আ’লীগকে ৩ বার ক্ষমতায় এনেছি, বিনিময়ে কিছুই পাইনি: এরশাদ

  বিশেষ সংবাদদাতা ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ২০:১৫ | অনলাইন সংস্করণ

এরশাদ

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ তিনবার আমাদের সহযোগিতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। বিনিময়ে আমরা কিছুই পাইনি।’

সোমবার জাতীয় পার্টির ৩২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর রমনায় অবস্থিত ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিরোধীদলীয় নেতা ও দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ এতে সভাপতিত্ব করেন।

জাতীয় পার্টি ছাড়া আগামী নির্বাচন হবে না দাবি করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, ‘এতদিন পরে আমরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি বিগ ফ্যাক্টর হবে। আমরা দেখাব, জাতীয় পার্টি সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। মানুষ পরিবর্তন চায়, জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। এ সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে।’

দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তোমরা প্রস্তুত হও, আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনবে। ক্ষমতায় যাবে। সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য লড়াই করতে হবে। বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে।’ এরশাদ বলেন, ‘১৯৯৬ সালে বিএনপির দেয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়ার বিনিময়ে তারা (আওয়ামী লীগ) আমার দলের তখনকার মহাসচিব আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে দিয়ে দল ভাঙালেন, আমাদের ১৪ জন সংসদ সদস্যকে কিনে নিলেন। আমাকে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করাসহ নির্বাচনে অযোগ্য করা হলো।’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘২০০৮ সালে মহাজোট করলাম। কথা ছিল ৪৮টি আসন দেয়া হবে, কিন্তু দেয়া হলো মাত্র ৩৩টি। জয়ী হলাম ২৯টিতে। বিএনপি পেলো ৩০টি। আমাদের কাছ থেকে যদি সেই ১৭টি আসন কেড়ে না নেয়া হতো তাহলে আমরা তখনই প্রধান বিরোধীদল হই। কিন্তু আওয়ামী লীগ তা হতে দিলো না। আর ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি যদি নির্বাচনে না যেতো তাহলে হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো’।

বিএনপির কথা উল্লেখ করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, ‘সীমাহীন অত্যাচারের মাধ্যমে বিএনপি আমাদের নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিল। আল্লাহ আছেন, বিচার আছে। আমাকে এবং আমার পরিবারকে বিনা দোষে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন। আজ (বেগম জিয়া) কারাগার আপনার অতি সন্নিকটে। আমার প্রতি অনেক অন্যায় কাজ করেছেন, আজ তার প্রতিফল পাচ্ছেন’।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান বলেন, ‘কেউ আমাদের সঙ্গে সুবিচার করেনি। আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেউ আমাদের প্রতি সদয় ছিল না। এত অত্যাচারের পরও আমরা বেঁচে আছি কেন? জাতীয় পার্টি ফ্যাক্টর কেন? কারণ আমরা মানুষের সঙ্গে অন্যায় করিনি। আমাদের হাতে রক্তের দাগ নেই। আমরা ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘মানুষের মাঝে প্রতিনিয়ত খুন আর গুমের ভীতি, অস্থির রাজনীতি। কিন্তু আমাদের মাঝে আর হতাশা নেই। বিজয়ের মাসে রংপুরে অভূতপূর্ব বিজয় প্রমাণ করেছে জাতীয় পার্টি আছে এবং থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপ্রধান হতে চাইনি। তৎকালীন বিএনপির সরকারের মন্ত্রীসভা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে সাত্তার সাহেবেরে অনুরোধে সেদিন ক্ষমতা নিয়েছিলাম। ক্ষমতা নিয়ে নির্বাচন দিয়েছিলাম। কেউ আসলেন না। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারীতে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করে সামরিক শাসন বিলুপ্ত করি। তার চার বছর পর নির্বাচন হলো। সে নির্বাচনে আওয়ালী লীগ, জামায়াত, সিপিবি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ ২৮টি দল অংশ নিলো। চার মাসের এই দল ১৭৪টি আসন পেয়ে জয়ী হলো।’

এরশাদ বলেন, ‘আমাদের শাসনামলকে কেউ অবৈধ বলতে পারবে না। কারণ, হাইকোর্ট ১৯৮৬ সাল থেকে জাতীয় পার্টির শাসনামল বৈধ ঘোষণা করেছে’।

জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি দেশের জন্য অনেক কিছু করেছি। আমার হাতে রক্তের দাগ নেই। ডা. মিলনকে কে হত্যা করেছে আমি জানি না। হত্যাকারীদের গ্রেফতারও করা হলো না। নূর হোসেনকে পেছন থেকে গুলি করা হলো, তার হত্যারও বিচার কোনো সরকার করলো না। আমি ক্ষমতায় আসতে পারলে এই হত্যার বিচার করে প্রমাণ করবো আসলে এই হত্যার পেছনে কারা দায়ী। আর কেনো তাদের হত্যা করা হলো’।

