এপস্টেইন কেলেঙ্কারি : ন্যায়বিচারের অস্বস্তিকর স্মারক
সাইফুল খান
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
জেফরি এপস্টেইন। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টার। ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট ভোরবেলা। একটি নিরাপত্তা সেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় ৬৬ বছর বয়সি জেফ্রি এপস্টেইনকে। সরকারিভাবে একে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ মৃত্যু কোনো সমাপ্তি টানেনি। বরং খুলে দিয়েছে এমন এক অতলের দরজা, যার গভীরতা আজও পুরোপুরি মাপা যায়নি।
জেফ্রি এপস্টেইনের নাম আজ আর শুধু একজন যৌন অপরাধীর পরিচয় বহন করে না। এটি এমন এক প্রতীক হয়ে উঠেছে যেখানে, ক্ষমতা ন্যায়বিচারকে পরাভূত করতে পারে, অর্থ আইনের চোখে অন্ধত্ব এনে দিতে পারে এবং একটি গোটা ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী অপরাধের নীরব সহযোগী হয়ে উঠতে পারে। তার মৃত্যুর পর বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি মৌলিক প্রশ্ন। একজন ব্যক্তি কীভাবে দশকের পর দশক ধরে ভয়াবহতম মানবিক অপরাধ চালিয়ে যেতে পারে! অথচ রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিচারব্যবস্থা তাকে থামাতে চেষ্টাও করেনি?
অন্ধকারের স্থাপত্য : তদন্ত নথিপত্র, আদালতে দেওয়া শপথবদ্ধ সাক্ষ্য এবং ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি মিলিয়ে যে চিত্র উঠে আসে, তা কোনো একক অপরাধের গল্প নয়। বরং এক সুপরিকল্পিত, বহুস্তরীয় নেটওয়ার্কের ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। সম্ভবত নব্বইয়ের দশক থেকেই এপস্টেইন পরিচালনা করে আসছিলেন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের যৌন পাচার ও নিয়মতান্ত্রিক নির্যাতনের এক জঘন্য কাঠামো। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশের বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। দারিদ্র্য, ভাঙা পরিবার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাতেন তার সহযোগীরা। প্রাথমিকভাবে ‘ম্যাসাজ থেরাপি’ বা সহজ কাজের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েদের নিয়ে আসা হতো নিউইয়র্কের আপার ইস্ট সাইডে অবস্থিত বিশাল টাউনহাউজে, কিংবা ফ্লোরিডার পাম বিচের জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে। কিন্তু প্রলোভনের আড়ালে লুকিয়ে থাকত নিষ্ঠুরতম ফাঁদ। যা শুরু হতো সাধারণ কথাবার্তায়, তা দ্রুত রূপ নিত জোরপূর্বক যৌন নির্যাতনে। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, অনেক ভুক্তভোগীকেই পরে ব্যবহার করা হতো অন্য মেয়েদের নিয়ে আসার মাধ্যম হিসাবে। আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে তৈরি হতো একটি ‘রিক্রুটমেন্ট পিরামিড’, যেখানে একজন ভুক্তভোগী অজান্তেই পরবর্তী ভুক্তভোগী তৈরির হাতিয়ারে পরিণত হতো।
এ অপরাধের ভৌগোলিক বিস্তৃতিও ছিল বিস্ময়কর। নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, নিউ মেক্সিকো, প্যারিস এবং সবচেয়ে কুখ্যাত স্থান ক্যারিবিয়ান সাগরে অবস্থিত তার ব্যক্তিগত দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’, যা পরে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ‘পেডোফাইল আইল্যান্ড’ নামে পরিচিতি পায়। স্থানীয়রা একে বলতেন ‘অপবিত্র দ্বীপ’। এই বিচ্ছিন্ন স্থানে প্রাইভেট জেটে আনা হতো অতিথিদের, আর সংঘটিত হতো এমন অপরাধ যা থেকে যেত কোনো সাক্ষী বা রেকর্ডের বাইরে।
২০০৮ : ন্যায়বিচারের প্রথম পরাজয় : ফ্লোরিডার পাম বিচে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো বড় মামলা দায়ের হয় ২০০৮ সালে। ফেডারেল তদন্তকারীরা শনাক্ত করেছিলেন তিন ডজনেরও বেশি সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে। প্রমাণের পাহাড় জমা হয়েছিল। মনে হচ্ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ঘটল উলটো। তৎকালীন মার্কিন অ্যাটর্নি আলেকজান্ডার অ্যাকোস্টার নেতৃত্বে এপস্টেইনের আইনজীবীদের সঙ্গে একটি গোপন সমঝোতা চুক্তি সম্পাদিত হয়। শর্তগুলো ছিল হতবাককারী।
মূল শর্তগুলো : সংক্ষিপ্ত কারাদণ্ড : এপস্টেইন মাত্র ১৩ মাস কারাগারে ছিলেন (১৮ মাসের সাজা থেকে)। সপ্তাহে ৬ দিন, দিনে ১২ ঘণ্টা তার অফিসে কাজ করার অনুমতি ছিল-মূলত শুধু রাতে ঘুমানোর জন্য জেলে থাকতেন। গুরুতর ফেডারেল যৌন পাচার অভিযোগের পরিবর্তে শুধু রাজ্য পর্যায়ের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ভুক্তভোগীদের এই চুক্তি সম্পর্কে আগে জানানো হয়নি, যা আইনের লঙ্ঘন ছিল। চুক্তিতে তার সম্ভাব্য সহযোগীদেরও ফেডারেল মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল এবং আর মামলা না করার অঙ্গীকার করা হয়।
