ইউথ ডেলিগেশন টু ইন্ডিয়া ২০১৯: তারুণ্যের জয় জয়কার

  লামিয়া মোহসীন ১৪ মে ২০১৯, ০২:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

ইউথ ডেলিগেশন টু ইন্ডিয়া ২০১৯: তারুণ্যের জয় জয়কার
‘বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেলিগেশন টু ইন্ডিয়া-২০১৯’ এর ১০০জন তরুণ-তরুণীসহ অন্যান্যরা

‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’, হায়দরাবাদে জহওরলাল নেহরু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনটিইউ) এর সুবিশাল অডিটরিয়াম যখন আলোড়িত হচ্ছিল একশত সম্মিলিত কণ্ঠ গাওয়া সেই চিরচেনা মধুর সুরে, হলফ করে বলতে পারি, মনে হচ্ছিল যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর মধ্যে একটি অতিবাহিত করছি।

এমন অনেক ছোট ছোট, কিন্তু অসম্ভব ভালো লাগার মুহূর্ত আমার ভারত সফরকে করে তুলেছে স্মরণীয়, যা স্মৃতির মণি কোঠায় থাকবে চির-অম্লান।

ভারত -বাংলাদেশের মধ্যেকার ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় করতে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখাজির ইচ্ছায় শুরু হয় ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেলিগেশন টু ইন্ডিয়া-২০১৯’।

মূলত আচার-কৃষ্টি ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানকে লক্ষ্য রেখে ২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন অঙ্গনের ১০০জন তরুণ-তরুণীকে নিয়ে ভারত সফরে নিয়ে যায় হাইকমিশন।

এ বছর ৩ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে থেকে ইন্টার্ভিউয়ের মাধ্যমে ১০০ জনকে বাছাই করে সপ্তম বারের মত ইন্ডিয়ান হাইকমিশন, ঢাকা আয়োজন করে এই প্রোগ্রামটির।

এবারের প্রোগ্রাম সাজানো হয়েছিল দিল্লি, আগ্রা ও হায়দরাবাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে। ১০০ জনের বিশাল টিমের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে ভারতীয় দূতাবাসের প্রথম রাজনৈতিক সচিব নবনীতা চক্রবর্তী এবং ভারতীয় হাইকমিশনের মিডিয়া ও কালচার সমন্বয়ক কল্যাণ কান্তি দাশ।

গত ২৮ মার্চ নয়া দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিভিন্ন পেশার ৪০ জন নারী ও ৬০জন পুরুষের বৈচিত্রময় একটি দল। যাদের মধ্যে কেউ ছিলেন শিক্ষক, চিকিত্সক, উদ্যোক্তা ,প্রকৌশলী; তেমনি কেউ বা সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সঙ্গীতশিল্পী, ক্রীড়াবিদ, মডেল, রেডিও জকি ও সমাজকর্মী।

এর আগের দিন ২৭ মার্চ বারিধারায় ভারতীয় হাইকমিশনে এক আড়ম্বরপূর্ণ ‘ফ্ল্যাগিং অফ’ (সংবর্ধনা) অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১০০ জন সফর সঙ্গীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আসে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাশ।

বিশেষ অতিথি হিসাবে ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ওয়ানডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ও সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজা।

দিল্লি ভ্রমণের প্রথম দিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে যেখানে প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টা সময় কাটাই আমরা।

কড়া নিরাপত্তা এবং প্রোটোকলের মধ্য দিয়ে যখন আমাদের একে একে লোকসভা, রাজ্যসভার ঐতিহাসিক কক্ষগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন নিজেকে বেশ ভিআইপি মনে হচ্ছিল!

ব্রিটিশ আমলে তৈরি উঁচু সিলিং, দেয়ালে দেয়ালে গান্ধীজী, পণ্ডিত নেহরু, নেতাজী সুভাষচন্দ্রসহ বিশ্বনন্দিত ভারতীয় নেতা, সাবেক সরকারপ্রধানদের বিশাল অয়েল পেন্টিং, পুরনো কাঠের আসবাব। সব মিলিয়ে যেন ইতিহাসের পাতা থেকে খসে পড়া একটি চিত্র।

পার্লামেন্ট ট্যুর শেষে আমাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন ভারতের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য এবং ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এসএস আহলুওয়ালিয়া।

উত্তর ভারতে অবস্থিত পাঞ্জাবের অধিবাসী হয়েও অত্যন্ত স্পষ্ট এবং চমত্কার বাংলায় আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা রাখেন।

