৭ মার্চ: যে ভাষণ র‌ক্তে শিহ‌রণ জাগা‌য়

  শ‌রিফুল হাসান ০৭ মার্চ ২০১৯, ১২:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

৭ মার্চ: যে ভাষণ র‌ক্তে শিহ‌রণ জাগা‌য়

যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব। বঙ্গবন্ধুর ৭ মা‌র্চের ভাষণে বলা এই কথাগু‌লো আমার ভীষণ পছ‌ন্দের। আর ন্যা‌য়ের জন্য স্রো‌তের বিপরী‌তে লড়াই‌য়ের শ‌ক্তি আমার এখা‌নেই।

আমার নিজের ম‌নে হ‌য়ে‌ছে, ৭ মার্চের ভাষণ এক অসাধারণ মহাকাব্য। শিরায় শিরায় দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ৪৭ বছর পরও যখন ৭ মার্চের ভাষণ রেডিও-টিভি আর মাইকে শুনি, সারা শরীর আমার শিউরে ওঠে।

মনে মনে ভাবি সেদিন যারা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনেছিলেন তাদের রক্ত না জানি কীভাবে টগবগ করছিল।

৭ মা‌র্চের ভাষণ নি‌য়ে বি‌শ্লেষণ করার ম‌তো রাজ‌নৈ‌তিক জ্ঞান আমার নেই। তবুও ক‌য়েকটা কথা ব‌লি।

সে‌দিন ভাষ‌ণে বঙ্গবন্ধু ব‌লে‌ছেন, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় ২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস-এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।

একটা ভাষণ কীভা‌বে একটা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হ‌য়ে উঠ‌তে পা‌রে! তা বিশ্বে আর কোনো ভাষণ পারেনি।

শুনুন কথাগু‌লো। বঙ্গবন্ধু বল‌ছেন, ‘১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে ১০ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে।

১৯৬৬ সালে ৬দফা আন্দোলনে ৭ জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গনতন্ত্র দেবেন।

তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেলো, নির্বাচন হলো।’

বাংলার মানু‌ষের ভো‌টের অধিকার‌কে পা‌কিস্তা‌নিরা কীভা‌বে প্রত্যাখ্যান কর‌লো সেই ইতিহাস ব‌লে বঙ্গবন্ধু ব‌ল‌লেন, ‘দোষ দেওয়া হল বাংলার মানুষকে। দোষ দেওয়া হল আমাকে।

একটা ভাষ‌ণই কীভা‌বে স্বাধীনতার দ‌লিল হ‌য়ে ও‌ঠ তার প্রমাণ ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধু ব‌লে‌ছেন, এবারের সংগ্রাম আমার মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

ত‌বে রাজ‌নৈ‌তিক নেতা বঙ্গবন্ধু বি‌চ্ছিন্নতাবাদী আন্দোল‌নের ম‌তো নি‌জে আক্রমণ না ক‌রে প্রতি‌রো‌ধের ঘোষণা দি‌য়ে‌ছেন।

তি‌নি ব‌লে‌ছেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল - প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু - আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’‌

আরেকটা কথা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু ব‌লে‌ছেন, আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।

মানু‌ষে‌র প্রতি বঙ্গবন্ধুর কী অধিকার দেখেন। বঙ্গবন্ধু ব‌লেছেন, ‘আমার যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিকে সামান্য টাকাপয়সা পৌঁছে দেবেন। সরকারী কর্মচারিদের তি‌নি ব‌লে‌ছেন, আমি যা বলি তা মানতে হবে।’

‌নি‌জে‌দের শত্রু‌দের ব্যাপা‌রেও সাবধান ক‌রে‌ছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ব‌লে‌ছেন, ‘মনে রাখবা, শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে। এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি, যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের ওপরে। আমাদের যেন বদনাম না হয়।’

বঙ্গবন্ধু তার ভাষ‌ণে ব‌লে‌ছি‌লেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় - প্রত্যেক ইউনিয়নে - প্রত্যেক সাবডিভিশনে - আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বঙ্গবন্ধু আস‌লেই বাংলার মানুষ‌কে মুক্ত ক‌রে‌ছেন। স্বাধীন ক‌রে‌ছেন। অথচ বেঈমান এই জা‌তির কিছু কুলাঙ্গার ১৫ আগস্ট তা‌কে হত্যা ক‌রে‌ছে। ৭ মা‌র্চের ভাষ‌ণে আবার ফি‌রি।

বঙ্গবন্ধু ব‌লে‌ছেন, ‘আপনারা আমার ওপরে বিশ্বাস নিশ্চই রাখেন - জীবনে আমার রক্তের বিনিময়েও আপনাদের সঙ্গে বেইমানি করি নাই। প্রধানমন্ত্রীত্ব দিয়ে আমাকে নিতে পারেনাই। ফাঁসিকাষ্ঠে আসামী দিয়েও আমাকে নিতে পারেনাই। যে রক্ত দিয়ে আপনারা আমাকে একদিন জেলের থেকে বাইর করে নিয়ে এসেছিলেন এই রেসকোর্স ময়দানে আমি বলেছিলাম - আমার রক্ত দিয়ে আমি রক্ত ঋণ শোধ করব - মনে আছে? আমি রক্ত দেবার জন্য প্রস্তুত।’

স‌ত্যি স‌ত্যি বঙ্গবন্ধু নি‌জের রক্ত দি‌য়ে‌ছেন। ১৯৭৫ সা‌লের ১৫ আগষ্ট স্বপ‌রিবা‌রে তা‌কে নির্মমভা‌বে হত্যা ক‌রে‌ছে। এরপর সেই খু‌নিরা উল্লাস ক‌রে‌ছে। রাষ্ট্র খু‌নি‌দের বিচার না ক‌রে পুরষ্কৃত ক‌রে‌ছে। মু‌ক্তিযু‌দ্ধের উল্টো প‌থে চ‌লে‌ছে রাষ্ট্র। আজও কী আমরা ঠিক প‌থে আস‌তে পারলাম? আমার ম‌নে হয় না।

বঙ্গবন্ধু জ‌ন্মে‌ছি‌লেন ব‌লেই এই দেশটা স্বাধীন হ‌য়ে‌ছিল। প্রতি‌দিন আমরা আজ স্বাধীন দে‌শে সূ‌র্যোদয় দে‌খি। আ‌মি প্রতি‌দিন সকা‌লে বল‌তে পা‌রি শুভ সকাল বাংলা‌দেশ। আজ ৭ মা‌র্চের সকালটা বঙ্গবন্ধুর জন্য। বাঙা‌লির নেতা‌কে ব‌লি য‌তদিন বাংলা‌দেশ থাক‌বে আপ‌নি থাক‌বেন। জয় বাংলা। শুভ সকাল বাংলা‌দেশ।

ঘটনাপ্রবাহ : শরিফুল হাসানের লেখা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×