চতুর্মুখী লড়াইয়ে ঢাকা–৭, বিএনপি-বিদ্রোহী দ্বন্দ্বে অন্য প্রার্থীরা কি ‘খালি মাঠে গোল’ দেবে?
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম
বিএনপি প্রার্থী মো. হামিদুর রহমান হামিদ (বামে) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসহাক সরকার। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুরান ঢাকা মানেই রাজনীতির উত্তাপ, ইতিহাসের ভার আর ভোটের জটিল অঙ্ক–কষাকষি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পুরান ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ঢাকা–৭ সংসদীয় আসন এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কোতোয়ালি ও কামরাঙ্গীরচরের ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলো নিয়ে গঠিত এই আসনে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, কর্মী–সমর্থকদের সক্রিয়তা এবং ভোটারদের কৌতূহলে নির্বাচনি মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
এবারের নির্বাচনে ঢাকা–৭ আসনে চতুর্মুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হলেও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ধানের শীষ ও ফুটবল মার্কার দ্বন্দ্ব। একই রাজনৈতিক ধারার দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভোটের সমীকরণকে যেমন জটিল করেছে, তেমনি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও নতুন সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করেছে। ফলে এই দ্বন্দ্বের ফাঁকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা হিসাব–নিকাশ চলছে।
গত বছরের ৩ নভেম্বর বিএনপি ২৩৭ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করলেও ঢাকা–৭ সেই তালিকার বাইরে ছিল। ফলে শুরু থেকেই এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলক বেশি। আলোচনায় ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ–যুববিষয়ক সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. হামিদুর রহমান হামিদ, যুবদলের কেন্দ্রীয় সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন চেয়ারম্যান, ডিএসসিসির ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মো. মোশাররফ হোসেন খোকন, অস্ট্রেলিয়া মেলবোর্ন বিএনপির সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ মনি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাসিমা আক্তার কল্পনা ও রফিকুল ইসলাম রাসেল—মোট আটজন নেতা।
শেষ পর্যন্ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ধানের শীষের মনোনয়ন দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. হামিদুর রহমান হামিদকে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার ফুটবল মার্কায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হলেও, ভোটের ভাগাভাগির প্রশ্নে অন্য দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা জোরদার হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ হাজী মো. এনায়েত উল্লাহ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছেন দলের কেন্দ্রীয় কৃষি ও শ্রম বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব আব্দুর রহমান। দুজনই একক দলীয় প্রার্থী হিসেবে নিজ নিজ ভোটব্যাংক ধরে রাখতে সক্রিয় রয়েছেন।

এদের বাইরে নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) থেকে সীমা দত্ত, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মাকসুদুর রহমান, জাতীয় পার্টির মো. শহিদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. হাবিবুল্লাহ, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) থেকে শাহানা সেলিম।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রবীণ বাসিন্দা ও সরেজমিনে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, এবারের ঢাকা–৭ আসনের নির্বাচন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্যতিক্রমী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে এই আসনে বিএনপির এমপি–শূন্যতা কাটানোর প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যমান ছিল। নাসির উদ্দিন পিন্টুর পর হাজী সেলিম টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নবম সংসদ নির্বাচনে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এবং দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সোলায়মান সেলিম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে জয়ী হয়েছিলেন নাসির উদ্দিন পিন্টু।
বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্যে, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে বিএনপি সবসময় দেশবাসীর পাশে থেকেছে। আন্দোলন–সংগ্রাম, হত্যা, জেল–জুলুমসহ নানা নির্যাতন সহ্য করে বহু নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন। দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য যেমন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তেমনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ নির্যাতন সহ্য করেও দেশের মাটিতে থেকেছেন। তার আদর্শের সন্তান আরাফাত রহমান কোকোও নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। একইভাবে দেশনায়ক তারেক রহমান ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্যেও দেশের ভবিষ্যৎ ভাবনা থেকে সরে যাননি—এটাই বিএনপির রাজনীতির ধারাবাহিকতা বলে দাবি নেতাকর্মীদের।
