Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

অবহেলিত কেন দুই মহান কবির স্মৃতি

Icon

আসিফ রশীদ

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অবহেলিত কেন দুই মহান কবির স্মৃতি

‘কাল শেষ রাতে চাঁদ যখন উল্টে গিয়ে নৌকার মতো

নিজের জোছনার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে,

আমি ফররুখ আহমদের কবর দেখতে গিয়েছিলাম।’

(আল মাহমুদ, ‘ফররুখের কবরে কালো শেয়াল’)

বাংলা সাহিত্য আমাদের জাতিসত্তার এক গৌরবময় পরিচয়। এ সাহিত্যের পথনির্মাণ করেছেন বহু কবি, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও মনীষী-যাদের কলমে গড়ে উঠেছে বাঙালির চেতনা, ভাষা, স্বপ্ন ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা তাদের লেখাকে যতটা শ্রদ্ধা করি, তাদের স্মৃতি ও শেষ ঠিকানাকে ততটা সম্মান দিতে পারি না। এ অবহেলার নির্মম উদাহরণ হিসাবে উঠে আসে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দুই প্রধান কবি-ফররুখ আহমদ ও আল মাহমুদের জন্মভিটা ও কবরের করুণ অবস্থা। ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ ফররুখ আহমদ এবং ‘সোনালী কাবিন’র স্রষ্টা আল মাহমুদ। তাদের কালজয়ী লেখনী বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করলেও এ দুই মহান কবির কবর-ঢাকার শাহজাহানপুরে ফররুখ আহমদের আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামে আল মাহমুদের কবর-পড়ে আছে অযত্নে-অবহেলায়, যা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়; এটি আমাদের জাতিগত সাংস্কৃতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। কবি আল মাহমুদের কবরটির অবস্থা দেখে কবি আবদুল হাই শিকদার তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছিলেন, ‘আমাদের সম্মিলিত অবহেলা, উদাসীনতা, অনাদর এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে মৃত্যুর মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে হারিয়ে গেছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের কবর। এখন কবর বলতে আছে শুধু একটি নামফলক। আল মাহমুদের কবরের ওপর দাফন করা হয়েছে আরও কয়েকজনকে। কবরের উপর একাধিক কবর। ডাইনে-বাঁয়ে কবর। আহা এ রকম নিষ্ঠুরতা কি আল মাহমুদের প্রাপ্য ছিল!’

কবি ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে ইসলামি চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের কবি হিসাবে সুপরিচিত। তার কবিতায় রয়েছে আত্মমর্যাদা, বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের শক্তিশালী ভাষা। তিনি বাংলা কবিতায় এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, যা তার সময়ের সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল। অন্যদিকে কবি আল মাহমুদ ছিলেন গ্রামীণ জীবন, প্রেম, প্রকৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক অনন্য কবি। তার কবিতায় বাংলার মাটি, নদী, কৃষকের জীবন এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা জীবন্ত হয়ে ওঠে। এ দুই কবি শুধু কবিতা লেখেননি, তারা আমাদের সমাজ ও জাতির মননের গভীরে একটি শক্ত ভিত নির্মাণ করেছেন।

এত বড় মাপের কবিদের স্মৃতিবিজড়িত জন্মভিটা ও কবর ধ্বংস হতে চলেছে, যা সত্যিই হৃদয়বিদারক। এসব তো শুধু জন্ম বা মৃত্যুর স্থান নয়, এগুলো স্মৃতির প্রতীক, সম্মানের চিহ্ন এবং জাতির ইতিহাসের অংশ। একজন কবি তার জীবদ্দশায় সমাজকে আলো দেন, জাতিকে পথ দেখান, ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। তার মৃত্যুর পর জন্মভিটা ও কবরটি হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক নীরব শিক্ষালয়, যেখানে মানুষ এসে শ্রদ্ধা জানায়, ইতিহাসকে স্মরণ করে এবং সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করে। কিন্তু যখন সেই স্মৃতিচিহ্নগুলো অযত্নে পড়ে থাকে, তখন তা শুধু কবির প্রতি অসম্মান নয়, এটি জাতির আত্মপরিচয়ের ওপরও আঘাত হয়ে ওঠে।

আমাদের সমাজে দেখা যায়, অনেক সময় বড় বড় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা ক্ষমতাবানদের কবর ও স্মৃতিচিহ্ন অত্যন্ত যত্নে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ববোধ প্রায়ই অনুপস্থিত। কেন এমন হয়? এর মূল কারণ হলো, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগের অভাব। আমরা মুখে বলি-‘কবি জাতির সম্পদ’, ‘সাহিত্য আমাদের অহংকার’; কিন্তু বাস্তবে তাদের স্মৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে উদাসীনতা প্রকাশ করি।

ফররুখ আহমদ ও আল মাহমুদের কবর অবহেলার পেছনে কিছু বাস্তব সমস্যাও থাকতে পারে। যেমন-কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, পরিবারের অসহায়তা বা অনাগ্রহ কিংবা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। তবে কারণ যাই হোক না কেন, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কেননা একজন কবি কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নন, তিনি জাতির সম্পদ। তার কবর রক্ষা করা জাতির দায়িত্ব।

কবির জন্মভিটা বা কবর অবহেলিত হওয়া আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কী বার্তা দেয়? এটি বলে দেয়, আমরা প্রতিভাকে ব্যবহার করি, কিন্তু সম্মান দিতে জানি না। আমরা তাদের কবিতা পাঠ্যবইয়ে রাখি, আলোচনা করি, উৎসবে আবৃত্তি করি, কিন্তু মৃত্যুর পর তাদের স্মৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব নিতে চাই না। এতে করে জাতির সাংস্কৃতিক শিকড় দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ যে জাতি তার কবি-সাহিত্যিককে ভুলে যায়, সে জাতি ধীরে ধীরে নিজের আত্মপরিচয় হারাতে শুরু করে।

এ অবহেলা শুধু ফররুখ আহমদ ও আল মাহমুদের ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশের বহু কবি-সাহিত্যিকের কবর ও স্মৃতিচিহ্ন একইভাবে অযত্নে পড়ে আছে। এটি যেন একটি সামাজিক ব্যাধি। অথচ উন্নত দেশগুলোতে সাহিত্যিকদের বাসস্থান ও কবর সংরক্ষণ করা হয় ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে। অনেক দেশে কবিদের সমাধিস্থল পর্যটনকেন্দ্র হিসাবেও পরিচিত। সেখানে মানুষ যায় শ্রদ্ধা জানাতে, সাহিত্যকে অনুভব করতে, ইতিহাসের অংশ হতে। আমাদের দেশেও এমন উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব; কিন্তু আমরা সেই সাংস্কৃতিক সচেতনতার জায়গায় এখনো অনেক পিছিয়ে।

এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সরকার ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় চাইলে দেশের বরেণ্য সাহিত্যিকদের কবর সংরক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে। বড় কবি ও সাহিত্যিকদের কবরস্থানে স্থায়ী সীমানা প্রাচীর, পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা, নামফলক, আলোকসজ্জা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে নিয়মিত তদারকি করার।

এ ছাড়া সাহিত্য সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে কবিদের কবর জিয়ারত ও পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নিতে পারে। এতে করে তরুণদের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ এবং সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। গণমাধ্যমকেও এ বিষয়ে সোচ্চার ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ গণমাধ্যম যখন কোনো বিষয় তুলে ধরে, তখন তা জনসচেতনতা সৃষ্টি করে এবং কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব নিতে বাধ্য করে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। আমরা যেন শুধু কবিতা পাঠ করে কবির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ না করি, বরং তার স্মৃতির প্রতিও দায়িত্ববান হই। কবি ফররুখ আহমদ ও কবি আল মাহমুদের জন্মভিটা ও কবর অবহেলায় পড়ে থাকা মানে শুধু দুজন কবিকে অবহেলা করা নয়, এটি বাংলা সাহিত্যকেই অবমাননা করা। এ অবহেলা আমাদের আত্মসম্মান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য লজ্জাজনক।

সবশেষে বলতে হয়, কবিরা চলে যান, কিন্তু তাদের কবিতা থেকে যায়। কবিতাই তাদের অমরত্ব। তবে সেই অমরত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর জন্য তাদের কবরও সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ফররুখ আহমদ ও আল মাহমুদের মতো কবিদের কবর যদি অবহেলিত থাকে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা কী উত্তর দেব? আমরা কি বলতে পারব, আমরা আমাদের কবিদের সম্মান দিতে পেরেছি?

আজ সময় এসেছে জেগে ওঠার। কবিদের কবর অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে না। রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিলে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। কারণ কবিরা শুধু অতীত নন, তারা আমাদের পরিচয়, আমাদের গর্ব, আমাদের আত্মার ভাষা। তাদের প্রতি অবহেলা মানে নিজেদের শিকড়কে অবহেলা করা। আর শিকড়হীন জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।

জাতির বাতিঘর হিসাবে পরিচিত এই কবিদের জন্মভিটা ও কবরের এমন পরিণতি আমাদের সাংস্কৃতিক উদাসীনতারই নামান্তর। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদের স্মৃতি ও অবদান অম্লান রাখতে সরকারি উদ্যোগ এবং সাহিত্যপ্রেমীদের সচেতনতায় অবিলম্বে জন্মভিটা ও কবরগুলোর সংস্কার ও যথাযথ সংরক্ষণ প্রয়োজন। এটি কেবল দায়িত্ব নয়, বরং আমাদের জাতিসত্তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।

আসিফ রশীদ : লেখক ও সাংবাদিক

arbangladesh@gmail.com

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম