নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশিক্ষাই হোক সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি

  রহমান মৃধা ১৪ জুন ২০১৮, ০১:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশিক্ষাই হোক সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি
রহমান মৃধা, পরিচালক ও পরামর্শক - সুইডেন থেকে।

গোটা বাংলাদেশ এমনকি গোটা বিশ্বজুড়ে দুর্নীতি ও ঘুষ নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনা।

আমরা কি প্রকৃতপক্ষে জানি ঘুষ বা দুর্নীতি কী এবং কখন এ কুকর্ম ঘুষ বা দুর্নীতিতে রূপান্তরিত হয়? অজানাকে জানা, জানা থেকে শেখা এবং শেখার পরে তাকে বাস্তবজীবনে কাজে লাগানো একটি জটিল ব্যাপার। এই ব্যাপারটি কতোটা জটিল হবে তা নির্ভর করছে কোন অবস্থা বা পরিবেশে ব্যাপরাটি ঘটে তার ওপর।

এমন একটি পরিবেশে বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। তাই সরাসরি দুর্নীতি বা ঘুষের ওপর না গিয়ে আমি কয়েকটি ঘটনার অবতারণা করবো। দেখা যাক ওয়ান দি জব ট্রেনিং এবং লার্নিং বাই ডুইং কনসেপ্টের মাধ্যমে দুর্নীতি বা ঘুষের সঠিক ব্যাখা দেওয়া সম্ভব হয় কিনা-

ক) ‘ম্যাড কাউ’ডিজিজ নামক রোগটার কথা কমবেশি অনেকেই জানে। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডে এই রোগের প্রভাব বিস্তার করে গবাদিপশুর ওপর।

একটি ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিতে একজন পরিচালক সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের ওপর কাজ করছেন। সেক্ষেত্রে যেকোনো সাপ্লাই সংক্রান্ত সমস্যা তাকে দেখতে হয় এবং সমাধান করতে হয়।

গরুর দুধের থেকে একটি উপাদান তৈরি হয় যার নাম ‘ক্যাসেইন প্রোটিন’এবং উপাদানটি তার কোম্পানির একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়।

এই উপাদানটি (ক্যাসিইন প্রোটিন) তখন ইংল্যান্ড থেকে খরিদ করা হতো। যেহেতু ম্যাড কাউ ডিজিজ ইংল্যান্ডের গরুর ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে তাই স্বাভাবিকভাবেই ইংল্যান্ডের তৈরি উপাদানটির ব্যবহার বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

নতুন করে উপাদানটি খরিদ করতে হবে বিধায় তাকে পাঠানো হলো সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াতে।

মালয়েশিয়াতে একটি নতুন অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রিডেন্টের কোম্পানি পরিদর্শন করা থেকে শুরু করে কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও সেইসাথে দামদর নিয়ে আলোচনা চলছে।

কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর তাকে নিয়ে গেল কুয়ালালামপুর থেকে সি-প্লেনে করে লাংকাভি আইল্যান্ডে, যেখানে তাদের মিটিং চলছে। সেখানে তাকে করা হলো ব্যাপক খাতির যত্ন।

১০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হবে এবং ৫ বছরের কনট্রাক্ট। তারা জানতে পেরেছে সিঙ্গাপুরে একটি সেকেন্ড অপশন রয়েছে। দুইদিন ঘোরাঘুরির পর ম্যানেজিং ডিইরেক্টর তাকে অফার করেছে যদি সে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে তবে তাকে লাংকাভি সাগরের ধারে সুন্দর একটি বাড়ি উপহার হিসাবে দেওয়া হবে।

বোটে করে পুরো আইল্যান্ড ঘুরানো, খাতির যত্ন, সেইসাথে আরো একটি বাড়ি-এমন লোভনীয় অফার উপেক্ষা করতে পারে কজন? কিন্ত তিনি সবকিছু উপেক্ষা করলেন।

চুক্তি না করে সরাসরি চলে গেলেন সিঙ্গাপুরে এবং তাদের সাথে আলোচনার পর চুক্তি সাক্ষর করলেন-১০ নয় ১০.৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি। তিনি রিপোর্ট করলেন তার বসকে। বস সব শোনার পরে ম্যানেজিং বোর্ড নিউইয়র্কে রিপোর্ট করলেন।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাকে রিওয়ার্ড দিলেন এবং তিনি পদোন্নতিও পেলেন। এখানে একটি ভাববার বিষয়। তিনি যদি মালয়েশিয়া অফারে রাজি হয়ে চুক্তি করতেন তাহলে কোম্পানির বছরে ০.৫ মিলিয়ন ডলার বেঁচে যেতো এবং তিনি নিজের নামে সাগরের ধারে একটি সুন্দর কর্টেজ উপঢৌকন হিসেবে পেতেন কিন্ত তা তিনি করেননি কারন সততা এবং প্রলোভনের আসক্ত থেকে বিরতি থেকে একটি সুনিদর্শন তৈরি করা ছিল তার মূল উদ্যেশ্য।

খ) আমার এক কলিগ লসএঞ্জেলসে ওষুধ বিক্রির জন্য বিজনেস ট্রিপে পরিদর্শন করছেন ক্রেতাদের। কাজের শেষে সেখানকার কর্তৃপক্ষ তাকে আমেরিকান ফুটবল খেলা দেখাতে নিয়েছে এবং সেইদিন বিকেলে তিনি যখন স্টেডিয়ামে খেলা দেখছেন ঠিক তখনই ক্যালিফোর্নিয়াতে ভূমিকম্প হচ্ছিলো, এমন সময় তার বস তাকে ফোন করে জানতে চাইলেন যে তিনি নিরাপদে আছেন কিনা!