তাদের মতে, সেই ত্যাগ ও আন্দোলনের জবাব দেবে দেশের ছাত্রসমাজ, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ জনগণ—আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে বিএনপিকে বিজয়ী করে। তারা আরও বলেন, বিএনপির ধানের শীষ মনোনীত প্রার্থী হামিদুর রহমান হামিদের এলাকার উন্নয়ন নিয়ে স্বপ্ন ও পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের জানা। সে কারণেই এবার শুধু নেতাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষই ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নেমেছে। জয়ের দ্বারপ্রান্তেই রয়েছেন হামিদ।
এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসহাক সরকারের সমর্থকদের মতে, দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে মানুষ একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোটের অপেক্ষায় ছিল, আর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই। তারা জানান, ইসহাক সরকার এলাকার সন্তান হিসেবে দীর্ঘদিন জনগণের সঙ্গে পথেঘাটে সময় কাটিয়েছেন এবং তিন শতাধিক রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন।
সমর্থকদের ভাষ্যে, মানুষের অধিকার আদায় এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তার প্রত্যাশা একটিই—ভোটের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং একটি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত রায় প্রতিফলিত হওয়া। তারা বলেন, সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে যে নেতৃত্বই নির্বাচিত হোক না কেন, জনগণের রায় হিসেবে তা সবাই মেনে নেবে—এই বিশ্বাস থেকেই তিনি নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন।
নতুন দেড় লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারই যুক্ত হয়েছে কামরাঙ্গীরচরের ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডে। ফলে কামরাঙ্গীরচর এখন এই আসনের ‘গেম চেঞ্জার’ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঢাকা–৭ সংসদীয় আসনটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৭৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮১ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১২ জন।
নতুন যুক্ত হওয়া দেড় লাখ ভোটারের বড় অংশ কামরাঙ্গীরচরে যোগ হওয়ায় এই এলাকা নির্বাচনি সমীকরণের প্রধান নিয়ামকে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এখানকার ভোট যেকোনো প্রার্থীর ভাগ্য ঘুরিয়ে দিতে পারে। এর পাশাপাশি লালবাগ থানা এলাকার পর বংশাল থানাও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ ও বংশাল—এই তিন থানার ভোটের প্রবণতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেবে নির্বাচনের জয়–পরাজয়ের চূড়ান্ত হিসাব। ফলে কোন প্রার্থী এসব এলাকায় কতটা সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন গড়ে তুলতে পেরেছেন, তার প্রকৃত প্রতিফলন দেখা যাবে ভোটের দিনই।
আওয়ামী লীগের ভ্রাম্যমান ভোট কতটুকু প্রভাব ফেলবে?
স্থানীয়দের মতে, আওয়ামী লীগের ভ্রাম্যমান ভোট কোন দিকে যাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলটির সমর্থকদের একটি অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছে। এই ভোট যদি কোনো একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে ফলাফলে তা দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারে।
জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাফেজ হাজী মো. এনায়েত উল্লাহ নারী ভোটার, মাদ্রাসাভিত্তিক ভোটব্যাংক এবং ব্যবসায়ী সমাজকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। চকবাজার এলাকায় বসবাসকারী এই প্রার্থী দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এলাকাজুড়ে তার পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
তার নেতাকর্মীদের ভাষ্য, এনায়েত উল্লাহ আদর্শভিত্তিক রাজনীতির প্রতীক হিসেবে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা আরও জানান, এবারের নির্বাচনে ঢাকা–৭ আসনের ভোটারদের তার প্রতি দোয়া ও সমর্থন রয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলে তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।

নেতাকর্মীদের মতে, ভোটের আগের শেষ দুই দিনে সাধারণ মানুষই স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন কে বিজয়ের দিকে এগিয়ে রয়েছেন।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আলহাজ্ব আব্দুর রহমান আগের নির্বাচনে প্রায় ২৬ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। ফলে তার একটি স্থায়ী ভোটব্যাংক রয়েছে। নাগরিক সমস্যা, গ্যাস সংকট, মাদক ও চাঁদাবাজি রোধ এবং কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন এবং তিনি আশাবাদী।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ঢাকা–৭ আসনে এবারের নির্বাচন কোনো একক ধারায় সীমাবদ্ধ নয়। ধানের শীষ ও ফুটবল মার্কার দ্বন্দ্ব, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের সংগঠিত ভোটব্যাংক, আওয়ামী লীগের ভ্রাম্যমান ভোট এবং বিপুল নতুন ভোটার—সব মিলিয়ে যেকোনো পক্ষের জন্যই সম্ভাবনার দরজা খোলা রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে বিজয়ের মালা, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত। তবে এক বিষয়ে সবাই একমত— ঢাকা–৭ আসনের এই নির্বাচন শুধু একটি আসনের ফল নয়, এটি পুরান ঢাকার রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও ঠিক করে দেবে।

