, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

kekbabu@yahoo.com

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম