ফলাফল নির্ধারণ করবে সুইং ও তরুণ ভোট
মোবায়েদুর রহমান
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আজ ৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার। আর জাতীয় নির্বাচন হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। সুতরাং যুগান্তরে নির্বাচনকেন্দ্রিক এটিই আমার শেষ লেখা। পরের শুক্রবার অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনি ফলাফলের ওপর লেখার কথা। কিন্তু সেটি সম্ভব হবে না। কারণ আমার ব্যক্তিগত ধারণা, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের সম্পূর্ণ ফলাফল ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার মধ্যেও পাওয়া যাবে না। পাঠক, লক্ষ করুন, আমি ‘ভোটের’ কথা বলেছি, ‘নির্বাচনের’ কথা বলিনি। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারকে দুটি ব্যালট পেপার দেওয়া হবে। এ
কটি হলো, সংসদ-সদস্য নির্বাচন। আরেকটি হলো, গণভোটে হ্যাঁ বা না সিল দেওয়া। তাই যারা ভোট গণনা করবেন, তাদের দুটি করে ব্যালট পেপার গণনা করতে হবে। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই ডাবল সময় লেগে যাবে। তাই আমার ধারণা, জনপ্রতিনিধি নির্বাচন এবং গণভোট-এ দুটি ভোটের সম্পূর্ণ রেজাল্ট ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে বা ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনে পাওয়া যাবে। যেহেতু নির্বাচনের পর এটিই হবে শেষ লেখা; তাই আসুন, আসন্ন নির্বাচনের বিভিন্ন দিক এবং সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে আলোচনা করি।
বুধবার ৪ ফেব্রুয়ারি যখন এ লেখাটি লিখছি, তখন একটি জরিপের ওপর চোখ আটকে গেল। একটি জাতীয় বাংলা দৈনিকে এ জরিপটি প্রকাশিত হয়েছে। এ সম্পর্কে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম, ‘ভোট দিতে চান ৯২ শতাংশ ভোটার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ৬৭ শতাংশ।’ আলোচ্য জরিপে এ অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। আমি লক্ষ করেছি, গ্রাম-গঞ্জের কৃষক বা খেটে খাওয়া মানুষ আর শহরের মানুষের মধ্যে এবার চিন্তাধারার সামান্য হলেও তফাত রয়েছে। শহরের মানুষ দুর্নীতি দমনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন। এর কারণ হতে পারে, তারা খবরের কাগজ পড়েন, রেডিও ও টেলিভিশন শোনেন এবং দেখেন। এ দেশে শেখ হাসিনা যে লুটপাটের এক চারণভূমি রচনা করেছিলেন, সে সম্পর্কে শহরের মানুষ মোটামুটি ওয়াকিবহাল। প্রধান দুই দল বিএনপি এবং জামায়াত জুলাই বিপ্লবের পরে এবং নির্বাচনি সভাগুলোতেও বলেছে, এমন সরকার কায়েম করতে হবে, যাতে করে এ দেশে আর ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার ফিরে না আসে।
আমরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলে, ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে আমরা যা বলি, সেটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তত সিরিয়াসলি গ্রহণ করেন না। একথা ঠিক, মোবাইল ফোনের কল্যাণে গ্রাম-গঞ্জের মানুষেরও দেশের ও দশের খবর নেওয়ার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে; কিন্তু অর্থনৈতিক কারণেই হোক বা সামাজিক পরিবেশের কারণেই হোক, মোবাইলে তারা সিনেমা দেখেন, গান শোনেন এবং যাদের হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমো রয়েছে, তারা ওইসব অ্যাপে অনর্গল কথা বলেন। তবে শেখ হাসিনার গুম ও খুন, তথা আয়নাঘর সম্পর্কে গ্রামের সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ বেশি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শেখ হাসিনার আমলেও প্রচারিত হয়েছে। আমি চার-পাঁচটি নির্বাচনি প্রচারণার প্রত্যক্ষ খবর জানি। হেমন্ত মুখার্জির গানের ভাষার ‘গাঁয়ের বধূরাও’ শেখ হাসিনাকে বেশি করে জানে একজন খুনি হিসাবে।
টাঙ্গাইল, বগুড়া, সিলেট, ঢাকার উত্তরা ইত্যাদি স্থানে কয়েকটি নির্বাচনি প্রচারণায় আলাদাভাবে ভোটারদের সঙ্গে আলাপে বোঝা গেল, ওইসব প্রচারণায় ভারতের শোষণ এবং আওয়ামী লীগের জুলুম কেন নেই, সেটিতে তারা বিস্মিত হচ্ছেন।
