জাতিসংঘে ভোটদানে বিরত থেকে বাংলাদেশ কী বার্তা দিল?
jugantor
জাতিসংঘে ভোটদানে বিরত থেকে বাংলাদেশ কী বার্তা দিল?

  মাসুদ করিম  

২৫ জুন ২০২১, ১২:০৮:২৮  |  অনলাইন সংস্করণ

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারসংক্রান্ত প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থেকে বাংলাদেশ কী বার্তা দিল তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে। প্রস্তাবে মিয়ানমারে জরুরি অবস্থার অবসান এবং গণতান্ত্রিকভাবে নিবাচিত পার্লামেন্টকে পুনরায় চালুর আহ্বান জানানো হয়। গত ১৮ জুন প্রস্তাবটি বিপুলসংখ্যক সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে পাস হয়। প্রস্তাবটির পক্ষে ১১৯ দেশ ভোট দেয়। বিপক্ষে একমাত্র ভোট দিয়েছে বেলারুশ। বাংলাদেশসহ ৩৬ রাষ্ট্র ভোটদানে বিরত ছিল।

প্রস্তাবে মিয়ানমারে আটক বেসামরিক নেতাকর্মীদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি চাওয়া হয়। এ ছাড়া প্রস্তাবটিতে আসিয়ান নেতারা গত এপ্রিলে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে বৈঠক করে যে পাঁচ দফা দাবি দিয়েছে; ওইসব দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। আসিয়ানের দাবির মধ্যে মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ওপর সব সহিংসতা বন্ধ করা এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতকে দেশটি সফরের অনুমতি দেওয়ার দাবি অন্যতম। জাতিসংঘের প্রস্তাবে মিয়ানমারে সকল প্রকার অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ গত বছর কোভিড ১৯ মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র বিরতির আহ্বান জানিয়েছিল। তার আলোকে বিশ্বের সব দেশকে মিয়ানমারে সকল প্রকার অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা যৌথ উদ্যোগে সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। সাধারণ পরিষদের এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রস্তাবটির রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। প্রস্তাবটি উত্থাপনের পর অনেকে মনে করেছিলেন, প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়ে যাবে। কিন্তু প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়ার জন্য বেলারুশ আহ্বান জানায়। তার পর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। ভোটে বেলারুশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। রাশিয়া, চীন, ভারতসহ ৩৬ দেশ ভোটদানে বিরত রয়েছে। মিয়ানমারের প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে ভোটাভুটিতে বিভক্তি দেখা গেছে। সার্কভুক্ত মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ভোটদানে বিরত ছিল। আসিয়ানে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম। ভোটদানে বিরত ছিল থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া ও ব্রুনাই। তবে ভোটদানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ থাকায় কূটনৈতিক মহলে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। অনেকে বিস্মিতও হয়েছেন।

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা একটি ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন— প্রস্তাবের অপারেটিভ অংশে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়নি। এ কারণে বাংলাদেশ প্রস্তাবটিতে ভোটদানে বিরত রয়েছে। প্রস্তাবের অপারেটিভ অংশে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রসঙ্গ না থাকায় এটি ভুল বার্তা দিতে পারে বলেও রাবাব ফাতিমা তার ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন। এ কারণে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের ফোকাস রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো। রাখাইন রাজ্যে তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। বিষয়টি সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের প্রিঅ্যাম্বলে থাকলেও অপারেটিভ অংশে নেই। এ কারণে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত রয়েছে। যারা মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বলেন; তারা মনে করেছিল, মিয়ানমার নিয়ে যে কোনো প্রস্তাব দিলে বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেবে। এখন তাদের টনক নড়ুক। তারা বুঝুক, আমাদের কাছে প্রত্যাবাসন বড় বিষয়।

মিয়ানমারে অং সান সু চির নেতৃত্বকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পশ্চিমাদের আগ্রহ লক্ষণীয়। কিন্তু বিগত সময়ে দেখা গেছে, সু চি রোহিঙ্গা শব্দ মুখে উচ্চারণ করেননি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তার আন্তরিকতার অভাব ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তাই উচিত হবে, এবার মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক শক্তিকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে যথাযথ গুরুত্বারোপ করা। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সংকট উপেক্ষিত। অপারেটিভ অংশে তার উল্লেখ না থাকায় বাংলাদেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ভবিষ্যতে মিয়ানমার বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিষয় অগ্রাধিকারে থাকায উচিত বলে মনে করি। ফলে ক্ষোভ প্রকাশের অংশ হিসাবে সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে বাংলাদেশের ভোটদানে বিরত থাকা যৌক্তিক বলে মনে করি।

রাশিয়া, চীন, ভারত যেসব কারণে ভোটদানে বিরত ছিল; বাংলাদেশের বিরত থাকার কারণ এক নয়। মিয়ানমারকে ঘিরে বৈশ্বিক মেরুকরণে রাশিয়া বরাবর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পক্ষে। পশ্চিমারা অং সান সু চির পক্ষে। অনেকটা চক্ষুলজ্জার কারণে সরাসরি সামরিক জান্তার ক্ষমতা গ্রহণকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে পারেনি রাশিয়া। বেলারুশ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব ভোটে নিয়ে গেলেও তার নেপথ্যে ছিল রাশিয়া। কার্যত রাশিয়া সামরিক জান্তাকে সমর্থন দিয়ে আসছে।

চীন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তাই সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপে চীন সমর্থন করবে না। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যদিও চক্ষুলজ্জার কারণে বেলারুশের মতো নির্লজ্জভাবে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়নি চীন। ভোটদানে বিরত ছিল। বাস্তবে চীন মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীকে সমর্থন করে।

ভারতের অবস্থান নতুন কিছু নয়। মিয়ানমারকে চীনের কাছ থেকে দূরে রাখতে চায়। ভারত তাই মিয়ানমারে যে সরকার থাকুক তাকে সমর্থন করে। মিয়ানমারের জেনারেলদের সঙ্গে ভারত সম্পর্ক রাখতে সচেষ্ট। তবে ভারত নিজে গণতান্ত্রিক দেশ। তাই সরাসরি প্রকাশ্যে সাধারন পরিষদের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিতে পারেনি। ভোটদানে বিরত ছিল।

রাশিয়া, চীন, ভারত চক্ষুলজ্জার কারণে সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না রাখার প্রতিবাদে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন যদিও বলেছেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা যারা বলেন, তারাই আবার মিয়ানমারে ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি করছেন। মিয়ানমারে তাদের ব্যবসা সাড়ে তিন গুণ থেকে ১৫ গুণ বেড়েছে। তাদের সাতটি ব্যাংক মিয়ানমারে ২৪ বিলিয়ন ডলার গ্যারান্টি দিয়েছে। ফলে তাদের মিয়ানমার নিয়ে দ্বৈত ভূমিকা আছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এসব বক্তব্য মেনে নিলেও এটাও মানতে হবে যে, রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্য, কানাডা সোচ্চার ভূমিকা নিয়েছে। আগামী দিনেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হলে তাদের সঙ্গে নিয়ে তা করতে হবে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ জাতিসংঘের রোডম্যাপ চাইছে। এমন রোডম্যাপ করতে হলে এসব প্রভাবশালী দেশের সমর্থন জরুরি। তার ওপর বাংলাদেশ নিজে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে রোহিঙ্গা সংকটে সমর্থন পেয়েছে। বাংলাদেশকে তাই এটা স্পষ্ট করতে হবে যে, মিয়ানমারে বাংলাদেশ গণতন্ত্র চায়। সহিংসতা চায় না। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনও চায়। এটি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়ে বিবৃতিতে বাংলাদেশ বলেছে।

বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কোনো পদক্ষেপ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের অপারেটিভ অংশে না থাকার প্রতিবাদে। চক্ষুলজ্জায় নয়। রাবাব ফাতিমার ব্যাখ্যায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। এটি আরও স্পষ্ট না করলে বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি ও ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকার কারণে যেন কোনো ভুল বার্তা না যায়। ভুল বার্তা কখনও কখনও হিতে বিপরীত হয়।

জাতিসংঘে ভোটদানে বিরত থেকে বাংলাদেশ কী বার্তা দিল?

 মাসুদ করিম 
২৫ জুন ২০২১, ১২:০৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারসংক্রান্ত প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থেকে বাংলাদেশ কী বার্তা দিল তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে। প্রস্তাবে মিয়ানমারে জরুরি অবস্থার অবসান এবং গণতান্ত্রিকভাবে নিবাচিত পার্লামেন্টকে পুনরায় চালুর আহ্বান জানানো হয়। গত ১৮ জুন প্রস্তাবটি বিপুলসংখ্যক সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে পাস হয়। প্রস্তাবটির পক্ষে ১১৯ দেশ ভোট দেয়। বিপক্ষে একমাত্র ভোট দিয়েছে বেলারুশ। বাংলাদেশসহ ৩৬ রাষ্ট্র ভোটদানে বিরত ছিল।

প্রস্তাবে মিয়ানমারে আটক বেসামরিক নেতাকর্মীদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি চাওয়া হয়। এ ছাড়া প্রস্তাবটিতে আসিয়ান নেতারা গত এপ্রিলে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে বৈঠক করে যে পাঁচ দফা দাবি দিয়েছে; ওইসব দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। আসিয়ানের দাবির মধ্যে মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ওপর সব সহিংসতা বন্ধ করা এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতকে দেশটি সফরের অনুমতি দেওয়ার দাবি অন্যতম। জাতিসংঘের প্রস্তাবে মিয়ানমারে সকল প্রকার অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ গত বছর কোভিড ১৯ মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র বিরতির আহ্বান জানিয়েছিল। তার আলোকে বিশ্বের সব দেশকে মিয়ানমারে সকল প্রকার অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা যৌথ উদ্যোগে সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। সাধারণ পরিষদের এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রস্তাবটির রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। প্রস্তাবটি উত্থাপনের পর অনেকে মনে করেছিলেন, প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়ে যাবে। কিন্তু প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়ার জন্য বেলারুশ আহ্বান জানায়। তার পর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। ভোটে বেলারুশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। রাশিয়া, চীন, ভারতসহ ৩৬ দেশ ভোটদানে বিরত রয়েছে। মিয়ানমারের প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে ভোটাভুটিতে বিভক্তি দেখা গেছে। সার্কভুক্ত মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ভোটদানে বিরত ছিল। আসিয়ানে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম। ভোটদানে বিরত ছিল থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া ও ব্রুনাই। তবে ভোটদানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ থাকায় কূটনৈতিক মহলে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। অনেকে বিস্মিতও হয়েছেন।

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা একটি ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন— প্রস্তাবের অপারেটিভ অংশে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়নি। এ কারণে বাংলাদেশ প্রস্তাবটিতে ভোটদানে বিরত রয়েছে। প্রস্তাবের অপারেটিভ অংশে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রসঙ্গ না থাকায় এটি ভুল বার্তা দিতে পারে বলেও রাবাব ফাতিমা তার ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন। এ কারণে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের ফোকাস রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো। রাখাইন রাজ্যে তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। বিষয়টি সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের প্রিঅ্যাম্বলে থাকলেও অপারেটিভ অংশে নেই। এ কারণে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত রয়েছে। যারা মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বলেন; তারা মনে করেছিল, মিয়ানমার নিয়ে যে কোনো প্রস্তাব দিলে বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেবে। এখন তাদের টনক নড়ুক। তারা বুঝুক, আমাদের কাছে প্রত্যাবাসন বড় বিষয়।