২০১৯ সালে একজন ফেডারেল বিচারক এ প্রক্রিয়াকে ভুক্তভোগীদের অধিকারের ‘সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু ততদিনে এক দশক অতিবাহিত হয়ে গেছে। প্রশ্ন থেকে যায়, কীভাবে এত গুরুতর অভিযোগের পরও এমন নমনীয় চুক্তি সম্ভব হলো? পরে অ্যাকোস্টা নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তাকে বলা হয়েছিল, ‘এপস্টেইন ইন্টেলিজেন্সের লোক।’ এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই হয়নি কখনো, কিন্তু একটি ইঙ্গিত স্পষ্ট এপস্টেইনের প্রভাব বিস্তৃত ছিল অনেক গভীরে।
ক্ষমতার মোহজাল : এপস্টেইনের কেলেঙ্কারিকে আরও জটিল করে তোলে তার অভূতপূর্ব সামাজিক সংযোগ। ফ্লাইট লগবুক, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আদালতের নথিতে উঠে এসেছে বিশ্বের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত ব্যক্তিদের নাম। সাবেক প্রেসিডেন্ট, রাজপরিবারের সদস্য, নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী, বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী। যদিও কারও নাম ফ্লাইট লগে থাকা মানেই সরাসরি অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নয়। এপস্টেইন নিজেকে উপস্থাপন করতেন বিত্তশালী বিনিয়োগকারী ও দানশীল ব্যক্তিত্ব হিসাবে। বহু বিখ্যাত ব্যক্তি তার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিলেন সম্পূর্ণ বৈধ কারণে। তবে প্রশ্ন এখানেই-এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, এই অভিজাত সম্পর্কের জালই কি তাকে দীর্ঘদিন আইনের ঊর্ধ্বে রেখেছিল? তার সম্পদের উৎসও রহস্যময়।
রহস্যময় পরিণতি : ২০১৯ সালের ৬ জুলাই, প্যারিস থেকে ফেরার পথে পুনরায় গ্রেফতার হন এপস্টেইন। এবার অভিযোগ আরও সুনির্দিষ্ট, ফেডারেল পর্যায়ে যৌন পাচার ও ষড়যন্ত্র। সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারত ৪৫ বছর। জামিন প্রত্যাখ্যাত হয়। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। ভুক্তভোগীরা প্রস্তুত হচ্ছিলেন সাক্ষ্য দিতে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা চিরতরে হারিয়ে যায় ১০ আগস্ট ভোরে। তদন্তে উঠে আসে অবিশ্বাস্য সব তথ্য। নির্ধারিত সময়ে পর্যবেক্ষণ হয়নি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কারারক্ষীরা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ গায়েব, তার সেলমেটকে মৃত্যুর ঠিক আগের দিন স্থানান্তরিত করা হয়। এসব ঘটনা মিলে তৈরি হয় বিশাল সন্দেহের ছায়া। সরকারিভাবে আত্মহত্যা বলা হলেও জনমনে প্রশ্ন থেকে যায়-তাকে কি নীরব করে দেওয়া হয়েছিল?
অসমাপ্ত সত্যের সন্ধানে : এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তার সহযোগী গিসলেইন মাক্সওয়েলকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশে প্রকাশিত হয় বিপুল নথি ‘এপস্টেইন ফাইলস’। কিন্তু এই প্রকাশও ছিল আংশিক। নথির বিশাল অংশ কালো করে রাখা হয়েছে। নাম প্রকাশিত হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ বিশাল নথি ফাঁস হয় : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬। মোট প্রকাশ হয় ৩ মিলিয়ন পৃষ্ঠা, ২০০০ ভিডিও, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি, তদন্ত নথি, ই-মেইলসহ ফটো/ভিডিওসহ বিশদ রেকর্ড। এই কেলেঙ্কারির কেন্দ্রে রয়েছেন সেসব নারী, যারা অল্প বয়সে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জেফ্রি এপস্টেইনের মৃত্যু একটি অধ্যায় শেষ করলেও কেলেঙ্কারির মূল প্রশ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে। এ ঘটনা দেখিয়েছে যখন ক্ষমতা ও অর্থ আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তখন ন্যায়বিচারও দুর্বল হয়ে পড়ে। এপস্টেইন কেলেঙ্কারি তাই শুধু একজন অপরাধীর গল্প নয়। এটি একটি ব্যবস্থার দর্পণ। যেখানে প্রতিফলিত হয় আমাদের বৈশ্বিক কাঠামোর গভীর ত্রুটি। এটি দেখায় কীভাবে অর্থ ও প্রভাব ন্যায়বিচারকে বিকৃত করতে পারে, ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা আইন প্রয়োগ হয় এবং ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ দশকের পর দশক উপেক্ষিত থাকতে পারে। মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়, আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান? নাকি ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা নিয়ম এখনো বহাল? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত, এপস্টেইন কেলেঙ্কারি বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির আলোচনায় একটি অস্বস্তিকর কিন্তু অত্যাবশ্যক স্মারক হয়ে থাকবে।
সাইফুল খান : ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশ্লেষক