তিনি বলেন, ‘ভারতের মতো বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি তরুণ। তাই উন্নয়নের পথে অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেবে এই তরুণরাই’।

তিনি আরও বলেন, ‘তারুণ্যের উদ্যম, শক্তি ও মনোবলের উপর আস্থাশীল হতে হবে আমাদের সবার, কারণ আজকের তরুণদের ওপরেই ভবিষ্যতের পৃথিবী গড়ার দায়িত্ব। ’

মধ্যাহ্ন ভোজের পর আমাদের একে একে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্ট, ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়াল ও ইন্ডিয়া গেট। ১৯৬২ সালের ইন্দো-চিনযুদ্ধ, ১৯৪৭, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালে ইন্দো-পাক যুদ্ধ, ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ এবং শ্রীলংকায় ভারতের শান্তি বাহিনীর অভিযানে নিহত শহীদদের স্মরণে তৈরি হয় মেমোরিয়ালটি।

১৯২১ সাল থেকে প্রায় ১০ বছর ধরে নির্মিত হয় ঐতিহাসিক ইন্ডিয়া গেট যার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের ১০০ জনের গ্রুপছবি তোলা হয়।

সন্ধ্যাবেলা এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার মাধ্যমে আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ভারতীয় সঙ্গীত এবং নৃত্যশিল্পীরা। সুরের মূর্ছনায় মোহিত করেন ডেলিগেটদের পক্ষ থেকে পারফর্ম করা লালন ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীরা।

এর পরের দিন চার ঘণ্টার লম্বা সফর করে গিয়েছি আগ্রা। গন্তব্য -বিশ্ববিখ্যাত মোঘল স্থাপত্য তাজমহল।

যমুনা নদীর পাড়ে অবস্থিত সাদা মার্বেলের তৈরি এই আশ্চর্য কীর্তি দেখতে গিয়ে তীব্ররোদে পুড়ে গেছিলাম সবাই, কারণ সেদিনকার তাপমাত্রা ছিল ৪২ ডিগ্রির কাছাকাছি। কিন্তু এ যে তাজমহল, পৃথিবীর বুকে শাশ্বত ভালবাসার অনন্য নিদর্শন!

প্রখর রোদ হোক, কি ঝুম বৃষ্টি, তাজমহল দেখতে গিয়ে সবরকম অত্যাচার হাসিমুখে সহ্য করে নেয়া বাঞ্ছনীয়।

তাজমহল থেকে গেলাম আগ্রা ফোর্ট। সম্রাট শাহজাহান জীবনের শেষ সময়টুকু এই দুর্গে কাটান গৃহবন্দী অবস্থায়। কথিত আছে, তার কক্ষ হতে তাজমহল দেখা যেত, আর চাঁদের আলোয় এই অপার্থিব সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে সময় কাটত তার।

এরপরের দিনগুলো যেন ঝড়ের বেগে কেটে গেছে। হায়দরাবাদের রামোজি ফিল্ম সিটিতে বলিউডে সিনেমার দর্শকনন্দিত সেট, ঐতিহাসিক শালার জং জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাচীন দ্রষ্টব্য, গোলকন্দা ফোর্টের ইতিহাসের উপর নির্মিত চমকপ্রদ লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো ইত্যাদি দেখতে দেখতে সময় কীভাবে কেটে গেছে টেরই পাইনি।

হায়াদরাবাদের জহওরলাল নেহরু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাচ-গান আর বাদ্য-বাজনার তালে শিক্ষার্থীরা বরণ করে নেয় আমাদের এবং এই আতিথেয়তা কখনোই ভুলবার নয়।

সংস্কৃত ভাষায় একটি উক্তি আছে, 'অতিথি দেব ভব', অর্থাৎ অতিথি যেন দেবতারই স্বরূপ। একজন বাংলাদেশী ডেলিগেট হিসাবে যে ভালবাসা এই ৬ দিনে পেয়েছি, নিঃসন্দেহে এর কোনো তুলনাই হয় না।

অনেক ধন্যবাদ বাংলাদেশে ভারতীয় হাই কমিশনকে, যারা প্রতি বছর একশ তরুণকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেন। জ্ঞান আহরণ ছাড়াও এই ট্যুর থেকে আমার প্রাপ্তি ৯৯ জন নতুন বন্ধু এবং এক ঝুলি অভিজ্ঞতা।

জয়তু তারুণ্য! জয়তু ভারত-বাংলাদেশ ভ্রাতৃত্ব!

* লামিয়া মোহসীন, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইউথ ডেলিগেশন টু ইন্ডিয়া ২০১৯ ট্যুর থেকে এসে

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×