মিয়ানমারে অং সান সু চির নেতৃত্বকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পশ্চিমাদের আগ্রহ লক্ষণীয়। কিন্তু বিগত সময়ে দেখা গেছে, সু চি রোহিঙ্গা শব্দ মুখে উচ্চারণ করেননি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তার আন্তরিকতার অভাব ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তাই উচিত হবে, এবার মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক শক্তিকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে যথাযথ গুরুত্বারোপ করা। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সংকট উপেক্ষিত। অপারেটিভ অংশে তার উল্লেখ না থাকায় বাংলাদেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ভবিষ্যতে মিয়ানমার বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিষয় অগ্রাধিকারে থাকায উচিত বলে মনে করি। ফলে ক্ষোভ প্রকাশের অংশ হিসাবে সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে বাংলাদেশের ভোটদানে বিরত থাকা যৌক্তিক বলে মনে করি।

রাশিয়া, চীন, ভারত যেসব কারণে ভোটদানে বিরত ছিল; বাংলাদেশের বিরত থাকার কারণ এক নয়। মিয়ানমারকে ঘিরে বৈশ্বিক মেরুকরণে রাশিয়া বরাবর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পক্ষে। পশ্চিমারা অং সান সু চির পক্ষে। অনেকটা চক্ষুলজ্জার কারণে সরাসরি সামরিক জান্তার ক্ষমতা গ্রহণকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে পারেনি রাশিয়া। বেলারুশ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব ভোটে নিয়ে গেলেও তার নেপথ্যে ছিল রাশিয়া। কার্যত রাশিয়া সামরিক জান্তাকে সমর্থন দিয়ে আসছে।

চীন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তাই সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপে চীন সমর্থন করবে না। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যদিও চক্ষুলজ্জার কারণে বেলারুশের মতো নির্লজ্জভাবে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়নি চীন। ভোটদানে বিরত ছিল। বাস্তবে চীন মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীকে সমর্থন করে।

ভারতের অবস্থান নতুন কিছু নয়। মিয়ানমারকে চীনের কাছ থেকে দূরে রাখতে চায়। ভারত তাই মিয়ানমারে যে সরকার থাকুক তাকে সমর্থন করে। মিয়ানমারের জেনারেলদের সঙ্গে ভারত সম্পর্ক রাখতে সচেষ্ট। তবে ভারত নিজে গণতান্ত্রিক দেশ। তাই সরাসরি প্রকাশ্যে সাধারন পরিষদের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিতে পারেনি। ভোটদানে বিরত ছিল। 

রাশিয়া, চীন, ভারত চক্ষুলজ্জার কারণে সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না রাখার প্রতিবাদে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন যদিও বলেছেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা যারা বলেন, তারাই আবার মিয়ানমারে ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি করছেন। মিয়ানমারে তাদের ব্যবসা সাড়ে তিন গুণ থেকে ১৫ গুণ বেড়েছে। তাদের সাতটি ব্যাংক মিয়ানমারে ২৪ বিলিয়ন ডলার গ্যারান্টি দিয়েছে। ফলে তাদের মিয়ানমার নিয়ে দ্বৈত ভূমিকা আছে। 

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এসব বক্তব্য মেনে নিলেও এটাও মানতে হবে যে, রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্য, কানাডা সোচ্চার ভূমিকা নিয়েছে। আগামী দিনেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হলে তাদের সঙ্গে নিয়ে তা করতে হবে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ জাতিসংঘের রোডম্যাপ চাইছে। এমন রোডম্যাপ করতে হলে এসব প্রভাবশালী দেশের সমর্থন জরুরি। তার ওপর বাংলাদেশ নিজে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে রোহিঙ্গা সংকটে সমর্থন পেয়েছে। বাংলাদেশকে তাই এটা স্পষ্ট করতে হবে যে, মিয়ানমারে বাংলাদেশ গণতন্ত্র চায়। সহিংসতা চায় না। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনও চায়। এটি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়ে বিবৃতিতে বাংলাদেশ বলেছে।

বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কোনো পদক্ষেপ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের অপারেটিভ অংশে না থাকার প্রতিবাদে। চক্ষুলজ্জায় নয়। রাবাব ফাতিমার ব্যাখ্যায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। এটি আরও স্পষ্ট না করলে বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি ও ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকার কারণে যেন কোনো ভুল বার্তা না যায়। ভুল বার্তা কখনও কখনও হিতে বিপরীত হয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন