মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমকালীন রাজনীতি

  এ.টি.এম. মোফাজ্জেল হোসেন (স্বাধীন) ০৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১৬:০১ | অনলাইন সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমকালীন রাজনীতি

শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধা স্বজনদের অভিযোগ সবাই (বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা) বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ৩০ লাখ শহীদের সঙ্গে, তাদের স্বজনদের সঙ্গে এবং সর্বোপরি সব প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। শুধু ডিসেম্বর মাসে অথবা কখনও কখনও আপনারা গানের পঙক্তিটি আওড়ান ‘এক সাগর’ রক্ত যারা দিয়েছেন- ‘আমরা তোমাদের ভুলব না।’ বাস্তবে, খুব কম লোকই তাদের মনে রেখেছেন, তাদের স্বজন ছাড়া। একটি দেশের বাস্তবিকই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা সেদিন নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিল তাদের কেউ শহীদ হয়েছে, যুদ্ধাহত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছে, কেউ স্বজন হারিয়েছে, সহায়-সম্পদ হারিয়েছে, কেউ জীবিত আছে এক বুক জ্বালা নিয়ে। এককথায় দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে তারা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

অন্যদিকে দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা যখন লড়াই করছিল, তখন অনেক মানুষ আবার ঘরে এসির (রূপক অর্থে) আরামে ছিল। দেশের স্বাধীনতার জন্য যে মুক্তিযোদ্ধারা এত বড় ভূমিকা রাখল, তারা কি পেল? তাদের সম্মান চাওয়া কি অন্যায়? দেশ ও দেশের মানুষ থেকে কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া তাদের ন্যায্য অধিকার। এ জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অন্যদের মেলানো ঠিক হবে না। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা চায় একটু সম্মান। কৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে একটু সম্মান কি আমরা তাদের দিতে পারি না! অপরপক্ষে, যেসব মানুষ (সমর্থবান মানুষ) দেশের পক্ষে লড়াইয়ে অংশ নেয়ার বদলে আরামে ছিলেন, পলায়নপর ছিলেন, তাদের দেশে পদ পাওয়ার অযোগ্য হওয়া উচিত। অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, অধিকাংশ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা (শহীদ ও যুদ্ধাহতসহ) সুযোগের চেয়ে বঞ্চনাই বেশি পেয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান- এ কথা আক্ষরিক অর্থেই কেবল সত্য; বাস্তবে নয়। এ কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে, মুক্তি বিনা মূল্যে মেলেনি বিশেষত বাংলাদেশের। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কারো ইচ্ছায় সৃষ্টি নয়, বল প্রয়োগেও সৃষ্ট নয়। এই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র মানুষের নিতান্ত প্রয়োজনেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, অনেক মা-বোন নির্যাতিত-ধর্ষিত হয়েছে, তাদের কোটি-কোটি পোষ্যরা চিরদুর্ভোগে আছে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, আজ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই অনেকে অনেক কিছু পেয়েছেন-আশাতীতভাবেই। কিন্তু যারা সব হারিয়ে নিঃস্ব হলো তাদের প্রবোধ কিসে? এমনকি আমিও আমার মতো অনেকেই তার বাবাকে কোনোদিন দেখতেও পাইনি! অর্থাৎ জন্মের আগেই এতিম হয়েছে বলে। চেতনা হলো মানুষের মনের গভীরে লালিত সেই আদর্শ, যা তাকে সব কাজে অনুপ্রেরণা জোগায়। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে (জাতীয়ভাবে) মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন তো দূরের কথা আমার বাবার মতো ৩০ লাখ শহীদের জীবন দিয়ে পাওয়া এই দেশে অনেকেই আজ আমাদের ওপরে জমিদারি মনোভাব দেখায়, যা সত্যিই বড় কষ্টের! আমাদের দেশে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দেখা গেছে ঘুণপোকা। বাংলাদেশিদের মধ্যে এ মুহূর্তে স্বাধীনতা তথা বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব কতটা প্রবল, সে সম্পর্কে ধারণা মোটেই সুখকর নয়। তবে বাংলাদেশ তথা মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ তথা মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের মধ্যে বৈরিতার ইতিহাস অতীতে না হলেও এখন তীব্র, দীর্ঘ এবং গভীর। আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির গোড়াটি নিহিত রয়েছে ১৯৭১-এর ঘটনায়। মূলত সব সমস্যার শুরু ১৯৭১ সালে। হতাশার কথা বাংলাদেশবিরোধী অনুভূতি বাংলাদেশের সমাজের (একটি অংশের) গভীরে প্রোত্থিত। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিরোধীদের সম্পর্কে আধুনিক কালের বৈরিতা শুরু হয় ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর থেকে।