নিজ দলের ভবিষৎত উত্তারধিকারী প্রসঙ্গে এরশাদ বলেন, ‘জাতীয় পার্টির ভবিষৎত দায়িত্ব কে পাবেন তা একটি বিরাট প্রশ্ন। এ বিষয়ে আমি সিদ্ধান্ত দিবো। আর যদি কোনো কারণে আমি ঘোষণা না করে যেতে পারি, তাহলে প্রেসিডিয়াম সিদ্ধান্ত নেবে কে হবেন জাতীয় পার্টির ভবিষৎ চেয়ারম্যান’।

সভাপতির বক্তব্যে দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, জনগণ এখন সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। জাতীয় পার্টিও চায়। রংপুরে এর প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন হলেও ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। রাজধানী ঢাকায় উন্নয়ন দেখা গেলেও ঢাকার বাইরে তা হচ্ছে না।

রওশন এরশাদ নিজ দল প্রসঙ্গে বলেন, আমরা কারো দাবার গুটি হতে চাই না। আমরা রাজা হতে চাই। দেশবাসীর ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে চাই।

মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিমন হাওলাদার বলেন, ‘দেশের মানুষ আগামীতে এরশাদকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চায়। রংপুর থেকে আমাদের বিজয়ের যে যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরা তা অব্যাহত রাখতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘সব বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে আগামী দিনের সরকার হবে এরশাদের সরকার। জাতীয় পার্টির সরকার।’

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন কো চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, এসএম ফয়সল চিশতী, শ্রমিক পার্টির সভাপতি একেএম আশরাফউজ্জামান খান। সভায় প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহিদুর রহমান টেপা, শেখ মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, গোলাম কিবরিয়া টিপু, নুর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরী এমপি, মহসীন রশিদ, সুনীল শুভ রায়, সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, মীর আবদুস সবুর আসুদ, হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, মো. সোলায়মান আলম শেঠ, মো. আজম খান, মেজর মো. খালেদ আখতার (অব.), মো. শফিকুল ইসলাম সেন্টু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভুইয়া, সৈয়দ দিদার বখত, ক্বারী হাবিবুল্লাহ বেলালী, রওশন আরা মান্নান এমপি, নাজমা আক্তার, এম এম নিয়াজ উদ্দিন, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার, এম এ তালহা, অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, জহিরুল ইসলাম জহির, মো. আরিফুর রহমান খান, নুরুল ইসলাম নুরু, দিদারুল আলম দিদার, সরদার শাহাজহান, যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোহাম্মদ রাজু, মোস্তাকুর রহমান মোস্তাক, শেখ আলমগীর হোসেন, কাজী আশরাফ সিদ্দিকী, জহিরুল আলম রুবেল, সাংগঠনিক সম্পাদক আমির উদ্দিন আহমেদ ডালু, মনিরুল ইসলাম মিলন, মো. ইসহাক ভুইয়া, ফকরুল আহসান শাহাজাদা, মোবারক হোসেন আজাদ, আমির হোসেন ভূইয়া এমপি, মনিম চৌধুরী বাবু এমপি, কেন্দ্রীয় নেতা সুলতান মাহমুদ, মো. বেলাল হোসেন, অনন্যা হুসেইন মৌসুমী, নিগার সুলতানা রানী, এম এ রাজ্জাক খান, মো. জামাল রানা, শারমিন পারভীন লিজা, সৈয়দা পারভীন তারেক, ডা. সেলিমা খান, মনোয়ারা তাহের মানু, মো. হারুন অর রশিদ, গোলাম মোস্তফা, আমিনুল ইসলাম ঝন্টু, সুমন আশরাফ, আবু সাঈদ স্বপন, শাহাদাত কবির, শাহিদা রহমান রিংকু, সৈয়দ ইফতেকার আহসান হাসান, মো. দ্বীন ইসলাম শেখ, রিতু নুর, আসমা সুলতানা, মিনি খান, মোমেনা আক্তার, তাছলিমা আক্তার রুনা, শেখ মোহাম্মদ শান্ত, মো. জাহিদুল ইসলাম জাহিদ,গোলাম মোস্তফা আঙ্গুর, সোলায়মান সামী উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভা শেষে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। এর মধ্য দিয়ে রাজধানীতে ব্যাপক শোডাউন করেন জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা।

শোভাযাত্রায় অংশ নেয়ার জন্য সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন ইঞ্জিনির্য়ার্স ইন্সটিটিউটশনের সামনে। আনুষ্ঠানিকভাবে শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার আগেই ইঞ্জিনির্য়ার্স ইন্সটিটিউশনের বাইরের পুরো এলাকা নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

শোভাযাত্রায় জাতীয় পার্টি ছাড়াও জাতীয় ছাত্র সমাজ, জাতীয় যুব সংহতির, জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টি, জাতীয় কৃষক পার্টি, জাতীয় মহিলা পার্টি, জাতীয় শ্রমিক পার্টি, জাতীয় ওলামা পার্টিসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বেলা দেড়টার দিকে শোভাযাত্রাটি ইঞ্জিনির্য়ার্স ইন্সটিটিউটশনের সামনে থেকে শুরু হয়ে মৎস্য ভবন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, পল্টন মোড়, বিজয় নগর হয়ে কাকরাইলের জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter