‘কীর্তিনাশার বুকে অমর কীর্তি’
jugantor
‘কীর্তিনাশার বুকে অমর কীর্তি’

  মনোজ সরকার  

২৮ জুন ২০২২, ২৩:৫১:০৭  |  অনলাইন সংস্করণ

পদ্মা, প্রমত্তা পদ্মা, খরস্রোতা পদ্মা, কীর্তিনাশা পদ্মা- যেন মহানন্দে ছুটে চলা এক দুরন্ত পাগলা ঘোড়া। সামনে যা পেয়েছে সব গিলে খেয়েছে এই সর্বনাশী। বিশ্বের সবচেয়ে খরস্রোতা নদী অ্যামাজনের পরেই পদ্মার স্থান। কত ইতিহাস, কত মহান কীর্তি, কত অমরগাথা, কত মানুষের জীবন এই সর্বনাশীর পেটে গেছে- তার ইয়ত্তা নেই। রাজা রাজবল্লভের বিশ্বনন্দিত অমর কীর্তি বুকে ধারণ করায় কীর্তিনাশা নামে অভিহিত করা হয় এই প্রমত্তা পদ্মাকে।

পদ্মা নদীর কথা শুনলেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কয়েকটি লাইনের কথা মনে পড়ে যায়।

‘আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি!
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ’।

‘নৃত্য-পাগল ছন্দ’ পদ্মাকে শাসন করে এর বুকে মহান কীর্তি গড়া সোজা কথা নয়। আর এই কঠিন কাজকে করে দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য প্রমত্তা পদ্মা নদীর সঙ্গে ইতিহাসে শেখ হাসিনার নামও জড়িয়ে থাকবে।

পদ্মার বুকে একটা সেতু দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের হৃদয় এক সুতোই বেঁধে ফেলেছেন। ২৫ জুন সকালে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর নতুন উদ্যমে স্বপ্ন বুনছেন খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ীসহ দেশের সব মানুষ। অদম্যকে জয় করার আবেগ আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়; দেশের প্রতিটি মানুষের চোখে-মুখে তার ঝলক দেখা গেছে। আর প্রমত্তা পদ্মার বুকে সেতুর মাধ্যমে যে বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বাংলাদেশের প্রধান ও দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী পদ্মা প্রমত্তা আর পাঁচটা সাধারণ নদীর মতো নয়; বেশ ভয়ংকর খরস্রোতা। হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন গঙ্গা নদী রাজশাহী জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। রাজা রাজবল্লভের কীর্তি পদ্মার ভাঙনের মুখে পড়ে ধ্বংস হয় বলে পদ্মার আরেক নাম কীর্তিনাশা।

বাংলাদেশে নদীটির দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১০ কিলোমিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। পদ্মার সর্বোচ্চ গভীরতা ১ হাজার ৫৭১ ফুট (৪৭৯ মিটার) এবং গড় গভীরতা ৯৬৮ ফুট (২৯৫ মিটার)। পদ্মা দিয়ে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়, তা বিশ্বের প্রথমসারির নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতি সেকেন্ডে এই নদী দিয়ে প্রায় ৩৮ হাজার ১২৯ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়।

পদ্মা নদী শুধু ধ্বংসই করেনি, গড়েছেও অনেক। রাক্ষুসী পদ্মার উন্মত্ততা যেমন বাঁধভাঙা পাগলা ঘোড়ার মতো মাতঙ্গিনীরূপে মানুষের ঘরবাড়ি, গ্রাম-গঞ্জ, হাটবাজার, হাজারো কীর্তি গিলে খেয়েছে; ঠিক তেমনই দিয়েছেও বুক উজাড় করে। এ নদীর বুকে জেগে ওঠা দিগন্তজোড়া চর মানুষের বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছে। পদ্মাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হাজারো গ্রাম, নগর, বন্দর। লাখো কোটি মানুষের জীবিকার উৎসও এই পদ্মা। বাংলাদেশকে সবুজে-শ্যামলে ভরে তোলার পেছনে পদ্মা নদীর ভূমিকা অপরিসীম। এ নদীর পানিতে বয়ে আসা পলি প্রাকৃতিকভাবে আমাদের মাটিকে উর্বর করেছে। আর মিঠা পানির মাছের অন্যতম উৎসও এই নদী।

পদ্মার নৈসর্গিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নানাভাবে প্রভাবিত করেছে আমাদের কবি, লেখক, সাহিত্যিকদের। কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কিছু গানে পদ্মার হারানো ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এই নদীর তীরের মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করেই লেখা। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক রচিত ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপন্যাসে পদ্মাপাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা উঠে এসেছে।

এবার কীর্তিনাশার বুকে গড়ে উঠেছে এক অমর কীর্তি। পদ্মা সেতু যেন এক অমর বীরগাথা। বীরেরা যেমন শত্রু প্রচণ্ডতাকে দমন করে নিজেদের কীর্তি প্রতিষ্ঠা করে; তেমনই পদ্মার প্রচণ্ডতাকে বশ করে এর বুকে গড়ে উঠেছে পদ্মা সেতু। আর এই পদ্মা সেতু যেন- ‘কীর্তিনাশার বুকে অমর কীর্তি’।

‘কীর্তিনাশার বুকে অমর কীর্তি’

 মনোজ সরকার 
২৮ জুন ২০২২, ১১:৫১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

পদ্মা, প্রমত্তা পদ্মা, খরস্রোতা পদ্মা, কীর্তিনাশা পদ্মা- যেন মহানন্দে ছুটে চলা এক দুরন্ত পাগলা ঘোড়া। সামনে যা পেয়েছে সব গিলে খেয়েছে এই সর্বনাশী। বিশ্বের সবচেয়ে খরস্রোতা নদী অ্যামাজনের পরেই পদ্মার স্থান। কত ইতিহাস, কত মহান কীর্তি, কত অমরগাথা, কত মানুষের জীবন এই সর্বনাশীর পেটে গেছে- তার ইয়ত্তা নেই। রাজা রাজবল্লভের বিশ্বনন্দিত অমর কীর্তি বুকে ধারণ করায় কীর্তিনাশা নামে অভিহিত করা হয় এই প্রমত্তা পদ্মাকে। 

পদ্মা নদীর কথা শুনলেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কয়েকটি লাইনের কথা মনে পড়ে যায়।

‘আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি!
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ’।

‘নৃত্য-পাগল ছন্দ’ পদ্মাকে শাসন করে এর বুকে মহান কীর্তি গড়া সোজা কথা নয়। আর এই কঠিন কাজকে করে দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য প্রমত্তা পদ্মা নদীর সঙ্গে ইতিহাসে শেখ হাসিনার নামও জড়িয়ে থাকবে।

পদ্মার বুকে একটা সেতু দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের হৃদয় এক সুতোই বেঁধে ফেলেছেন। ২৫ জুন সকালে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর নতুন উদ্যমে স্বপ্ন বুনছেন খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ীসহ দেশের সব মানুষ। অদম্যকে জয় করার আবেগ আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়; দেশের প্রতিটি মানুষের চোখে-মুখে তার ঝলক দেখা গেছে। আর প্রমত্তা পদ্মার বুকে সেতুর মাধ্যমে যে বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বাংলাদেশের প্রধান ও দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী পদ্মা প্রমত্তা আর পাঁচটা সাধারণ নদীর মতো নয়; বেশ ভয়ংকর খরস্রোতা। হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন গঙ্গা নদী রাজশাহী জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। রাজা রাজবল্লভের কীর্তি পদ্মার ভাঙনের মুখে পড়ে ধ্বংস হয় বলে পদ্মার আরেক নাম কীর্তিনাশা।

বাংলাদেশে নদীটির দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১০ কিলোমিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। পদ্মার সর্বোচ্চ গভীরতা ১ হাজার ৫৭১ ফুট (৪৭৯ মিটার) এবং গড় গভীরতা ৯৬৮ ফুট (২৯৫ মিটার)। পদ্মা দিয়ে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়, তা বিশ্বের প্রথমসারির নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতি সেকেন্ডে এই নদী দিয়ে প্রায় ৩৮ হাজার ১২৯ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়।

পদ্মা নদী শুধু ধ্বংসই করেনি, গড়েছেও অনেক। রাক্ষুসী পদ্মার উন্মত্ততা যেমন বাঁধভাঙা পাগলা ঘোড়ার মতো মাতঙ্গিনীরূপে মানুষের ঘরবাড়ি, গ্রাম-গঞ্জ, হাটবাজার, হাজারো কীর্তি গিলে খেয়েছে; ঠিক তেমনই দিয়েছেও বুক উজাড় করে। এ নদীর বুকে জেগে ওঠা দিগন্তজোড়া চর মানুষের বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছে। পদ্মাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হাজারো গ্রাম, নগর, বন্দর। লাখো কোটি মানুষের জীবিকার উৎসও এই পদ্মা। বাংলাদেশকে সবুজে-শ্যামলে ভরে তোলার পেছনে পদ্মা নদীর ভূমিকা অপরিসীম। এ নদীর পানিতে বয়ে আসা পলি প্রাকৃতিকভাবে আমাদের মাটিকে উর্বর করেছে। আর মিঠা পানির মাছের অন্যতম উৎসও এই নদী।

পদ্মার নৈসর্গিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নানাভাবে প্রভাবিত করেছে আমাদের কবি, লেখক, সাহিত্যিকদের। কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কিছু গানে পদ্মার হারানো ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এই নদীর তীরের মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করেই লেখা। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক রচিত ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপন্যাসে পদ্মাপাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা উঠে এসেছে।

এবার কীর্তিনাশার বুকে গড়ে উঠেছে এক অমর কীর্তি। পদ্মা সেতু যেন এক অমর বীরগাথা। বীরেরা যেমন শত্রু প্রচণ্ডতাকে দমন করে নিজেদের কীর্তি প্রতিষ্ঠা করে; তেমনই পদ্মার প্রচণ্ডতাকে বশ করে এর বুকে গড়ে উঠেছে পদ্মা সেতু। আর এই পদ্মা সেতু যেন- ‘কীর্তিনাশার বুকে অমর কীর্তি’।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : পদ্মা সেতু নির্মাণ