সঙ্গত কারণে অনেক সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রান্তিকাল দেখা গেছে। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কেন্দ্র করে সব কার্যক্রমে একধরনের নৈরাজ্য বিরাজ করে। মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের, সুবিধাভোগী অমুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে অনেক সময় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কোণঠাসা হয়ে থাকে। বস্তুত ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর থেকেই স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্টিত হয়। এরপর একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস শুনে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ ঘঠনা। সেই মুক্তিযুদ্ধের বীরদের তালিকা নিয়ে অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ হোক। লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে, তা হয়নি। বরং স্বাধীনতার মূল্যবোধ এ দেশে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। এর সুযোগে দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা (অধুনা বাংলাদেশবিরোধীরা) যে অবস্থান নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে নেবে, তা তারা নিশ্চিত করেছে। তারা (স্বাধীনতাবিরোধীরা) অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী এবং তাদের শেকড় সমাজের একশ্রেণির মানুষের হৃদয়ে একেবারে ঢুকে গেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে কত লোক আছে, তার হিসাব করতে গেলে আমরা দেখি, বিপক্ষে এখনো অনেক মানুষ আছে। তার অন্যতম কারণ একাত্তরের জঘন্যতম গণহত্যার কাহিনি হৃদয়ে ধারণ না করা, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাস প্রচার ও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশবিরোধী অব্যাহত ষড়যন্ত্র, ইত্যাদি। আর প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করায় জাতির মহাক্ষতি হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে দেশের ইউনিয়ন- উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে গোয়েন্দাদের দিয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকারীদের চিহ্নিতকরণ, তাদের গণকবর শনাক্তকরণ, শহীদদের স্মৃতি ও নির্যাতনের স্মারকগুলো চিহ্নিত করে তা রক্ষার চেষ্ঠা করতে হবে। প্রকত মুক্তিযোদ্ধাসহ (শহীদ ও যুদ্ধাহতসহ) সাধারণ জনগণের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না ঘটাতে পারলে জনগণ শুধু রাজনীতিবিদদের স্বপ্নের জিকিরে আর ভুলবে বলে মনে হয় না। কারণ বিগত ৪৬ বছরে দেশে সংগঠিত সেই মহানাটক আজও মঞ্চায়িত হচ্ছে। জনগণের চাই-অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, স্বাস্থ্য, চিকিৎসাসহ অন্যান্য চাহিদা মেটানোর মতো সক্ষমতা। দেশে মুদ্রাস্ফীতি চলছে (দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে)। মানুষের এত কষ্ট (অনেক দিন যাবৎ) চোখে দেখা যায় না। রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা আজ এ দেশে বড় ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধানোর ক্ষমতা রাখে বলে অনেকের অভিমত।

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের জন্য নতুন সমাজ গঠনোপযোগী যে সংস্কারের পরিকল্পনা হাতে নেয়া দরকার ছিল, তা নেয়া হয়নি ( যদিও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার কিছু কিছু কাজ করেছে)। অন্যদিকে দেশে অনেক আগে থেকে চলে আসছে- অব্যাহত সন্ত্রাস, লুটপাট ইত্যাদি। দেশ স্বাধীন হলেই সবাই শান্তিতে থাকবে বলে মনে করেছিল অনেকেই। কারণ সবার প্রাণের দাবি ছিল অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও অস্থিতিশীল রাজনীতির কারণে দেশে পরিপূর্ণ শান্তি আসেনি। এ দেশের জনগণের দাবি খুব বেশি নয়। কিন্তু রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন ইস্যুতে ভোল বদলে ফেলেছে (সব রাজনীতিবিদ নয়)। সংবিধানে সবার সমান অধিকারের কথা বলা থাকলেও-বাস্তবে তার বাস্তবায়ন পরিপূর্ণভাবে হচ্ছে না। দেশের রাজনীতি ক্রমেই অধঃপতিত হচ্ছে। তবে এত কিছুর পরেও অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে আমাদের দেশে। আমার বিশ্বাস জনগণ পরিবর্তন আনবে। সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতির আসল সমস্যা নিহিত রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণতা ও ক্ষমতালিপ্সার কারণে যে আদর্শে বলীয়ান হয়ে আমরা এক ক্ষমতাধর ঔপনিবেশিক শক্তিকে ভেঙে খানখান করে দিয়েছিলাম, সে আদর্শ, ঐক্য তারা ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। অনেকেই আজ বলে থাকে, বর্তমানে রাজনীতি এক জঘন্য কৌশল। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ এখন মোটামুটি উন্নত। বহু ত্যাগ ও রক্ত দিয়ে পাওয়া সুন্দর স্বাধীন বাংলাদেশে আজ কেবলই গণ্ডগোল আর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। দরকার রাজনৈতিক ঐক্য। ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে এবং আলোচনার ভিত্তিতে করতে হবে। আগেকার দিনের মতো গণ-অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করা যাবে বলে মনে হয় না। কারণ বাংলাদেশে সব সময় চলে ক্ষমতা দখল প্রতিষ্ঠার লড়াই। অতএব এসব থেকে পরিত্রাণের, উঠে দাঁড়ানোর এখনই সময়। তাহলেই সুখীসমৃদ্ধ বাংলাদেশ পাব আমরা-নচেৎ নয়। ইতিহাস বলে, ভালো কাজ না করলে কোনো কূটচাল, প্ল্যান-পাঁয়তারাই কাজে লাগে না। এগুলো বাদ দিয়ে জনসেবা করুন সবাই। রাজনীতি করতে হলে-এটা লাগবেই। অন্য কোনো কিছুই কাজে দেবে না।

লেখক: এ.টি.এম. মোফাজ্জেল হোসেন (স্বাধীন), মানবাধিকার কর্মী ও একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.