মিঠে কড়া সংলাপ
ডিপ স্টেট তত্ত্ব ও বাংলাদেশ
ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘ডিপ স্টেট’ বা রাষ্ট্রের মধ্যে আরেক রাষ্ট্র কথাটি এমন একটি ধারণাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যেখানে একটি দেশের নির্বাচিত সরকারের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় অদৃশ্য আরও কিছু শক্তি কাজ করে। আর সেই অদৃশ্য শক্তির ক্ষমতার কাঠামো সেদেশের আমলাতন্ত্র, পুলিশ প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, করপোরেট গ্রুপ, সংবাদমাধ্যম, সামরিক-বেসামরিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি শ্রেণির স্বার্থ সমন্বয়ে গঠিত হয়। এসব গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাসহ বিভিন্ন ধরনের কূটকৌশলের জাল বিস্তার করে দেশে দেশে অশান্তি, অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের স্বার্থ হাসিলের সক্ষমতা অর্জন করে। একটি নির্বাচিত সরকার থাকাবস্থায় অদৃশ্য এ ছায়াশক্তির ক্ষমতা কাঠামো তাদের নিজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং প্রয়োগে সক্রিয় হয়ে ওঠায় সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক সরকারের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং ডিপ স্টেট নামধারী শক্তি নিজেদের স্বার্থে বিশেষ কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে।
১৯২৩ সালে তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো ধরে রাখার চেষ্টায় সামরিক গোয়েন্দা, আমলাতন্ত্রসহ কিছু শক্তি বা নেটওয়ার্ক সেদেশে একটি সমান্তরাল ছায়ারাষ্ট্র গড়ে তোলার পর ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। অতঃপর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই, সিআইএ ইত্যাদি গোয়েন্দা সংস্থা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। আমেরিকান ডিপ স্টেট প্রভাবশালী করপোরেট শক্তি বা করপোরেশন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, ব্যাংকিং সেক্টর, সামরিক শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করাসহ জনগণের মনোভাব এবং ধারণা প্রভাবিত করতে গণমাধ্যমে প্রোপাগান্ডা সৃষ্টি করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেটকে সরকারি-বেসরকারি স্বার্থের মিশ্রণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
তবে আমেরিকান ডিপ স্টেট বা গভীর রাষ্ট্র আর ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত যে সমার্থক, তা বোধহয় কারও কাছেই অজানা নয়। কারণ আমেরিকান ডিপ স্টেটের নগ্ন থাবা এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায়, ১৯৬৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায়, ১৯৭৩ সালে চিলিতে, ২০০৩ সালে ইরাকে, ২০১১ সালে লিবিয়ায়, ২০১৪ সালে ইউক্রেনে তাদের অপতৎপরতা বা অপকর্মের কথা বাদ দিলেও অতি সম্প্রতি তেলের খনি নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা যেভাবে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট এবং তার স্ত্রীকে বলপূর্বক তুলে এনেছে এবং ইরানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাতে করে আমেরিকান ডিপ স্টেট যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অপশক্তি হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই!
মার্কিন ডিপ স্টেট একটি বাস্তব রাজনৈতিক ধারণা এবং পৃথিবীর দেশে দেশে তাদের নগ্ন থাবা বিস্তৃত। এ অবস্থায় আমাদের বাংলাদেশও তাদের কর্মক্ষেত্রের বাইরে নয়। তাছাড়া রাশিয়ার কেজিবির উত্তরসূরি এফএসবি, ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (RAW) ইত্যাদি সংস্থাও তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ডিপ স্টেটের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে থাকে। আর ডিপ স্টেট হলো মূলত একটি বহুবৃত্তীয় নেক্সাস; যা নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য কোনো রাষ্ট্রের দিকে নজর দিলে যে কোনো পদ্ধতিতে তারা সেই দেশের স্বার্থান্বেষী মহলকে হাত করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সুতরাং আমাদের দেশকেও ডিপ স্টেটের মতো বাস্তব এ শত্রুর বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, এ ডিপ স্টেট কিন্তু এখন আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার বা স্ট্রাকচার হিসাবে কাজ করে চলেছে।