জামায়াত থেকে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

জামায়াত থেকে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ
জামায়াত

দল বিলুপ্ত এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। খবর বিবিসির।

জামায়াতের আমীর মকবুল আহমদকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন তিনি। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকাকেই সামনে এনেছেন। পদত্যাগপত্রে রাজ্জাক বলেছেন- তিনি দুই দশক ধরে দলের শীর্ষ নেতাদের বোঝাতে চেয়েছেন যে, জামায়াত যেন একাত্তরের ভূমিকার জন্য জাতির কাছ ক্ষমা চায়। কিন্তু স্বাধীনতার চার দশক পরও জামায়াত সেটি করেনি।

পদত্যাগপত্রে ব্যারিস্টার রাজ্জাক উল্লেখ করেছেন স্বাধীনতায় বিরোধিতার জন্য তিনি জামায়াতকে বিলুপ্ত করে দেয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন দলীয় ফোরামে। কিন্তু জামায়াত সেটি করেনি।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের এ আইনজীবী।যুক্তরাজ্যের এসেক্সের বারকিং থেকে তিনি চিঠিটি আমিরে জামায়াত বরাবর পাঠিয়েছেন।

পাঠানো চিঠিতে তিনি এও বলেছেন, ওই ইস্যুতে তিনি জামায়াতকে বিলুপ্ত করে দেয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন দলীয় ফোরামে।

যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দল জামায়াত নিষিদ্ধ করার বিষয়ে যখন জোর আলোচনা হচ্ছে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত যখন নাম পরিবর্তন করে নতুন নামে রাজনীতি শুরু করার চিন্তা করছে, তখন দলটির এই জ্যেষ্ঠ নেতার পদত্যাগের খবর এলো। ব্যারিস্টার রাজ্জাক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতাদের প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন।

জামায়াতের রাজনীতি থেকে বিদায় নেয়ার পেছনে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। একাত্তরের ভূমিকার জন্য দলটির ক্ষমা না চাওয়া, দলটির নাম পরিবর্তন না করার বিষয়ে শীর্ষ নেতাদের অনড় অবস্থান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সংস্কার করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেন তিনি।

পদত্যাগপত্রে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বৈশ্বিক রাজনীতির বাস্তবতা ও একাত্তরে দলের ভূমিকা নিয়ে বর্তমানে যে প্রভাব, তা তুলে ধরেছেন দলের আমিরের কাছে।তিনি লিখেছেন- জামায়াতে যোগ দেয়ার পর থেকে তিনি দলের ভেতর থেকে সংস্কারের চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিন দশক ধরে তিনি সে চেষ্টাই করে গেছেন। কিন্তু জামায়াত তার কথা শোনেনি। তাই তিনি হতাশ। এমতাবস্থায় পদত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন।

একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে চিঠিতে ব্যারিস্টার রাজ্জাক লেখেন- স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর আজও দলের নেতারা '৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে পারেনি। এমনকি মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ প্রসঙ্গে দলের অবস্থানও জাতির সামনে ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

পদত্যাগপত্রে বলেন, গত প্রায় তিন দশক তিনি জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, '৭১-এ দলের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত এবং ওই সময়ে জামায়াতের ভূমিকা ও পাকিস্তান সমর্থনের কারণ উল্লেখ করে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক মনে করেন- উপমহাদেশে জামায়াতের রাজনীতির ঐতিহ্য প্রশংসার দাবি রাখে। দলটি '৬০-এর দশকে সব সংগ্রামে যেমন অংশ নিয়েছে, তেমনি '৮০-র দশকে আট দল, সাত দল ও পাঁচ দলের সঙ্গে যুগপৎভাবে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। কিন্তু জামায়াতের এসব অবদান একটি ভুলের জন্য গণমানুষেরে কাছে স্বীকৃতি পায়নি। '৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তখনকার নেতাদের ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে জামায়াত অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা পরবর্তীকালে জামায়াতের সব সাফল্য ও অর্জন ম্লান করে দিয়েছে বলে মনে করেন রাজ্জাক।