উত্তরে বললেন যে, তিনি ফুটবল খেলা দেখছেন এবং ভালো আছেন। কলিগ ফিরে এলে পরে জানা গেল ২০% কমে ব্যাবসাচুক্তি সাক্ষর হয়েছে।

অর্থাৎ কোম্পানিকে ২০% কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হবে, যা কোম্পানির জন্য ক্ষতির ব্যাপার।

ক্রেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ মেলামেশায় এবং তাদের সৌজন্যসুলভ ব্যবহারে আমার কলিগ আসক্ত হয়েছিলেন বিধায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ কারণে তাকে কোম্পানি থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল।

গ) এক সুইডিস বন্ধু আইটি কোম্পানির মালিক, তার ব্যস্ততার সময় ৩০কিমি/ঘন্টার রাস্তায় সে ৫০কিমি/ঘন্টায় গাড়ি চালাতেই পুলিশের লেন্সে ধরা পড়েছে। এ ধরনের অপরাধে একমাস গাড়ি চালানো নিষেধ।

বন্ধু তার অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং রেফারেন্স দিয়ে পরিচয় দেয় যে তার বন্ধু স্টকহোম জেলার পুলিশ সুপার তাই তাকে যেনো ছেড়ে দেওয়া হয়।

পুলিশ এ কথা শোনার পরে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স তৎক্ষণাৎ বাতিল ও সেইসাথে দশ হাজার ক্রোনার জরিমানা করে।

পুলিশকে ভয় দেখানো ও ক্ষমতার অপব্যবহার করার কারণে এমন শাস্তি তাকে পেতে হয়েছিল। পুলিশের সৎ এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কারণে দুর্নীতি পরাজিত হয়েছিল সেদিন।

ঘ) ২০১০ সালের কথা, সুইডেনের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেত্রী মোনা শালিনের বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করা হয় যে তিনি স্টকহোম ওপেনের এটিপি টেনিস ইভেন্টে যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন আয়োজকদের পক্ষ থেকে।

এবং তিনি পাঁচদিনই আমন্ত্রণ রক্ষা করে ফ্রি টিকেটে খেলা দেখেছিলেন। ফাইনাল বা পঞ্চম দিনে আরেকজন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেতা ও সাবেক মন্ত্রীও ফ্রি টিকেটে খেলা দেখেছিলেন।

অথচ অন্য একজন আমন্ত্রিত অতিথি সুইডিশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার টাকা দিয়ে টিকেট কিনে খেলা দেখেছিলেন।

মোনা শাহলিন এবং সামাজিক ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রি টিকিট গ্রহণ করায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের।

অর্থাৎ যারা তাদেরকে ফ্রি টিকেটে খেলা দেখিয়েছে তারা পরবর্তীতে কোনো অন্যায় আবদার নিয়ে এলে তাদেরকে কিভাবে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হবে?

এ ধরনের কাজকে সুইডেনে দুর্নীতি হিসেবে দেখা হয়েছে। উপরের চারটি ঘটনা আলোচনা এবং বিচার বিবেচনা করে বেশ পরিষ্কার যে ন্যায়-অন্যায়, ঘুষ-দুর্নীতি, নৈতিকতা-মূল্যবোধ-এসবের সাথে দৈনন্দিন কর্মের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

লক্ষণীয় হওয়া উচিত যে এসব অন্যায়গুলোকে খুব বড় আকারে ইউরোপে ধরা হয়। এবার ভাবা যাক বাংলদেশের দু্র্নীতি ও ঘুষের ধরন। মানুষ হত্যা বা একজনকে বিপদে ফেলে তার থেকে ঘুষ নেওয়া অথবা একজন মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীকে বাদ দিয়ে ঘুষের পরিবর্তে অন্যকে চাকরি দেওয়া, লাখ লাখ টাকা দিয়ে জিপিএ ৫ কেনা এমন হাজারো ক্রাইম যা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে!

এখানে এত বড় ক্রাইম হতে পারে যা ভাবতেও অবাক লাগে! স্কুল কলেজের লেখা পড়ার সাথে ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, সত্যি-মিথ্যে এসব বিষয়ে জানার জন্য ডিজিটাল যুগে আমাদের সবাইকে খোলামেলা ভাবে ডিবেট তৈরি করতে হবে। সমাজের দৈনন্দিন কাজে বা পরিবেশে নিয়ম কানুন থাকা সত্বেও ভুল ত্রুটি হতে পারে।কিন্ত ইচ্ছাকৃতভাবে বা জেনেশুনে অথবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে যখন কেউ অন্যায় কাজ করে তখন দেশে বা সমাজে অরাজকতার সৃষ্টি হয়।

ধ্বংস হয় গণতন্ত্রের। যে রাজ্যে রাজা-প্রজা, মন্ত্রী-সৈনিক, কোট-কাচারি সবই আছে এবং থাকা সত্বেও যখন অন্যায়-অত্যাচার চলে, সেখানে শিক্ষার ও নৈতিকতার অবক্ষয় ছাড়া আর কী হতে পারে?

তাই এর থেকে রেহাই পেতে হলে বন্দুক যুদ্ধ নয়, খুন-খারাবি নয়, ঘৃণা নয়, দরকার বিশেষায়িত শিক্ষক-শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়-যেখানে পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়াও আলোচনা হবে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, ম্যানেজমেন্ট বাই অবজেকটিভস, ভালো ও মন্দের ওপর এবং লার্নিং বাই ডুইং কনসেপ্ট ব্যবহার করতে হবে। জানতে হলে শিখতে হবে, তবেই হবে সুশিক্ষা আর সুশিক্ষাই হবে সোনার বাংলা গড়ার চাবিকাঠি।

রহমান মৃধা, পরিচালক ও পরামর্শক - সুইডেন থেকে।

 

 

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.