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে মার্কিন ডিপ স্টেটের সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া না গেলেও ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ইত্যাদি দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে আমাদের দেশে ডিপ স্টেটের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে বর্তমান অবস্থায় পৃথিবীর পরাশক্তিগুলো যেভাবে নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে; তাতে আমাদের নিজেদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সদাসর্বদা সজাগ থাকার বিকল্প নেই। কারণ বিপদে পড়লে এখন আর কেউ কাউকে রক্ষা করে না, নিজেদের রক্ষা করতে হয় নিজেদেরকেই। প্রমাণস্বরূপ, ইউক্রেনের যুদ্ধে যেমন ন্যাটো বা আমেরিকা কেউই সৈন্য পাঠিয়ে সাহায্য করেনি, তেমনি ইরানের ক্ষেত্রেও রাশিয়া বা চীন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বা করবে না। কারণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এখন আরও বেশি করে নিজ নিজ স্বার্থের দিকে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এ অবস্থায় সারা পৃথিবীতে যে কটি সাম্রাজ্যবাদী বলয় তৈরি হয়েছে, তার নেতৃত্ব কে বা কারা দেবে বা দিচ্ছে, সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন। প্রথমেই আমেরিকার বিষয়টি মাথায় রেখে বলা যায়, যে যাই বলুক, তেলের জন্য আমেরিকা কাউকে ছাড় দেবে না। আজ ভেনিজুয়েলা, কাল ইরান, এমনকি পরশু কানাডাকেও তারা ছাড় দেবে না। ইদানীং শোনা যাচ্ছে, কানাডার উত্তরাঞ্চলের খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ একটি প্রদেশের দিকে আমেরিকান ডিপ স্টেট হাত বাড়িয়ে দিয়েছে! আবার ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখল করার জন্যও আমেরিকা ছক কষে চলেছে এবং এ বিষয়ে গ্রিনল্যান্ডের নাগরিকদের মাথাপিছু এক লাখ ডলার প্রদানের প্রস্তাবের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। মোট কথা, সরকারি-বেসরকারি স্বার্থের সম্মিলিত শক্তির কাঠামোয় গঠিত আমেরিকান ডিপ স্টেটের সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
পৃথিবীর অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও হাত গুটিয়ে বসে নেই। রাশিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসও (এফএসবি) বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে তাদের স্বার্থ হাসিল করে চলেছে। আবার ভারতও তার গোয়েন্দা সংস্থা RAW-কে দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। যেমন কানাডায় RAW-এর এজেন্ট পাঠিয়ে শিখ জাতীয়তাবাদী নেতাকে হত্যা করানোসহ সংস্থাটি কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলকে সহযোগিতা করারও অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
বাংলাদেশও এসব ডিপ স্টেটের অপতৎপরতার আওতাধীন একটি রাষ্ট্র। কারণ ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশের ওপর বিভিন্ন পরাশক্তির আগ্রাসী দৃষ্টি আছে। আর বর্তমান অবস্থায় চীন, ভারত, রাশিয়া ও আমেরিকা-এ চারটি পরাশক্তি পার্শ্ববর্তী অপেক্ষাকৃত ছোট শক্তির রাষ্ট্রগুলোর ওপর তাদের আধিপত্যবাদী এবং আগ্রাসী নীতি চাপিয়ে দিতে তাদের ডিপ স্টেট কাঠামো শক্তি ব্যবহার করে চলেছে। রাশিয়া ইউক্রেনকে গিলে চলেছে, চীন তীব্বতকে গিলে তাইওয়ানকেও প্রচণ্ড চাপে রেখেছে, আমেরিকার কথাও সবার জানা, ভারতও অতীতে হায়দরাবাদসহ বেশ কয়েকটি স্বাধীন রাজ্য নিজেদের অঙ্গীভূত করে নিয়েছে, সুতরাং ভবিষ্যতেও সুযোগ পেলে তারা যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে, সে কথাটিও মনে রাখতে হবে। ভারত, চীন, রাশিয়া, আমেরিকার এসব কর্মকাণ্ডে তারা কিন্তু একে অপরের বিরুদ্ধে যাবে না। কারণ এসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিজ নিজ বলয়ে থেকে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে চলবে।
আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ, দলাদলি, হিংসা-বিদ্বেষের পরিমাণ এতটাই বেশি যে, সহজেই ভাঙন ধরিয়ে যে কোনো মুহূর্তে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কঠিন কাজ নয়। সামনের দিনগুলোয় এ আশঙ্কা আরও বেশি। কারণ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি মহল ষড়যন্ত্রের চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে এবং নিজের নাক কেটে হলেও তারা পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে পারে। সুতরাং হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ করে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাই হবে এখন সময়ের কাজ। দেশি-বিদেশি কোনো ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্রের জালে পা না দিয়ে জনগণ যাকে বা যে দলকে ভোট দেবেন, তিনি বা তারা সরকার গঠন করবেন তেমন মানসিকতা নিয়ে আমরা সবাই যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি, তেমনটাই প্রত্যাশা।
ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কলামিস্ট, বীর মুক্তিযোদ্ধা