একাত্তরের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য ওই সময়কার নেতাদের পক্ষ থেকে জামায়াতকে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিয়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের পক্ষের এই কৌঁসুলি চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন '৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের ক্ষতিকর ভূমিকা সম্পর্কে ভুল স্বীকার করে জাতির সঙ্গে সেই সময়ের নেতাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে পরিষ্কার অবস্থান নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।’

ব্যারিস্টার রাজ্জাক যে বারবার মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে সেই সময়কার দলীয় ভুল সিদ্ধান্তের জন্য দলের নেতাদের ক্ষমা চাইতে বলেছেন, সেটি পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে চিঠিতে তিনি লেখেন- ‘২০০১ সালে জামায়াতের সেই সময়ের আমির (মতিউর রহমান নিজামী) এবং সেক্রেটারি জেনারেল (আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ) মন্ত্রী হওয়ার পর বিজয় দিবসের আগেই ১৯৭১ নিয়ে বক্তব্য দেয়ার জন্য তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন একটি কমিটি এবং বক্তব্যের খসড়াও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।’

দলীয় ফোরামে এ বিষয়ে নিজের অবস্থান বারবার পরিষ্কার করেছেন জানিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, ‘২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বৈঠকেও তিনি প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন এবং ২০০৭-০৮ সালে জরুরি অবস্থার সময়েও তিনি জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।’

তিনি জানান, পরে ২০১১ সালে মজলিসে শূরার সবশেষ প্রকাশ্য অধিবেশনেও তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন। কিন্তু দলের শীর্ষ নেতাদের একাংশের অবহেলায় তার প্রস্তাব নাকচ হয় বলে উল্লেখ করেন পদত্যাগপত্রে।

বর্তমান আমিরে জামায়াতকেও একই ইস্যুতে বক্তব্য দেয়ার অনুরোধ করেন রাজ্জাক। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে জাতির কাছে দলের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে একটি খসড়া বক্তব্য লিখে আমিরে জামায়াতকে দেন তিনি। এমনটি জানিয়ে পদত্যাগপত্রে ব্যারিস্টার রাজ্জাক লেখেন- ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বর্তমান আমির মকবুল আহমদকেও চিঠি পাঠিয়ে ১৯৭১ প্রসঙ্গে বক্তব্য দেয়ার প্রস্তাব করি। ২০১৬ সালের নভেম্বরে আমার মতামত চাইলে আমি এ বিষয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া সংক্রান্ত একটি খসড়া বক্তব্য লিখে পাঠাই আমিরে জামায়াতকে। কিন্তু সেটিও আর বাস্তবায়িত হয়নি।

সবশেষ তিনি জামায়াতকে বিলুপ্ত করার পরামর্শ দেন জানিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাক জানান, ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জানুয়ারি মাসে জামায়াতের করণীয় সম্পর্কে তার মতামত চাওয়া হয়। তখন তিনি যুদ্ধকালীন জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে দায়দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেন। অন্য কোনো বিকল্প না পেয়ে এবং মতামতের সাড়া না পেয়ে জামায়াত বিলুপ্ত করে দেয়ার পরামর্শ দেন দলীয় নেতাদের।

জামায়াত তার পরামর্শ গ্রহণ না করায় আক্ষেপ করে ব্যারিস্টার রাজ্জাক লেখেন- অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমার তিন দশকের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

‘বিগত ৩০ বছর আমি সেই চেষ্টাই করেছি। আমি কাঠামোগত সংস্কার ও নারীর কার্যকর অংশগ্রহণের পক্ষে ছিলাম। ২০১৬ সালে চিঠি দিয়ে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। অন্য মুসলিম দেশগুলোর উদাহরণ দিয়েছি। কিন্তু কোনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি’-লেখেন রাজ্জাক।

পদত্যাগপত্রে ব্যারিস্টার রাজ্জাক উল্লেখ করেন, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান মেনে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে জামায়াতকে একটি গণতান্ত্রিক দল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু সে দাবি অনুযায়ী জামায়াত নিজেকে এখন পর্যন্ত সংস্কার করতে পারেনি। এটিকে জামায়াতের একটি ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। লন্ডন যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সেই সময়ে আটক থাকা জামায়াত নেতাদের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।১৯৮৬ সালে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন সুপ্রিমকোর্টের এ আইনজীবী।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×