আমাদের দেশে ভারতের মতো অত খোলামেলা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হয় না। ভারতের একটি নির্বাচনে স্লোগান উঠেছিল, ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়।’ সেবার রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস লোকসভা নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন।
এবারের বাংলাদেশের নির্বাচনে তেমন একটা নির্বাচনি উত্তাপ নেই। কারণ, সাধারণত নির্বাচনে প্রধান দুটি দল থাকে। একটি সরকার পক্ষ। আরেকটি বিরোধী পক্ষ। বাংলাদেশেও এবার প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে নির্বাচনি লড়াই চলছে। কিন্তু তারা কেউই সরকার বা বিরোধী পক্ষ নয়। দেশে এখন এমন একটি সরকার আছে, যারা কেয়ারটেকার সরকারও নয়, আবার নির্বাচিত সরকারও নয়। কিন্তু তারা জনতার সরকার। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছে তাদের। তারা ক্ষমতায় এসে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চাননি। তাই বিপ্লবের ১৮ মাসের মাথায় তারা ইলেকশন দিয়ে বিদায় নিতে চলেছেন। ফলে এবারের সরকার শুধু নিরপেক্ষই নয়, বলতে গেলে একজন নিরপেক্ষ রেফারির সরকার।
২.
অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিবদমান দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষে অনেক লোক মারা গেছেন। এবার নির্বাচনি সংঘর্ষে একজন মাত্র ব্যক্তি মারা গেছেন শেরপুরের শ্রীবরদীতে। পাঠক, আমরা এ একজনের মৃত্যুকেও হালকা করে দেখছি না। বরং আমরা আশা করেছিলাম, নির্বাচনি সংঘর্ষে এক ব্যক্তিও যেন মারা না যান। অবশ্য এখনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আর ৫ দিন বাকি আছে। প্রার্থনা করি, এ ৫ দিনে আর কোনো আদম সন্তান যেন অকালে প্রাণ না হারান।
তাই বলে নির্বাচনে কোনো উত্তাপ নেই, একথা বলা যাবে না। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল ও তাদের জোট ঢাকার বাইরে অনেক বিশাল জনসভা করছেন। সেখানে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে সেটি এমন উত্তপ্ত নয়, যা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে ধাবিত হতে পারে।
এবারে দেখছি ইন্টেলেকচুয়াল বা বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। বিগত ১৬ বছরে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে, একটি জোটপ্রধানের একটি বক্তব্য নিয়ে প্রতিপক্ষ শোরগোল তুলেছে। তারপর ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, প্রথম জোটপ্রধানের ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেল (সাবেক টুইটার) আইডি হ্যাক্ড হয়েছে। আর এ হ্যাকিংয়ে সহায়তা করেছে বঙ্গভবনেরই একজন ছোট কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। খবর বেরিয়েছে, ওই জোটের নেতৃত্বে যে দল, তার জেনারেল সেক্রেটারির ফেসবুক আইডিও নাকি হ্যাক্ড হয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, এবার সরাসরি মারামারির চেয়ে দলগুলো সাইবার অ্যাটাকে লিপ্ত হয়েছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর একটি ইউটিউব চ্যানেল চালান। তিনি ৩ ফেব্রুয়ারি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনেক এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এবং ডিপ ফেক অ্যাটাক হবে। আমাদের দেশে এআই যতখানি পরিচিতি পেয়েছে, ডিপ ফেক ততখানি পরিচিতি পায়নি। ডিপফেক হলো একজনের কণ্ঠ নকল করিয়ে বা তার ছবি বসিয়ে তাকে নিয়ে এমন কিছু বলানো, যেটা তিনি আদতেই করেননি বা বলেননি। ইতোমধ্যেই ডিপ ফেকের কয়েকটি কেস ধরা পড়েছে, যেগুলো রিউমার স্ক্যানার শনাক্ত করেছে।
এখানে আমি একটি উদ্বেগজনক অবস্থার দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সেই পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশের সর্বশেষ নির্বাচন পর্যন্ত দেখেছি, নির্বাচনি প্রোপাগান্ডা চলেছে দলীয় লাইন অনুসরণ করে। সেই লাইন অনুযায়ী গান রচনা করা হয়েছে। এখন ইউটিউবে আপলোড করা হচ্ছে। ফেসবুকেও হরেক রকমের কাহিনি ভাইরাল হচ্ছে।
এবার দেখা যাচ্ছে, বেশ কয়েকজন ইউটিউবার এবং ব্লগার নির্বাচনি পরিবেশকে ঘোলাটে করছেন। এদের অধিকাংশই দেশের বাইরে আছেন। কারও বা অবস্থান নিউইয়র্ক, কারও বা কানাডার টরেন্টো, কারও বা লন্ডন, কারও বা ফ্রান্স, কারও বা দিল্লি, আবার কারও বা কলকাতা। এরা সবাই বঙ্গতনয় বা তনয়া। আবার এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কয়েকজন ক্যালকেশিয়ান (পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে আগে ক্যালকেশিয়ান বলা হতো)।
গত ১৬ মাস হলো এদের ইউটিউব বা ফেসবুকের যন্ত্রণা বাংলাদেশের সুস্থ মানুষকে সহ্য করতে হয়েছে। নিউইয়র্ক থেকে এক মহিলা, লন্ডন থেকে এক মহিলা এবং কলকাতা থেকে একাধিক মহিলা ইউটিউবে এসে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে এমন সব বয়ান প্রচার করছেন, যেগুলোর উপসংহার হলো ‘আগেই তো ভালো ছিলাম’। এটি একটি সূক্ষ্ম পলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডা। আর এ কাজে তারা বাউল শাহ আবদুল করিমের ওই গানটির মোক্ষম এস্তেমাল করছেন। গানটি হলো, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’।
৩.
গত শুক্রবারের এ কলামে আমি বলেছিলাম, এ নির্বাচনে একটি বড় ফ্যাক্টর হবে হিন্দু ও আওয়ামী ভোট। ৪ ফেব্রুয়ারি একটি সংস্থা একটি জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ করে বলেছে, শেখ হাসিনার আহ্বান ছিল আওয়ামী সমর্থকরা যেন ভোটকেন্দ্রে না যান। কিন্তু ওই জরিপে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের ৪৮ শতাংশ এবার ভোট দেবেন এবং তারা প্রায় সবাই ধানের শীষে অর্থাৎ বিএনপিকে ভোট দেবেন। তরুণ ভোটার হলেন মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবেন। হতে পারে, পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল জরিপকারীদের প্রভাবিত করেছে।
আওয়ামী লীগ যতই ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আউড়িয়েছে, ততই মহিলাদের হিজাব পরার সংখ্যা বেড়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজে মসজিদে ঠাঁই না হওয়ায় নামাজিরা রাজপথে জুমার নামাজ আদায় করছেন। আমি একাধিক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের কথা জানি, যার শিক্ষিকারা বড় বড় আমলা বা সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রী বা কন্যা। এদের ৮০ শতাংশ হিজাব বা নেকাব পরেন। যারা পরেন না, তারা মাথায় কাপড় দেন। বেগম খালেদা জিয়াসহ ১০ মহিলাকে বিএনপি নমিনেশ দিয়েছিল। বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯। পক্ষান্তরে জামায়াত একজন নারীকেও নমিনেশন দেয়নি। নমিনেশনের এ চিত্র নারী ভোটারদের ওপর কতখানি প্রভাব ফেলবে, সেটি দেখার বিষয়।
হিন্দু প্রার্থী নমিনেশনের বেলায় বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে তেমন বড় একটা হেরফের দেখা যায় না। বিএনপির হিন্দু প্রার্থী হলেন দুজন। তারা হলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং তার বেয়াই নিতাই চন্দ্র রায়। জামায়াতের হিন্দু প্রার্থী হলেন কৃষ্ণ চন্দ্র নন্দী। হিন্দু ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ১ লাখ। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি। এ ভোট জামায়াতের চেয়ে বিএনপিতে বেশি পড়বে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।
সবশেষে সুইং ভোট বা দোদুল্যমান ভোট। দুই মাস আগে এক জরিপে বলা হয়েছিল, সুইং ভোটের পার্সেন্টেজ হলো ৪০ শতাংশ। তারপর সেটি কমতে কমতে নেমে এসেছে ২৪ শতাংশে। এখন নির্বাচনের মাত্র ৫ দিন আগে এ সুইং ভোট কত শতাংশ, সেটা কেউ বলেননি। তবে অনুমান করা হয়, তরুণ ভোট এবং সুইং ভোটই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে এবারের নির্বাচনি বরমাল্য কার গলায় পড়বে-বিএনপি না জামায়াতের গলায়? সবকিছু জানা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারির পর। ততক্ষণ পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা।
মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক
journalist15@gmail.com
