যে জাতি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে সে জাতি দেশ ভালোবাসে না

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০১৮, ১৯:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

ট্রাফিক সিগন্যাল। ছবি: যুগান্তর

আমার ছেলে জনাথানের বয়স ১৬ বছর হতেই সে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য দরখাস্ত করল। যেন সে আমার এবং তার মা মারিয়ার সঙ্গে গাড়ি চালাতে পারে। 

সুইডেনে ১৬ বছর বয়স হলে কারও সঙ্গে প্রাকটিস করার নিয়ম রয়েছে। তবে যার সঙ্গে চালাবে তার কমপক্ষে পাঁচ বছর গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। 

আমেরিকাতে ১৬ বছর বয়স হলেই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়া যায়, তবে ইউরোপে ১৮ বছর বয়স হতে হবে। 

কর্তৃপক্ষ জনাথানকে আবেদনের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়ে দিল। এখন সে সময় পেলেই আমাদের সঙ্গে গাড়ি চালানোর জন্য রাস্তায় বের হয়ে যায়। 

আমাদের দায়িত্ব তাকে ট্রাফিক লাইট থেকে শুরু করে সব বিষয়ে অবগতি করানো। সে বেশ ভালো গাড়ি চালাতে শিখল। 

পরে ১৮ বছর বয়স হতেই সে আবার দরখাস্ত করল যে সে এখন থিওরির পরীক্ষা দিতে চায় এবং পাস করলে সে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য গাড়ি চালানোর পরীক্ষাও দিতে প্রস্তুত। 

হয়ে গেল পারমিশন। পরীক্ষা দিতেই পাস করল। সঙ্গে প্রাকটিক্যালের জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হলো এবং একবারেই সে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে গেল।

লাইসেন্স পেতেই সে আমাদের গাড়িতে যেখানে সেখানে যেতে শুরু করল। সে একজন টেনিস খেলোয়াড়। হঠাৎ তার খেলা জনসোপিংয়ে। 

জনসোপিং স্টকহোম থেকে তিন ঘণ্টার রাস্তা। সে নিজে গাড়ি চালিয়ে সেখানে যেতে চায়। আমি কেন যেন সাহস পেলাম না যে, সে একা গাড়ি চালিয়ে যাক এত দূরে। 

তাই বললাম, ঠিক আছে চল আমি তোমার সঙ্গে যাই। যাত্রা শুরু হলো। বেশ চালাচ্ছে সে। মাঝেমধ্যে স্পিড ভ্যারি থাকায় সে বেশির ভাগ সময় স্পিড ভঙ্গ করছে। 

আমি তাকে বারবার বলছি, তুমি রাস্তার গতি সীমা লঙ্ঘন করছ। সে বলে, ৫-১০ কিলোমিটার কোনো সমস্যা নয়। এদিকে আমি বলছি, কেন তুমি নিয়ম লঙ্ঘন করছ?

১১০ কিলোমিটার গতিতে যেতে হবে, তুমি কেন তা মেনে চলছ না? পুলিশ তো তোমাকে ধরবে এবং প্রথমবার ফাইন ও পরের বার লাইসেন্স বাতিল করে দেবে। 

সে বলে, এখানে পুলিশ নেই। কিছু ভ্যারি হলে অসুবিধে নেই। হঠাৎ হেলিকপটারের শব্দ শুনতেই আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে জনাথান ধরা খেয়েছে। 

পুলিশ ওপর থেকে ল্যান্সের মাধ্যমে তার স্পিড নিয়ন্ত্রণ করছে যে সে ১১০ কিলোমিটারের রাস্তায় ১২৫ কিলোমিটার বেগে চালিয়েছে ১০ মিনিট ধরে।

বিধায় হঠাৎ ল্যান্ড পুলিশ আমাদের একজিটে নিয়ে গেল। ড্রাংভিং লাইসেন্স চেক করার পর সতর্কতাসহ ২ হাজার ক্রোনার জরিমানা করল। 

জনাথান জীবনে প্রথম শিক্ষা পেল। ফাইন খেল সে। টাকা গেল আমার। 

পুলিশ বলল, জনাথানকে আজকের জরিমানাটি তোমার টু ডু সিস্টে রেখে দাও এবং ভবিষ্যতে যেন এমনটি আর না ঘটে। 

তারপর থেকে জনাথান আর ট্রাফিকের ওপর কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেনি। 

আমার সুইডিস বন্ধু নাম নিকলাস। আইটি কোম্পানির মালিক। তার ব্যস্ততার সময় ৩০ কিমি/ঘণ্টার রাস্তায় সে ৫০কিমি/ঘণ্টায় গাড়ি চালাতেই পুলিশের ল্যান্সে ধরা পড়েছে। 

এ ধরনের অপরাধে এক মাস গাড়ি চালানো নিষেধ। বন্ধু তার অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং রেফারেন্স দিয়ে পরিচয় দেয় যে তার বন্ধু স্টকহোম জেলার পুলিশ সুপার। 

তাই তাকে যেন ছেড়ে দেয়া হয়। পুলিশ এ কথা শোনার পরে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স তৎক্ষণাৎ বাতিল এবং ১০ হাজার ক্রোনার জরিমানা করে। 

পুলিশকে ভয় দেখানো ও ক্ষমতার অপব্যবহার করার কারণে এমন শাস্তি তাকে পেতে হয়েছিল। পুলিশের সৎ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কারণে দুর্নীতি পরাজিত হয়েছিল সেদিন। 

ট্রাফিকের নিয়ম ভঙ্গ করা বা রেড লাইটের সিগন্যাল না মানা মাঝেমধ্যে হয়ে থাকে কমবেশি পৃথিবীর সবখানে।

এমন অপরাধে (ব্যতিক্রম মানসিক বিকারগ্রস্ত, নেশাগ্রস্ত, অপরাধী, অসচেতন) ধরা খেলে জরিমানা সঙ্গে লাইসেন্স বাতিল হওয়াটা নির্ভর করে পৃথিবীর কোন দেশে ঘটনাটি ঘটেছে তার ওপর। 

যেখানেই ঘটুক না কেন শাস্তি সব জায়গাতে এক। কিন্তু বাংলাদেশে এটা একেবারেই বলতে গেলে অন্যরকম। কারণ একটাই তা হলো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা এবং দুর্নীতিযুক্ত ব্যবস্থাপনা। 

ঘুষ দিয়ে যদি অন্যায়কে ঢাকার সুযোগ থাকে তবে তা পৃথিবীর সর্বত্র ট্রাফিকের নিয়মকানুনের লঙ্ঘন ঘটাতে পারে। কিন্তু তা সবখানে সম্ভব নয় বিধায় সবাইকে ট্রাফিকের নিয়ম মেনে চলতে হয়। 

বাংলাদেশে কি আদৌ রেড সিগন্যাল বা রাস্তার গতি মেনে চলা হয়? না মানার কারণ কী হতে পারে? 

এখানে বেশির ভাগ ক্ষমতাশীল লোক ব্যবহার করে তাদের ক্ষমতাকে বা তারা ঘুষ দিয়ে এ ধরনের ক্রাইম থেকে সচরাচর মুক্তি পেয়ে থাকে। 

নিয়ম ভঙ্গ করা নতুন কিছু নয় তবে শাস্তি না পাওয়া বা যদি ঠিকমতো শাস্তি দেয়া না হয় তখন তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। 

বাংলাদেশে যারা যানবহন চালান তাদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শুধুমাত্র প্লেনের পাইলটদের ভালো প্রশিক্ষণ দিলেই কি মানব জাতির জীবনের গারান্টি আসবে? 

যারা অনিয়ম করে গাড়ি চালাচ্ছে এবং প্রতিটি গাড়িতে কম করে হলেও ১০০ জন যাত্রী রয়েছে। যদি এক্সিডেন্ট ঘটে তবে কতগুলো জীবনের শেষ হবে? 

প্লেনের পাইলট আর গাড়ির চালকের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য দেখতে পারি? যদি অসতর্কতার কারণে এক্সিডেন্ট ঘটে? 

মানব জাতিকে ম্যুরাল ভ্যালু ও ঘুষমুক্ত সুপ্রশিক্ষণ দিতে পারলেই তৈরি হবে রেসপেক্ট ও দায়িত্ববোধ। 

যে জাতি ট্রাফিকের সিগন্যাল অমান্য করতে পারে সে জাতির দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকতে পারে বলে আমার মনে হয় না। 

যেদিন জাতি এই ছোট একটি পরীক্ষায় পাস করবে শুধু ট্রাফিকের সিগন্যালের ওপর রেসপেক্ট দেখাবে, সেদিন প্রমাণিত হবে সোনার বাংলায় লাল সবুজের পতাকার জয় হয়েছে, সেই সঙ্গে মানবতারও। 

ট্রাফিক সিগন্যালের ওপর রেসপেক্ট দেখানো মানে জাতি মানবতার ওপর রেসপেক্টের পরিচয় দিতে শিখেছে ভাবা যাবে। 

বাংলাদেশে অনতিবিলম্বে উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থা সুপরিসর রাস্তা নির্মাণ এবং আইন মেনে চলার আন্তরিকতা গড়ে উঠুক এমন প্রত্যাশায় সুইডেন থেকে রহমান মৃধা।

[email protected]