সংসদে যুগান্তর সাংবাদিকের মুক্তি দাবি জিএম কাদেরের

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৯, ২৩:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

  সংসদ রিপোর্টার

বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের। ফাইল ছবি

বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের দুর্র্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। 

সোমবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি যুগান্তরের কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি আবু জাফরের মুক্তি দাবি করে বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করায় আবু জাফর এখন কারাগারে। 

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নও আবু জাফরের মুক্তি দাবি করেছে। তিনি বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হলে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে, সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংবাদিক ইউনিয়নগুলো অভিযোগ করে আসছে, সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার করছে। যখন এ আইন প্রণয়ন করা হয় তখন আমরা বিরোধিতা করেছিলাম। তখন আইনমন্ত্রীসহ সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, কোনো নিরীহ মানুষ এ আইনের অপব্যবহারের শিকার হবেন না।

তিনি বলেন, সাংবাদিকরাও স্বাধীন এবং নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এ আইনকে গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ আইনের কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা আজ হুমকির মুখে। 

বিরোধীদলীয় উপনেতা দুর্নীতি বন্ধে এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশে একদিকে উন্নয়ন হচ্ছে। অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বেকারত্ব বাড়ছে। শুধু সরকারি হিসাবেই বছরে ১৫-১৮ লাখ লোক বেকার হচ্ছে। এ বেকারত্ব লাঘবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি বন্ধে কঠোর হতে হবে। 

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, সরকারের পক্ষে সব খবর জানা সম্ভব নয়। গণমাধ্যম কর্মীরাই প্রকৃত চিত্র তুলে আনে খবরের পাতায়। তারা যদি বাধাগ্রস্ত হন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের শিকার হন, তারা যদি লিখতে না পারেন, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজের অনেক দুর্নীতির চিত্রই ধামাচাপা পড়ে থাকবে। সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে না। দুর্নীতিবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে পড়বে। এতে করে সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণে সরকারের ব্যাপক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হলেও আমি মনে করি উন্নয়নে আরও মনোযোগ দিতে হবে। সড়ক নির্মাণের খরচ পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি। এর পেছনে রয়েছে দুর্নীতি এবং ধীর গতি। ঢাকা-চট্টগ্রাম ৪ লেনের সড়ক উন্নীত করার খরচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সড়ক নির্মাণের খরচের চেয়ে ১০ গুণ বেশি।

তিনি বলেন, গত ১০ বছরে সরকারি পর্যায়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি কমেনি। দুর্নীতির কারণে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলেছে। আমিও মনে করি, দুর্নীতি বন্ধে সরকার আরও কঠোর হবে।   

সুশাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে জিএম কাদের বলেন, সুশাসন না থাকলে বৈষম্য বাড়ে, অনাচার-অত্যাচার বাড়ে। ন্যায়বিচার ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ কঠিন হয়ে যাবে। তাই সুশাসন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী দেশে গত ১ বছরে ৪১৮ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটি বন্ধ করতে হবে। 

তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। গত এক বছরে ২৫ হাজারের বেশি লোক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এর জন্য ৯০ ভাগ চালক দায়ী। চালকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিনা লাইসেন্সে কেউ চালক হতে না পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। 

জিএম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টির নিজস্ব প্রতীক এবং নীতি রয়েছে। জাতীয় পার্টি দীর্ঘদিন ধরে দেশ পরিচালনা করেছে। বিরোধী দলেও ছিল। সত্যিকারের বিরোধী দল হতে চাইলে কেন বলা হবে এটা পাতানো খেলা। 

তিনি বলেন, সংসদকে প্রাণবন্ত করতে চাইলে আমাদের কথা বলতে দিতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে। আমাদের সমালোচনাকে শত্রু ভাবা যাবে না। আমাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে ভাবতে হবে। আমাদের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হলে তা গ্রহণ করতে হবে।

রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার জনগণের কাছে একটি সংখ্যা মাত্র। জনগণ মনে করে কী পেলাম, তারা তাদের প্রাপ্তিটা দেখতে চায়। বেকার সমস্যার অবসান চায়। উচ্চ প্রবৃদ্ধি এ বেকার সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বেকার সমস্যা লাঘব হয়নি। মাথা পিছু আয় বাড়ছে। আবার আয়ের সঙ্গে বৈষম্যও বাড়ছে। এটা সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তিনি অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচলের সংখ্যা বাড়ানো এবং পুরনো বিমান চালুর দাবি জানান।

জিএম কাদের বলেন, নিমতলীর ঘটনা থেকে কেউ শিক্ষা নেয়নি। ওই সময়কার সুপারিশ আমলে নিলে চকবাজারের ঘটনা ঘটত না। মানুষকে বাঁচাতে চাইলে পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরাতেই হবে। 

তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশে যাওয়া-আসার সময় নাজেহাল হচ্ছেন। এটা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জিএম কাদের বলেন, একটা কথা আছে, ‘বাতির নিচে অন্ধকার’। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত, চিকিৎসকের অভাব। এসব জায়গায় চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অনেক জায়গায় চিকিৎসকের পদ শূন্য। এসব শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। জিএম কাদের ভারতের সঙ্গে অনএরাইভাল ভিসা ব্যবস্থা চালুরও দাবি জানান।

বিরোধীদলীয় উপনেতা তার নির্বাচনী এলাকা লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরে বলেন, ‘আমার এলাকার মানুষ মনে করেন শেখ হাসিনার সরকার তাদের এলাকার উন্নয়ন করবেন। বেকারত্ব কমাতে নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা স্থাপনে উদ্যোগ নেবেন। তিনি লালমনিরহাট বিমানবন্দর পুনরায় চালুর দাবি জানান। 

জিএম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট গঠন করে নির্বাচন করেছে। কথা ছিল একসঙ্গে নির্বাচন করব। নির্বাচনের পর সরকার গঠনেও থাকব। কিন্তু আমাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভোটে বিপর্যয়ের কারণে আমরা প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছি।

জাতীয় পার্টি সংসদে কৃত্রিম বিরোধী দল নয় বলে দাবি করে জিএম কাদের বলেন, বর্তমান বিরোধী দল কৃত্রিমভাবে তৈরি এটা কিছুটা হতে পারে; কারণ জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটভুক্ত হয়ে নির্বাচন করেছে। তবে সম্পূর্ণ কৃত্রিম বিরোধী দল নয়। জিএম কাদের জাতীয় পার্টিকে নিয়ে জনমনে সৃষ্ট এসব প্রশ্ন দেখা দেয়ায় এভাবেই তার জবাব দেন। বিরোধীদলীয় নেতা এইচএম এরশাদের অনুপস্থিতিতে বিরোধী দলের পক্ষে বক্তব্য দেন তিনি। 

জিএম কাদের বলেন, অনেকে বলেন সবকিছু পাতানো খেলা। জাতীয় পার্টি সরকারি জোটে থেকে নির্বাচন করেছে, এজন্য তারা মনে করছেন এখন হয়তো বিরোধী দলে থেকেও জাপা কার্যত সরকারের পক্ষ হয়েই কাজ করবে। বর্তমান যে সংসদীয় ব্যবস্থা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, তাতে এখানে যারাই বিরোধী দলে থাকুক না কেন ফল কী হবে সবাই জানে। 

তিনি বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো দলের সদস্য সেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন না। যার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যা সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই হবে। এ ব্যবস্থায় সবসময় জিতে সরকারি দল, আর বিরোধী দল সবসময় সংসদে হারে। আমি মনে করি, এটাই আসলে পাতানো খেলা। সে কারণে আমি বলব, আসলে ’৯০-এর পর থেকে প্রতিটি সংসদই পাতানো খেলা। আমরা যদি সংখ্যায় আরও বেশি থাকতাম, বেশি করে হইচই করতে পারতাম, তখন সংসদকে প্রাণবন্ত মনে হতো। কিন্তু বাস্তব অবস্থা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারতাম না।